জনপ্রিয় পোস্টসমূহ

বুধবার, ১৩ আগস্ট, ২০১৪

বৃষ্টি বিলাস-৩


শহরে রাত জুড়ে কোলাহল থাকে
দিনের হিসেব কষবার,রাত্রী গভীর হবার!
তবুও,
খানিকটা সময় এর জন্য তা থেমেও থাকে
রাত্রীর সেই নীরবতায় সৃষ্টি হয় সুনিপুণ ছন্দের
আর সে ছন্দে ছন্দে সৃষ্টি হয়
বর্ষার আবেশ,শ্রাবণের শেষ রেশ!

শহর জুড়ে নামছে বৃষ্টি
থেমেছে কোলাহল
শ্রাবন দিনের গল্প ফুরোলো
বৃষ্টি সরবোর!

বৃষ্টি আসুক তমুল বেগে
বৃষ্টি আসুক শর্ত ভেঙ্গে
অনেক বৃষ্টি,অনেক গল্প
থাকুক জুড়ে ভূবন
বৃষ্টি থাকুক সময় হয়ে অনেক বেশি আপন! 


বৃহস্পতিবার, ৩১ জুলাই, ২০১৪

নীলমেঘের দেশ


''হাঁটতে-হাঁটতে হাঁটতে-হাঁটতে
একসময় যেখান থেকে শুরু করেছিলাম সেখানে পৌঁছুতে পারি
পথ তো একটা নয়,
তবু, সবগুলোই ঘুরে ফিরে ঘুরে ফিরে শুরু আর শেষের কাছে বাঁধা
নদীর দু – প্রান্তের মূল
একপ্রান্তে জনপদ অন্যপ্রান্ত জনশূণ্য
দুদিকেই কূল, দুদিকেই এপার-ওপার, আসা-যাওয়া, টানাপোড়েন!'' 

খুব পরিচিত আর প্রিয় কবিতাটা অচেনা কারো ওয়ালে দেখে চোখ আটকে গেলো! এই কবিতাটা আমি সচরাচর পরিচিত মানুষজনদের ওয়ালে দেখি না,খুঁজে দেখলাম শৈলী নামে কেউ একজন কবিতাটা পোষ্ট করেছে। খানিকক্ষন টাইম লাইনে ঘুরে আসলাম,এই এক কবিতা ছাড়া আর কিছু দেখলাম না,সে আসলে কবিতা পড়ার মানুষ কি না তাও বুঝলাম না।
ট্যাব থেকে চোখ তুলে একবার জানালা দিয়ে বাইরে তাকালাম,চমৎকার একটা আবহাওয়া চারপাশে,আকাশে চাঁদটা এখনো পরিপূর্ণ জোছনা হয়ে উঠেনি,দু'একদিনের মধ্যেই হবে। আচ্ছা,সব সুন্দর জায়গায় যাত্রাকালেই কি আবহাওয়া খুব সুন্দর থাকে? গল্পে-উপন্যাসে,মুভি-নাটকে সব সময়ই দেখা যায়,খুব চমৎকার একটা জায়গায় হয়তো যাওয়া হচ্ছে,তখন চারপাশের আবহাওয়াটাও অনেক সুন্দর থাকে!ইটস জাস্ট কো-ইন্সিডেন্স?
আপন মনেই হাসলাম! বাইরে থেকে চোখ সরিয়ে পাশের সীটে ফেরালাম। সহযাত্রীর ঘুমে ঢুলতে ঢুলতে পড়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখার ইচ্ছে নেই বলে আবার চোখ সরিয়ে নিলাম। যেভাবে ঘুমে একদিকে কাঁত হয়ে আছে,যেকোন মূহুর্তে বাস ব্রেক কষলে কিছু একটা হবেই,আই থিংক আমার উচিত তাকে সতর্ক করা!উসখুঁস করতে করতে আবার তাকালাম,কিন্তু কিছু বলতে পারলাম না।
প্যাডটা ব্যাগে রেখে পুরনো ডায়রীটা বের করলাম। ভেতরের পাতায় খুব যত্ন করে অনেক পুরনো একটা চিঠি পিনাপ করে রেখেছি,বের করে সেটা পড়া শুরু করলাম। এই চিঠি টা যে আমি কতো হাজার বার পড়লাম,তার হিসেব নেই,প্রায় ৫বছরের বেশি সময় ধরে চিঠিটা আমার সাথেই আছে,নীল জলছ্বাপের পাতায় সবুজ কালিতে লেখা চিঠিটার প্রতিটা লাইন,শব্দই আমার মুখস্থ,এমনকি শব্দের সাথে জড়িয়ে থাকা লেখকের আবেগ গুলোও! কি যত্ন করেই না চিঠি টা লিখেছিলো আমাকে,তরু'পা...
তরু'পা কে চিনতাম ছোট বেলা থেকেই,তবে জানা শুরু হয়েছিলো কলেজ দিন গুলোতে। প্রায় দুপুরেই ক্লাস শেষে বাড়ি ফিরে কোচিং এর জন্য বের হবার কালে দেখতাম,বারান্দায় বসে একমনে চিঠি পড়ছেন। কৌতুহল জাগতো খুব!রোজ অমন করে কার চিঠি পড়েন তিনি?আজকাল কে এমন আছে,যে রোজ চিঠি লিখতে পারে কাউকে!
ইয়ার ফাইনাল শেষ করে,এক বিকেলে খুব করে ধরেছিলাম,জানলাম চিঠি গুলো জামান ভাই মানে তরু'পার জামাই পাঠায় সুদুর সিয়েরালিওন থেকে। গল্প করতে করতে এক পর্যায়ে তরু'পা বলল,
-তুই ভাবছিস,খুব দীর্ঘ চিঠি লিখে সে?মোটেও নারে!আমার ৪/৬পাতা চিঠির জবাবে খুব বড়জোর দেড় পাতার একটা চিঠি আসে।
-আর তুমি সেটাই পড়ো দেড় সপ্তাহ লাগিয়ে?!
জবাব না দিয়ে হেসেছিলো তরু'পা। কি সুন্দর সে হাসি!আজো চোখ বন্ধ করলে দিব্যি দেখতে পাই।
চিঠি ইস্যুতেই রোজ বিকেলে জমে উঠতো আমাদের গল্প। কফির মগে চুমুক দিতে দিতে আমি অবাক হয়ে যেতাম,তরু'পা বলতে গেলে জামান ভাইয়ের সমস্ত চিঠিই মুখস্থ করে রেখেছেন,গল্প কথার সময় হুবহু তা বলতে পারতেন! কি আবেগরে বাবা! মাথায়ই ঢুকতো না,কেমনে পারে এতো আবেগি হতে,যেখানে কি না দু'জনের মাঝে হাজার হাজার মাইলের ব্যাবধান! আর জামান ভাই তো বিয়ের মাস তিনেকের মাথায় মিশনে চলে গেছেন,সেখানে এই মানুষটাকে এতো অল্প সময়ের মাঝে এমন পাগলের মতো ভালো কি করে বাসল তরু'পা?! আমার তখন চিন্তা করতে গেলে মাথা হ্যাং হয়ে যেতো,আর এখন ভাবতে গেলে দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসে!
প্রায় সময় রাত ১২টা, ১টার দিকে ঘুমে ভারি হয়ে আসা চোখের পাতা মেলে আমি যখন ম্যাথ করায় ব্যস্ত থাকতাম,চোখ তুলে বারান্দায় তাকালেই দেখতাম,এক হাতে মোবাইল নিয়ে উদাস নয়নে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে তরু'পা। ধীরে ধীরে এক সময় আশে-পাশের সব বাতি নিভে যেতো,শুধু তরু'পা জেগে থাকতো মোবাইলের বাতি টা জ্বলে উঠার অপেক্ষায়! কখনো সে অপেক্ষার অবসান ঘটতো আর বেশিরভাগ সময়ই রাত পেরিয়ে ভোর হয়ে যেতো।

হর্নের শব্দে আমার ভাবনায় ছেদ পড়ল। মাথা তুলে আসে-পাশে একবার তাকালাম,সব ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে আছে! বার কয়েক হাই তুলে ডায়রীটা ব্যাগে ঢুকিয়ে রাখলাম। পাশের জন এখনো সেই অবস্থায় ই ঘুমাচ্ছে!এই দৃশ্য দেখলে যে কেউ ই বুঝবে,পৃথিবীতে 'বালিশ' নামক বস্তুটা আল্লাহ কতটা রহমত স্বরুপ দিয়েছিলেন!
অফিসে আমার এক কলিগ আছে,জয়।বেশ সাংস্কৃতিমনা মানুষ, জীবনে শিল্পী হবার আশা থাকলেও বাস্তবতা তাকে বানিয়েছে ব্যাংকার,আর তাই সে এখন গুণ গুণ করতে করতে ক্লাইন্টদের অভার ডিউ হিসেব করে। আমার এই ট্যুর এর কথা শুনে সে খুব আফসোসের সুরে বলছিলো,
-ম্যাডাম,আপনার যাওয়া উচিত,পিরামিড দেখতে অথবা এর থেকে বেশি হইলে বিল-গেটসের বাড়ি!তা না যেয়ে আপনি যাচ্ছেন এমন জায়গায়,যেখানকার আসল স্বাদটা ই উপলব্ধি করতে পারবেন কি না সন্দেহ!
পাশ থেকে আরেক সুপ্ত কবি নিয়াজ ভাই বলে উঠল,
- আরে জয়,নিতু কি সেখানে আসলে বেড়াতে যাচ্ছে মনে হয়?আর যদি যায়ও দেখবা আল্টিম্যাটলি ব্যাংকেরই লাভ! ঐ জায়গায় প্রফিটেবল ইনভেষ্ট করার মতো কোন প্রজেক্ট আইডিয়া নিয়ে আসবে মাস্ট!
মুচকি হেসে মাথা দুলিয়ে বলেছিলাম,
-রাইট,হান্ড্রেড পার্সেন্ট রাইট!
সারাক্ষন কাজ কাজ করা মানুষদের সম্পর্কে সবারই এমন ধারনা থাকে,আর আমার কাছে এটাই প্রশান্তি! আমি তো জীবনে এমন কিছু সময়,আর নিজের সম্পর্কে এমন কিছু ধারনাই চেয়েছিলাম।
গাড়ির এসি টা অফ করে,জানালা খুলে দিতে ইচ্ছে করছে। বাইরে এতো সুন্দর বাতাস বইছে,আর সেখানে এই দম বন্ধ পরিবেশ বেড়ানোর মুডে ক্লান্তি বাড়াচ্ছে! পাশের মানুষটা কে এবার ডাকতেই হবে! আমার ডাক শুনে অনেকটা ঢুলু ঢুলু অবস্থায় ঘাড় ম্যাসাজ করতে করতে উঠে ড্রাইভার কে বলে এসি টা অফ করে এসে সীটে বসে বলল,
- টিকেট কাটার সময়,ম্যানেজার ব্যাটা কে এত্ত করে জিজ্ঞেস করলাম,যে ভাই আপনাদের বাসের সীটের অবস্থা কেমন?আরামে ঘুমানো যাবে তো?ব্যাটা কি সুন্দর দাঁত কেলিয়ে বলল,আরে ভাই,সীটে মাথা রাখলে মনে নিজের বিছানায় বালিশে মাথা রাখছেন!ব্যাটা মিথ্যুক,এমন জঘন্য সীটকে বালিশের সাথে তুলনা করছে!চিন্তা করছো?
আমি আইপ্যাডের দিকে চোখ রেখে বললাম,
- তোমার অবস্থা দেখে একটা গল্পের কথা মনে পড়ে গেলো! শুনবা?
-হুম,শোনাও!ঘুমের ভাবটা কাটুক,আর খাওয়ার কি আছে একটু দাও!
হায়রে খাওয়া! এমন ফালতু ঘুম দেয়ার পর মানুষের মাথা যন্ত্রণা করে,তার পানিটা খাওয়ারও ইচ্ছে থাকে না,আর এই মানুষের ক্ষুধাই লেগে গেছে!
খাওয়া হাতে ধরিয়ে দিয়ে আমি খুব সংক্ষেপে বললাম,
-এক বার এক ব্যাবসায়ী বিয়ের পর বউ নিয়ে সমুদ্র দেখতে গেছে,ধরো কক্সবাজার। ভদ্রলোক ব্যাবসায়ী হলেও,মনে মনে বেশ প্রকৃতি প্রেমিক ছিলেন, তখন ওখানে যাওয়া-থাকার ব্যাবস্থা এতো উন্নত ছিলো না,তারা খুব্বই কষ্ট করে খানিকটা বাসে তারপর পায়ে হেঁটে সমুদ্র দেখতে গেলেন,এবং থাকলেনও খুব কষ্টকর ভাবে। ফিরে এসে ভদ্রলোক কঠিন নিয়্যাত করলেন,এবং তিনি পরের ৫বছর তার বিজনেসে যা ইনকাম হলো টা দিয়ে ঐ সমুদ্র পাড়ে খুব সুন্দর একটা কটেজ তৈরী করলেন,এবং একটা বাস সার্ভিসও চালু করলেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন,নিজের কষ্টটা উপলব্ধি করতে পারলে অন্যের কষ্ট লাঘব করা সম্ভব,আর তাই তিনি সমুদ্র দেখতে যেয়ে আর কেউ যেনো তার মতো কষ্ট না করে সেই ব্যাবস্থা করেছিলেন। দিস ওয়াজ স্টোরি,বুঝলা?
গল্প শুনে হাই তুলতে তুলতে বলল,
-ফিলিং ভাগ্যবান! তুমি এইজন্যই আসলে এতো কম সময়ে কাজে উন্নতি করতে পারছো,কি দারুন ভাবে তুমি এক ঢিলে এত্তো গুলা পাখি মেরে ফেললা! বিজনেস আইডিয়া,হিউমেন সার্ভিস,আবার সেলফ ড্রিমস!বাহ!!
আমি কি-প্যাডে আঙ্গুল চালাতে চালাতে বললাম,
-থ্যাংকস!এবার তুমি খাওয়া শেষ করে আবার ঘুমাতে পারো,তবে খেয়াল রেখো,যেনো গাড়ি হার্ডব্রেক কষলে ঘাড় ভেঙ্গে না যায়,যেখানে যাচ্ছি সেখানে ঘাড় ম্যাসাজ করতে থাকা লোকজন এর সাথে থাকার ইচ্ছে নাই আমার!
হুম হুম করতে করতে সে খাওয়ায় মনোযোগ দিলো,আর আমি আমার কাজে।

'নীলমেঘের দেশ'এর গল্পটা আমি প্রথম শুনেছিলাম তরু'পার মুখে। জন্ম থেকে শহরের গন্ডিতে বড় হওয়া আমার জানার জগতে 'নীলমেঘ ছুঁয়ে দেখার'আনন্দ কি জিনিস টা বুঝার ক্ষমতা ছিলোই না বলা যায়। বড় জোর মাঝে-সাঝে সবুজ ঘাসের উপর খালি পায়ে হাঁটতে শিখেছিলাম। আমি যতবার এই 'নীলমেঘের দেশ'এর গল্প শুনতাম ততোবারই মনে হতো,জীবনে বোধহয় তরু'পার আর কোন ইচ্ছেই নেই শুধুমাত্র জামান ভাইয়ের হাত ধরে নীলমেঘের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া। তরু'পা তার প্রতিটা চিঠিতেও এই নীলমেঘের দেশের বেড়াতে যাবার প্ল্যান লিখতেন,চিঠি শুরু হতো সেই প্ল্যান দিয়ে আর শেষ হতো সেই প্ল্যান বাস্তবায়নের অপেক্ষা দিয়ে,এতোটা মন থেকে কেউ প্রিয়জনের সাথে কোথাও যাওয়ার ইচ্ছে পুষতে পারে দিনের পর দিন,এটা আমার ধারনার বাইরে। একবার ঠাট্টাচ্ছলে বলেছিলাম,
-তুমি যেভাবে নীলমেঘ দেখতে যাওয়ার জন্য ব্যাকুল,বেচারা জামান ভাই তো মনে হয় ওখান থেকে পারলে উড়েই চলে আসে!
তরু'পা তখন মলিন হাসি হেসে বলেছিলো,
-ইশ!যদি সত্যিই মানুষটা উড়ে আসতো!
সেই প্রথম,সেই দিনই প্রথম আমি তরু'পার চোখে অভিমানের মেঘ দেখেছিলাম। দূরে থাকা মানুষটার জন্য কেবল ভালোবাসাই নয়,অভিমানের শক্ত পাহাড়ও তৈরী হয়,কখনো ভালোবাসার বৃষ্টি সেই পাহাড় কে গুঁড়িয়ে দিতে পারে,আর কখনো পারে না।
দিন গেছে,মাস গেছে কতো-শত দিন গেছে,আমি শুধু নীরবে দেখে যেতাম তরু'পার অপেক্ষার দিন গুলো কতোটা অসহনীয় ভাবে কাটতো,কতোটা মলিন ছিলো সেই সময় গুলো। একটা সময় অবাক হতাম,অভিমানের সাথে যুদ্ধ করে কিভাবে মানুষ?এই যুদ্ধে কি ভালোবাসা জিততে পারে? তরু'পা কে দেখে বুঝেছিলাম,কঠিন সেই যুদ্ধ করাটা কতোটা কঠিন ছিলো।

শুভ্র খুব ভয়ে ভয়েই বেড়াতে যাবার প্রস্তাবটা আমাকে দিয়েছিলো। ওর ঠিক ধারনা নয়,বিশ্বাসই ছিলো যে আমি এক ঝাটকায় না করে দিবো!যেটা সচরাচর করি। কিন্তু আমি বেশ নির্বিকার ভঙ্গিতেই বললাম,
-কোথায় যাওয়ার প্ল্যান করেছো?
-তা এখনো ঠিক করিনি! তবে যেখানেই যাই,গুণে গুণে ৪দিন,যেতে-আসতে ২দিন আর থাকবো ২দিন,ব্যাস! ৪টা দিনের জন্য কি একটু কষ্ট করে ছুটি ম্যানেজ করা যাবে না?
আমি খাবারের প্লেট গুলো ধুয়ে রেখে এসে বললাম,
- ৪দিন না,আমরা যাবো ৭দিনের জন্য।
শুভ্র অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইল!
-সাআআআত দিন!!বলো কি? দীর্ঘ ৪বছরে যেখানে ৪দিন আমরা কখনো ছুটি কাটাতে কোথাও যাইনি,সেখানে ৭দিনের জন্য যাবো??কেমনে কি হইলো? তোমার অফিসিয়াল কোন কাজ আছে নাকি ঢাকার বাইরে?
আমি কিছু বললাম না সাথে সাথে। যে মানুষ ছুটি কাটাইনি,তার হিসেব রাখে অথচ কেন কাটায়নি তার খবরের আগা-মাথাও জানে না,তাকে আর কি ব্যাখ্যা করবো! খানিক সময় পর বললাম,
-আমরা কোথায় যাচ্ছি বললে না তো?
-এখনো ঠিক করিনি,আমি তো ভেবেছি তুমি না বলবে!দু'দিন সময় দাও,আমি জায়গা ঠিক করে ফেলবো।
-ওকে। তবে আমি একটা জায়গা সাজেস্ট করতে পারি,বান্দরবান।
শুভ্র খানিকটা কিউরিয়াস টোনে জিজ্ঞেস করলো,
-বান্দরবান?তুমি আগে গিয়েছিলে কখনো?
-নাহ,তবে এখন গেলে যেতে পারি,'নীলমেঘের দেশে'।
শুভ্র আমার মুখের দিকে অনেকক্ষন তাকিয়ে থেকে বলল,
-'নীলমেঘের দেশ'! তুমি যে কখনো নীলমেঘ ছুঁতে পছন্দ করো জানতাম না!
তারপর খুব হালকা ভাবেই বলল,''ওকে,এটাই ফাইনাল থাকল। ইনশাআল্লাহ,ওখানেই যাচ্ছি আমরা।
আমি খানিকটা আপন মনেই হাসলাম! শুভ্র যদি ভুলেও কোনদিন আমার পারসোনাল ফ্লোডার বা কাবার্ডে লুকিয়ে রাখা এলবামটা দেখতো,তাহলে হয়তো আর এই কথা বলতো না। সে জানেও না,তার দেখা এই অফিস-বাসা,ব্যস্ত মানুষটা একটা সময় কতোটা দূরন্ত আর স্বপ্নবিলাসী ছিলো! এই শহরের অলি-গলি থেকে শুরু করে অখ্যাত,ভাঙ্গাচূড়া টং এর দোকানটা পর্যন্ত তার নখদপর্ণে ছিলো,মেয়ে বলে কোথাও বসলে লোকে কি ভাববে টা কোনদিন কেয়ার না করেই বর্ষা ছুঁতে ঘুরে বেড়ানো,শহর ছাড়িয়েও বহুদূর পর্যন্ত পূর্ণিমায় একলা সন্ধ্যায় হেঁটে বেড়ানো সেই মানুষটা কে তো শুভ্র কোনদিন জানেই নি!
পূর্ণিমার কথা মনে হতেই হঠাত বললাম,
-ঠিক আছে,তবে একটু খেয়াল করো,আমরা যখন যাচ্ছি সেই সময়টা যেনো পূর্ণিমার শেষ ৭/৮দিন হয়।কারণ,পূর্ণিমা ছাড়া ওখানে যেয়ে অতো আনন্দ নেই।
শুভ্র আবারো অবাক হয়ে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল। আমি তখন ছোট্ট করে মুখে থ্যাংকস বললেও,ভেতরে তখন আমার ঝড়ের পূর্বাভাস শুরু করে গিয়েছিল!
'নীলমেঘের দেশ'! পূর্ণিমা রাতে পাহাড়ের চূড়োয় দাঁড়িয়ে মেঘ ছুঁয়ে কবিতা পড়া! এই বাক্যগুলো তো আমি আর কোনদিন আমার চিন্তায় আনবো না বলেই পণ করেছিলাম!তীব্র স্রোতের ধাক্কায় আমি সেই কবেই ভাসিয়ে দিয়েছিলাম সব তা তো ভুলেই গিয়েছি!
নাহ,এই পণ শুধু তরু'পার জন্যেই করিনি,আসলে তখন এই পণ না করলে হয়তো আমার সময় গুলোও আটকে যেতো বহু আগে! এই পণের জালে নিজেকে না বাঁধলে হয়তো আজ আর আমি এই বর্তমান খুঁজে পেতাম না। যেখানে আমার আছে,আমাদের আছে কিন্তু কেবল 'আমি'ই নেই!
আফসোস নেই আমার এ নিয়ে,আমি এমনটা ই চেয়েছিলাম। এমন একটা ব্যস্ত সময়,আর কিছু হালকা অনুভূতি,যা কখনো নাড়া দিবে না,জাগাবেও না। পেয়েছিও বলবো,এবং  আমি এতেই খুশি তবে মাঝে মাঝে শুভ্র যখন দীর্ঘশ্বাস ফেলে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে,তখন কি যেনো 'নেই' মনে হয়! পেছন ফিরে তাকাতে ইচ্ছে হয় খুব কিন্তু তবুও আমি অনড়। মানুষ সব সময় নিজেকে মানুষ ভেবে সুখ পায় না,সুখ খুঁজে না,আর আমি যখন বুঝতে পেরেছি এটা,তখন থেকেই সুখের সংগা নিজের জন্য বদলে নিয়েছি। উপায়হীন সেই আমার জন্য তখন আর এখনো এটাই শ্রেয় ছিলো,আছে।

আর তাই,ল্যাগেজ গুছাতে গুছাতে ও আমি দ্বিধায় ভুগছিলাম,যে আমার আসলে বান্দরবান যাওয়া ঠিক হচ্ছে কি না! ফিরে এসে কি সব কিছু আগের মতো থাকবে? ডায়রীটা ব্যাগে ঢুকিয়ে নিজের সাথে যুদ্ধ করতে করতেই পথে বেড়িয়েছি। আজ অনেক বছর,সহস্র দিন পর আরেকবার মানুষ হয়ে সুখ খুঁজতে বের হচ্ছি! নিজেকে নিজের আয়নায় দেখার চেষ্টা করতে যাচ্ছি,সেই অনেক দিনের পুরনো আর কাংখিত নীলমেঘের দেশে।
গাড়ির ঝাঁকুনিতে চিন্তার জাল ছিঁড়ে বাস্তবে ফিরলাম। পাশে তাকিয়ে দেখি,আবারো আগের মতোই ঘুমে ঢুলতে ঢুলতে পড়ে যাবার অবস্থায় আছে শুভ্র! ওকে ডেকে বললাম,
-তুমি চাইলে ঘুমে ঢুলতে ঢুলতে ডান দিকে না যেয়ে বাম দিকে পড়ে যেতে পারো,তাতে অন্তত আর যাই হোক,ঘাড় ভাঙ্গার আশংকা থাকবে না!
হাই তুলতে তুলতে বলল,
-আর তুমিও চাইলে আইপ্যাডটা ব্যাগে রেখে গল্প করতে করতে আমার ঘুম তাড়াতে পারো!
আমি বিড়বিড় করে বললাম,
-এ কাজে আমি অভ্যস্ত নই!
শুভ্র শুনতে পায়নি,আর তাই উত্তরের অপেক্ষায় সে আবারো ঘুমিয়ে পড়লো! আমি আরো কিছুক্ষন বাইরে তাকিয়ে থেকে  আবারো ডায়রি বের করে সেই চিঠিটা মেলে ধরলাম, যেখানে ক'টা লাইন ছিলো,
''আজকাল সবাই বলে,প্ল্যান ক্রাশে দেশে ফেরার পথে তোর জামান ভাই মারা গেছে!কিন্তু তুই কি জানিস,সেই মানুষটা আমার কাছে ফিরে এসেছে সবার অলোক্ষ্যে! আমি জানি,তুই সেটা জানিস। এবং এটাও জানিস,আমার নীলমেঘের দেশে ঐ মানুষটার সাথে এখনো রোজ যাওয়া হয়। আমার কেমন লাগে তুই বুঝতে পারিস নিতু?
জীবন টা কেমন তুই জানিস? নাহ,জানিস না আর তাই তোকে বলছি,নীলমেঘদের গল্পটা ভুলে যা,একেবারেই মুছে ফেল মন থেকে! তুই যদি কখনো শখের বাগান তৈরী করিস,তবে ভুলেও সেখানে নিজের প্রিয় বেলি ফুলের গাছ রাখবি না,কখনো যদি বিশাল খাঁচায় পাখি পুষার সুযোগ পাস,হাজার পাখি রাখলেও ময়না রাখবি না!কখনো যদি নিজের জন্য একটা ছোট্ট ফ্ল্যাট কেনার সুযোগ পাশ,অবশ্যই সেখানে কোন দক্ষিণ-পশ্চিম মুখো খোলা বারান্দা রাখবি না!
নিতু,সুখ ছুঁতে চাসনে কখনো,কখনোই না। কেবল ধরে নিস,কখনো না কখনো টা আসবেই,তবে কিভাবে জানতে চাসনে। আমি তোর মাঝে আমার প্রতিচ্ছবি দেখার ভয় করি!আর তাই বলছি,আজ না হলেও কাল তোকে ভুলে যেতেই হবে,কখনো কোথাও হাত বাড়ালেই মেঘ ছুঁয়ে দেখা যায়,চাইলে জোছনা ছুঁয়ে নিঃশ্বাস নেয়া যায়,দু'হাত মেলে নিজের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়। ...... ''
তরু'পা ঠিকই বুঝেছিলো,আজ না হলেও কাল আমাকে ভুলে যেতেই হবে,কিন্তু ঘুরতে ঘুরতে যদি সেই ভুলে যাওয়া গল্পটাই সুখ হয়ে ধরা দিতে চায় তাহলে কি করতে হয়?! তা কি তরু'পা জানতো?
এই যে পাখির কিচির-মিচির শব্দ,চারপাশে ফুঁটে উঠা ভোর আর পাশে থাকা মানুষটা,যে অনেক দূরে থাকলেও হাত বাড়ালেই তাকে ছোঁয়া যায় এই সব কিছুই যদি সেই না চাওয়া সুখের গল্প হয়,তাহলে কি নীলমেঘ ছুঁতে চাওয়া যায় না? তরু'পা নিজেও হয়তো সে উত্তর জানে না,তবে আমার জানার বড্ড ইচ্ছে। আমার শুভ্র কে জানানোর ইচ্ছে,ভোরের শুদ্ধ সময়ে আর শেষ বিকেলের নীলপটে কি করে মেঘ ছুঁতে হয়,জোছনা রাতে মেঘের বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে কি করে কবিতা পড়তে হয়,কি করে সুর সুরে বলে দেয়া যায়,জোছনা রাতে কান্নার জল ছুঁয়ে সেই ভুলে ভরা গল্প গুলো...

কবিতাঃ মনে মনে বহুদূর চলে গেছি-শক্তি চট্টোপাধ্যায়।





শনিবার, ২৬ জুলাই, ২০১৪

সময়টা কে তৈরী করুন আমি-আমার-আমাদের জন্য।


হে নবী! #প্রজ্ঞা ও #বুদ্ধিমত্তা এবং #সদুপদেশ সহকারে তোমার রবের পথের দিকে দাওয়াত দাও এবং লোকদের সাথে #বিতর্ক করো সর্বোত্তম পদ্ধতিতে। তোমার রবই বেশী ভালো জানেন কে তাঁর পথচ্যুত হয়ে আছে এবং সে আছে সঠিক পথে। *[সূরা আন্ নাহলঃ ১২৫]*

ছোট্ট একটা উদাহরন দেই,ধরুন আপনি একটা বাসায় গেছেন,যে বাসায় একজন মুরুব্বি মারা গেছেন,শোকার্ত পরিবেশ,কারো মুখে কারো বা মনে কিন্তু সবাই মোটামুটি শোকাহত। আপনি যেয়ে দেখলেন,কেউ খাচ্ছে আর কেউ বসে কোরআন পড়ছে আর কেউ স্মৃতিচারণ করছে। এমন অবস্থায়,আপনি মৃতের আত্নীয়দের বলা শুরু করলেন,
'হ্যাঁ,তোমরা তো বেঁচে থাকতে মানুষটার কদর করনি,সেবা করোনাই আর এখন একটু শোক করবা,তাও ঠিক মতো করো না,তোমাদের দিয়ে আসলে কিচ্ছু হবে না,তোমাদের ছেলে-মেয়েরাও তোমাদের জন্য কিছু করবে না... তবে যদি তোমরা এখন থেকে সঠিক ভাবে নিজেদের কে সংশোধন করো,তাহলে হয়তো তোমাদের উপর আল্লাহ রহম করবেন,যা যা ভুল হয়েছে তা মাফ করবেন।'
তাহলে বলুন তো,উপরের ঐ কোরআনের আয়াতে আল্লাহ যে ভাবে দাওয়াত দিতে বলেছেন,আপনি কি সেভাবে দাওয়াত দিলেন?বা আপনার দাওয়াত টা,সদুপদেশ গুলো কি #গ্রহনযোগ্য হবে? অথচ আপনি কিন্তু বলেছেন,সুন্দর নিয়ত নিয়ে,নিজের কাজের বিনিময়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের পাশাপাশি মানুষ গুলোকেও সঠিক ভাবে চলার জন্যে। কিন্তু মানুষ কি সেটাকে আন্তরিক ভাবে গ্রহন করতে পারবে?
বরং এখানে কি হবে?এক শ্রেণি সুবিধা নিবে এই বলে,' যে ঐ দেখো,আসছে ভালো কথা বলতে!এভাবে মানুষের মুখের উপর দোষ বলে আবার ভালো কথা বলে কেউ?' আরেক শ্রেনী বলবে,' অবস্থা বুঝে আসছে ফায়দা নিতে,সবার সামনে ওদের দোষও বলল আবার নিজে ভালো সেটাও বুঝায় দিলো,নিজে যে কি তা কি মানুষ জানে না?!
মোট কথা দেখা যাবে,৩ভাগের ২ভাগ লোকই আপনার বক্তব্যের নেগেটিভ অর্থ বের করবে,এবং যার ফলে বাকী ১ভাগ যদি ভালোভাবে গ্রহন ও করতে চায় তাহলে তারাও কনফিউসড হয়ে যাবে।

কোরআনে আল্লাহ স্পষ্ট ভাবে বলে দিয়েছেন, প্রজ্ঞা,বুদ্ধিমত্তা,সদুপদেশ এই ৩টি উপাদানের সংমিশ্রনেই আপনি মানুষকে ভালো কাজের দিকে আহবান জানাবেন,আপনার কথায় এই তিনটা বিষয়ের উপস্থিতি অবশ্যই থাকবে। আপনি যা বলবেন,তাতে জ্ঞান থাকবে,সরাসরি নয় তবে কৌশলে আপনি তাদের ভুল গুলো ধরিয়ে দিবেন এবং সে গুলো সংশোধনের জন্য উত্তম উপদেশ দিবেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন,'ইক্বরা' কথাটা কেন বলেছিলেন?যখন তিনি জানতেন,এই জাতি যা জানে তা মানে না,আর যা জানে না তা জানার চেষ্টাও করে না!এর কারণ হিসেবে আমরা সূরা ইমরানে এবং উপরে সূরা নাহলে পড়েছি,আল্লাহ তো চেয়েছেন,এমন একটা দল তার প্রতিনিধিত্ব করবে,যাদের কথায় প্রজ্ঞার পরিচয় থাকবে,তারা যতটুকুই বলবে সঠিক কথা বলবে,যা লোকেরা আন্তরিকতার সাথে গ্রহন করবে। কারণ,আপনি যা দেখছেন তা ই সম্পূর্ণ বা সত্যি না,আপনার রব আপনার চাইতে অনেক গুণ বেশি ভালো জানেন।আর এই জন্যই নুহ (আ) সাড়ে ৯০০বছর তার জাতি কে দাওয়াত দিয়েছিলেন,কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন,আল্লাহ তার চাইতে তার জাতিকে অনেক বেশি ভালো জানেন,সুতরাং তার জন্য হাল ছেড়ে দিয়ে,রাগ হয়ে তাদের দোষ ধরে ক্ষোভ দেখানোর সময় তার জন্য আসেনি। সুতরাং পরিস্থিতি যেমনই হোক,আপনি আপনার সুন্দর নিয়াত কে বাস্তবায়নের জন্য সু-কৌশলের সাথে সুন্দর,প্রোডাক্টিভ অনুভূতি তৈরী করার বদলে লোকদের মাঝে বিরক্তি,দূরত্ব সৃষ্টি করতে পারেন না।

সোশ্যাল নেটওয়ার্ক এমন একটা জায়গা,যেটাকে আমরা উন্মুক্ত মাঠ বলতে পারি,যেখানে সম্ভব বিপ্লব বা পরিবর্তনের জোয়ার তৈরী করা,সত্য-সুন্দরের পথে সময়ের সাথে যুগান্তকারী পদক্ষেপ তৈরী করতে খোরাক ছড়িয়ে দেয়া। আপনি এটাকে নিছক টাইম পাস এর ক্ষেত্র হিসেবে নিলেও এটা আগামী দিনের জাতি তৈরীতে মহামূল্যবান ভূমিকা রাখে।এটা এমন একটা জায়গা,গ্লোবাল ভিলেজের প্রকৃত রূপ,যেখানে আপনি আওয়াজ তুললে,সারা দুনিয়া আপনার সাথে কন্ঠ মেলাবে,জাতি-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই আপনার সাথে,আপনার প্রয়োজনে আপনার পাশে দাড়াতে পারে।  আপনি হয়তো এখানে আসনে,কিছু সময় রিফ্রেশ থাকার জন্যে,অবসরের ক্লান্তি দূর করার জন্য কিন্তু এই জায়গাটা আপনার কাছে যতটা না হালকা,তার চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী অসৎ এবং অন্যায় শক্তিদের জন্য। আর তাই আপনার এই #টাইমপাস' মনোভাবের এই সুযোগটাই অসৎ উদ্দ্যেশ্যে অমানুষরা ব্যাবহার করছে তাদের স্বার্থউদ্ধারের জন্য।

আজ ইসরাঈল তাদের লোকবল জোরে-সোরে লাগিয়েছে শুধু মাত্র এই সোশ্যাল নেটওয়ার্ক সাইট গুলোতে নিজেদের আধিপত্য বিস্তারের জন্য,আমরা দেখেছি মিশরে,তুরস্কে 'আরব বসন্ত' অর্থাৎ পেশির জোরে নয় সত্যিকারের জনগনের বিপ্লবের জোয়ার সৃষ্টি হয়েছিলো,এই সোশ্যাল নেটওয়ার্কের মাধ্যেমে। কিন্তু কেন?তাদের তো মিডিয়া,অস্ত্র,নিজদের লোকের অভাব নেই!তারপরেও তারা কেন সারা দুনিয়া কে মিডিয়ার মাধ্যমে নিজেদের সাথে রাখে? কারণ,সময় বদলে গেছে,প্রযুক্তির উৎকর্ষতা মানুষকে আজ একই বৃত্তে এনে দাড় করিয়েছে। সুতরাং সময় এসেছে,প্রশ্ন তৈরী হবার,
'এই অংগনে আপনার ভূমিকাটা কি এবং কেমন?'  
সময় এসেছে এই অঙ্গন টা কে আপনার এবং আপনার দেশ-জাতির জন্য আপনার কাজের হাতিয়ার বানাবার। রাসূল (স) এর একটা হাদীস আছে,'সমগ্র মুসলিম জাতি হচ্ছে একটি দেহের ন্যায়,তার এক অংশে যদি ব্যাথা হয় তবে তা সারা দেহ অনুভব করতে পারে।' (তিরমিযি)
জ্বি হ্যাঁ,আমরা আসলেই একই দেহ। আর তাই আজ ফিলিস্তিন যখন কাঁদছে,আমরা এখানে অস্থির হয়ে আছি।যে সময়টায় আপনি বসে আড্ডা দিতে পারতেন,তখন আপনি সোশ্যাল সাইট গুলতে হন্য হয়ে খুঁজছেন,আপনার ফিলিস্তিনি ভাই-বোনেরা কেমন আছে তা জানার জন্য,তাদের জন্য বড় বড় মিডিয়াদের দৃষ্টি আকর্ষন করে টুইট-স্ট্যাটাস দিয়ে যাচ্ছেন,নিজের প্রোপিক-কাভারপিক বদলাচ্ছেন। আজ যখন আমি কোন টুইট লিখছি ফিলিস্তিন কে নিয়ে সাথে সাথে সেটা দুনিয়ার ঐ প্রান্তের কোন আরব ভাই-বোন রিটুইট করে দিচ্ছে,আমার অনুভূতির সাথে একমত প্রকাশ করছে। ঠিক তেমনি ভাবে আমরা যখন আমাদের সমস্যা গুলো নিয়ে সোশ্যাল সাইটে গিয়েছে,সেখানেও দেখেছি দুনিয়ার কোণায় কোণায় ছড়িয়ে থাকা নাম না জানা হাজারো মানুষ আমাদের সাথে কন্ঠ মিলিয়েছে। আমাদের সমস্যা কে আমাদের ইস্যুকে ট্রেন্ড লিস্টের শীর্ষে উঠিয়েছে,তাদের নিউজ সাইটের হেডলাইন করেছে।
না,এই সব গুলোকে আপনি নিছক লোক দেখানো আবেগ বলতে পারেন না,কোন ভাবেই না। যদি ঢালাও ভাবে এটা আপনি মনে করেন,তাহলে ধরে নিন,আপনিও এই লোক দেখানো মানুষদের একজন! আফসোস করুন,যে আপনি নিজেও ঐসব সুবিধাবাদীদের দলেই পড়লেন!

বাচ্চার ঘুম কড়া বলে আপনি তাকে গরম পানি ঢেলে জাগাতে পারেন না,বরং তার ভেতরের অনুভূতি কে আপনি নাড়া দিতে পারেন,তাকে সময় মতো সবাই জেগে উঠার পরিবেশ দিতে পারেন, যাতে সে এক ডাকেই ঘুম থেকে উঠার অভ্যাস করতে পারে। ঠিক তেমনি,ওয়েস্টার্ন মিডিয়ার কু-প্রভাবে সমগ্র মিডিয়া হাতছাড়া হয়ে গেছে বলে আপনি আপনার অবস্থান টা ওদের স্রোতে ভাসিয়ে দিতে পারেন না।
একটা সময় ছিলো,যখন আমরা মোবাইল কে নিছক বিলাসিতা বলে ভাবতাম,এখন তা প্রয়োজন। একটা সময় ছিলো,সোশ্যাল মিডিয়া বলতে আমরা স্রেফ,ছবি শেয়ার,পরিচিত বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ রাখার মাধ্যম আর নিজের অনুভূতি শেয়ার করার জন্য কমনপ্লেস বলে জানতাম,বাট এখন তা সব রকমের ইফেক্টিভ প্ল্যাটফরম হিসেবে ব্যাবহৃত হচ্ছে,বিজনেস,এডুকেশন থেকে শুরু করে রিভ্যুলেশন পর্যন্ত। সময় অনেক বদলে গেছে,এবং সামনের দিন গুলোতে আরো বদলাবে। তাই ঘুরে ফিরে প্রশ্ন আসবে,
এই সোশ্যাল মিডিয়াতে আপনার ভূমিকা কি?কেমন হওয়া উচিত?
প্রশ্ন করুন নিজের বিবেক কে,যা আপনি করতে চান,যা আপনার বিবেক করার জন্য সায় দেয় সে উদ্দ্যেশ্য পূরণের জন্য এই সাইট গুলো কি কোন ভূমিকা রাখে?যদি রাখে তাহলে আপনি কি করে এখানে সময় অপচয় করতে পারেন?নিছক বিনোদনের জন্য এটা কে আপনি কি করে ভাবতে পারেন? আসলে সব সময় আমাদের জন্যই ছিলো,আছে শুধু আমরাই সময়টা কে অন্যের ভেবেছি আর তাই আজো সময় খুঁজে ফিরছি,অথচ সময় এখনো আমাদের অপেক্ষাতেই আছে।
আপনি যে জায়গাটা কে তুচ্ছ ভাবছেন সময় স্বাক্ষী,সেটাই এখন অনেক দামী। আপনি পারেন,এখানে বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি তৈরী করতে,নতুন সূর্যের আলোর ছটা এখানেও তৈরী করতে।
আর সে জন্যই,এখানে আপনাকে হতে হবে ঠিক তেমন চিন্তার অধিকারী,যেভাবে আপনি পারেন বাস্তবতা কে বদলাতে।
এখানেও আপনার কথায় থাকতে হবে সেই রকম গুণাবলি,তেমন চিন্তার প্রতিচ্ছবি যেমনটা পারে বদলে দিতে আজকের আগামী। তিক্ততা,স্বার্থান্বেষি মনোভাব,হতাশা নয় বরং ধৈর্য্যের সাথে সঠিক প্রচেষ্টা।

''এখন সময় জেগে উঠবার,জাগাতে ঘুমের পাড়া
এখন সময় তৈরী হবার,আগামী দিচ্ছে সাড়া
সময় এখন নতুন করে নিজেকে গড়ে নেবার
সময় এখন নতুন করে আগামীকে গড়বার।''
ছোট্ট এই জীবনে একটা জিনিস আমাদের কে ভাবতে হয় সব সময়,আর তা হলো যে সময়টাই পার করি না কেন,কিছু না কিছু হোক তা সামান্য তবু কাজ করে যেতে হবে। কোন সময়ই যেনো সম্পূর্ণ বৃথা না যায়,ছটাক পরিমান হলেও যেনো সেখানে উত্তম প্রতিদান পাবার মতো কাজ থাকে। তাই যেই সময় টা 'হোয়াট'স আপ ফ্রেন্ডস' হিসেবে কাটাতে এখানে আসা হয়,তার মাঝেই একটু সময় বদলে নেবার এবং দেবার চেষ্টায় কাজে লাগানো সম্ভব।
চেষ্টা করুন,নিয়্যাত কে বদলাবার এবং পরিশুদ্ধ-আত্নবিশ্বাসি করার। চেষ্টা করুন,সুন্দর-সত্যের সুবাতাস বইতে মনের জানালা খুলে দেবার,নিজের চিন্তা গুলোকে আরো অনেক বেশি উন্নত করার। মুখোশের আড়ালে থাকা নিজের কালো অধ্যায়টা কে চিরতরে দূর করে দেবার। সময় কখনো আপনার মতো করে আসবে না,বরং সময় আপনাকেই তৈরী করে নিতে হবে,তৈরী করে নিতে হবে আপনার জন্য,আমাদের জন্য। আর তাই নতুন করে ভাবতে শুরু করুন,আজ-এই মুহুর্ত থেকেই,তৈরী হোক চিন্তার নতুন অধ্যায়,তৈরী হোক স্বর্নজ্জ্বল অধ্যায়। এবং,
জীবনের প্রতিটা ক্ষেত্রে আমাদের কথা এবং কাজের মাঝে তৈরী হোক, #প্রজ্ঞা_বুদ্ধিমত্তা_সদুপদেশ।     


রবিবার, ১৫ জুন, ২০১৪

এক দিবসের কিয়দাংশ! (আমার আমি)


সন্ধ্যায় বৃষ্টিতে ভিজে আব্বু বাসায় আসার পর ভাবলাম,খাওয়ার পর আব্বুকে এক কাপ চা করে দিবো,ডাক্তারের নিষেধ থাকায় আব্বুকে ইদানিং চা বানিয়ে দেয়া হয় না!আমার চা প্রিয় বাপজান,এক কাপ চা এর জন্য খুব হাসফাঁশ করেন বুঝলেও,নানুর অবস্থা দেখার পর আম্মু আমাকে পই পই করে মান করে দিয়েছেন। আজ আম্মুও বাসায় নেই,তার উপর আজ 'বাবা দিবস',ভাবলাম,এট লিস্ট এক কাপ চা তো খাওয়াতে পারি! একদিন এক কাপ খেলে কিচ্ছু হবে না!  

কিন্তু খানিক পরে বুঝলাম আজকে আব্বুর মনের অবস্থা খুব্বই খারাপ! আর তাই রাত পর্যন্ত হাসপাতালে ছোটবোন আর আম্মুর সাথে থাকার কথা থাকলেও দুঃশ্চিন্তা আর শরীর খারাপের কারণে দেখা না করেই চলে এসেছেন! এক'দিন আসলে ধকলও কম যায়নি,তার উপর সমস্যার তো অন্ত নেই!
এশার নামাজ পড়েই যখন শুয়ে পড়লেন,তখন আমি চায়ের মগটা নিয়ে রুমে এসেছিলাম!কিন্তু বুঝলাম,আব্বু এখন একটা ভালো ঘুম দিতে চাচ্ছেন,যাতে দুঃশ্চিন্তা গুলো মাথা থেকে সরিয়ে সলিউশন বের করতে পারেন। চা আর দেয়া হলো না...

আমি এখন অপেক্ষা করছি,আব্বু কখন ঘুম থেকে উঠবে। কারণ,উনি ঘুম থেকে উঠলে,কয়েকটা ব্যাড নিউজ বা দুঃশ্চিন্তা বাড়িয়ে দেয়ার মতো কিছু নিউজ উনাকে দিতে হবে!! ইচ্ছে থাকলেও নিউজ গুলো না দিয়ে উপায় নেই! সন্তান হিসেবে আমি এখনো সু-সন্তানের প্রথম স্টেজেও পা রাখতে পারিনি,আর তাই আমার পক্ষে সম্ভব না,বাবার দুঃশ্চিন্তা গুলো থেকে অন্তত ১টা দুঃশ্চিন্তাও সলভ করে দেয়ার!

আজ শহর জুড়ে বৃষ্টি মুখর রাত...আজ বর্ষার প্রথম দিন। চারপাশে তাই মেঘ ডাকা মুহুমুহু বাতাসে জড়ানো চমৎকার ওয়েদার। জীবনে প্রথম মনে হচ্ছে,এমন সন্ধার কোন দরকার নেই,দরকার নেই এমন তারাহীন রাতের।
দিন তিনেক আগে,রাতের এমনই সময় আমি নানুর নিথর দেহ টা জড়িয়ে চিৎকার করে বলছিলাম,'ও নানু উঠেন,আমার তো অনেক কথা আছে আপনার সাথে,আপনি তো কিছু বলে গেলেন না,উঠেন নানু উঠেন!' কিন্তু নিষ্প্রান সেই দেহটা থেকে কোন সাড়া পায়নি! আমি অবুঝ না হয়ে পারিনি,আমার আসলেই অনেক কথা ছিলো নানুর সাথে!আমার বিশ্বাস ছিলো একটা বারের জন্য হলেও,নানু যাবার আগে চোখ মেলে আমাদের দিকে তাকাবেন! নানু ছিলেন আমার আরেক মা,যার জন্য আমার অনেক না হোক,কিছু তো করার ছিলো!কিন্তু উনি সময় দিলেন না,শেষ বারের মতো নানু ডাকার সুযোগও দিলেন না!
আজ যখন সাড়ে চার বছরের মামাতো ভাই লাজিম আমাকে বলে,'আপু,আল্লাহকে একটু ফোন দাও না,দাদুর সাথে কথা বলবো!উনাকে তাড়াতাড়ি আসতে বলবো!' আমি তখন ওকে বুঝানোর বদলে আপন মনেই বিড়বিড় করে নানুর সাথে রাগ দেখাই! রাগ দেখাই নানা ভাইয়ের সাথেও!! নানা ভাই সব সময় আম্মুদেরকে বলতেন,
'আমি চাই আল্লাহ যেনো তোর মা কে কবরে রেখে যাওয়ার সুযোগ দেন!তোর মায়ের দায়িত্ব আমার,তাই আমার দায়িত্ব আমি পুরোপুরি শেষ করে যেতে চাই,তোদের দায়িত্বে রেখে যাবো,তোরা যদি ঠিক মতো পালন করতে না পারিস!তখন তো তোর মা ও কষ্ট পাবে,আমিও!'
আল্লাহ ঐ ভদ্রলোকের দোয়াই শুনলেন!আমাদের না...!

নানু চলে যাবার পর আমি প্রিয়জনদের জন্য কিছু করতে পারবো এই আশাটাও করা ছেড়ে দিয়েছি!আমি এখন আরো ভালো ভাবেই বুঝতে শিখেছি,আমাকে দিয়ে আসলে ওমন কিছুই হবে না!বড় আম্মু আসলে ঠিকই বলতেন,ওমন কিছু করতে হলে,কপালওয়ালী মেয়ে মানুষ হতে হয়!
আমার শুধু চেয়ে চেয়ে দেখার কপাল! দুঃশ্চিন্তা করতে করতে অল্পতেই বুড়িয়ে যাওয়া বাবার মুখ! একূল-ওকূল সামলাতে সামলাতে রোগাক্রান্ত মায়ের ক্লান্ত হাঁসি আর সারা জীবন দু'হাত ভরে আদর দেয়া মানুষ গুলোর নিরবে হারিয়ে যাওয়া! আমি আসলেই ওমন কপালওয়ালী কেউ না,আমিও আর দশজন স্বার্থপর মানুষদের মতো!
কেবল নিজের খোরাক জুটাতেই জীবন পার করে দিবো,আর বুকের ভেতর ছাই চাপা আফসোসের আগুন নিয়ে ঘুরবো। সময় পার হবে,বাস্তবতা বদলাবে,তবুও নিজের প্রয়োজনের কিয়দাংশও পূরণ করতে হিমশিম খাবো,দিনের পর দিন পার করে,একদিন ব্যস্ত শহরের বিষাক্ত বাতাসে উড়িয়ে দিবো,নিজের জমানো ইচ্ছে গুলোর লিস্ট! আর দিন শেষে ভাববো,ইনশাআল্লাহ সব ঠিক হয়ে যাবে একদিন... দিনে দিনে ষড়ঋতুর মতোই জীবন থেকে কখন যে হারিয়ে যাবে শরত,হেমন্ত,বসন্ত গুলো টেরও পাবো না! একসময় যা হতাশা মনে হতো,তখন তা ই হবে আশা! হাহাহাহা!! 

মঙ্গলবার, ১০ জুন, ২০১৪

চলে যাওয়া্,চলে যায়! (আমার আমি)


আল্লাহ কতো ভাবে মানুষের সময় গুলো কে বদলে দেন!! অথচ এই সময় গুলো নিয়ে,আমরা কতো রকমের পরিকল্পনাই না করে থাকি!কিন্তু কেই কি আন্দাজ করতে পারি?কখন কিভাবে সব বদলে যাবে...
ছোট বেলায় আমার পুতুল খেলতে ভালো লাগতো না খুব,স্পেশালি পুতুল বিয়ে! আমার সেন্সটা ছিলো,
'আমার পুতুল আমার কাছেই থাকবে,আরেকজন কে দিবো ক্যান?ও যদি আমার পুতুলটাকে হারায় ফেলে?!' তাই পুতুল সাজিয়ে রাখার শখ ছিলো,ঠিক বইয়ের ছবির মতো। কিন্তু বড় হওয়ার পর বুঝেছি,পুতুল আসলে চিরদিন নিজের কাছে রেখে দেয়ার মতো জিনিস না,অন্য কেউ সেটা হারিয়ে ফেলুক কি ভেঙ্গে ফেলুক,পুতুলকে চিরদিন নিজের কাছে রাখা যায় না! আমার নানু খুব সৌখিন মানুষ, ছিলেন বলতে চাই না,আমাকে ভালোবাসার-আদর করার মানুষ গুলো আমার জন্য সব সময়ই আছেন। নানুর প্রথম নাতনী ছিলাম আমি। শুধু তাই না, আমার মা তাদের মামা-খালাদের প্রথম ভাগ্নি ছিলেন,আর সেদিক থেকেও ছিলাম প্রথম নাতনী,জীবনে তাই বড় হবার সাজা,মজা দুটোই পেয়েছি। আমি শুধুমাত্র আমার নানুদের মেয়েদের খেলনা গুলোই পেয়েছিলাম তা না,বরং তাদের ছোট বেলার কয়েকটা পুতুলও আমাকে দিয়েছিলেন। আমি সেগুলো অনেক বছর যত্ন করে রেখেছিলাম,খেলতাম না ওগুলো দিয়ে,যদি নষ্ট হয়ে যায় এই ভয়ে!
আজ অনেক দিন পর আমার খুব ইচ্ছে করছে,আমার ওই মানুষ গুলোর কাছে যেয়ে,আরো ক'টা পুতুল আবদার করতে! কে জানে,হয়তো পুতুল বানিয়ে দেয়ার উসিলায় আল্লাহ মানুষ গুলোকে আরো ক'টা দিন আমার সাথে থাকার সুযোগ দিবেন!আরো ক'টা দিন আমার আবদারের যন্ত্রণায় বিরক্ত হয়ে তাদেরকে বলা সুযোগ দিবেন,
'বুবুরে বড় হবি কবে?কবে বুঝ-বুদ্ধি হবেরে?তুই বড় না?তুই যদি বুঝিস,দেখবি বাকী গুলোও বুঝবে,মায়ের কষ্ট কম হবে!নিজের ভালো বুঝবি যেদিন,দেখবি সব কাজ ঠিক মতো হবে!'
কিংবা শাহানা মামীর মতো বলবে,
-মেয়ের মা আল্লাহ বানায় নাই বলে কি,তুই মেয়ের আদর সব নিয়ে যাবি?!

এই এক বছরের মধ্যে পরিবার থেকে ৩ জন মুরুব্বী কে হারালাম!বিশ্বাসই হয় না এখনো! মনে হয়,আছেন উনারা এখনো,এই তো ও বাসায় গেলেই দেখতে পাবো বুঝি!আমার ঈদের সালামী,রকমারী পিঠা,আমসত্ত্ব-আচার,ঠিক মতো না খাওয়ার জন্য বকা,পরীক্ষার জন্য দোয়া সবই আগের মতোই পাবো!
আমি সব সময় বলি,আমি ভাগ্যবতী যে আমি তিন তিনটা মা পেয়েছি। আমার মা,মায়ের মা,নানুর মা। মজা করে বলতাম,আগের দিনে বাচ্চা বয়সে বিয়ে দেয়ার এডভান্টেজ স্বরুপ আল্লাহ বুঝি,আমাকে তিন তিনটা মায়ের আদর পাওয়ার সৌভাগ্য দিয়েছিলেন! অনার্সে পড়া অবস্থায় বিয়ে হয়েছিলো আম্মুর,আব্বু তখন ছাত্র জীবন শেষ করি করি অবস্থায়,ছোট একটা চাকরী আর ভাই-বোন,সংসারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে যেনো অথৈ সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছিলেন। আর আম্মুর তখন পড়াশুনা,সংসারের প্রয়োজনে চাকরী,দায়িত্ব সব মিলিয়ে আরো করুন অবস্থা! সেই সময় আমার এই মায়েরা আমাকে যে পরিমাণ আদর-শাসন,যত্নের সাথে পালতেন,যে দিন শেষ আমার আর আব্বুর সাথে বাসায় ফেরার ইচ্ছে হতো না। আমার স্কুল কেন নানু বাসার কাছে ছিলো না,কেনো আমাকে মিরপুর থেকে প্রতিদিন নানু বাসায় কেউ নিয়ে আসে না,সেই আফসোসে স্কুলে বসে বালিকা বেলায় খাতায় বড় বড় অক্ষরে লিখে কূল পেতাম না,
'আমাকে কেউ আদর করে না,শুধু নানু আর বড় আম্মু আদর করে!'
বড় হয়ে নিজের সেই সময়কার কীর্তি গুলো ভেবে লজ্জা পেয়ে হাসতাম,কিন্তু এখন আর হাঁসি আসে না!এখন চোখ ভিজে উঠে শুধু!বুকটা খাঁ খাঁ করে উঠে... আমার সেই মানুষ গুলো কই এখন?আমার সেই বেণী গেঁথে দেয়ার মানুষ গুলো,ফুল তোলা ফ্রক বানিয়ে দেয়ার মানুষ গুলোকে আমি তো এখন আর ডাকলেও পাই না!এখনতো আর খাওয়া নিয়ে হাজারো নাক করলেও কেউ বকা দিয়ে ভাতের লোকমা মুখের সামনে এনে ধরে বলে না,
-নে ধর,বুবু মাখায় দিছি!বেত্তুমিজ!না খেয়ে খেয়ে কি হইতেছিস দিন দিন খবর আছে?

২দিন আগে এলাকার এক চাচা মারা গেলেন,মারা যাওয়ার আগের রাতে ছেলেকে বলে গিয়েছিলেন,''বাবা,আমি যে তোমাকে মাঝে মাঝে বকা দেই,তুমি কি কষ্ট পাও?কষ্ট পেয়ো না কিন্তু!আমি ভালোর জন্যই বকি!' সেই বাবা,সকালে নাশতার টেবিলে 'ভালো লাগছেনা'বলতে বলতে চলে গেলেন চিরদিনের জন্য! কবরস্থানের পাশে বাড়ি করেছিলেন,আব্বু জিজ্ঞেস করেছিলেন একবার,
-কি ভাই?বাড়ি যে করলেন একদম কবরস্থানের গা ঘেঁষে?
হেসে বলেছিলেন,
-একটু আগায়ে থাকলামরে ভাই!কষ্ট কম হয় যাতে!যেতে তো হবে ঐখানেই তাই না?
উনি ঠিকই বুঝেছিলেন হয়তো,যে বড় তিন ভাই,বৃদ্ধ শ্বশুড়,বাবা কে রেখে উনাকেই আগে যেতে হবে!তাই সবার যাতে কষ্ট কম হয় সেই জন্য নিজের পার্মানেন্ট বাড়িটার কথা আগে ভেবেছিলেন! 



পরিবারের বড় সন্তান হিসেবে,আমার মুরুব্বীদের সাথে সম্পর্কটা খুব বেশি,উনাদের ভালোবাসা,আদর পেয়েছি বেশি,উনাদের সাথের স্মৃতিও অন্য ভাই-বোনদের তুলনায় অনেক বেশি,এতো বেশি যে,এখন এই স্মৃতি গুলোই আমার জন্য সবচেয়ে বেশি কষ্টকর হয়ে যাচ্ছে! এখনো আমি আমার সামনের কোন দিনের পরিকল্পনা করতে গেলে,উনাদেরকে ছাড়া,উনাদের দোয়া ছাড়া ভাবতে পারি না!আমি পরীক্ষা দিতে যাবো আর আমার মাথায় হাত দিয়ে কেউ দোয়া পড়ে ফুঁ দিয়ে দিবেনা,আমের সিজন চলে যাচ্ছে,কেউ আমার জন্য আম সত্ত্ব বানিয়ে পাঠাবে না আর, এই সত্যি গুলোর সাথে আমি এখনো অভ্যস্থ হতে পারছি না!
আমি এখনো এই বাস্তবতা গুলোর অভ্যস্থ হতে পারিনি,যে একে একে আমার নানুবুবুদের মধ্যে থেকে আজ সকালেও আমি একজন কে বিদায় দিয়ে এসেছি! যখন বাসার সবাই আমরা ধীরে ধীরে প্রস্তুতি নিচ্ছি,হসপিটাল থেকে ফেরত আসা,আমার নানু চলে যাবেন ভেবে তখনই হুট করে কাল রাতে চলে গেলেন আমার আরেক নানু! (আম্মুর সেঝ খালা)  খুব যে অসূস্থ ছিলেন তা না,অন্তত বড় বোনের মতো বিছানায় সেন্সলেস অবস্থায় শুয়ে থাকার মতো তো না ই। কিন্তু সেই মানুষটাই যে আগে চলে যাবেন,কে ভেবেছিল?!
চলে গেলেন মানুষটা! ছেলে-মেয়েরা কাঁদে,মা বুঝি আমাদের সাথে রাগ করে চলে গেলেন!তাই সেবা করার সুযোগও পেলাম না! ভাই-বোনরা কাঁদেন,বছরের শুরুতে মা চলে গেলেন,আর সাথে সাথে দেখি একে একে সব ভাই-বোনেরাই চলে যাচ্ছে!

কিন্তু এই চলে যাওয়াটাই যে সত্য,সেটা মেনে নিতে সবারই খুব কষ্ট!কেউ হুট করে চলে যায়,কেউ অনেকদিন সময় নিয়ে আপনজনদেরকে প্রস্তুত করে যায়,কিন্তু চলে যায়। সবাইকেই যেতে হয়। তাই আজকাল এই 'চলে যাওয়া' শব্দটাই বেশি কানে বাজে! আর মনের ভেতর শুধু আনচান করে,এরপর কে যাবে????!!!
আজকাল প্রিয় মুখ গুলোর দিকে তাকাতে ভয় করে,মনে হয়,বুঝি আর সামলাতে পারবো না নিজেকে!মুখ দেখলেই বোধহয় মায়া বেড়ে যাবে!কিন্তু কাউকেই তো আটকে রাখতে পারবো না। ছেড়ে তো চলে যাবে সবাই...এমনকি আমিও! মাঝে মাঝে মনে হয়,চারপাশে কতো মানুষ আছে,যারা নাকি কোনদিন,দাদী-দাদা,নানা-নানি,মুরুব্বীদের আদর কি জিনিস পাই নাই!এমন হলেই বুঝি ভালো হতো! অন্তত উনাদের চলে যাওয়ার কষ্টটা থেকে বুঝি রেহাই পেতাম!
বাদ ফজর আব্বু আমাদেরকে স্বান্তনা দেবার জন্য সূরা ইমরান এর ওই আয়াতটা শোনাচ্ছিলেন,
''অবশেষে প্রত্যেক ব্যক্তিকে মরতে হবে এবং তোমরা সবাই কিয়ামতের দিন নিজেদের পূর্ণ প্রতিদান লাভ করবে। একমাত্র সেই ব্যক্তিই সফলকাম হবে, যে সেখানে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা পাবে এবং যাকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে। আর এ দুনিয়াটা তো নিছক একটা বাহ্যিক প্রতারণার বস্তু ছাড়া আর কিছুই নয়। '' [সূরা আল ইমরানঃ ১৮৫]
আর বলছিলেন,
'অনেক তো একসাথে থাকা হলো আমাদের সবার,এবার একলা থাকার অভ্যাস শুরু করো সবাই!কারণ,কষ্টের পরেই তো আল্লাহ সুখ দিবেন,এরপর যেনো আল্লাহ সবাইকে আবার একসাথে,পরম সুখের জান্নাতে থাকার তাওফিক দেন তাই।এই দুনিয়াটা কিছু নারে মা,খালি ক'টা দিন থাকার জায়গা,আসল বাড়ি তো ঐটা,চেষ্টা করো যেনো ঐ বাড়িটাতে আল্লাহ একসাথে থাকার যোগ্যতা সবাইকে দেন!' আমীন। 

শুক্রবার, ৬ জুন, ২০১৪

কোন এক অবার্চীনার গল্প

এক,
-চুপ থাকাটা কোন সমস্যার সমাধান না,জানো তো?
-জানি। 
-তাহলে কেন চুপ করে আছো?
আমি সাথে সাথে কিছু বলতে পারলাম না। খানিক টা সময় পর বললাম,
-চুপ থাকাটা যেমন কোন সমাধান না,তেমনি কথা বলাটাও কখনো সমস্যা বাড়িয়ে দেয়,তাই চুপ করে আছি। 
আমার কথা শুনে রিদু আর কিছু বলল না,খানিকক্ষন আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল! তারপর বলল,
-বাসায় জানিয়েছো? 
-নাহ
-জানাবে না?
-আপাতত ইচ্ছে নেই!পরে বাসায় যেয়ে সামনা-সামনি বসে বলবো। এখন মাথায় জাস্ট একটাই চিন্তা,এই জায়গাটা বদলাতে হবে,দ্রুত অন্য কোথাও শিফট হতে হবে।  
-কোথায় যাবে?
আমি আবারো তাৎক্ষনিক কোন জবাব দিতে পারলাম না। কি বলবো?আসলেই তো!কোথায় যাবো আমি? মাসের আজ ১৮তারিখ,এই সময় বাড়ি ছাড়া সম্ভব না,আবার নতুন কোন এলাকায় যে যাবো সেটাও পারবো না,তাহলে কি করবো?
ছোট খালার বাসায় যাবো?কিন্তু সেখানে তো বড়জোর ২দিনের বেশি থাকা যাবে না,খালু হাজারো প্রশ্ন শুরু করে দিবে! 
আমার চিন্তা করা দেখে রিদু বলল,
-শোন,আমার মনে হয় তোমার একবার শিমু ভাবির সাথে কথা বলা উচিত,উনাকে বুঝিয়ে বলা উচিত,আমার মনে হয় কথা বললে অনেক কিছুই সলভ হবে। 
-আর যদি সলভ না হয়?যদি আবার নতুন কোন ঝামেলা শুরু হয় তখন?বাদ দাও রিদু!উনাদের যা খুশী করতে দাও,বেটার আমি আমার মতো চলে যাই এখান থেকে। 
রিদু হাল ছেড়ে দেয়ার ভঙ্গিতে আমার দিকে করুন চোখে তাকিয়ে রইল। আর আমি?
আমার মনে তখন রাজ্যের দুঃশ্চিন্তা আর কষ্ট এর চাইতে ক্লান্তি এসে ভর করেছে!অনেক দিনের পুরনো ক্লান্তি... 

মফস্বল শহর ছেড়ে যখন আমি পড়াশোনার জন্য এই শহরে আসি,তখন আমার মাথায় এক পড়াশুনা ছাড়া আর কোন চিন্তাই বলা যায় ছিলো না। ডায়েরীর পাতায় লুকিয়ে লেখা কিছু স্বপ্ন আর তারুণ্যের উচ্ছ্বাস ছাপিয়ে আমার কাছে শহরটাই মুখ্য ছিলো। এক ফুপি,এক খালা,দুই চাচা যে শহরে আছেন সেখানে থাকা নিয়ে আমার তেমন কোন সমস্যা হবে এটা আমরা কেউ ই ভাবিনি। তাই,এক বিকেলে ল্যাগেজ আর বই এর বোঝা নিয়ে মামার হাত ধরে সোজা চলে এসেছিলাম ফুপির বাসায়। পরের দিন থেকে ভার্সিটির ক্লাস শুরু,নতুন জায়গা,নতুন বন্ধু আর অনেক অনেক কিছু শেখার আনন্দ নিয়েই শুরু হয়েছিলো আমার শহর জীবন। ক্লাস,পড়া,টিচারের কাছ থেকে 'ভেরিগুড' শোনা,বন্ধুদের সাথে আড্ডা আর বিকেলে চা খেতে খেতে ফুপি-বোনদের সাথে গল্প করা। ব্যাস,চলে যাচ্ছিলো দিন দারুন ভাবেই। 
কিন্তু মাস ছ'য়েক যাবার পর আমার মনে হলো,ফুপা আমার এখানে থাকাটা একদমই পছন্দ করেন না! যদিও আমার থাকা বাবদ,আমার স্কুল টিচার মা ফুপির কাছে প্রতিমাসেই কিছু টাকা দিয়ে যান,কিন্তু তবুও আমার মনে হচ্ছিলো,ফুপা খুব বিরক্ত আমার উপর! 
ফুপাতো বোন মৌ কে আসার পর থেকে আমিই পড়াতাম,কিন্তু হঠাত বলা নেই,ফুপা ওর জন্য নতুন টিচার ঠিক করলেন,সামনে মৌ এর পিএসসি পরীক্ষা,তাই ওর নাকি ভালো গাইড দরকার! ফুপি কিছু বলতে পারলেন না। তবে আমাকে শুধু বললেন,হলে সীট পাওয়া যায় কি না দেখতে!  
এর ক'দিন পর হলে সীটের জন্য এপ্লিকেশন করে খালার বাসায় এসে উঠলাম। কিন্তু সেই সময় হলে সীট পেলাম না,ওদিকে খালার বাসাতেও বেশিদিন থাকা সম্ভব না,খালার শ্বাশুড়ি পছন্দ করেন না। খুব্বই খারাপ অবস্থায় পরে গেলাম!না পারছি বাসায় কিছু বলতে,না পারছি কোথাও যেতে তার উপর ইয়ার ফাইনাল পরীক্ষার ডেট দিয়ে দিয়েছে! 
এমন সময় এক ক্লাসমেটের মাধ্যমে পরিচয় হলো সোশ্যাল সাইন্সের রিদুর সাথে। ও আর ওর কয়েক ক্লাসমেট মিলে ভার্সিটির কাছেই একটা ফ্ল্যাট নিয়ে থাকে। যদিও রিদু কে খুব একটা চিনতাম না,তবুও উপায় না দেখে আল্লাহর উপর ভরসা করে চলে আসলাম ওদের ফ্ল্যাটে। বাবা-মা প্রথমে শুনে অবাক হলেও,পরে আমি পড়াশুনায় সুবিধা হওয়ার অজুহাত দিয়ে ম্যানেজ করেছিলাম। 
দিন গুলো মন্দ যাচ্ছিলো না আমার। রিদুদের এখানে আসার পর ২/৩টা টিউশনী পেয়ে যাই। ক্লাস,টিউশনী,সপ্তাহে নিয়ম করে রান্না করা,অনেক রাত পর্যন্ত রুমমেটরা মিলে গল্প করা এই সব মিলিয়ে এই অচেনা শহরেও বেশ সুন্দর কেটে যাচ্ছিলো আমার দিন গুলো। দেখতে দেখতে সেকেন্ড ইয়ার পার করলাম। ইচ্ছে আছে,গ্রাজুয়েশন টা শেষ করেই,চাকরী একটা নিবো,এর মাঝে বিসিএস হয়ে গেলে তো ভালোই,চলে যাবো কোন এক অচেনা শহরে,দিন কাটাবো একদম নিজের মতো করে। কিন্তু সময় গুলো এভাবে যে বদলে যাবে বুঝিনি!
দুই,
ব্রোকেন ফ্যামিলি কথাটা আমার পছন্দ না,তাই আমি বলে থাকি,টুকরো ঘর!
আমি টুকরো ঘরের মেয়ে,যে ঘরটায় সব মানুষ থেকেও থাকে না,কিংবা ঘরের মানুষ গুলোই আর ঘরে থাকতে চায় না,সেটাই 'টুকরো ঘর'।
আমার বাবা থাকেন সূদুর সুনামগঞ্জ প্রায় ৫বছরের বেশি হবে! বাবা আর মায়ের মধ্যে আসলে বোঝাপড়াটা কখনোই ভালো ছিলো না,বিয়েটাও হয়তো নিজেদের ইচ্ছায় ছিলো না! দু'জনেই দু'জনের কাছ থেকে দূরে থাকতে চাইতেন,কি নিয়ে আসল সমস্যাটা ছিলো তা এখন পর্যন্ত জানা হয়নি,বলা যায় জা্নার চেষ্টাই করিনি! শুধু দেখেছি,বাবা-মা দু'জন কখনোই দু'জনকে সহ্য করতে পারতেন না। আর তাই যখন বাবার বদলীর ওর্ডার আসলো তখন সাথে সাথেই মা বলে ফেললেন,
-আমি যাচ্ছি না কোথাও,তোমার চাকরী তুমিই যাও! আর নিতু কার সাথে থাকবে তা ওকেই ডিসাইড করতে দাও।
ক্লাস এইটে পড়ুয়া আমি তখন কমিকস আর তিন গোয়েন্দার জগত থেকে মাথা বের করে কিছু ভাবার আগেই,দেখি এক সকালে বাবা ল্যাগেজ গুছিয়ে চলে গেলেন। ব্যাস,আমার 'টুকরো ঘরের" জীবনের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছিলো সেদিন থেকেই।
তবে আমি একটা ব্যাপারে বাবা-মা এর কাছে কৃতজ্ঞ এই জন্য যে,তারা সব সময় চেষ্টা করেছেন আমি যেনো তাদের মধ্যকার ঝগড়া,ক্ষোভ,ঘৃণা থেকে দূরে থাকি! তারা কখনো আমাকে এটা বুঝতে দিতে চাইতেন না,যে আমি তাদের জন্য এই অসম,যন্ত্রণাকর সম্পর্কের মাঝে একটা বোঝা স্বরুপ কেউ! তাই তারা ঝগড়া করতেন আমার অবর্তমানে!সব রকমের সিদ্ধান্ত নিতেন আলাদা ভাবে বসে,আমার সাথে কখনোই কিছু শেয়ার করতেন না। তবে আমাকে এসব দেখতে না দিলেও,সব সময় তাদেরকে আমি দু'মেরুতেই দেখতাম,দেখতাম বছরের প্রায় ৩৬৫ টা দিন,তাদের জন্য একই রকম!
ছোট থেকেই আমি সব সময় ডুবে থেকেছি বই এর জগতে। বই পড়তে পড়তে আমি তৈরী করে নিয়েছি আমার নিজের আলাদা একটা জগত!এই জগত থেকে বের হয়ে এসে,বাবা-মায়ের রাগ-ঘৃণা বুঝবার মতো ইচ্ছে কোনদিন ই আমার হয়নি। বাস্তব জগতকে আমি সব সময় হালকা ভাবেই নিয়েছি!বাবা চলে গেছেন?যাক!কি এমন হয়েছে তাতে?বরং ভালোই হয়েছে,ছুটিতে সিলেট বেড়াতে যাবার সুযোগ হয়েছে। মা বাবাকে সহ্য করতে পারেন না?তো কি হয়েছে?সবার সবাইকে সহ্য করতে হবে এমন তো কথা নেই!মা তো আমাকে সহ্য করতে পারেন,এই ই অনেক!

কলেজে উঠার পর জানলাম,মা চাইছেন আমি যেনো হোষ্টেল জীবনে অভ্যস্থ হই!উনি উনার মতো করে জীবন সাজাবেন।ব্যাস,শুরু করে দিলাম হোস্টেল লাইফ। সেই যে বাড়ি ছাড়লাম,আর ফিরে যাওয়া হয়নি! এখনো পর্যন্ত কোন ছুটিতে মাঝে মাঝে মায়ের কাছে যাই,মাঝে মাঝে বাবার কাছে কিন্তু এই নিয়ে কখনো আক্ষেপও করিনি।
সিলেট যাবার বছর খানেকে এর মাথায় বাবা বিয়ে করেন তার কলেজ জীবনের এক বান্ধবীকে! ভদ্র মহিলার আগে একটা ৪বছর বয়সের ছেলে ছিলো,বাবার সাথে বিয়ের পর তার আরেকটা ছেলে হয়। নিজের কোন মেয়ে ছিলো না,আবার বাবাও আমাকে খুব ভালোবাসতেন বলেই হয়তো,আমি গেলে মহিলা খুব ভালো ব্যাবহার করতেন!আর আমি নিজের মতো থাকতাম,কোন উচ্চ-বাচ্চ করতাম না বলে তিনি বেশ শান্তি পেতেন।
তবে মা নিজের মতো করে থাকতে চাইলেও বাবার মতো নতুন জীবন শুরু করতে পারেননি। মায়ের এক দুঃসম্পর্কের কাজিন মা কে খুব পছন্দ করতেন,মা চেয়েছিলেন তাকেই বিয়ে করতে কিন্তু ভদ্রলোক তার কথা রাখেন নাই। আর তাই চাকরী আর আমাকে নিয়ে একাই আছেন এখনো।
আমি এখনো যখন ছুটিতে বাবা-মায়ের কাছে যাই,দু'জনেই প্রতিবার জিজ্ঞেস করেন,'কোন কষ্ট হচ্ছে না তো তোর?' আমি দৃঢ় ভাবে মাথা নাড়িয়ে না করি!নাহ, কোন কষ্টই হচ্ছে না আমার! আর হবেই বা কিভাবে?
আসলে আমি তো কোনদিন জানার চেষ্টাই করিনি,যে আমি কিসে কষ্ট পাচ্ছি আর কিসে সুখ!বেঁচে আছি যে সূস্থভাবে এই তো আমার জন্য অনেক!খাচ্ছি,পড়ছি,ঘুমাচ্ছি ব্যাস। এর বাইরে আর কি ই বা আমার চাওয়ার থাকতে পারে? আর দশ জন কি করে আমার জেনে কি হবে?আমার জীবনটা আর দশ জনের মতো যখন না,তখন খামোখা ওসবের আফসোস করার মানে নেই! এভাবেই আমি ভাবতাম,এই বোধ নিয়েই নিজেকে তৈরী করে নিয়েছিলাম।
তবে কলেজে থাকা অবস্থায় একদিন আমার রুমমেট তরু ওর বাবা-মায়ের ডিভোর্সের খবর শুনে সারা রাত যখন ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদেছিলো,তা দেখার পর আমি অনেক গুলো রাত ঘুমাতে পারিনি! কি এক যন্ত্রণা আমার ভেতরটা যেনো কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছিলো,কিন্তু কাউকে বলতে পারিনি...
আমি ছেলে না হয়ে মেয়ে হওয়াতে আমার বাবা-মা বোধকরি অনেকটা নিশ্চিন্ত ছিলেন!যাক,অন্তত নেশা-টেশা করে বখে যাওয়ার ভয় তো নেই!কিন্তু ঐ দিন গুলোতে আমার খুব ইচ্ছে করতো,এমন কিছুতে ডুব দেই,যাতে করে আমি ভুলে যেতে পারি বাবা-মায়ের মুখটা! খানিকটা সময়ের জন্য ভুলে যাই আমি কে!তবে হ্যাঁ,আমি আমার জগতে সব সময় একলা থাকতেই পছন্দ করতাম,আর কাউকে সহ্য করতে পারতাম না,সে জন্যই বোধ করি,বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে বখে যাওয়ার পথটা খোলা হয়নি কখনো। কলেজ বন্ধু তিয়াসী কবিতা লিখতো বেশ! একবার একটা কবিতা লিখে আমার টেবিলের দেয়ালে সাঁটিয়ে রেখেছিলো,
তারচেয়ে একটা স্বপ্ন দেখি চল...
তুই আমি হেঁটে চলেছি সবুজ বুনো ঘাস ছুঁয়ে
প্রিয় লাল অথবা নীল অথবা শুভ্র সাদার আবেশ জড়িয়ে
কাশফুলের ভীড়ে,কোনদিন না হারাবার সুখ নিয়ে...

নাহ,স্বপ্ন বোধহয়  বেশীই দেখা হয়ে যাচ্ছে,
এত স্বপ্ন দেখার কষ্ট স্বপ্ন ভাঙ্গার কষ্টের চেয়েও 
কখনো অনেক বেশী মনে হয়...    

  
রিদুদের এই এলাকার বেশ প্রভাবশালী পরিবারের নাতনী জুহি কে পড়াতাম আমি। জুহির বাবা ব্যবসায়ী,আর মা পেশায় এডভোকেট,দু'জনেই আবার পলিটিশায়ন। আমি যখন পড়াতে যেতাম,তখন বাসায় থাকতো জুহি আর ওর দাদী,কাজের লোক। প্রথম প্রথম আমি ওকে পড়িয়েই চলে আসতাম,কিন্তু ধীরে ধীরে এক সময় ওর দাদীর সাথে খুব ভালো সম্পর্ক হয়ে গেলো। ভদ্রমহিলা আমার সাথে অনেক গল্প করতেন,জীবনের গল্প তার সংসারের গল্প,ইচ্ছে-অনিচ্ছার গল্প। তার একাকী দিন গুলোর গল্প! আমি খুব আগ্রহ নিয়ে শুনতাম। যেদিন তিনি জানলেন,আমার বাবা-মা আলাদা থাকেন,সেদিন তিনি খুব অবাক হয়ে বলেছিলেন,
-তোমাকে দেখলে কখনোই বুঝা যায় না,যে তোমার ভেতর কোন কষ্ট আছে!কি হাসি-খুশী থাকো সারাক্ষন!
আমি হেসে বলেছিলাম,
-দুঃখ তো কম বেশি সবারই আছে দাদী,কিন্তু সেটা নিয়ে বসে থাকলে কি আর দিন যাবে?আমি ওভাবে আসলেই ভাবি না,আপনিও ভাববেন না,ওকে?
দাদী স্নেহের হাঁসি দিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছিলেন। এভাবেই বেশ ভালো একটা সম্পর্ক হয়ে যায় দাদির সাথে আমার।
মাস কয়েক আগে জুহির দাদী কে বৃদ্ধাশ্রমে দিয়ে আসেন জুহির মা-বাবা। জুহি সপ্তাহে একদিন ওর দাদীর সাথে দেখা করতে যেতো,প্রথম কয়েক দিন ওর মা/বাবা সাথে গেলেও,সপ্তাহ কয়েক পর আমাকেই যেতে হতো। আমার কখনোই যেতে খারাপ লাগতো না,বরং জুহির দাদীর মতো মানুষের সাথে সময় কাটিয়ে আসতে ভালোই লাগত। প্রতিবার দেখা করে আসার সময়,জুহির দাদী আমার মাথায় হাত রেখে প্রাণ ভরে দোয়া করে দিতেন। মাঝে মাঝে সেই দোয়ার লোভেই যেতাম,আবার কখনো ঐ একলা মানুষটার খুশীর কথা ভাবতাম। আমরা গেলে তিনি অসম্ভব খুশী হতেন,বলা যায় সারা সপ্তাহ তিনি আমাদের জন্যই অপেক্ষা করতেন।
শেষ বার যখন দেখা করে আসি,ফেরার সময় আমার মনে হলো দাদী খুব দুর্বল হয়ে যাচ্ছেন!আগের মতো নেই!আসার সময় আমার হাত টা শক্ত করে ধরে রেখেছিলেন,আমি যখন বললাম,
-দাদী,আপনি কি অসূস্থ?এখানকার ডাক্তার কি ভালো ট্রিটমেন্ট দেয় না?তাহলে জুহির আব্বুকে বলেন,ভালো ডাক্তার দেখাতে!
উনি মলিন একটা হাঁসি দিয়ে বললেন,
-নারে বোন,এখানকার সবই ভালো!অসুখ তো হলো আমার মনে!তুই আবার জুহিদের বাসার কাউকে কিছু বলিস না,ওরা সবাই অনেক ব্যস্ত,খামোখা আমার জন্য কাজ ছেড়ে আসবে!
আমি জোর গলায় বললাম,
-মায়ের জন্য সময় বের করতে আবার খামোখা কি?আপনি কি তাদের জন্য করার সময়,অতো সময়ের হিসেব করেছেন?আমি আজই বলবো,না হয় আপনি ক'দিন বাড়ি থেকে ঘুরে আসবেন।
-না না,তুই কিছু বলিস না,ওরা রাগ হবে অনেক!বুঝিস না কেন?তুই বাইরের মানুষ,তোর কাছ থেকে মায়ের খবর শুনলে ওদের মাইন্ডে লাগবে!
আমার তখন বলতে ইচ্ছে হলো,
দাদী,আমি জানি আপনার ছেলের সময় হয় না,আপনার খবর নেবার!তারচেয়ে বরং চলেন,আমি ই না হয় আপনাকে নিয়ে যাই!
কিন্তু পারলাম না বলতে। তবে সেদিন ফিরে আসার পর থেকে,আমার ভেতরে ভেতরে খুব আফসোস কাজ করছিলো!ঠিক করলাম,পরের সপ্তাহে যেয়ে দাদীকে বাসায় নিয়ে আসবো,না হয় দু'টো কড়া কথা বলবে জুহির মা! কিন্তু আমার আর পরের সপ্তাহে দাদীকে দেখতে যাওয়া হয়নি,বরং দাদী নিজেই সেখান থেকে বাড়ি চলে এসেছিলেন একেবারে!

তিন,

আমার মাঝে মাঝে মনে হয়,আমি মানুষটা একটু বেশিই আত্নকেন্দ্রিক! মানুষকে আমি আমার কাছে ভীড়তে দেই না!আর তাই কারো সাথে আমার অন্তরঙ্গ বা আত্নার সম্পর্ক হয় না,আমি মানুষকে বুঝলেও মানুষ বুঝতে পারে না আমাকে,বুঝতে পারে না,যে আমিও তার প্রতি আন্তরিক!দাদীও বোধহয় সে জন্যই আমাকে সেদিন আপন ভেবে দাবী খাটিয়ে বলতে পারেননি,'আমায় একটু বাসায় নিয়ে চল'!
এই প্রথম আমার মনে হচ্ছিলো,আমি বোধহয় চাইলে পারতাম আমার বাবা-মা কে একসাথে ধরে রাখতে!আসলে আমার বাবা-মা আমাকে অনেক ভালোবাসেন,কিন্তু আমি তাদেরকে একদমই ভালোবাসি না,কোন দিন বাসিও নাই!
বাবা-মা কে আমি যতটা স্বার্থপর ভেবেছিলাম,আজ মনে হচ্ছিলো আমি নিজে তার চেয়েও অনেক বেশি স্বার্থপর! কোনদিন ভালোবাসা নিয়ে,বাবা কে ডাকিনি,মা কে জড়িয়ে ধরিনি! জানি উনারা আমাকে ভালোবাসলেও একে অন্যকে ভালোবাসতেন না,কিন্তু আমি তো তাদের কাউকেই ভালোবাসিনি! বরং তাদের ব্যাবধানের কারণেই হোক,আমার এই ছন্নছাড়া জীবনটাকেই আমি অসম্ভব ভালোবেসেছি। আর কোন কিচ্ছু নিয়ে ভাবিনি কখনো,কাউকে নিয়ে না। কোন দিন অভিমান নিয়ে বা অধিকার নিয়েও বাবা-মা কে বলিনি,
-তোমরা আমার জন্য হলেও একসাথে থাকো,আমাকে আর দশটা স্বাভাবিক মানুষের মতো বাঁচতে সাহায্য কর!'
জীবনে প্রথম আমার ইচ্ছে হলো,একটু বাবা-মায়ের সাথে কথা বলতে!তাদের কন্ঠ শুনতে!বড্ড অবেলায়। কাঁপা কাঁপা হাতে ফোন দিলাম বাবা কে,বাবা তখন ব্যাস্ত রাতের খবর দেখা নিয়ে। আমার কল দেখে অবাক হলেন!অনেকবার হ্যালো হ্যালো করলেন,কিন্তু আমি এপাশ থেকে কান্নার দমকে কিচ্ছু বলতে পারলাম না! এরপর মা কে ফোন দিলাম,কিন্তু মায়ের সাথেও কথা বলতে পারলাম না!
অনেকক্ষন একা একা কাঁদলাম...অনেকক্ষন! বোধহয়,জীবনে প্রথম আমার মনে হলো,আমি একলা একটা মানুষ!সবার জন্য অনেকেই আছে,সবাই অনেকের জন্য থাকে,কিন্তু আমি কারো জন্যই নই,ছিলাম ও না কোনদিন!
আমার বিশাল সার্কেল আছে বন্ধুদের,কারণ,আমাকে সবার ই দরকার হতো কিন্তু আমার সেভাবে কাউকেই দরকার হতো না!আমি কাছের বন্ধু আমি কাউকেই বানাইনি,আমার জগতটাতে কাউকেই ঢুকতে দিতে চাইতাম না বলে!তারপরেও কিছু বন্ধু ছিলো যারা সারাক্ষন আমার জন্য ভালোবাসা,মায়া নিয়ে অপেক্ষা করতো। কলেজ ছেড়ে যখন চলে আসি,তখন আমার দীর্ঘদিনের বন্ধু রিজ্জু,তিয়াসী ছলছল চোখে বলছিলো,
-দোস্ত,তুই কি আমাদের সাথে দেখা করার জন্য কখনো রাজশাহী আসবি না?
আমি কঠিন স্বরে বলেছিলাম,
-নাহ!ছাড়লাম দেশের আবার মায়া কি?
-তোর কি আমাদের দেখতে ইচ্ছে করবে না কখনো?
-শোন,আমি এসব ইচ্ছে এর মূল্য জীবনে দিতে শিখি নাই!তাই আমাকে এসব নিয়ে ভাবতে বলিস না। আমার একলা থাকতেই ভালো লাগে,জানিস ই তো!
আমি সেদিন মিথ্যে বলেছিলাম!এই এতো গুলো বছরে প্রায় রোজই ওদের কথা অনেক মনে পড়েছে,অনেকবার দেখতে ইচ্ছে হয়েছে,অনেকবার। প্রচন্ড ঝাল মিশিয়ে ফুচকা খাওয়ার সময় অথবা পরীক্ষার সময় পড়ার চাপে মনের ভুলে মরিচ বেশি দিয়ে ভর্তা বানিয়ে ভাত খাওয়ার সময় মনে হতো,এখন যদি সেই সময়ের মতো বলা নেই হঠাত কুলফি আর পানির বোতল হাতে রিজ্জু এসে হাজির হতো!
কিংবা জ্বরের ঘোরে কাঁপা হাতে প্যারাসিটামল খেয়ে,মাথায় পট্টি দিতে দিতে,অথবা বৃষ্টিতে ভিজে হাঁচি দিতে দিতে মনে হতো,এখন যদি হুট করে এককাপ কড়া লিকারের আদার চা কিংবা প্রিয় খিচুড়ী প্লেটে নিয়ে তিয়াসী হাজির হতো!
হাতে টাকা নেই,কিন্তু বই কেনার নেশা চেপেছে তখন খুব মনে হতো,এখন যদি সেতু এসে হাতে একগাদা নতুন বই ধরিয়ে দিয়ে বলতো,'নে ধর,পড়ে বিদ্যান হয়ে আমাকে লেকচার দিস!' কিংবা ক্লাস শেষে সাইকেলটা রেখে যেয়ে বলতো,'সন্ধ্যায় উড়তে বের হইস,তবে চাকা পাংচার যেনো না হয়!'
শহরের ব্যস্ত গলিতে হাঁটতে হাঁটতে যখন বেলী ফুলের মালা খুঁজতাম তখন খুব মনে হতো,পিয়ালী যদি এখন ওর গাছের ফুল ছিঁড়ে মালা বানিয়ে আমার হাতে জড়িয়ে বলতো,'নেরে সখী,ভালোবাসা নে...তুই ই সব নে,আর কাউকে লাগবে না!'
খুব মনে পড়তো ওদেরকে,সময়ে-অসময়ে,চলতে পথে অনেকবার...
কতোভাবেই না ওরা আমাকে খুঁজতো!কখনো ফোনে,কখনো সোশ্যাল সাইটে,কখনো আত্নীয়-বন্ধুদের অনুষ্ঠানে। তিয়াসী কতো করেই না রিকোয়েস্ট করেছিলো,ওর বিয়েতে যাবার জন্য! আর রিজ্জু? মেইলের পর মেইল করেছিলো,দেশ ছেড়ে যাবার আগে যেনো একটাবার দেখা করি!
আমি ভেবেছিলাম,আমার এসব কীর্তির পর ওরা আমাকে আর কখনোই মনে করবে না!ঘৃণা করবে! কিন্তু মানুষ গুলো বড্ড বেশিই পাগল! তাই এখনো প্রতি জন্মদিনে মা ফোন দিয়ে বলে,
-নিতু,তোর জন্য পার্সেল এসেছে,কাবার্ডে রেখে দিলাম,এসে দেখিস!
দিন দিন আমি অপরিচিতদের জন্য যতটা না পরিচিত হয়েছি,তার চেয়ে বেশি অপরিচিত হয়েছি পরিচিতদের জন্য। আজ এতো বছর পর এসে,তাদেরকে যতটা না অপরাধী মনে হচ্ছে,তার পাশে নিজেকেও অনেক অপরাধী লাগছে!

দাদির মৃত্যুর কয়েক সপ্তাহ পর একটা অদ্ভুদ খবর আমার কানে আসলো! জুহির মা আমাকে ডেকে নিয়ে খবরটা দিলেন। আর সেটা হলো, দাদী তার নিজের নামের একটা ফিক্সড ডিপোজিট নাকি আমাকে দিয়ে গেছেন!!!
খবরটা শুনে আমি হতভম্ব হয়ে শিমু ভাবির দিকে তাকিয়ে রইলাম!! কিন্তু তার পরের খবর শুনে আরো হতভম্ব হলাম!যখন শিমু ভাবি আমাকে বললেন,
-শোন মেয়ে,আমার শ্বশুড় এই টাকা আমার শ্বাশুড়ি কে দিয়ে গিয়েছিলেন,নিয়ম অনুযায়ী এই টাকা জুহির বাবার!কিন্তু হঠা করে একটা বাইরের মেয়ে এসে আম্মাকে পটিয়ে সেই টাকা নিয়ে যাবে,এটা তো আমরা মানতে পারছি না!জানি শেষের দিকে তুমি মা কে অনেক সময় দিয়েছো কিন্তু তাই বলে...
ভাবির কথা শুনে আমার মনে হলো,আমি কোন বাংলা সিনেমার দৃশ্য দেখছি!আর না হলে কোন বঙ্গীয় সিরিয়াল! আরে আগে তো ব্যাপারটা আমাকে সুন্দর করে বুঝিয়ে বলবে,তারপর তো জানতে চাইবে আমার মতামত! তা না করে সে কি বলে যাচ্ছে!টাকার জন্য উনারা আমাকে যা খুশী ভাবছেন,এক ঝাটকায় আমাকে কোথা থেকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন! অথচ আমি তো ভাবছি ঐ মানুষটার কথা,যিনি জীবনের শেষ দিন গুলোতে কতটা একলা আর অসহায় ভাবতেন নিজেকে!যার জন্য আমার মতো ক'দিনের পরিচিত মানুষের সঙ্গ পেয়ে এতোটাই খুশী হয়েছিলেন,যে নিজের অর্জিত অংশের একভাগ আমাকে দিয়ে গেছেন!আর এদিকে তার ছেলে-বৌ তো অনেক কিছুই ভেবে বসেছে! মানুষের কাছে টাকা টা এমন করে 'এতকিছু' কেন হয়ে যায়?যে সে সব কিছু ভুলে যায়! আজকের দিন টা চলে যাবে,কাল আমিও চলে যাবো,আস্তে আস্তে দিন,মাস,বছর চলে যাবে। কিন্তু থেকে যাবে এই কথা গুলো!
আর ক'বছর পর যখন জুহির মা ও ঠিক একইভাবে দাদীর মতো একলা হয়ে যাবেন,তখন কি বুঝবেন তার শ্বাশুড়ির কষ্টটা? তার কি তখন মনে পড়বে আমার কথা? নাকি তখনো তার মনে পড়বে এই টাকা গুলোর কথা। আজকের পর জীবনের বাকীটা সময় আমার দাদীর কথা খুব মনে থাকবে,মনে থাকবে তার অসহায় দিন গুলোর কথা,আর রেখে যাওয়া দুঃখ গুলোর কথা।
এরপর থেকে ও বাসায় যাওয়া আমি বন্ধ করে দেই। শিমু ভাবি মানে জুহির মা তবুও সেদিন রিদু কে ডেকে নিয়ে আমার নামে অনেক গুলো কথা শুনিয়েছেন!জুহির মা যখন আমাকে শক্রু ভাবতে শুরু করেছেন তখন আর এই এলাকাতেই আমার থাকার মতো অবস্থা নেই,তাই এখান থেকে চলে যাওয়াই উত্তম।

প্রায় অনেক বছর পর,

বই খুঁজতে যেয়ে বেশ পুরনো অফহোয়াইট মলাটের ডায়রীটা হঠাত হাতে আসল। অনেকদিন হয়ে গেছে,ডায়রি লিখি না,নিজের সাথে নিজে কথাও বলি না! আজকাল কি আসলেই অনেক ব্যস্ত থাকি নাকি ব্যস্ততার মাঝে ডুবে থাকি জানি না,তবে এখন আর ওভাবে নিজের কথা ভাবার সময়ও হয় না!অনেক বদলে গেছে সব কিছু। একটা সময় ছিলো,ডায়রীর পাতায় কালির আঁচড় না বসালে আমার দিন ফুরাতো না! আমার ডায়রী গুলো আমার আমির কথা বলতো...
ভাবতে ভাবতে আনমনে পাতা উল্টাতে উল্টাতে এক পাতায় যেয়ে জুহিদের ঘটনাটা চোখে পড়ল!হঠাত করেই থমকে গেলাম! জুহি...
অনেক দিন পেরিয়ে গেছে,এর মধ্যে বদলে গেছে অনেক কিছু!কেমন আছে এখন জুহিরা? কেমন আছে শিমু ভাবি?
মানুষের একটা স্বভাব হলো,
ব্যস্ততার মাঝেও হঠাত করে যখন কারো কথা মনে পড়ে যায়,তখন কেন জানি অদ্ভুদ অস্থিরতা কাজ করে!মনে হয়,
'ইশ,যদি একটু খোঁজে পেতাম মানুষটার!কেমন আছে,কি করছে এখন? কিছু যদি জানা যেতো!'
এমন হাজারো চিন্তা এসে ভর করে,তারপর এক সময় আবার কাজের ভীড়ে তা হারিয়েও যায়। তবে জুহিদের ব্যাপারটা আমার মাথা থেকে সহজে গেলো না। ইনডেক্স খুঁজে নাম্বার বের করে, রিদু কে ফোন দিলাম,ও এখন আছে খুলনা,বিসিএস দিয়ে ওখানেই জয়েন করেছে এক কলেজে। এতো বছর পর হঠাত জুহিদের খবর জানতে চাওয়ায় বেশ অবাক হলো রিদু! তেমন কোন খবর অবশ্য ও দিতে পারলো না,শুধু জানালো জুহি পড়াশুনা করতে গেছে ইউএস এ,সম্ভবত ওখানেই স্যাটেল হয়েছে।
কেমন আছেন তাহলে শিমু ভাবি এখন?উনিও কি এখন উনার শ্বাশুড়ির মতো একলা দিন কাটাচ্ছেন? কে জানে! হয়তো!
আসলে জীবন কখনো স্বাভাবিক ভাবে,কখনো বা অদ্ভুদ ভাবে বদলে যায়! সেটা মানুষ চায় কি না চায়। আজ হয়তো শিমু বুঝতে পারছেন, নিজের ভুল গুলো,হয়তো...

সময়ের সাথে সাথে আমিও বদলে গেছি! মানুষকে বুঝতে শিখেছি,বাঁচতে শিখেছি মানুষের মাঝে,একা একা নয়। বদলে গেছে বাবা,বদলে গেছে মা ও।
কনভোকেশন প্রোগ্রামের দিন আমার রেজাল্টে খুশী হয়ে বাবা জিজ্ঞেস করেছিলেন,
-কি চাসরে মা?বলে ফেল।
আমি জীবনে প্রথম বাবা কে অবাক করে দিয়ে বলেছিলাম,
-বাকী জীবন,তোমাকে আর মা কে নিয়ে একসাথে থাকতে চাই!
অনেকটা সময়ের জন্য বাবা হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে ছিলেন। আমার অশ্রু ভরা চোখের দিকে তাকিয়ে নিজের ঢেকে রাখা অসহায়ত্ব কে বুঝাতে চাইছিলেন। আর মা?
দেয়ালে হেলান দিয়ে আমার মাথায় শুধু হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলেন। দু'জনে এর বেশি আর কিছুই বলেননি।আর ঐদিনের পর আমিও আর কিছু ভাবিনি। কিছু অসম্পূর্ণতা নিয়েই তো জীবন,এই আধেক সুখ-দুঃখ গুলোই অনুভূতির ভারসাম্য।
তারপর একে একে অসংখ্য সিঁড়ি পেরিয়েছি। 'টুকরো ঘরের' মেয়ে হয়েও অনেক ঘর জুড়তে সাহায্য করেছি,ঐ হাসি-আনন্দ গুলোর মাঝেই নিজের আধেক গুলো পুরো করেছি।


বাসায় ফিরে,নিজের রুমে যাবার আগে দেখে নিলাম পুরো বাসাটা,মা তার রুমে কলেজের খাতা চেক করছেন! মাঝে মাঝে বাবা বেড়াতে আসেন আমার এখানে! তখন মা সহজে রুম ছেড়ে বের হোন না। নাহ,কোন কালেই এদের দূরত্ব আর কমানো গেলো না।
অবশ্য এখন আমার ও নিয়ে আফসোস কম। আমি শুধু অপেক্ষায় থাকি,কবে ছুটিতে বাবা আসবেন,ক'টা দিন তখন আমি রোজ সকালে উঠে,আর রাতে ঘুমাতে যাবার আগে যে,বাবা-মায়ের মুখটা দেখতে পারি,আমার জন্য এই ই তো অনেক!
মায়ের সাথে থেকে আমি বুঝতে শিখেছি,একাকীত্ব কত কষ্টের! যদিও এখন আর জ্বর হলে আমাকে একা একা প্যারাসিটামল খেতে মাথায় পট্টি দিতে হয় না,একা একা কুলফি খেতে হয় না। তবুও বুঝতে পারি,মা এর কষ্ট টা। কিছু করার নেই আমার,এই জীবনটা ই হয়তো তিনি চেয়েছিলেন,অথবা এমন জীবন ই তার প্রাপ্য ছিলো।
খুব বেশি না হলেও একটি-আকটু বুঝতে পারি,বাবা-মায়ের মাঝে সন্তান হচ্ছে খুব শক্ত একটা বাঁধন। এই বাঁধনটার অনেক শক্তি আছে,বছরের পর বছর দু'টো মানুষকে এক করে রাখার শক্তি। এই বাঁধনটা যদি ঢিলে হয়,ছিঁড়ে যায় তাহলে বাবা-মা দু'টো সম্পূর্ণ আলাদা মানুষ হয়ে যেতে একটুও দেরি হয় না। সব সময় যে,বাবা-মা কে ই এই বাঁধন শক্ত করতে হবে এমনটা না,কখনো কখনো সন্তানও পারে।
জুহির দাদীর সেই একলা দিন গুলো আমাকে শিখিয়েছে,বাবা-মায়ের সন্তানকে ছাড়া একলা থাকতে কতো কষ্ট হয়! কত কষ্ট হয় দিনের দিনের পর দিন সন্তানের মুখের ডাক না শুনে থাকতে!আর এখন মা-বাবা কে দেখে শিখেছি,নিজেদের মধ্যে যাই কিছুই থাকুক না কেন,সন্তানের জন্য আসলে আলাদা জায়গা থাকেই,কখনো আবার সেই জায়গা টাই নতুন সুযোগ দেয় আবার কখনো বছরের পর বছর ঐ জায়গাটা বিরান ই থেকে যায়। আর তাই,আমি সারাক্ষন চেষ্টা করি,এই দুই মেরুর মানুষ দু'জন কে সঙ্গ দিতে,তাদের একাকীত্বের ভাগ নিতে।
তিয়াসী এখনো কবিতা লেখে। মাঝে মাঝে মেইল করে,সুযোগ পেলে মুঠো ফোনে ম্যাসেজ করে। আজকাল ঘুরে ফিরে মাথায় তিয়াসীর লেখা কবিতার কিছু লাইন মাথায় ঘুরে,
'আমার সুখ খোঁজার বেলা কই?
যখন আপনাতেই ডুবে রই!
আমার একলা থাকার দুঃখ কই?
যখন এপাড়-ওপাড় থৈ থৈ!
এবার বেলা পড়ে এলো বলে
সঙ্গী তবে হোক সময়,
সুখে-দুঃখের সব জানালায়
চির বসন্তের বাতাস বয়।'





রবিবার, ২৫ মে, ২০১৪

শহর জুড়ে বৃষ্টি


আসি আসি করছে
অপেক্ষারাও জাল বুনছে
এরপর নানা সাজে সাজছে
এই নানা রঙের প্রকৃতির শহর।

এই শহরের,
একটা বৃষ্টি দিনের গল্প শোনাই,শুনবে?
শোন তবে,
শুরুটা ছিলো রোদে জ্বল জ্বল আলোর সকাল
এরপর এলো মেঘ
নিকষ হতে নিকষ কালো
আর বাতাসের দ্বিগুণ বেগ!

তার খানিকটা সময় পরেই
মেঘ আনন্দে উচ্ছ্বল হয়ে গেলো
আর বাতাস যেনো সূর্য হতে মুক্তি পেলো
শুরু হলো এক অনাবিল ছন্দের বৃষ্টি।

ব্যাস!এইটুকুই ছিল গল্প?

হুম,এটুকুই!

সে বৃষ্টি দিনে কোন বাঁধাহীন আনন্দের গল্প ছিলো না?
ছিলো না কোন,ধূসর সময়ের ভীড়ে বর্ণিল গল্প?

হুম,ছিলো বৈকি!
সে গল্পে সূদুরে লুকানো কোন উচ্ছ্বল কিশোরীর হাঁসি ছিলো
অথবা তরুনীর নূপুর পায়ের ছন্দ
বৃষ্টির গান,আর কবিতার ভাঁজে লুকানো কিছু মিষ্টি হাঁসি
আর এক রাশ জমানো ক্ষোভ,অভিমান আর ক্লান্তির বাষ্পীয় মুহুর্ত!

সে গল্পে আরো ছিলো,
কাঠখোট্টা অথবা ইট-পাথরের অফিসের জানালায়
দাঁড়ানো কোন ক্লান্ত অনুভূতি
ছিলো ফাইল হাতে ছুটে চলা মানুষটার
অনেক দিন আগে ব্যস্ততার ভীড়ে ফেলে আসা
কোন সুখস্মৃতি,
বাস্তবতার ভীড়ে হাসতে ভুলে যাওয়া মানুষ গুলোর
ফেলে আসা দুরন্ত শৈশব!

এই শহরের বৃষ্টির গল্প বড্ড রকমের বর্ণিল
নানা রকমের অনুভূতির ভিন্ন ছন্দ মিল
কেউ বৃষ্টি ছুঁয়ে মুগ্ধ,কেউ বা বৃষ্টির ছোঁয়ায় বিরক্ত!
বড্ড ব্যস্ত এই শহর,তার নিজের সাথেই
বৃষ্টি এখানে গল্প বুনে তাই,সবার অজান্তেই।