১.
কলিংবেল চাপার পরেও বেশ কিছুক্ষন দাঁড়িয়ে থাকতে হলো,কিছুটা বিরক্ত হলাম!আরেকবার চাপতে যাবো তখনই দেখি মা দরজা খুললেন। সালাম দিয়ে কিছু বলতে যেয়েও বলতে পারলাম না,তার আগেই মা যেনো ঝাড়ি দিয়ে বললেন,
কলিংবেল চাপার পরেও বেশ কিছুক্ষন দাঁড়িয়ে থাকতে হলো,কিছুটা বিরক্ত হলাম!আরেকবার চাপতে যাবো তখনই দেখি মা দরজা খুললেন। সালাম দিয়ে কিছু বলতে যেয়েও বলতে পারলাম না,তার আগেই মা যেনো ঝাড়ি দিয়ে বললেন,
-এতো বার বেল টেপার কি আছে?আমাদের কি কান নেই?বাহিরে কেবল তুই একাই থাকিস বলে মনে হয়!
আমি কপাল কুঁচকে তাকিয়ে রইলাম মায়ের দিকে,আজকাল কি হয়েছে মায়ের কে জানে,সারাক্ষনই কেমন রেগে রেগে থাকেন!কিছু একটা হলেই রাগ ঝাড়েন। মাঝে মাঝে মনে হয়েছে,সারাদিন বাসায় একা থাকেন বলেই হয়তো মেজাজ তেতো হয়ে থাকে,আবার মনে হয়েছে,বয়সও তো হয়েছে,তার উপর ডায়াবেটিকসের রোগী,মেজাজের ভারসাম্য একটু এলোমেলোই হয়তো তাই।
আমি আর কোন কথা না বলে,চুপচাপ হাত-মুখ ধুয়ে খেতে বসলাম। খাবারের মেনু দেখে আরেকবার দীর্ঘশ্বাস ফেললাম! আজকাল পরীক্ষা-ক্লাসের ঝামেলায় রান্না ঘরে ঢুকার সময় পাইনা,আর মা ও আগের মতো মজা করে রান্না করেন না,যেদিন যা ইচ্ছে হয় কোন রকম তৈরী করে রাখেন। মা এসে আমার পাশের চেয়ারে বসলেন,
-মিতুর সাথে কি তোর আজকাল কথা হয়েছে কোন?
আমি প্লেটে ডাল ঢালতে ঢালতে মাথা নাড়ালাম।
-ওর সাথে কথা হয় না তো এতো সময় কম্পিউটারে বসে কি করিস?
-কেন?কি হয়েছে?
-তুই আজই ওর সাথে কথা বলবি,মোবাইলে টাকা না থাকলে আমার কাছ থেকে টাকা নিয়ে যাবি।
আমি আগের মতোই চুপ করে রইলাম।মা উঠে চলে গেলেন। প্লেট ধুতে ধুতে চিন্তায় ডুব দিলাম! মা হঠাত করে মিতু আপুর সাথে কথা বলতে বলছেন কেন?!
সন্ধ্যায় ছাত্রী পড়িয়ে বাসায় ফিরে,কফির মগ নিয়ে পিসির সামনে বসলাম। স্যার এর লেকচার ডাউনলোড করা হয়নি,আর অনেকদিন হয়ে গেলো মেইল গুলোও চেক করা হয়নি। মেইল বক্সে মিতু'পুর একটা নতুন মেইল পেলাম।
মেইলটা এসেছে গত পরশু,প্রায় চার মাস পর। এই চারমাসে আমার মুপ্পু মানে মিতু'পুর সাথে কোন কথা বা যোগাযোগ হয়নি,ফেইসবুক,স্কাইপি কিংবা ইয়াহু কোথাও না। অথচ একটা সময় ছিলো,এই মিতু আপুই আমার সব ছিলো,আমার ভাই-বোন,বন্ধু,টিচার সব কিছু।
ছোট বেলায় আমার খুব মনে হতো,বাবা আমার চাইতে মুপ্পুকেই বেশি আদর করেন!আর আমি?সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতাম বাবাকে,এখনো বাসি। মুপ্পুর জন্মদিনের একদিন আগে ছিলো বাবার জন্মদিন,ওর প্রতি জন্মদিনে বাবা বলতেন,
-ইশরে মা,আল্লাহ তোকে কেন যে একদিন আগে পাঠালেন না!কি মজাই না হতো তাহলে,আমাদের বাপ-বেটির আনন্দের দিনটা একই হয়ে যেতো!
শুনে মুপ্পুও আফসোস করতো,আর আমি গাল ফুলাতাম! কিন্তু কে জানতো,বাবা চলে যাওয়ার সাথে সাথে মুপ্পুর জন্মদিনটাই আমাদের জন্য সবচেয়ে দুঃসহ হয়ে যাবে!বাপ-মেয়ে জন্ম তারিখ একই দিনে না হলেও,জন্ম-মৃত্যুর তারিখটা একই দিনে হয়েছিলো! এরপর সব কিছুই বদলে গিয়েছিলো,সব...
বাবার হঠাত চলে যাওয়ার পর সংসারের হাল ধরেছিলো আমার সদ্য কলেজ পেরোনো বোনটি,মা-আমি,বাসা ভাড়া,বাজার খরচ,আমার স্কুল মায়ের ঔষধ সব কিছুর জন্য রাত-দিন এক করে দিয়েছিলো মিতু আপু। যেখানে আত্নীয়-স্বজনরা বাবা চলে যাওয়া মাত্রই আপুর জন্য একের পর এক বিয়ের প্রস্তাব আনতে আনতে বিরক্ত হচ্ছিলো,সংসারের চিন্তা,বাবা চলে যাওয়ার কষ্টে মা প্রায় বিছানা নিয়েছিলো,সেখানে তখন রান্না থেকে শুরু করে বাজার-ইনকাম সব কিছু সামলাচ্ছিলো মিতু আপু।
মাস্টার্স শেষ করে আপুর বিয়ে হয় ওদের ভার্সিটিরই দু'ব্যাচ সিনিয়র মুহিন ভাইয়ের সাথে। তখন আমি ক্লাস নাইনে পড়ি। বিয়ের খরচ,শপিং,আত্নীয়-স্বজন আপ্যায়ন সব কিছুই এক হাতে সামলেছিলো মুপ্পু। বিয়ের দু'বছরের মাথায় উচ্চ শিক্ষার জন্য দু'জনেই চলে যায় সুদূর টোকিও তে। ব্যাস,সেই থেকে দীর্ঘ ৬বছর যাবত এমন একঘেয়ে,একই রুটিনের দিন কাটাচ্ছি আমি আর মা। প্রথম প্রথম আপুর সাথে নিয়মিতই যোগাযোগ ছিলো,বাট গত এক বছর যাবত আপুই আমাদের সাথে যোগাযোগ করা কমিয়ে দিয়েছে কেন জানি! ফোন করে না,এসএমএস এর তেমন রিপ্লাই দেয় না,মেইলও করে না।
সেখানে আজ এতো দিন পর আপুর মেইল দেখে আমার কেমন জানি ভয় ভয়ই লাগছে!
রাত থেকে আমি স্ট্যাচুর মতো বসে আছি,ওদিকে ঘড়ির কাঁটা সকাল ৮টার ঘর পেরুচ্ছে!আজ জরুরী একটা ক্লাসও আছে। কিন্তু আমার রেডি হওয়ার কোন লক্ষণ নেই!মা একবার আমার রুমের সামনে দিয়ে চলে গেলেন,কিছু বললেন না। আমি সারাদিন অনেকটা ওভাবেই রুমে পড়ে রইলাম। দেড়টার দিকে কলিংবেল বেজে উঠলো,অনেক ক্ষন পর মা গেট খুলে দিতেই দৌড়ে আমার রুমে আসল সোমা। আমার বহু পুরনো বান্ধবি। এসেই হৈ চৈ শুরু করলো,
-কিরে তুই আজ ক্লাসে গেলি না কেন?আজ স্যার নতুন শীট ও দিলো,আর তুই ফোন ধরিস না কেন?কত্ত বার ফোন দিয়েছি তোকে?কই তোর ফোন কই?
বলেই ও আমার ফোন খুঁজতে লাগল। আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চুপচাপ ওয়াশরুমে ঢুকলাম। হাত-মুখ ধুয়ে এসে দেখি সোমা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে,আমি কিছু বলছিনা দেখে ও বলল,
-নিতু,এতো সিরিয়াস ঝামেলা আর তুই আমাকে একটা ম্যাসেজও করলি না?করলে তো আমি আরো আগেই চলে আসতাম।
আমি তোয়ালেতে মুখ মুছতে মুছতে বললাম,
-আমি জানলাম কাল রাতে,আর মা জানতো গত সাত দিন ধরেই!
-কি করবি?কিছু ভেবেছিস?
আমি স্বাভাবিক কন্ঠেই বললাম,
-মুপ্পুর সাথে কথা বলতে হবে,আগে জানতে হবে ও কি চায়?ও যদি বলে আমি স্বেচ্ছায় তাই করবো,আর যদি না করে তাহলে বিষ খাবো তবুও এই প্রস্তাবে রাজী হবো না।
সোমা আর কিছু বলল না। কিছুক্ষন পর আবার বলল,
-তুই খুব শকড হয়েছিস তাই না?
আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম,
-আমার জায়গায় না থাকলে বুঝতে পারবি না!আসলে আমাদের দু'বোনের জীবনটাই এমনরে!জীবনে যা কিছু আনন্দ-ভালোবাসা পেয়েছি তা মনে হয় ঋন হিসেবেই পেয়েছিলাম,আর তাই যা পেয়েছিলাম,তারচেয়ে দ্বিগুণ কষ্ট হাসিমুখে মেনে নিয়ে সুখের ঋন শোধ করতে হচ্ছে আমাদেরকে,বাবা চলে যাওয়ার পর মুপ্পু করেছিলো,তারপর কিছুদিন যাও সুখ পেয়েছিলো এখন আবার তার ঋন শোধ করছে,এবার আমাকেও করতে হবে হয়তো!
বলতে বলতে কন্ঠ ধরে আসলো আমার!হাতে ধরা তোয়ালেটার উপর ফোঁটায় ফোঁটায় অশ্রু পড়তে লাগল।
২,
সেই রাতের পর থেকে আমি কেন জানি নিজেকে আরো বেশি গুটিয়ে রাখতে শুরু করলাম,বিশেষত,মা এর কাছ থেকে!মা সেটা বুঝেছে কি না কে জানে!কারণ,মা নিজেও কেমন যেনো ছাড়া ছাড়া ভাব বজায় রাখছে। এর মধ্যে একবার মামাত ভাইয়ের বউ এসেছিলেন,কথার ইঙ্গিতে কিছু বুঝাতে চাচ্ছিলেন,কিন্তু আমি ইচ্ছে করেই বুঝেও না বুঝার ভান ধরে ছিলাম!
আমি জানি,আত্নীয়-স্বজনরা বেশ মজাই পাচ্ছে,আমাদের এমন অবস্থা দেখে!আসলে সমাজে ব্যাক্তিত্ব কিংবা নিজস্ব পরিচয় নিয়ে আলাদা ভাবে বেঁচে থাকা অনেক কঠিন!সবাই ই চায়,যেনো অন্যরা তার মতো চলে,তার থেকে বেশি দূরে যেতে না পারে।
প্রায় ছয় বছর পর দরজা খুলে মিতু আপু,মানে আমার মুপ্পুকে দেখে আমি কেন জানি খুব একটা অবাক হলাম না!মানে হতে পারলাম না,শুধু ঠাঁয় দাঁড়িয়ে রইলাম। কারণ,আমার মনে হলো অবচেতন মনেই হোক,আমি মিতু আপুরই অপেক্ষা করছিলাম,এবং আমি জানতাম ও দেশে ফিরবে ক'দিনের মধ্যেই! আমাকে এভাবে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মুপ্পু বলল,
-নিতুমণি,কেউ দরজায় আসলে তাকে সালাম দিতে হয়,আর ভেতরে আসতে দিতে হয়,তাই না?
আমি ছল ছল চোখে হাসার চেষ্টা করলাম,সালাম দিয়ে দরজা থেকে সরে দাঁড়ালাম। ও ভেতরে ঢুকলে দরজা লাগিয়ে ওকে জড়িয়ে ধরলাম। অনুভব করতে চাইলাম,আমার সেই মুপ্পুকে,যার গলা জড়িয়ে আমি ঘুমাতাম,যার হাত ধরে আমি স্কুলে যেতাম। ইশশ...৬টা বছর কতো ই না দীর্ঘ একটা সময়!কিচ্ছু বলতে পারলাম না,শুধু দু'বোনের চোখের পানি অনেক কথা বলে দিলো।
মায়ের এক্সপ্রেশনে আমি কিছুটা অবাক হলাম!তারমানে আমার মতো মা ও মনে মনে তৈরী ছিলেন!আপুকে অবশ্য চমকাতে দেখলাম না,মা আপুকে জড়িয়ে ধরে স্বাভাবিক কন্ঠেই বললেন,
-যা হাত-মুখ ধুয়ে নে,আমি খাবার দিচ্ছি।'' যেনো মেয়ে তার মাত্র ক্লাস থেকে ফিরলেন!
আপু আমাদের সেই চেনা ছোট্ট চুড়ুই পাখির বাসার মতো ঘরটাতে ঢুকে দু'হাত মেলে চোখ বুজে নিঃশ্বাস নিয়ে বলল,
-ইশশ... কত্ত বছর পর,সেই রুমটা,সেই জানালা,আর...ঐ গাছগুলো?ও গুলো আছে নারে এখনো?
আমি হেসে মাথা নাড়লাম।
-হুম,ঘরটা আগের মতোই আছে,আবার আগের চাইতে সুন্দরও হয়েছে বলা যায়! বদলায়নি অনেক কিছুই আমার মতো,তাই না?
কথাটা শুনতে কেমন জানি লাগলো!আমি কিছু না বলে চুপচাপ রুম থেকে বেরিয়ে আসলাম।
কেন জানি মুপ্পুর সামনে আমার অস্বস্তি লাগছিলো! ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে পারছিলাম না,ওর জল থৈ থৈ চোখ দু'টো সব বলে দিচ্ছিলো,যা সহ্য করা আমার জন্য অনেক কষ্টকর!
খাবার টেবিলে এসে মুপ্পু উচ্ছ্বাসিত কন্ঠে বলতে লাগল,
-ওরে ওরে ওরে,আমার প্রিয় নতুন আলুর সাথে মুরগীর ঝোল!ইশশ...কত্তদিন পর!আর ওটা কি?লাউ পাতার ভর্তা!ওহহো!কইরে বুড়ি,জলদি আয়,আমার আর তর সইছে না।
আমি হাসতে হাসতে ওর আর মায়ের জন্য প্লেট সাজালাম। আজ প্রায় অনেক বছর পর আমরা মা-মেয়েরা একসাথে দুপুরের খাবার খেতে বসেছি। কিন্তু কেন জানি তেমন কোন সুখানুভূতি ভেতরে কাজ করছে না!আমরা মানুষরা আসলেই কেমন জানি!কোন কিছুতেই মন ভরে না। এই যে এত বছর পর আমরা একসাথে হলাম,কই সেই খুশী নিয়েই মশগুল থাকবো তা না...
রাতে চা খেতে খেতে মুপ্পু আমাদেরকে জাপানের গল্প শোনাচ্ছিলো,আমিও বেশ আগ্রহ নিয়ে শুনছিলাম। হঠাত ই মা বলে উঠলো,
-মুহিন কবে আসবেরে মিতু?
সাথে সাথেই আমি আর আপু মনে হয় স্ট্যাচু হয়ে গেলাম। মুপ্পু একবার আমার দিকে তাকিয়ে বলল,
-জানিনা।
বলেই ও আবার গল্পে ফিরে যাচ্ছিলো,কিন্তু মা আবার বলে উঠলেন,
-জানিনা মানে কি?তুই কি ডিসিশন নিয়েছিস?কি করছিস কিছু তো জানাবি না জানি,কিন্তু মুহিন কি করছে সেটা তো বলবি?
আপু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল,আমি কিছু বলতে চাচ্ছিলাম,কিন্তু বলতে পারলাম না শুধু মাথা নিচু করে রইলাম।
-মুহিন সম্ভবত জুন-জুলাইয়ের দিকে আসবে।
মা আবারো জিজ্ঞেস করলেন,
-কি সিদ্ধান্ত নিয়েছে ও?
আপু এবার কিছুটা বিরক্ত গলায় বলল,
-মা তুমি তো সবই জানো,এখানে আমার সিদ্ধান্তের আর কি বাকী আছে বল?আর তার সিদ্ধান্ত জানারই বা কি আছে? ডাক্তার বলে দিয়েছে,আমার কখনো বেবি হবে না,যদি কখনো আল্লাহর অনেক দয়া হয়,তাহলে হয়তো...আর এটা জানার পরেও মুহিন অনেকদিন অপেক্ষা করেছিলো কিন্তু এখন আর করতে চাইছে না,আর যেহেতু সে বিয়ে করবেই তাই ওর পরিবার চেয়েছিলো বিয়েটা নিতুর সাথেই হোক!যেটা আমার বা নিতুর পক্ষে মেনে নেয়া সম্ভব না!সুতরাং ওরা এখন অন্য মেয়ে দেখছে,এবং মেয়ে ঠিক হলে মুহিন এসে বিয়ে করবে,ব্যাস।
আপুর কথা শেষ হলেও আমরা তিন জনই নিরব রইলাম। মায়ের মুখ দেখেই বুঝা যাচ্ছে,তিনি প্রচন্ড অসন্তুষ্ট হয়েছেন আপুর এমন কথা শুনে। নিচু কন্ঠে বললেন,
-তোর বড় মামী বলছিলো,ওদের প্রস্তাবটা নিয়ে আরেকবার ভাবতে!সবই তো আমাদের চেনা-জানা,আর সংসার ও তোরই,ক্ষতি কি নিতু গেলে!
কথাটা শুনে আমার কেমন যে অনুভূতি হচ্ছে নিজেও বুঝতে পারছি না! একবার আপুর মুখের দিকে তাকালাম,
ও স্বাভাবিক ভাবেই বলল,
-মা,তুমিও কি বড় মামীর সাথে একমত?
মা হ্যাঁ/না কিছুই বললেন না। আপুই আবার বললো,
-মা,এতো পাষাণ হইয়ো না প্লিজ!আমি কষ্ট যা পাওয়ার পাচ্ছি,বাট নিতুর উপর এত বড় জলুম করতে যেও না।
আমি আবারো আপুর মুখের দিকে তাকালাম,শেষের দিকে কন্ঠটা কাঁপছিলো যেনো! আহারে,কি কষ্টের পাহাড় টাই না বুকের ভেতর পুষে রেখেছে আমার বোনটা!না পারছে কাউকে বলতে না পারছে সহ্য করতে,কেবল ভেতরে ভেতরে মরছে।
আজকাল দিন গুলো কেমন যেনো অদ্ভুদ সুন্দর ভাবে কাটছে,এমন বৈচিত্র্যময় দিন শেষ কবে কাটিয়েছিলাম মনে নেই। আসার সপ্তাহ খানেকের মধ্যেই আপু একটা স্কুলে জয়েন করেছে,ওখানকার এসি.হেড আপুর বান্ধবী ছিলো।
মা এখন ঠিক আগের মতো আমাদের জন্য রান্না করেন,যেভাবে আগে বাবা থাকা কালে করতেন,সেই স্বাদ আর আগ্রহ নিয়ে। মিতু'পু মাঝে মাঝে মা কে নিয়ে ছুটির দিনে বাজার করতে বের হয়,সেদিন দু'জনের বাজার গুলো দেখার মতো হয়!!বাসায় থাকলে দু'জন মিলে ঘরের জিনিসপত্র একবার এপাশে তো আরেকবার ওপাশে করে। সেই আগের মতোই সকাল সকাল আমরা দু'বোনই বেড়িয়ে যাই,আবার দিন শেষে এক সাথেই ফিরি। প্রায় ছয় বছর দেশের বাইরে থেকে আসার পর মুপ্পুর কীর্তি দেখলে না হেসে উপায় নেই!
প্রায় প্রতিদিনই বিকেলে আমাকে নিয়ে সে রিকশায় ঘুরতে বের হবে,সে নাকি ঢাকা শহর চিনে না!তাই রিকশায় করে তার শহর চিনতে হয়! টং এর দোকানের চা থেকে শুরু করে ঝালমুড়ি পর্যন্ত সব কিছুই যেনো সে প্রথম খাচ্ছে এমন ভাব! তবে বিদেশে থেকে আসলেও অন্যদের মতো ওর দেশ নিয়ে কোন খুঁত খুঁতে ভাব নেই,বলতে শোনা যায় না,'উফফ,কি ধূলোরে'! কিংবা 'নাহ,দেশের কোন উন্নতি হইলো না,অথচ বিদেশে...ব্লা,ব্লা!' ভাবখানা এমন,যেনো এই ধূলোবালির শহরটাই তার অনেক প্রিয়!এই রাস্তার পাশের ফুচকা অনেক অমৃত!
মিতু'পুর চাকরী নিয়ে মামারা কিছুটা উচ্চ-বাচ্চ করেছিলেন,এমন চাকরী টা তাদের মোটেও পছন্দ হয়নি!ক'টাকাই বা বেতন পাবে,এখন তো আবারও ওকেই সংসারের হাল ধরতে হবে ইত্যাদি চিন্তা মার্কা কথা!
অবশ্য মুপ্পু চাইলে যেকোন ভালো কোম্পানি বা ভার্সিটিতে জয়েন করতে পারতো,কিন্তু সে তা না করে জয়েন করেছে একটা বাচ্চাদের স্কুলে। কেন?সেটা আমরা কেউ ই জিজ্ঞেস করিনি। বাবা চলে যাওয়ার পর আপুর সংসারে দায়িত্ব বুঝে নেয়াটাও কেউ তেমন ভালো চোখে দেখেননি,ওর একার সেই প্রচেষ্টা গুলোকে তখন সবার চোখেও বিরক্ত লাগতো!আর তাই বলা যায় ওর সংসারের এই পরিণতিতে অনেকেই মনে মনে খুশী!
মা প্রায়ই আমাকে চুপে চুপে জিজ্ঞেস করেন,মুহিন ভাইয়ের সাথে আপুর যোগাযোগ হয় কি না! কিংবা আপু মুহিন ভাইয়ের কথা কিছু বলে কি না। আমি কখনো হু/হ্যা করি আবার কখনো চুপ থাকি।
আপু এখানে আসার পর মুহিন ভাই ক'বার ফোন করেছিলেন,আমি দেখেছি আপু খুব দায়সারা ভাবেই কথা বলেছে। একটা সময় পর আর কোন ফোন আসেনি। আমি মাঝে মাঝে আপুর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি!বুঝার চেষ্টা করি,
আগের চেয়েও অনেক চাপা স্বভাবের হয়ে গেছে আপু,ও ভাবে,ও কিচ্ছু না বললে,প্রকাশ না করলে আর কেউ কিছুই বুঝবে না! বোকা একটা... কষ্ট কখনো কখনো আগুনের মতো হয়। তাই পোড়ার গন্ধ কিংবা কষ্টের ফ্যাকাশে রংটা সব সময় লুকিয়ে রাখা যায় না। আর ওর চোখ?
মানুষের চোখ হচ্ছে ভয়ংকর রকমের আয়না!একবার তাকালেই অনেক কথা দেখা যায় স্পষ্ট ভাবে। মুপ্পুর চোখ দু'টোও তাই অনেক কথা বলে দেয়,যা ও বলে না। কতোবার ও কথা বলতে বলতে থেমে যায়,কথার মাঝখানে ভাইয়ার নাম আসতেই ধাক্কা খায়,কতোবার যে ভাইয়ার স্মৃতি জড়িত কিছু দেখে ও নিজেকে হারিয়ে ফেলে তার কোন ইয়াত্তা নেই,অথচ জিজ্ঞেস করলে খুব সুন্দর করে এড়িয়ে যায়।
আমি হঠাত করে জিজ্ঞেস করে বসি,'আচ্ছা,তোর আর মুহিন ভাইয়ের মধ্যে ভালোবাসা কেমন ছিলোরে?'
ও ভ্রু কুঁচকে আমার দিকে তাকায়,
-কেমন ছিলো মানে?
-মানে কেমন ছিলো?সরব নাকি নিরব?
মুপ্পু হাসল খানিকটা,
-ওর ভালোবাসা সরব ই ছিলো বলা যায়,কোন না কোন ভাবে বুঝাতোই! মুখে বলা থেকে শুরু করে রাগ-অভিমান, বোকামী,সবই করতো!
-আর তোর ভালোবাসা?
-নিরব... অনেক নিরব ছিলো!এখানে যতোদিন ছিলাম,ততোদিন তোদের কথা,তোদের নিয়ে ব্যস্ত থাকতাম,আর ওখানে চাকরী-পড়াশুনা নিয়ে। সাধারনত বাঙ্গালী মেয়েদের অভিযোগ থাকে,যে তাদের মানুষটা বিদেশ-বিভূঁইয়ে তাদেরকে সময় দেয় না,কিন্তু আমার ক্ষেত্রে ছিলো উল্টো!
-তুই ভাইয়া কে ভালোবাসতি না?!
মুপ্পু সাথে সাথে উত্তর দিলো না,খানিক পর বলল,
-আসলে আমি খুব ভয় পেতাম সব সময়!আমার মনে হতো,আমি যা কিছুই খুব বেশি ভালোবাসি,তা ই আমার কাছ থেকে দূরে সরে যায়!আমি আমার জীবনে খুব ভালোবাসা কারো কাছ থেকে একবারের বেশি পাইনি!আমার মনে হতো,মুহিনকেও আমি হারিয়ে ফেলবো!তাই কখনোই নিজের ভালোবাসা প্রকাশ করতে চাইতাম না!মনে হতো আমি ওকে খুশী করতে পারবো না,কিন্তু যখন মাঝে মাঝে যদি কখনো ওর মনের মতো কিছু করতাম,মানুষটা তখন এত্ত খুশী হতো,যে দেখে ভয়ই লাগতো! কিন্তু শেষের দুটো বছর খুব খারাপ গিয়েছেরে!এতোটা বদ মেজাজ আর অধৈর্য্য আচরন করতো যে,আমিও মেজাজ সামলাতে পারতাম না!এমন অবস্থা হয়েছিলো,যে দিন শেষে কেউ বাড়িই ফিরতে চাইতাম না,ঝগড়া করার ভয়ে!
বলতে বলতে আপু আবারো মনের জগতে হারিয়ে গেলো! আমি বইয়ের পাতা উল্টাতে উল্টাতে বললাম,
-কিন্তু হলো তো তাই,তুই তো মানুষটাকে হারিয়েই ফেললি!তুই কখনো বুঝাতে চাসনি বলেই,আজ সে তোর চোখের ভাষা পড়তে পারেনি!তোর হারাবার ভয় এতোটাই দূরত্ব তৈরী করে ফেলেছিলো,যে মানুষটা তোর কষ্ট বুঝতে ভুলে গিয়েছিলো! পুর্ণেন্দু পত্রীর সেই কবিতাটার কথা তোর মনে আছে?ঐ যে,
''বুকের মধ্যে বাহান্নটা মেহগনি কাঠের আলমারি।
আমার যা কিছু প্রিয় জিনিস,সব সেইখানে।
সন্ধ্যায় ছাত্রী পড়িয়ে বাসায় ফিরে,কফির মগ নিয়ে পিসির সামনে বসলাম। স্যার এর লেকচার ডাউনলোড করা হয়নি,আর অনেকদিন হয়ে গেলো মেইল গুলোও চেক করা হয়নি। মেইল বক্সে মিতু'পুর একটা নতুন মেইল পেলাম।
মেইলটা এসেছে গত পরশু,প্রায় চার মাস পর। এই চারমাসে আমার মুপ্পু মানে মিতু'পুর সাথে কোন কথা বা যোগাযোগ হয়নি,ফেইসবুক,স্কাইপি কিংবা ইয়াহু কোথাও না। অথচ একটা সময় ছিলো,এই মিতু আপুই আমার সব ছিলো,আমার ভাই-বোন,বন্ধু,টিচার সব কিছু।
ছোট বেলায় আমার খুব মনে হতো,বাবা আমার চাইতে মুপ্পুকেই বেশি আদর করেন!আর আমি?সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতাম বাবাকে,এখনো বাসি। মুপ্পুর জন্মদিনের একদিন আগে ছিলো বাবার জন্মদিন,ওর প্রতি জন্মদিনে বাবা বলতেন,
-ইশরে মা,আল্লাহ তোকে কেন যে একদিন আগে পাঠালেন না!কি মজাই না হতো তাহলে,আমাদের বাপ-বেটির আনন্দের দিনটা একই হয়ে যেতো!
শুনে মুপ্পুও আফসোস করতো,আর আমি গাল ফুলাতাম! কিন্তু কে জানতো,বাবা চলে যাওয়ার সাথে সাথে মুপ্পুর জন্মদিনটাই আমাদের জন্য সবচেয়ে দুঃসহ হয়ে যাবে!বাপ-মেয়ে জন্ম তারিখ একই দিনে না হলেও,জন্ম-মৃত্যুর তারিখটা একই দিনে হয়েছিলো! এরপর সব কিছুই বদলে গিয়েছিলো,সব...
বাবার হঠাত চলে যাওয়ার পর সংসারের হাল ধরেছিলো আমার সদ্য কলেজ পেরোনো বোনটি,মা-আমি,বাসা ভাড়া,বাজার খরচ,আমার স্কুল মায়ের ঔষধ সব কিছুর জন্য রাত-দিন এক করে দিয়েছিলো মিতু আপু। যেখানে আত্নীয়-স্বজনরা বাবা চলে যাওয়া মাত্রই আপুর জন্য একের পর এক বিয়ের প্রস্তাব আনতে আনতে বিরক্ত হচ্ছিলো,সংসারের চিন্তা,বাবা চলে যাওয়ার কষ্টে মা প্রায় বিছানা নিয়েছিলো,সেখানে তখন রান্না থেকে শুরু করে বাজার-ইনকাম সব কিছু সামলাচ্ছিলো মিতু আপু।
মাস্টার্স শেষ করে আপুর বিয়ে হয় ওদের ভার্সিটিরই দু'ব্যাচ সিনিয়র মুহিন ভাইয়ের সাথে। তখন আমি ক্লাস নাইনে পড়ি। বিয়ের খরচ,শপিং,আত্নীয়-স্বজন আপ্যায়ন সব কিছুই এক হাতে সামলেছিলো মুপ্পু। বিয়ের দু'বছরের মাথায় উচ্চ শিক্ষার জন্য দু'জনেই চলে যায় সুদূর টোকিও তে। ব্যাস,সেই থেকে দীর্ঘ ৬বছর যাবত এমন একঘেয়ে,একই রুটিনের দিন কাটাচ্ছি আমি আর মা। প্রথম প্রথম আপুর সাথে নিয়মিতই যোগাযোগ ছিলো,বাট গত এক বছর যাবত আপুই আমাদের সাথে যোগাযোগ করা কমিয়ে দিয়েছে কেন জানি! ফোন করে না,এসএমএস এর তেমন রিপ্লাই দেয় না,মেইলও করে না।
সেখানে আজ এতো দিন পর আপুর মেইল দেখে আমার কেমন জানি ভয় ভয়ই লাগছে!
রাত থেকে আমি স্ট্যাচুর মতো বসে আছি,ওদিকে ঘড়ির কাঁটা সকাল ৮টার ঘর পেরুচ্ছে!আজ জরুরী একটা ক্লাসও আছে। কিন্তু আমার রেডি হওয়ার কোন লক্ষণ নেই!মা একবার আমার রুমের সামনে দিয়ে চলে গেলেন,কিছু বললেন না। আমি সারাদিন অনেকটা ওভাবেই রুমে পড়ে রইলাম। দেড়টার দিকে কলিংবেল বেজে উঠলো,অনেক ক্ষন পর মা গেট খুলে দিতেই দৌড়ে আমার রুমে আসল সোমা। আমার বহু পুরনো বান্ধবি। এসেই হৈ চৈ শুরু করলো,
-কিরে তুই আজ ক্লাসে গেলি না কেন?আজ স্যার নতুন শীট ও দিলো,আর তুই ফোন ধরিস না কেন?কত্ত বার ফোন দিয়েছি তোকে?কই তোর ফোন কই?
বলেই ও আমার ফোন খুঁজতে লাগল। আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চুপচাপ ওয়াশরুমে ঢুকলাম। হাত-মুখ ধুয়ে এসে দেখি সোমা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে,আমি কিছু বলছিনা দেখে ও বলল,
-নিতু,এতো সিরিয়াস ঝামেলা আর তুই আমাকে একটা ম্যাসেজও করলি না?করলে তো আমি আরো আগেই চলে আসতাম।
আমি তোয়ালেতে মুখ মুছতে মুছতে বললাম,
-আমি জানলাম কাল রাতে,আর মা জানতো গত সাত দিন ধরেই!
-কি করবি?কিছু ভেবেছিস?
আমি স্বাভাবিক কন্ঠেই বললাম,
-মুপ্পুর সাথে কথা বলতে হবে,আগে জানতে হবে ও কি চায়?ও যদি বলে আমি স্বেচ্ছায় তাই করবো,আর যদি না করে তাহলে বিষ খাবো তবুও এই প্রস্তাবে রাজী হবো না।
সোমা আর কিছু বলল না। কিছুক্ষন পর আবার বলল,
-তুই খুব শকড হয়েছিস তাই না?
আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম,
-আমার জায়গায় না থাকলে বুঝতে পারবি না!আসলে আমাদের দু'বোনের জীবনটাই এমনরে!জীবনে যা কিছু আনন্দ-ভালোবাসা পেয়েছি তা মনে হয় ঋন হিসেবেই পেয়েছিলাম,আর তাই যা পেয়েছিলাম,তারচেয়ে দ্বিগুণ কষ্ট হাসিমুখে মেনে নিয়ে সুখের ঋন শোধ করতে হচ্ছে আমাদেরকে,বাবা চলে যাওয়ার পর মুপ্পু করেছিলো,তারপর কিছুদিন যাও সুখ পেয়েছিলো এখন আবার তার ঋন শোধ করছে,এবার আমাকেও করতে হবে হয়তো!
বলতে বলতে কন্ঠ ধরে আসলো আমার!হাতে ধরা তোয়ালেটার উপর ফোঁটায় ফোঁটায় অশ্রু পড়তে লাগল।
২,
সেই রাতের পর থেকে আমি কেন জানি নিজেকে আরো বেশি গুটিয়ে রাখতে শুরু করলাম,বিশেষত,মা এর কাছ থেকে!মা সেটা বুঝেছে কি না কে জানে!কারণ,মা নিজেও কেমন যেনো ছাড়া ছাড়া ভাব বজায় রাখছে। এর মধ্যে একবার মামাত ভাইয়ের বউ এসেছিলেন,কথার ইঙ্গিতে কিছু বুঝাতে চাচ্ছিলেন,কিন্তু আমি ইচ্ছে করেই বুঝেও না বুঝার ভান ধরে ছিলাম!
আমি জানি,আত্নীয়-স্বজনরা বেশ মজাই পাচ্ছে,আমাদের এমন অবস্থা দেখে!আসলে সমাজে ব্যাক্তিত্ব কিংবা নিজস্ব পরিচয় নিয়ে আলাদা ভাবে বেঁচে থাকা অনেক কঠিন!সবাই ই চায়,যেনো অন্যরা তার মতো চলে,তার থেকে বেশি দূরে যেতে না পারে।
প্রায় ছয় বছর পর দরজা খুলে মিতু আপু,মানে আমার মুপ্পুকে দেখে আমি কেন জানি খুব একটা অবাক হলাম না!মানে হতে পারলাম না,শুধু ঠাঁয় দাঁড়িয়ে রইলাম। কারণ,আমার মনে হলো অবচেতন মনেই হোক,আমি মিতু আপুরই অপেক্ষা করছিলাম,এবং আমি জানতাম ও দেশে ফিরবে ক'দিনের মধ্যেই! আমাকে এভাবে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মুপ্পু বলল,
-নিতুমণি,কেউ দরজায় আসলে তাকে সালাম দিতে হয়,আর ভেতরে আসতে দিতে হয়,তাই না?
আমি ছল ছল চোখে হাসার চেষ্টা করলাম,সালাম দিয়ে দরজা থেকে সরে দাঁড়ালাম। ও ভেতরে ঢুকলে দরজা লাগিয়ে ওকে জড়িয়ে ধরলাম। অনুভব করতে চাইলাম,আমার সেই মুপ্পুকে,যার গলা জড়িয়ে আমি ঘুমাতাম,যার হাত ধরে আমি স্কুলে যেতাম। ইশশ...৬টা বছর কতো ই না দীর্ঘ একটা সময়!কিচ্ছু বলতে পারলাম না,শুধু দু'বোনের চোখের পানি অনেক কথা বলে দিলো।
মায়ের এক্সপ্রেশনে আমি কিছুটা অবাক হলাম!তারমানে আমার মতো মা ও মনে মনে তৈরী ছিলেন!আপুকে অবশ্য চমকাতে দেখলাম না,মা আপুকে জড়িয়ে ধরে স্বাভাবিক কন্ঠেই বললেন,
-যা হাত-মুখ ধুয়ে নে,আমি খাবার দিচ্ছি।'' যেনো মেয়ে তার মাত্র ক্লাস থেকে ফিরলেন!
আপু আমাদের সেই চেনা ছোট্ট চুড়ুই পাখির বাসার মতো ঘরটাতে ঢুকে দু'হাত মেলে চোখ বুজে নিঃশ্বাস নিয়ে বলল,
-ইশশ... কত্ত বছর পর,সেই রুমটা,সেই জানালা,আর...ঐ গাছগুলো?ও গুলো আছে নারে এখনো?
আমি হেসে মাথা নাড়লাম।
-হুম,ঘরটা আগের মতোই আছে,আবার আগের চাইতে সুন্দরও হয়েছে বলা যায়! বদলায়নি অনেক কিছুই আমার মতো,তাই না?
কথাটা শুনতে কেমন জানি লাগলো!আমি কিছু না বলে চুপচাপ রুম থেকে বেরিয়ে আসলাম।
কেন জানি মুপ্পুর সামনে আমার অস্বস্তি লাগছিলো! ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে পারছিলাম না,ওর জল থৈ থৈ চোখ দু'টো সব বলে দিচ্ছিলো,যা সহ্য করা আমার জন্য অনেক কষ্টকর!
খাবার টেবিলে এসে মুপ্পু উচ্ছ্বাসিত কন্ঠে বলতে লাগল,
-ওরে ওরে ওরে,আমার প্রিয় নতুন আলুর সাথে মুরগীর ঝোল!ইশশ...কত্তদিন পর!আর ওটা কি?লাউ পাতার ভর্তা!ওহহো!কইরে বুড়ি,জলদি আয়,আমার আর তর সইছে না।
আমি হাসতে হাসতে ওর আর মায়ের জন্য প্লেট সাজালাম। আজ প্রায় অনেক বছর পর আমরা মা-মেয়েরা একসাথে দুপুরের খাবার খেতে বসেছি। কিন্তু কেন জানি তেমন কোন সুখানুভূতি ভেতরে কাজ করছে না!আমরা মানুষরা আসলেই কেমন জানি!কোন কিছুতেই মন ভরে না। এই যে এত বছর পর আমরা একসাথে হলাম,কই সেই খুশী নিয়েই মশগুল থাকবো তা না...
রাতে চা খেতে খেতে মুপ্পু আমাদেরকে জাপানের গল্প শোনাচ্ছিলো,আমিও বেশ আগ্রহ নিয়ে শুনছিলাম। হঠাত ই মা বলে উঠলো,
-মুহিন কবে আসবেরে মিতু?
সাথে সাথেই আমি আর আপু মনে হয় স্ট্যাচু হয়ে গেলাম। মুপ্পু একবার আমার দিকে তাকিয়ে বলল,
-জানিনা।
বলেই ও আবার গল্পে ফিরে যাচ্ছিলো,কিন্তু মা আবার বলে উঠলেন,
-জানিনা মানে কি?তুই কি ডিসিশন নিয়েছিস?কি করছিস কিছু তো জানাবি না জানি,কিন্তু মুহিন কি করছে সেটা তো বলবি?
আপু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল,আমি কিছু বলতে চাচ্ছিলাম,কিন্তু বলতে পারলাম না শুধু মাথা নিচু করে রইলাম।
-মুহিন সম্ভবত জুন-জুলাইয়ের দিকে আসবে।
মা আবারো জিজ্ঞেস করলেন,
-কি সিদ্ধান্ত নিয়েছে ও?
আপু এবার কিছুটা বিরক্ত গলায় বলল,
-মা তুমি তো সবই জানো,এখানে আমার সিদ্ধান্তের আর কি বাকী আছে বল?আর তার সিদ্ধান্ত জানারই বা কি আছে? ডাক্তার বলে দিয়েছে,আমার কখনো বেবি হবে না,যদি কখনো আল্লাহর অনেক দয়া হয়,তাহলে হয়তো...আর এটা জানার পরেও মুহিন অনেকদিন অপেক্ষা করেছিলো কিন্তু এখন আর করতে চাইছে না,আর যেহেতু সে বিয়ে করবেই তাই ওর পরিবার চেয়েছিলো বিয়েটা নিতুর সাথেই হোক!যেটা আমার বা নিতুর পক্ষে মেনে নেয়া সম্ভব না!সুতরাং ওরা এখন অন্য মেয়ে দেখছে,এবং মেয়ে ঠিক হলে মুহিন এসে বিয়ে করবে,ব্যাস।
আপুর কথা শেষ হলেও আমরা তিন জনই নিরব রইলাম। মায়ের মুখ দেখেই বুঝা যাচ্ছে,তিনি প্রচন্ড অসন্তুষ্ট হয়েছেন আপুর এমন কথা শুনে। নিচু কন্ঠে বললেন,
-তোর বড় মামী বলছিলো,ওদের প্রস্তাবটা নিয়ে আরেকবার ভাবতে!সবই তো আমাদের চেনা-জানা,আর সংসার ও তোরই,ক্ষতি কি নিতু গেলে!
কথাটা শুনে আমার কেমন যে অনুভূতি হচ্ছে নিজেও বুঝতে পারছি না! একবার আপুর মুখের দিকে তাকালাম,
ও স্বাভাবিক ভাবেই বলল,
-মা,তুমিও কি বড় মামীর সাথে একমত?
মা হ্যাঁ/না কিছুই বললেন না। আপুই আবার বললো,
-মা,এতো পাষাণ হইয়ো না প্লিজ!আমি কষ্ট যা পাওয়ার পাচ্ছি,বাট নিতুর উপর এত বড় জলুম করতে যেও না।
আমি আবারো আপুর মুখের দিকে তাকালাম,শেষের দিকে কন্ঠটা কাঁপছিলো যেনো! আহারে,কি কষ্টের পাহাড় টাই না বুকের ভেতর পুষে রেখেছে আমার বোনটা!না পারছে কাউকে বলতে না পারছে সহ্য করতে,কেবল ভেতরে ভেতরে মরছে।
আজকাল দিন গুলো কেমন যেনো অদ্ভুদ সুন্দর ভাবে কাটছে,এমন বৈচিত্র্যময় দিন শেষ কবে কাটিয়েছিলাম মনে নেই। আসার সপ্তাহ খানেকের মধ্যেই আপু একটা স্কুলে জয়েন করেছে,ওখানকার এসি.হেড আপুর বান্ধবী ছিলো।
মা এখন ঠিক আগের মতো আমাদের জন্য রান্না করেন,যেভাবে আগে বাবা থাকা কালে করতেন,সেই স্বাদ আর আগ্রহ নিয়ে। মিতু'পু মাঝে মাঝে মা কে নিয়ে ছুটির দিনে বাজার করতে বের হয়,সেদিন দু'জনের বাজার গুলো দেখার মতো হয়!!বাসায় থাকলে দু'জন মিলে ঘরের জিনিসপত্র একবার এপাশে তো আরেকবার ওপাশে করে। সেই আগের মতোই সকাল সকাল আমরা দু'বোনই বেড়িয়ে যাই,আবার দিন শেষে এক সাথেই ফিরি। প্রায় ছয় বছর দেশের বাইরে থেকে আসার পর মুপ্পুর কীর্তি দেখলে না হেসে উপায় নেই!
প্রায় প্রতিদিনই বিকেলে আমাকে নিয়ে সে রিকশায় ঘুরতে বের হবে,সে নাকি ঢাকা শহর চিনে না!তাই রিকশায় করে তার শহর চিনতে হয়! টং এর দোকানের চা থেকে শুরু করে ঝালমুড়ি পর্যন্ত সব কিছুই যেনো সে প্রথম খাচ্ছে এমন ভাব! তবে বিদেশে থেকে আসলেও অন্যদের মতো ওর দেশ নিয়ে কোন খুঁত খুঁতে ভাব নেই,বলতে শোনা যায় না,'উফফ,কি ধূলোরে'! কিংবা 'নাহ,দেশের কোন উন্নতি হইলো না,অথচ বিদেশে...ব্লা,ব্লা!' ভাবখানা এমন,যেনো এই ধূলোবালির শহরটাই তার অনেক প্রিয়!এই রাস্তার পাশের ফুচকা অনেক অমৃত!
মিতু'পুর চাকরী নিয়ে মামারা কিছুটা উচ্চ-বাচ্চ করেছিলেন,এমন চাকরী টা তাদের মোটেও পছন্দ হয়নি!ক'টাকাই বা বেতন পাবে,এখন তো আবারও ওকেই সংসারের হাল ধরতে হবে ইত্যাদি চিন্তা মার্কা কথা!
অবশ্য মুপ্পু চাইলে যেকোন ভালো কোম্পানি বা ভার্সিটিতে জয়েন করতে পারতো,কিন্তু সে তা না করে জয়েন করেছে একটা বাচ্চাদের স্কুলে। কেন?সেটা আমরা কেউ ই জিজ্ঞেস করিনি। বাবা চলে যাওয়ার পর আপুর সংসারে দায়িত্ব বুঝে নেয়াটাও কেউ তেমন ভালো চোখে দেখেননি,ওর একার সেই প্রচেষ্টা গুলোকে তখন সবার চোখেও বিরক্ত লাগতো!আর তাই বলা যায় ওর সংসারের এই পরিণতিতে অনেকেই মনে মনে খুশী!
মা প্রায়ই আমাকে চুপে চুপে জিজ্ঞেস করেন,মুহিন ভাইয়ের সাথে আপুর যোগাযোগ হয় কি না! কিংবা আপু মুহিন ভাইয়ের কথা কিছু বলে কি না। আমি কখনো হু/হ্যা করি আবার কখনো চুপ থাকি।
আপু এখানে আসার পর মুহিন ভাই ক'বার ফোন করেছিলেন,আমি দেখেছি আপু খুব দায়সারা ভাবেই কথা বলেছে। একটা সময় পর আর কোন ফোন আসেনি। আমি মাঝে মাঝে আপুর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি!বুঝার চেষ্টা করি,
আগের চেয়েও অনেক চাপা স্বভাবের হয়ে গেছে আপু,ও ভাবে,ও কিচ্ছু না বললে,প্রকাশ না করলে আর কেউ কিছুই বুঝবে না! বোকা একটা... কষ্ট কখনো কখনো আগুনের মতো হয়। তাই পোড়ার গন্ধ কিংবা কষ্টের ফ্যাকাশে রংটা সব সময় লুকিয়ে রাখা যায় না। আর ওর চোখ?
মানুষের চোখ হচ্ছে ভয়ংকর রকমের আয়না!একবার তাকালেই অনেক কথা দেখা যায় স্পষ্ট ভাবে। মুপ্পুর চোখ দু'টোও তাই অনেক কথা বলে দেয়,যা ও বলে না। কতোবার ও কথা বলতে বলতে থেমে যায়,কথার মাঝখানে ভাইয়ার নাম আসতেই ধাক্কা খায়,কতোবার যে ভাইয়ার স্মৃতি জড়িত কিছু দেখে ও নিজেকে হারিয়ে ফেলে তার কোন ইয়াত্তা নেই,অথচ জিজ্ঞেস করলে খুব সুন্দর করে এড়িয়ে যায়।
আমি হঠাত করে জিজ্ঞেস করে বসি,'আচ্ছা,তোর আর মুহিন ভাইয়ের মধ্যে ভালোবাসা কেমন ছিলোরে?'
ও ভ্রু কুঁচকে আমার দিকে তাকায়,
-কেমন ছিলো মানে?
-মানে কেমন ছিলো?সরব নাকি নিরব?
মুপ্পু হাসল খানিকটা,
-ওর ভালোবাসা সরব ই ছিলো বলা যায়,কোন না কোন ভাবে বুঝাতোই! মুখে বলা থেকে শুরু করে রাগ-অভিমান, বোকামী,সবই করতো!
-আর তোর ভালোবাসা?
-নিরব... অনেক নিরব ছিলো!এখানে যতোদিন ছিলাম,ততোদিন তোদের কথা,তোদের নিয়ে ব্যস্ত থাকতাম,আর ওখানে চাকরী-পড়াশুনা নিয়ে। সাধারনত বাঙ্গালী মেয়েদের অভিযোগ থাকে,যে তাদের মানুষটা বিদেশ-বিভূঁইয়ে তাদেরকে সময় দেয় না,কিন্তু আমার ক্ষেত্রে ছিলো উল্টো!
-তুই ভাইয়া কে ভালোবাসতি না?!
মুপ্পু সাথে সাথে উত্তর দিলো না,খানিক পর বলল,
-আসলে আমি খুব ভয় পেতাম সব সময়!আমার মনে হতো,আমি যা কিছুই খুব বেশি ভালোবাসি,তা ই আমার কাছ থেকে দূরে সরে যায়!আমি আমার জীবনে খুব ভালোবাসা কারো কাছ থেকে একবারের বেশি পাইনি!আমার মনে হতো,মুহিনকেও আমি হারিয়ে ফেলবো!তাই কখনোই নিজের ভালোবাসা প্রকাশ করতে চাইতাম না!মনে হতো আমি ওকে খুশী করতে পারবো না,কিন্তু যখন মাঝে মাঝে যদি কখনো ওর মনের মতো কিছু করতাম,মানুষটা তখন এত্ত খুশী হতো,যে দেখে ভয়ই লাগতো! কিন্তু শেষের দুটো বছর খুব খারাপ গিয়েছেরে!এতোটা বদ মেজাজ আর অধৈর্য্য আচরন করতো যে,আমিও মেজাজ সামলাতে পারতাম না!এমন অবস্থা হয়েছিলো,যে দিন শেষে কেউ বাড়িই ফিরতে চাইতাম না,ঝগড়া করার ভয়ে!
বলতে বলতে আপু আবারো মনের জগতে হারিয়ে গেলো! আমি বইয়ের পাতা উল্টাতে উল্টাতে বললাম,
-কিন্তু হলো তো তাই,তুই তো মানুষটাকে হারিয়েই ফেললি!তুই কখনো বুঝাতে চাসনি বলেই,আজ সে তোর চোখের ভাষা পড়তে পারেনি!তোর হারাবার ভয় এতোটাই দূরত্ব তৈরী করে ফেলেছিলো,যে মানুষটা তোর কষ্ট বুঝতে ভুলে গিয়েছিলো! পুর্ণেন্দু পত্রীর সেই কবিতাটার কথা তোর মনে আছে?ঐ যে,
''বুকের মধ্যে বাহান্নটা মেহগনি কাঠের আলমারি।
আমার যা কিছু প্রিয় জিনিস,সব সেইখানে।
নিজের এবং সমকালের সমস্ত
ভাঙা ফুলদানির টুকরো
সব ঐ বাহান্নটা আলমারির অন্ধকার খুপরীর
থাকে-থাকে, খাঁজে-খাঁজে বুকের মধ্যে।'' মনে আছে? তুই বুকের ভেতর কাঠের আলমারিতে সব কিছু লুকিয়ে রেখে ভেবেছিলি সব থাকবে জমা সযত্নে!কিন্তু থাকে কি আসলে? থাকে না তো!'
ভাঙা ফুলদানির টুকরো
সব ঐ বাহান্নটা আলমারির অন্ধকার খুপরীর
থাকে-থাকে, খাঁজে-খাঁজে বুকের মধ্যে।'' মনে আছে? তুই বুকের ভেতর কাঠের আলমারিতে সব কিছু লুকিয়ে রেখে ভেবেছিলি সব থাকবে জমা সযত্নে!কিন্তু থাকে কি আসলে? থাকে না তো!'
মুপ্পু আমার কথার পিঠে আর কিছু বলল না। আমিও উঠে ড্রয়িং রুমে এসে বসলাম,ও থাকুক কিছুক্ষন একা।
৩,
মায়ের মুখে কথাটা শুনে আমরা দু'বোনই অদ্ভুদ ভাবে পরস্পরের দিকে তাকালাম!আমি অবাক হয়ে বললাম,
-মা তুমি এসবে কবে থেকে যোগ দিলে?
মা খুব আগ্রহ নিয় বললেন,
-তোর মেঝ মামী বললেন,তার এক বোনেরও নাকি এমন বাচ্চা না হওয়ার সমস্যা ছিলো,বাট এই তদবির করার পর আল্লাহর রহমতে বাচ্চা হয়েছে,চেষ্টা করতে দোষ কি?চল না মিতু একবার!
আপু মুচকি হেসে বলল,
-মা,তোমার কি মনে হয়?এসবে কিছু হয়? সন্তান দেয়ার মালিক আল্লাহ,যদি তিনি আমাকে দিতে চান তাহলে কোন তাবিজ-তদবির ছাড়াই দিবেন,তুমি শুধু শুধু এসবে কান দিও না।
-তোরা তো বেশিই বুঝে আসলি সব সময়!একটা বাচ্চার জন্য লোকে কত কিছুই না করে,কত মানত-তাবিজ-তদবির,কতো জায়গায় যায়,আর তুই?এভাবে হাল ছেড়ে বসে থাকলেই কি হবে?
আমি বললাম,
-মা শোন,আল্লাহর কাছে তো আমরা কেউ কম চাইছি না,আপু,ভাইয়া,আমরা সবাই ই দোয়া করছি,ডাক্তারের কাছেও তো কম যাওয়া হচ্ছে না এর চাইতে আর বেশি কি করবে ওরা?এসব তাবিজ-তদবির কিছুই না,শুধু টাকা নষ্ট!এগুলো তুমিও ভালো করে জানো,তবুও কেন এখন খামোখা এসবে কান দিচ্ছো?বাদ দাও,ইনশাআল্লাহ সব ঠিক হয়ে যাবে।
মা হঠাত করে খুব রেগে গেলেন,
-ঠিক আছে,আমি কিছুই বলবো না!আমি বলার কে?যেদিন তোদের বাবা মারা গেলেন আমিও তো সেদিন ই মরে গেছি তোদের জন্য!যার যা যেভাবে খুশী এতোদিন তো সেভাবেই করেছিস,আত্নীয়-স্বজনরা কত ভালো ভালো বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসতো নাহ,কোন কথাই কানে তুলেনি,করলো গিয়ে বিয়ে ঐ হতচ্ছাড়াটাকে,না ছিলো চাল-চূলো না ছিলো পয়সা,এখন যেই সব হলো ওমনি বাচ্চা না হওয়ার অজুহাতে পর করে দিলো!
-মা প্লিজ...চুপ করো!'
-হ্যা চুপ করেই তো আছি!এজন্যই লোকে বলে,মেয়ে মানুষকে এতো ছাড় দিতে নেই,অতো স্বাধীনতা দিতে নেই!কিন্তু আমার তো কপাল খারাপ,যার জন্য তোরা যা খুশী তাই করেছিস আর এখন আবার আমার চোখের সামনেই ভুগছিস!
শোন মিতু,তোর তো যা হওয়ার হলো,এবার বোনটার দিকে তাকা,এর কোন গতি কর,আত্নীয়-স্বজনরা কিন্তু কম কথা বলছে না,আর হয়েছে তো তোর মতোই,এখনো সময় আছে কিছু কর না হলে কিন্তু দেখবি নিজের হাল ই হবে!''
আমি আর সহ্য করতে পারলাম না,উঠে নিজের রুমে চলে আসলাম। মুপ্পু ওখানে বসেই নীরবে চোখের পানি ফেলতে লাগল! সে রাতে আমরা কেউ ই ঘুমোতে পারিনি।
ভোরে নামাজ শেষ করে গাছে পানি দিয়ে এসে দেখি,কিচেনে মুপ্পু নাশতা বানাচ্ছে,মা এখনো তার রুমেই আছেন।
আমি চুপচাপ আপুর পাশে যেয়ে দাড়ালাম,ওর বানানো পরোটা ভাজতে ভাজতে বললাম,
-তুই কি মায়ের কথায় খুব মন খারাপ করেছি আপু?
মুপ্পু একটা নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল,
-নাহ,এসব কথা শুনতে শুনতে আমি এখন অভ্যস্থ!অতো খারাপ লাগেনা আর।
-শুনতে শুনতে মানে?আর কে বলতো এসব কথা?!!মুহিন ভাই?
সাথে সাথে আপু কিছু বলল না,খানিক পর বলল,
-আগে আড়াল আড়ালে আমার শ্বশুড় বাড়ির লোকজন বলতো!কিন্তু দু'বছর তোর ভাই আমাকে এমন কথা উঠতে বসতে শতবার শুনিয়েছে!কখনো চুপ করে থাকতাম,বলতো অহংকার দেখাই,কিসের এতো দেমাগ আমার!আবার কিছু বললেও বলতো,মুখে মুখে তর্ক করি!এ জন্যই লোকে বলে,বউকে অতো আদর-সম্মান দিতে নেই ইত্যাদি।
ফ্রিজ থেকে ডিম বের করে পেঁয়াজ-কাঁচা মরিচ কাটতে কাটতে বললাম,
-সে কি চাইতো আসলে?এমন খারাপ ব্যবহার করলে যাতে তুই চলে আসিস?
-অনেকটা তেমনই!ওর কথা গুলো শুনলেই বুঝা যেতো মুখস্থ বুলি!যখন জানলো,বাচ্চা হওয়ার সম্ভাবনা কম,তখন থেকেই সে হতাশ ছিলো!তার মনে হতো,আমাকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেয়াটাই ভুল ছিলো,আ\আবার ভাবতো,আমি যেমন শক্ত-ক্যারিয়ারিস্ট মাইন্ডের মেয়ে নিশ্চয়ই বাচ্চা পছন্দ করি না,তাই আল্লাহ আমাকে বাচ্চা দেন না! এইসব আর কি।
আমি আর কিছু বললাম না। কিন্তু আমার ভেতরে চিন্তার হিসেব গুলো মিলছিলো না!
মুহিন ভাইয়ের সাথে আপুর বিয়েটা হুট করে হয়নি,বেশ ক'মাস সময় লেগেছে!আত্নীয়-স্বজনরা কেউ ই এই প্রস্তাব পছন্দ করছিলো না,গ্রাম থেকে আসা,বাবা নেই,মাথার উপর ছোট চার ভাই-বোনের দায়িত্ব তার উপর ইনকাম বলতে,দুটো কোচিং এ পড়ানোর পাশাপাশি টিউশনি! মা একবার হ্যা বলতো তো একবার না। সে সময়ের দেখা,আর বিয়ের পর প্রায় বছর খানেকের চেনা-জানার সাথে এই মুহিন ভাইয়ের কোন মিল ই পাচ্ছি না! মানুষ এতো বদলে যায়?
জীবনের এই কঠিন সময়ে তো উচিত ছিলো,দু'জনের ই দু'জনের পাশে থাকা,কষ্ট তো কারোরই কম না,তেমনি এই কষ্টের লাঘব কাঠিটাও তো দু'জনের হাতেই থাকার কথা,তা না করে হতাশা-রাগ-ক্ষোভ দেখিয়ে এভাবে আলাদা হয়ে যাওয়ার মাঝে কি সমাধান থাকে?কি গ্যারান্টি আছে,যে সে আবারো বিয়ে করলেই সন্তানের বাবা হতে পারবে?
মনে পড়ে গেলো,আশফাক মামার কথা,মায়ের দু'সম্পর্কের ভাই ছিলো,প্রথম স্ত্রীর ঘরে সন্তান হয় না বলে,কতো উঠেপড়ে আবারো বিয়ে করলেন,তার প্রথম স্ত্রী অনেক ভালো একটা মানুষ ছিলেন,অনেক কষ্ট পেয়েছিলেন মামার এমন সিদ্ধান্তে! কিছু কি কপাল!পরের সাত বছরেও আর বাচ্চার মুখ দেখার ভাগ্য হলো না,দ্বিতীয় বউ ডিভোর্স দিয়ে চলে গেলো,মামা-মামী এখন দুটো অনাথ মেয়েকে নিজেদের পরিচয়ে বড় করছেন।
আবার আমার বাশার স্যার,১৯বছর ধরে একটা সন্তানের জন্য আল্লাহর কাছে কেঁদেছেন,কতোবার লোকজন ২য় বিয়ের কথা বলেছে,কিন্তু নাহ,স্যার তেমন কিছুই করেননি। শেষে ক'বছর আগে ম্যাম একটা গরীব ঘরের বাচ্চাকে এডপ্ট করেছেন,আর সেই বাচ্চাকে নিয়ে স্যার এর সে কি খুশী!
জীবন টা এমন কেন হয় না?যে মানুষ গুলো নিজের চাইতে অন্যের জন্য এতো করে যায় তার জন্য করার সময় আসলে কেন মানুষ গুলো বদলে যায়?
৬বছর আগে টোকিওতে স্কলারশীপ পেয়ে যখন আপু ওখানে ভাইয়া কে নিয়ে গেলেন,কই এ নিয়ে তো কোনদিন আপুকে একটা শব্দ করতে শুনিনি!আপুর দেবর-ননদের পড়াশুনা,বিয়ে থেকে শুরু করে শ্বাশুড়ির চিকিৎসা,ঢাকায় ফ্ল্যাট সব কিছুর ক্ষেত্রে আপু হাত খুলে যেভাবে পেরেছে দিয়েছে,কোন দিন এই নিয়ে মা কে ফোন করেও আফসোস করতে শুনিনি! আর আজ?সময় বদলাতেই সবাই এক ঝাটকায় বদলে গেলো,আর সব দোষ এসে পড়লো আমার বোনের উপর!হায়রে!
মুপ্পুর মোবাইলে আজকাল অদ্ভুদ সব কল আসে!কখনো যদি ও ব্যস্ত থাকে তাহলে আমি ফোন ধরি,আর ধরলেই শুনি,কেউ বলছে,
-হ্যালোওওও,টিচার মিস!আপনি কাল স্কুলে আসবেন না?!
ওরে বাব্বাহ!পিচ্চিরা কত্ত কনসার্ন আজকাল!!মিস ক্লাসে যাবে কি না,সেটা কনফার্ম হচ্ছে!আবার কখনো শোনা যায়,
-হ্যাল্লো,মিস...আপনি কি চকলেট কেক খান?আমার মামণি আজ বানিয়েছি,আপনার জন্য নিয়ে আসিইইই??
কথা শুনে আমি মোবাইলটা মুপ্পুর দিকে দিতে দিতে বলি,
-কি আহ্লাদরে বাবা!এই মেয়ে কি আসলেই পিচ্চি না কি কন্ঠ পিচ্চি!
দিনে দিনে আমি আর মা টের পেলাম,বাচ্চাদের সাথে মুপ্পুর অসম্ভব দারুন সম্পর্ক হতে পারে,যা আমরা আগে কখনো জানতাম না। প্রায় দিন ই দেখা যায়,তার কোন না কোন স্টুডেন্টের মা এটা-সেটা তৈরী করে বাসায় পাঠিয়েছে! কিংবা স্টুডেন্ট স্কুলেই নিয়ে এসেছে,ও আবার সেটা বাসায় নিয়ে এসেছে। হাস্যকর কিন্তু সবার সব কাজ করে ওর স্টুডেন্টরা!
সেদিন ঘটল তেমনি এক কান্ড!মা গেছেন বড় খালার বাসায়,মুপ্পু ছাদে,আমি টিভিতে খেলা দেখায় ব্যস্ত। এমন সময় কলিংবেল বেজে উঠলো! আমি অবাক হলাম,দরজা তো লক করে যায়নি আপু!তো বেল দিচ্ছে কে?খুলে দেখি
দেড় ফুটের এক ব্যাটারী সাইজের পিচ্চি পরী দাড়িয়ে আছে!আশে পাশে আর কাউকে চোখে পড়ছে না,পাশের ফ্ল্যাটের দরজাও বন্ধ!আমি চোখ বড় বড় করে তাকালাম! নিচু হয়ে বললাম,
-কে গো তুমি?কাকে চাও?
পিচ্চি ডানে-বামে ঘুরে বলে,
-সিনড্রা কে চাই!
আমি এবার ভ্রু কুঁচকালাম!
-সিনড্রা!সিনড্রা কে?তুমি কার সাথে এসেছো?
-তাচ্চুর সাথে!
-চাচ্চুর সাথে?কোথায় চাচ্ছু?
সে আঙ্গুল দিয়ে একবার বাইরে,আরেকবার নিচের সিঁড়ির দিকে ইশারা করলো! আমি ঠিক ভাবে ধরতে পারলাম না!
-আচ্ছা,বুঝলাম,বাট এই বাসায় তো কোন সিন্ড্রা থাকে না!
-না থাকে তো!
পিচ্চি ভেতরে আসার জন্য উঁকি দিচ্ছে!কিন্তু কে,কার সাথে এসেছে না বুঝে কিভাবে ঢুকাই!এমন সময় সিঁড়িতে আওয়াজ পেলাম কারো,দেখি লাল চুল ওয়ালা এক লোক উঠছে!উমম,না ছেলেই বলা চলে,আইমিন লাস্ট স্টেজে আছে!!
আমাদের সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলল,
-এটা কি শারমিন ম্যামের বাসা?
আমি মাথা দুলিয়ে বললাম,
-জ্বি,ও কি আপনার সাথেই এসেছে?
-জ্বি হ্যাঁ,আমার ভাইয়ের মেয়ে,নবনী !শারমিন ম্যামের প্রচন্ড ভক্ত সে,আজ এক কারণে স্কুলে যায়নি,তাই দুপুর থেকে জেদ ধরেছে তাকে যেনো তার সিন্ড্রেলা ম্যামের কাছে নিয়ে আসা হয়!সে জন্যই স্কুল থেকে এড্ড্রেস নিয়ে আসলাম,তা আপনি ই কি শারমিন ম্যাম?
আমি মাথা নেড়ে দরজা থেকে সরে দাঁড়িয়ে বললাম,
-ভেতরে আসুন আপনারা,আপু ছাদে গেছে,আমি ডেকে দিচ্ছি!
ওদেরকে ড্রয়িং রুমে বসিয়ে আমার রুমে এসে দেখি,আপু মোবাইল চার্জে দিয়ে গেছে!অগ্যাত কি আর করা,তাদেরকে বাসায় রেখেই আমি ধুপধাপ সিঁড়ি ভেঙ্গে ছাদ থেকে আপুকে ডেকে আনলাম।
নবনী সেদিন খুব বেশি সময় ছিলো না,তবে সেদিনের পর থেকে পিচ্চি প্রায় ছুটির দিনেই চাচা কিংবা মা,কারো না কারো সাথে বিকেল বেলা চলে আসে। মাঝে মাঝে আপুর আর ওর সাথে আমিও যোগ দেই!কিন্তু আমি কেন জানি অতো মজা পাই না!আর নবনী যথেস্ট কথা বলতে জানে,ওর সাথে তাল মিলিয়ে বেশিক্ষন কথা বলতে পারিনা। তবে ওদের কথা-কান্ড গুলোতে বেশ মজা পাই।
৪
আজকাল আপু খুব ব্যস্ত থাকে বলা যায়। স্কুল শেষে ফিরে দুপুরে,আবার প্রায় বিকেলেই কোন না কোন দাওয়াত-গেট টুগেদার থাকে বলে চলে যায়,ফিরে সন্ধ্যার পর,খেয়ে-দেয়ে আবার খাতা দেখায় লেগে যায়!
আমিও আজকাল ক্লাস,টিউশনী নিয়ে ব্যস্ত আছি,তাই খুব একটা আড্ডার সুযোগ তেমন পাই না,ছুটির দিন ছাড়া।
ক'দিন ধরে ভাবছি আপুর সাথে বসবো,কিন্তু বসবো বসবো করেও বসা হচ্ছে না! আজ বৃহঃস্পতিবার দেখে দেরি করে ঘুমাবো ঠিক করলাম,এশার নামায পড়ে রুমে এসে দেখি,আপু ল্যাপটপে কাজ করছে,আমি কিচেনে যেয়ে কফি আর পপ কর্ণ নিয়ে আসলাম।
মুপ্পু বলল,
-কিরে?কিছু বলবি?
-হুম,ক'দিন ধরেই বলবো ভাবছি!আজ একটু দেরি করে ঘুমালে তোমার সমস্যা হবে?
-না না,সমস্যা নেই,বল,কি বলবি?
আমি কফি তে চুমুক দিয়ে বললাম,
-সেদিন মারুফ ভাইয়ের সাথে দেখা হয়ে ছিলো,আজিজ মার্কেটের সামনে।
আপু ল্যাপটপ থেকে একবার মুখ তুলে বলল,
-কে?মুহিনের ছোট ভাই মারুফ?ওহ,তো কি বলল?
-তেমন কিছু বলেনি!জিজ্ঞেস করলো তোমার কথা,কি করছো,কেমন আছো এই আর কি!
আপু স্ক্রিণের দিকে তাকিয়েই বলল,
-ওহ,আচ্ছা,তো কেমন আছে ওদের বাসার সবাই?ওর আম্মা?
-হুম,ভালো আছে সবাই। আরেকটা কথা বলেছে মারুফ ভাই!
-কি কথা?মুহিনের বিয়ে নিয়ে?
আমি খানিকটা চুপ থেকে বললাম,
-ওরা মেয়ে ঠিক করেছে,মুহিন ভাই আসলেই বিয়ে হবে! বিয়ে করিয়ে তাদের মা হজ্বে যাবেন এবার।
মুপ্পু সাথে সাথে কিছু বললো না,আবার ল্যাপটপ থেকে মুখ তুললো না!আমি বুঝলাম,ও আসলে কোন রিএকশন দেখাতে চাচ্ছে না! একটু পর বলল,
-ভালোই তো!সময় তো আর কারো জন্য থেমে থাকে না। বিয়ে যখন আবার করতেই হবে,তো দেরি করে লাভ কি!আচ্ছা, বাদ দে,ওসব,আর কিছু বলবি?
আমি নড়েচড়ে বসে বললাম,
-নবনীর চাচা প্রফেশনালি কি করেন জানো তুমি?সে কি এখনো স্টুডেন্ট?
আপু একটু ভ্রু কুঁচকে বলল,
-কি জানি!মেবি এমবিএ পড়ুয়া হতে পারে,নট শিউর!কেন?
-লোকটা কে প্রায়ই আমার ভার্সিটি এরিয়াতে দেখি,কখনো চা খাচ্ছে আবার কখনো ফোনে কথা বলছে,তবে অফিসিয়াল গেটাপে না!তাই জিজ্ঞেস করলাম।
-ওহ!কথা হয়েছে তোর সাথে?
-নাহ।
মুপ্পু আর কিছু বললো না!। আমিও আর কিছু বলতে পারলাম না। কফির মগটা ধুতে ধুতে কিছুটা বিরক্তি লাগতে শুরু করলো!রাস্তায় কাউকে দেখলে সেটা কি এসে আবার বোনকে বলতে হয়?!এখন যদি মুপ্পু ঐ লোক কে জিজ্ঞেস করে,তাহলে লোকটা কি ভাববে?!ধুর...আর মুপ্পুকে তো বলাও হলো না,ওই লোক দুই বার কথা বলার চেষ্টা করেছিলো বাট আমি ইচ্ছে করেই কোনভাবে এড়িয়ে গেছি!অপরিচিত বা স্বল্প পরিচিত কারো এমন গায়ে পড়ে কথা বলতে আসাটা আমার খুবই অপছন্দের তার উপর অপ্রয়োজনে!
ফাল্গুন শুরু হয়ে গেছে,আর শীত যাই যাই করছে প্রায়,কিন্তু গরমও এসে ভালো মতো পৌছাতে পারিনি!ফলে এই গরম লাগে তো এই শীত।
এরই মধ্যে সর্দি লাগিয়েছি!ক্লাস শেষে লাইব্রেরি থেকে দুটো বই নিয়ে হাচ্চি দিতে দিতে আর নাক মুছতে মুছতে বের হলাম। আজ সাথে সোমা নেই,আদা চা খেতে খেতে দেরি করে ফেলেছি,তাই ওরা চলে গেছে আগেই।এদিকে আমি রিকশা ভালো মতো খুঁজতে পারছি না!অনেক ক্ষন হাঁচি দেয়ার ফলে শরীরটাও খুব উইক লাগছে,কি করবো ভাবছি!
এমন সময় পাশ থেকে কেউ বললো,
-অসূস্থ নাকি আজ?
আমি নাকে টিস্যু ধরা অবস্থাতেই তাকালাম!হায় আল্লাহ!!সেরেছে,নবনীর চাচা! এই লোক আবার এখানে কেন?আপু কি কিছু বলেছে নাকি!ছিঃ,গেছি তাহলে আমি...! বলতে বলতে আবার হাঁচি!হাঁচ্চুউউউউ...!
-জ্বী,কিছুটা!সর্দি লেগেছে আর কি!
-ওহ,আচ্ছা। তো কোথায় যাবেন এখন?বাসায়?
-বাসায় ঠিক না,তবে ওদিকেই যাবো,স্টুডেন্ট কে পড়াতে।
ভদ্রলোক কিছুক্ষন থেমে হঠাত বললেন,
-ওকেই,আমার গাড়ি আছে সাথে,চলুন ড্রপ করে দেই,এট লিস্ট সাইন্সল্যাব পর্যন্ত?
আমি আরেকটা হাঁচ্চি দিতে দিতে মাথা নেড়ে 'না' করলাম!মনে মনে বিরক্ত হলাম,
আরে কি?চিনে আমার আপুকে,লিফট দিতে চায় আমাকে?!আমি কি বলছি,রিকশা-গাড়ি কিচ্ছু পাচ্ছি না!নাকি বুঝালো,নিজের গাড়ি আছে?!হুহ
লোকটা মনে হয় বুঝতে পারলো,
-আচ্ছা,ঠিক আছে,তাহলে রিকশা ডেকে দেই একটা!
আমি না করতে করতেই বান্দা একটা রিকশাওয়ালাকে ডাক দিলো!এমন জোরে ডাকল,যে আমার মাথা মনে হয় একবার চক্কর দিলো!! আজীব লোক...!
আমি রিকশায় বসে বললাম,
-থ্যাংকস!হেল্প করার জন্য।
-ওয়েলকাম,তো কাল সন্ধ্যায় আসছেন তো?আমাদের বাসায়?
আমি ভ্রু কুঁচকালাম,
-কেন?কাল কি আপনাদের বাসায় যাওয়ার কথা?
-কেন?শারমিন ম্যাম কিছু বলেননি?কাল নবনীর আব্বু-আম্মুর এনিভার্সেরি,খুব সিম্পলি আয়োজন করা হয়েছে,আর শারমিন ম্যাম যেহেতু নবনী ফেভারিট মানুষ,তাই তাকেও বলা হয়েছে।
-ওহ,আচ্ছা!
-বাট আপনিও কিন্তু আসবেন।
আমি মনে মনে প্রমোদ গুণলাম!অনুষ্ঠান যাদের তারা আমাকে দাওয়াত করেনি,আর ইনি বলছেন!! আমি হু/হ্যাঁ কিছু একটা বলে রিকশাওয়ালাকে যাওয়ার তাড়া দিলাম।
বাসায় আসতে আসতে আমি রিকশায় বসে পুরো ঘটনাটা মনে করে একা একাই হাসতে লাগলাম! মাঝে মাঝে এমন মজার কিছু ঘটে যেমনটা ঘটার কোন সম্ভাবনা থাকে না,কিন্তু তবুও ঘটে!ক্যানভাসে নতুন রঙের ছোঁয়া দিতে হয়তো!
রাতে মুপ্পু মিট মিট করে হাসতে হাসতে আমার পাশে এসে বসলো। আমি টিভির দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে একবার বললাম,
-ঘটনা কি?!
মুপ্পু কিছু না বলে মাথা নাড়লো। কিন্তু চোরের মন তো পুলিশ পুলিশ!!তাই আবারো জিজ্ঞেস করলাম,
-কি হইছে?বলো না!
মুপ্পু ভ্রু নাচিয়ে বলল,
-বাপরে!এত্ত শোনার আগ্রহ!নাকি আগে থেকেই আন্দাজ করতে পেরেছিস,কোনটা?হুম!
আমার রাগ লাগলো!
-ধুর,লাগবে না বলা যা তুই!
মুপ্পু জোরে হেসে ফেলল!
-শোন,নবনীর আম্মু ফোন দিয়েছিলো,ক'দিন আগে একবার আমাকে দাওয়াত দিয়েছিলো,আজ ফোন করে স্পেশালি তোকে দাওয়াত করলো!হুমম!
বলেই আবার হাসা শুরু করলো!আমি ঠিক সাথে সাথে বুঝতে পারলাম না,আমার কি রিএকশন দেখানো উচিত!আমি একবার খুব অবাক হওয়ার ভান করে বলার চেষ্টা করলাম,
কেন?আমাকে কেন দাওয়াত দিয়েছে?!!
কিন্তু বলতে পারলাম না। বরং বললাম,
-আমি কোথাও যেতে পারবো না!আমার ওসব ফাংশন ভালো লাগে না!আর আমি কাউকে চিনিও না,যেয়ে বোরড হবো!
-সমস্যা কোথায়?নবনীর মা কে চিনিস,নবনীকে চিনিস আর...ওর সেই লাল চুল ওয়ালা চাচাকেও চিনিস!কত্ত মানুষ!
বলতে বলতে আবারো হেসে গড়িয়ে পড়লো আপু! আর ওদিকে আমার রাগ আরো বেড়ে গেলো!সোফার কুশনটা মুপ্পুর দিকে ছুঁড়ে আমি রুমে চলে আসলাম। ভাল মজা পেয়েছে যেনো!
পরদিন আমাকে অনেক জোরাজুরি করেও মুপ্পু ওর সাথে নিতে পারলো না,কিন্তু কি মনে করে যেনো মা কে সঙ্গে নিয়ে গেলো!আর মা ও কোন রকম জোর করা ছাড়াই বিনা বাক্যে রাজী হয়ে গেলো!অদ্ভুদ!
একা বাসায় কোন কাজ নেই দেখে,আপুর ল্যাপটপ টা নিয়ে বসলাম। আপুর মেইল বক্সটা ওপেনই ছিলো,হঠাত তাকিয়ে দেখি,নতুন একটা মেইল এসেছে,স্ক্রীণে মুহিন ভাইয়ের আইডিটা জ্বল জ্বল করছে!!
ওপেন করার লোভটা সামলাতে পারলাম না!ক্লিক করেই ফেললাম,
''কেমন আছো?গত ছয় বছরে দেশে আসার জন্য কতোই না ওয়েট করতাম,কিন্তু এবার যখন সত্যি সত্যি আসছি তখন কেন জানি মন ভালো থাকছে না! সব কিছুই অনেক বদলে গেছে তাই না?তুমিও বদলে গেছো!শুনলাম,বাচ্চাদের স্কুলে চাকরী নিয়েছো!তারমানে তোমার ফিরে আসার আর কোন ইচ্ছে নেই? মিতু,আমার কেন জানি মনে হয়,তুমি আমাকে অনেক ভালো বুঝ আর তাই,আমার রাগ-ক্ষোভের কথা গুলোকে,ভুল গুলোকে ক্ষমা তুমি করতে পারবে।
এক কাজ করি?আমি দেশে আসার টিকেট টা ক্যান্সেল করে ফেলি!তুমি বরং ফিরে আসো,তারপর যা হয় হোক!''
এই মেইল পড়ার পর আমি কি খুশী হবো না কি অবাক হবো?বুঝলাম না! বুকের ভেতর কেমন জানি আনন্দ আর বিস্ময় মিশ্রিত অস্থিরতা কাজ করছিলো! এই মেইলটা পড়ার পর আমি জানি আপুর মুখে হাসি ফুঁটবেই!
সিদ্ধান্ত হয়তো বদলাবে না,কিন্তু মুহিন ভাইয়ের প্রতি যে ক্ষোভ-অভিমান জন্মেছিলো তা নিশ্চয়ই কমবে।
ইশশ...ভালোবাসার গল্প গুলো যদি সত্যি সত্যি এভাবে বদলে যেতো,তাহলে কতোই না ভালো হতো!
৫
আমার ধারণা ঠিক ছিলো!মেইলটা পড়ার পর আপুর মুখে প্রচন্ড আনন্দ ফুঁটে উঠেছিলো!একটা সময় সেল ফোনটাও হাতে নিয়েছিলো কিন্তু খানিক পরেই আবার তা রেখে দিয়েছে!
আমি পুরোপুরি না হলেও এতটুকু বুঝতে পারছি,প্রচন্ড এক ঝড় বয়ে যাচ্ছে মুপ্পুর ভেতরে!যেখানে আছে,ভালোবাসা-অভিমান,পাওয়া-না পাওয়া,আবেগ-বাস্তবতার কালো মেঘ! আজ হয়তো ও ফিরে যাবে,কিন্তু কোন নিশ্চয়তা নেই,কাল আবারো একই ঝড় শুরু হবে না!যে অপূর্ণতার বিষ বৃক্ষ ওদের মাঝে জন্মেছে তা থেকে ভালোবাসা-সম্পর্ককে বাঁচিয়ে রাখা খুব সহজ না। আর তাই আপু না পারছে ফিরে যাবার সিদ্ধান্ত নিতে আবার না পারছে স ভুলে থাকতে!
মুপ্পু আসার পর এত গুলো দিন গেছে,আমি কোনদিন ওকে রাতে একা একা বসে কাঁদতে দেখিনি,কিন্তু আজ মাঝরাতে টের পেলাম ও ব্যালকনিতে বসে কাঁদছে! আজ অনেক বছর আমি ওর এমন ফুঁপিয়ে কান্না দেখলাম।
বাবা চলে যাবার পর,আমাদের ঘরে যে ঝড় বয়ে গিয়েছিলো,সে সময় এই মুপ্পুই মা আর আমাকে প্রচন্ড শক্ত ভাবে আঁকড়ে ধরে রেখেছিলো,আত্নীয় স্বজনরা চেয়েছিলো মুপ্পুকে বিয়ে দিয়ে মা কে ও অন্য কোথাও বিয়ে করিয়ে দিতে!আর আমাদের বাড়ীটা ভাড়া দিয়ে দিতে। সব শুনে মুপ্পু কারো তোয়াক্কা না করে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো,এই সংসারের হাল ধরার।
ও ধরতে পেরেছিলো বটে! কষ্ট সহ্য করার চরম ট্রেনিং বুঝি ও সেই অল্প বয়সেই পেয়েছিলো!সে সময় আমি মাঝে মাঝে টের পেতাম,ও রাতে বালিশ ভিঁজিয়ে কাঁদে!কখনো ঘুমের মাঝে অস্ফুট স্বরে,'বাবা,বাবা'বলে ডেকে উঠতো!
আজো আবার ও কাঁদছে,মুহিন ভাইয়ের জন্য!কে জানে?সাত সমুদ্র তের নদীর ওপারে বসে মুহিন ভাইও হয়তো ওর কথা মনে করে প্রচন্ড কষ্ট পাচ্ছে,দিন শেষে বাড়ি ফিরে ওর মুখটা খুঁজে বেড়াচ্ছে,একা বাসায় ওর সাথে একটু কথা বলার জন্য হয়তো হাঁপিয়ে উঠছে!
গত দু'দিন যাবত খুব চুপচাপ হয়ে আছে মুপ্পু!স্বাভাবিক থাকার আপ্রাণ চেষ্টা করছে ঠিকই কিন্তু ভেতরে ভেতরে দুর্বল হয়ে পড়ছে! আমার নিজেরও খুব কষ্ট হচ্ছে,কিছুই করতে পারছি না বোনটার জন্য!বার বার মনে হচ্ছে,কিছু একটা যদি করতে পারতাম!...
একমাত্র আল্লাহই এখন ভরসা,তার ইশারা থাকলে কিভাবে সব কিছু পাল্টে যেতে পারে তা চিন্তাও করা যায় না!
প্রায় এক সপ্তাহ ধরে আমি খেয়াল করে দেখছি,মুপ্পু কেমন যেনো অসূস্থ হয়ে পড়ছে!চোখের নীচে কালি পড়ে যাচ্ছে,খাওয়া দাওয়া আগের চাইতে অনেক কমে গেছে!মা এর চোখেও ব্যাপারটা ধরা পড়েছে,জিজ্ঞেস করলে বলেছে,শরীর খুব দুর্বল লাগে!আর ক্ষিধে লাগে না!প্রচন্ড পরিশ্রম আর মানুষিক চাপের কারণেই হয়তো...
মা কয়েকবার ডাক্তার দেখানোর কথা বলেছে,কিন্তু ছুটির দিনের অপেক্ষায় আর যাওয়া হয়নি এখনো! আজ ছুটির দিন বিধায় সকালে আমি নিজেই ফোন করে ডাক্তারের চেম্বারে সিরিয়াল দিলাম,বিকেলে মা এর সাথে ও চলে গেলে,আমিও সোমার বাসায় যাওয়ার জন্য বের হলাম।
সন্ধ্যার আগে আগে বাসায় ঢুকে সিঁড়ি বেয়ে ফ্ল্যাটের কাছে এসেই দেখলাম,নবনী আর তার চাচা এসেছেন,ফ্ল্যাটে তালা দেখে সম্ভবত ফিরে যাচ্ছেন! আমাকে দেখে নবনী বলে উঠলো,
-ঐ তো সিন্ড্রার বোন এসেছে!
আমি হেসে বললাম,
-কেমন আছো তুমি?আজ তো সিন্ড্রা বাসায় নেই!
নবনীর চাচা জিজ্ঞেস করলেন,
-বাসায় নেই?কখন ফিরবেন?
আমি ব্যাগ থেকে চাবি বের করতে করতে বললাম,
-আসলে আপু,ক'দিন থেকে কিছুটা অসূস্থ্য তাই বিকেলে ডাক্তারের কাছে গেছে,ফিরবে কখন ঠিক বলতে পারছি না!বসুন আপনারা?
উনি একবার নবনীর দিকে তাকিয়ে বললেন,
-নাহ,আজ বরং আমরা যাই,যেহেতু আজ ম্যাম বাসায় নেই,আবার আরেকদিন আসবো ঠিক আছে?
নবনীও মাথা নেড়ে সায় দিলো। ওরা সিঁড়ি দিয়ে নামতে যেয়েও আবার থকমে দাঁড়ালো!নবনীর চাচা আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,
-আপনি সেদিন গেলেন না কেন?আমরা ভেবেছিলাম আপনি যাবেন!ভাবি আগে কিছু বলেনি দেখেই কি যাননি?
আমি দ্রুত কন্ঠে বললাম,
-না না,তেমন কোন কারণ নেই!আমি আসলে একটু ঘরকুনো!কোথাও খুব একটা যেতে ইচ্ছে করে না!আপু বলেছিলো খুব,বাট ইচ্ছে করলো না,তাই...
-ও,আচ্ছা,ঠিক আছে পরে কখনো সুযোগ পেলে যাবেন আশা করি!আসি তাহলে...
আমি কিছুক্ষন ওদের যাওয়ার পথে তাকিয়ে থাকলাম,একটা সময় আনমনেই ঠোঁটে হাসি ফুঁটে উঠলো!
দুই আর দুই এ চার এর অংক করতে সবাই ই পারে,কিন্তু শূণ্যের সাথে এক যোগ করে সংখ্যার ফল বের করতে সবাই জানে না!তাই সত্যি-মিথ্যার বিচারটা এখানে মূখ্য না।
বাসায় মনে হচ্ছে বোমা ফেটেছে! স্পেশালি মুপ্পু আর মা এর মুখে!ডাক্তারের চেম্বার থেকে আসার পর একটা কথাও ভালো মতো কেউ বলেনি!এমন থমথমে মুখ দেখে আমিও আর বেশি কিছু জিজ্ঞেস করার সাহস পেলাম না!বাট মনের ভেতর কৌতুহলের পাশাপাশি,দুঃশ্চিন্তাও ঘুরতে লাগল,কোন খারাপ কিছু হয়নি তো!কি এমন হয়েছে যে দু'জনেই চুপ হয়ে আছে!!
রাতে একবার মুপ্পুর সাথে কথা বলার জন্য ওর রুমে গেলাম,কিন্তু দেখি ও লাইট অফ করে শুয়ে আছে! মা কে জিজ্ঞেস করলাম,খুব বেশি কিছু বললো না,শুধু বলল,ডাক্তার টেস্ট দিয়েছে কিছু,করার পর বলা যাবে।
এর পরের সপ্তাহ ক্লাস টেস্ট-এস্যাইনমেন্টের ঝামেলায় মুপ্পুর সাথে আর বসা হয়নি,বাট দেখলাম কি কি যেনো টেস্ট করানোর জন্য গিয়েছিলো,আবার রিপোর্ট নিয়েও ডাক্তারের কাছে গেলো,কিন্তু কি যে হচ্ছে তা আর জানার সময় পাচ্ছিনা!
আজ শুক্রবার,সকাল থেকেই আকাশ কেমন মেঘলা হয়ে আছে,কাল রাতে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টিও এসেছিলো,বসন্তের শুরুতে এই আবহাওয়ার মানে কি বুঝিনা! প্রচন্ড ঠান্ডা বাতাসও বইছে দেখে,জানালা লাগিয়ে রাখলাম।
নাশতা শেষ করে,মগে চা ঢালতে ঢালতে ভাবলাম,এখন যেয়ে আপুর সাথে বসবো। কি হয়েছে জিজ্ঞেস করবো। কিন্তু কলিংবেল বেজে উঠলো হঠাত!কে এলো এই সময় আবার? চা রেখে দরজা খুলতে দৌড়ে গেলাম,কিন্তু দরজা খুলে সম্পূর্ণ নির্বাক আর অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম!!!
আগন্তুক আমাকে দেখে ভ্রু নাঁচিয়ে হাসল!স্টাইলটা একদম আগের মতো,একটুও বদলায়নি!আমাকে ইশারায় প্রথমে চুপ করতে বললেন,তারপর দরজা থেকে সরে যেতে বললেন। আমি যন্ত্রচালিত রোবটের ন্যায় সরে দাঁড়ালাম। উনি ভেতরে ঢুকলেন। পুরো ব্যাপারটাই আমার কাছে স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছে!
ঘন্টা খানেকের মধ্যেই আমার মনে হলো,আমাদের বাসাটাতে আজকে ঈদ হচ্ছে! এতো খুশী মনে হয় না লাস্ট অনেক গুলো বছরে এসেছিলো! আমি একদফা খুশীতে কেঁদেছি,এখন মনে হচ্ছে আরেকদফা কাঁদতে হবে!
ওদিকে মুপ্পু কতক্ষন হাসছে,তো একটু পর চেঁচামেঁচি করছে!ওর রাগী রাগী সে মুখটা দেখার মতো মনে হচ্ছে!আর মা?
তার মুখ দেখেই বুঝা যাচ্ছে,আজ তার খুশী সপ্তম আকাশে ছুঁয়েছে!একবার একে-ওকে ফোন করে,আবার ফ্রিজ থেকে মশলা-মাংস নামায়,আজ নাকি অনেক কিছু রান্না করবেন তিনি! আমি এই ফাঁকে যেয়ে চমচম আর রসমালাই নিয়ে এসেছি,মেয়ের জামাইকে নাকি মিষ্টি দিয়ে প্রথমে আপ্যায়ন করতে হয়!!
ফাইনালি আমাদের সবার বিশেষ করে মুপ্পুর ডাক আল্লাহ শুনেছেন,আর তাই খুব শীঘ্রই আমি খালামণি হবো!আর এই খবর শোনার পর মুহিন ভাই দু'দিনও জাপানে থাকতে পারননি,কোন রকমে একটা ল্যাগেজ নিয়ে চলে এসেছেন,তবে হ্যাঁ,আসার সময় মনে করে আপুর জন্য একটি ফিংগার রিং আনতে ভুলেননি!তাও আবার লাভ শেপের!
কিন্তু মুপ্পু ক্ষেপেছে,কেন ফুল আনা হয়নি!অন্তত একটা গোলাপ তো আনতে পারতো নাকি?একটু পর পর ই সে চেঁচিয়ে উঠছে,
-শাহাবাগ হয়ে আসলা,আর একটা ফুল আনতে পারলে না?এমনে সময় দেখি ফুল ছাড়া বাসায় আসো না,আর আজকে?ক'দিন আমি ছিলাম না,আর ওমনি সব ভুলে বসে আছ না?
দুলাভাই এই নিয়ে কত্তবার সরি বললো আল্লাহই ভালো জানে!বেচারা পারলে এখনই দৌড়ে যায় ফুল আনতে,কিন্তু এতোদিন পর বউকে রেখে কোথাও নাকি তার যেতে ইচ্ছে করছে না!! অগ্যাত,আমিই ছাদ থেকে গোলাপ ছিঁড়ে আনলাম!
আর মা করছে আরেক টেনশন!,তার নাতি-নাতনি টা কি এই দেশে হবে,নাকি টোকিও তে!ওখানে হলে মুপ্পুর দেখাশুনা করবে কে?ইত্যাদি ইত্যাদি!
খেতে বসে মুহিন ভাইকে এক দফা খোঁচা দিলাম,
-কি?এখন নিজেকে খুব বাপ বাপ মনে হচ্ছে না?আর যাচ্ছিলেন তো আরেকটা বিয়ে করতে!!একটু সবুরও করা যায়নি না?এই মুপ্পু,একে মাফ এতো সহজে করবি না বলে দিচ্ছি!
মুপ্পু হাসতে হাসতে বলে,
-আসলেই তো!শাস্তি তো দেয়া হয়নি তোমাকে!
দুলাভাই নাক কুঁচকে রুমের দরজায় দাঁড়ানো আমার দিকে তাকিয়ে বলল,
-কূটনামি কম করো!আমি কিন্তু এখন মুরুব্বিও হচ্ছি বুঝলা?
-ইহহ,কি মুরুব্বি!!ধরে আপনাকে আবার আপুর সাথে বিয়ে দিয়ে দিবো দাঁড়ান!
দুলাভাই একটা রসমালাই মুখে দিয়ে বলল,
-আরেকবার কেন,তুমি বরং আরো তিনবার বিয়ে করিয়ে দাও,একবারে ঝামেলা শেষ!হাহাহা!ও হ্যাঁ,সেই সাথে আমার ভায়রা ভাই এর ব্যবস্থাটাও করে ফেলা যায়!এক ঢিলে অনেক পাখী মারা হবে,কি বলো মিতু?ঠিক বলেছি না মা?
মা হাসলেন,আর মুপ্পু খুব উৎসাহ নিয়ে বলল,
-আরে তুমি বিয়ের আয়োজন করো,তোমার জন্য ভায়রা খোঁজার কাজ হয়ে গেছে বলা যায়!!
আমি আর দুলাভাই একসাথে বলে উঠলাম,
-কি????!!!!
আপু হাসতে হাসতে মা এর দিকে তাকিয়ে বললেন,
-আমার এক ছাত্রী আছে বুঝলে,নবনী নাম,ওর এক চাচা আছেন,যারা মাথার চুল নাকি কিছুটা লালচে!তো সেই লাল চুলের লোকটা,আমাদের নিতুর জন্য অনেকদিন ধরে পথচেয়ে বসে আছে!সেদিন তো নবনীর মা আর দাদী,আনুষ্ঠানিক ভাবে প্রস্তাবও দিয়েছেন,এখন শুধু আমাদের 'হ্যাঁ'বলা বাকী!
আমি দাঁতে দাঁত চেপে কপট রাগ দেখিয়ে বললাম,
-ওহ,আচ্ছা?এই কাহিনী না?তাই তো বলি,ঐ ব্যাটা আমার ভার্সিটির সামনে ঘুরে কেন?! ধুর...আর তোমরাও!কথাই বলবো না আর যাও!
বলতে বলতে আমি রুমের দরজা লাগিয়ে বসলাম।মা খুব উচ্ছ্বাসিত কন্ঠে বললেন,
-একেই বলে আল্লাহর রহমত,আজ কতোদিন পর মনে হলো,আল্লাহ আমার মেয়ে দু'টোর উপর অনেক রহম করেছেন!না হলে,এমন দিন দেখতে হবে তার আশা তো ছেড়েই দিয়েছিলাম,আসলে বিশ্বাস রেখে চাওয়ার মতো চাইলে আল্লাহ যে অবশ্যই দেন,তা আরেকবার বুঝতে পারলাম। এখন যেনো সব কিছু আল্লাহ সুন্দর ভাবে সম্পন্ন করেন সেই দোয়াই করি।
আমি মনে মনে বললাম 'আমীন'। আমার আজ অনেকদিন পর খুব ইচ্ছে করছে বাবা কে দেখতে!খুব ইচ্ছে করছে...
ডায়নিং রুম থেকে কানে আমার ঠিকই আসছিলো,আপু আর দুলাভাইয়ের হাসির আওয়াজ,মাঝে মাঝে মায়ের উচ্ছ্বাসিত কন্ঠের কথাও শুনছিলাম,আর এপাশে আমি বোধহয় সুখের কান্নাই কাঁদছিলাম।
সেই সাথে অদ্ভুদ বাঁধনহারা আনন্দে মনটা ভরে উঠলো। বাইরের আকাশের দিকে তাকালাম... মেঘটা আরো গভীর হচ্ছে,সেই সাথে ঠান্ডা বাতাস,তার বৃষ্টি আসছে! এখন মনে হচ্ছে,বসন্তের এই অদ্ভুদ আবহাওয়ার মানে বুঝতে পারছি!
প্রকৃতির এমন হঠাত বদলে যাওয়া রূপের ছোঁয়াতেই বদলে যায় অনেক কিছু। সব বর্ষণ বেলাই কোন কোন না গল্পের সূচনা অথবা সমাপ্তি টানে। এই বসন্তের বর্ষণটাও অনেক দীর্ঘ কোন গল্পের সমাপ্তি ঘটয়ে নতুন আরেক গল্পের সূচনা করলো...
৩,
মায়ের মুখে কথাটা শুনে আমরা দু'বোনই অদ্ভুদ ভাবে পরস্পরের দিকে তাকালাম!আমি অবাক হয়ে বললাম,
-মা তুমি এসবে কবে থেকে যোগ দিলে?
মা খুব আগ্রহ নিয় বললেন,
-তোর মেঝ মামী বললেন,তার এক বোনেরও নাকি এমন বাচ্চা না হওয়ার সমস্যা ছিলো,বাট এই তদবির করার পর আল্লাহর রহমতে বাচ্চা হয়েছে,চেষ্টা করতে দোষ কি?চল না মিতু একবার!
আপু মুচকি হেসে বলল,
-মা,তোমার কি মনে হয়?এসবে কিছু হয়? সন্তান দেয়ার মালিক আল্লাহ,যদি তিনি আমাকে দিতে চান তাহলে কোন তাবিজ-তদবির ছাড়াই দিবেন,তুমি শুধু শুধু এসবে কান দিও না।
-তোরা তো বেশিই বুঝে আসলি সব সময়!একটা বাচ্চার জন্য লোকে কত কিছুই না করে,কত মানত-তাবিজ-তদবির,কতো জায়গায় যায়,আর তুই?এভাবে হাল ছেড়ে বসে থাকলেই কি হবে?
আমি বললাম,
-মা শোন,আল্লাহর কাছে তো আমরা কেউ কম চাইছি না,আপু,ভাইয়া,আমরা সবাই ই দোয়া করছি,ডাক্তারের কাছেও তো কম যাওয়া হচ্ছে না এর চাইতে আর বেশি কি করবে ওরা?এসব তাবিজ-তদবির কিছুই না,শুধু টাকা নষ্ট!এগুলো তুমিও ভালো করে জানো,তবুও কেন এখন খামোখা এসবে কান দিচ্ছো?বাদ দাও,ইনশাআল্লাহ সব ঠিক হয়ে যাবে।
মা হঠাত করে খুব রেগে গেলেন,
-ঠিক আছে,আমি কিছুই বলবো না!আমি বলার কে?যেদিন তোদের বাবা মারা গেলেন আমিও তো সেদিন ই মরে গেছি তোদের জন্য!যার যা যেভাবে খুশী এতোদিন তো সেভাবেই করেছিস,আত্নীয়-স্বজনরা কত ভালো ভালো বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসতো নাহ,কোন কথাই কানে তুলেনি,করলো গিয়ে বিয়ে ঐ হতচ্ছাড়াটাকে,না ছিলো চাল-চূলো না ছিলো পয়সা,এখন যেই সব হলো ওমনি বাচ্চা না হওয়ার অজুহাতে পর করে দিলো!
-মা প্লিজ...চুপ করো!'
-হ্যা চুপ করেই তো আছি!এজন্যই লোকে বলে,মেয়ে মানুষকে এতো ছাড় দিতে নেই,অতো স্বাধীনতা দিতে নেই!কিন্তু আমার তো কপাল খারাপ,যার জন্য তোরা যা খুশী তাই করেছিস আর এখন আবার আমার চোখের সামনেই ভুগছিস!
শোন মিতু,তোর তো যা হওয়ার হলো,এবার বোনটার দিকে তাকা,এর কোন গতি কর,আত্নীয়-স্বজনরা কিন্তু কম কথা বলছে না,আর হয়েছে তো তোর মতোই,এখনো সময় আছে কিছু কর না হলে কিন্তু দেখবি নিজের হাল ই হবে!''
আমি আর সহ্য করতে পারলাম না,উঠে নিজের রুমে চলে আসলাম। মুপ্পু ওখানে বসেই নীরবে চোখের পানি ফেলতে লাগল! সে রাতে আমরা কেউ ই ঘুমোতে পারিনি।
ভোরে নামাজ শেষ করে গাছে পানি দিয়ে এসে দেখি,কিচেনে মুপ্পু নাশতা বানাচ্ছে,মা এখনো তার রুমেই আছেন।
আমি চুপচাপ আপুর পাশে যেয়ে দাড়ালাম,ওর বানানো পরোটা ভাজতে ভাজতে বললাম,
-তুই কি মায়ের কথায় খুব মন খারাপ করেছি আপু?
মুপ্পু একটা নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল,
-নাহ,এসব কথা শুনতে শুনতে আমি এখন অভ্যস্থ!অতো খারাপ লাগেনা আর।
-শুনতে শুনতে মানে?আর কে বলতো এসব কথা?!!মুহিন ভাই?
সাথে সাথে আপু কিছু বলল না,খানিক পর বলল,
-আগে আড়াল আড়ালে আমার শ্বশুড় বাড়ির লোকজন বলতো!কিন্তু দু'বছর তোর ভাই আমাকে এমন কথা উঠতে বসতে শতবার শুনিয়েছে!কখনো চুপ করে থাকতাম,বলতো অহংকার দেখাই,কিসের এতো দেমাগ আমার!আবার কিছু বললেও বলতো,মুখে মুখে তর্ক করি!এ জন্যই লোকে বলে,বউকে অতো আদর-সম্মান দিতে নেই ইত্যাদি।
ফ্রিজ থেকে ডিম বের করে পেঁয়াজ-কাঁচা মরিচ কাটতে কাটতে বললাম,
-সে কি চাইতো আসলে?এমন খারাপ ব্যবহার করলে যাতে তুই চলে আসিস?
-অনেকটা তেমনই!ওর কথা গুলো শুনলেই বুঝা যেতো মুখস্থ বুলি!যখন জানলো,বাচ্চা হওয়ার সম্ভাবনা কম,তখন থেকেই সে হতাশ ছিলো!তার মনে হতো,আমাকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেয়াটাই ভুল ছিলো,আ\আবার ভাবতো,আমি যেমন শক্ত-ক্যারিয়ারিস্ট মাইন্ডের মেয়ে নিশ্চয়ই বাচ্চা পছন্দ করি না,তাই আল্লাহ আমাকে বাচ্চা দেন না! এইসব আর কি।
আমি আর কিছু বললাম না। কিন্তু আমার ভেতরে চিন্তার হিসেব গুলো মিলছিলো না!
মুহিন ভাইয়ের সাথে আপুর বিয়েটা হুট করে হয়নি,বেশ ক'মাস সময় লেগেছে!আত্নীয়-স্বজনরা কেউ ই এই প্রস্তাব পছন্দ করছিলো না,গ্রাম থেকে আসা,বাবা নেই,মাথার উপর ছোট চার ভাই-বোনের দায়িত্ব তার উপর ইনকাম বলতে,দুটো কোচিং এ পড়ানোর পাশাপাশি টিউশনি! মা একবার হ্যা বলতো তো একবার না। সে সময়ের দেখা,আর বিয়ের পর প্রায় বছর খানেকের চেনা-জানার সাথে এই মুহিন ভাইয়ের কোন মিল ই পাচ্ছি না! মানুষ এতো বদলে যায়?
জীবনের এই কঠিন সময়ে তো উচিত ছিলো,দু'জনের ই দু'জনের পাশে থাকা,কষ্ট তো কারোরই কম না,তেমনি এই কষ্টের লাঘব কাঠিটাও তো দু'জনের হাতেই থাকার কথা,তা না করে হতাশা-রাগ-ক্ষোভ দেখিয়ে এভাবে আলাদা হয়ে যাওয়ার মাঝে কি সমাধান থাকে?কি গ্যারান্টি আছে,যে সে আবারো বিয়ে করলেই সন্তানের বাবা হতে পারবে?
মনে পড়ে গেলো,আশফাক মামার কথা,মায়ের দু'সম্পর্কের ভাই ছিলো,প্রথম স্ত্রীর ঘরে সন্তান হয় না বলে,কতো উঠেপড়ে আবারো বিয়ে করলেন,তার প্রথম স্ত্রী অনেক ভালো একটা মানুষ ছিলেন,অনেক কষ্ট পেয়েছিলেন মামার এমন সিদ্ধান্তে! কিছু কি কপাল!পরের সাত বছরেও আর বাচ্চার মুখ দেখার ভাগ্য হলো না,দ্বিতীয় বউ ডিভোর্স দিয়ে চলে গেলো,মামা-মামী এখন দুটো অনাথ মেয়েকে নিজেদের পরিচয়ে বড় করছেন।
আবার আমার বাশার স্যার,১৯বছর ধরে একটা সন্তানের জন্য আল্লাহর কাছে কেঁদেছেন,কতোবার লোকজন ২য় বিয়ের কথা বলেছে,কিন্তু নাহ,স্যার তেমন কিছুই করেননি। শেষে ক'বছর আগে ম্যাম একটা গরীব ঘরের বাচ্চাকে এডপ্ট করেছেন,আর সেই বাচ্চাকে নিয়ে স্যার এর সে কি খুশী!
জীবন টা এমন কেন হয় না?যে মানুষ গুলো নিজের চাইতে অন্যের জন্য এতো করে যায় তার জন্য করার সময় আসলে কেন মানুষ গুলো বদলে যায়?
৬বছর আগে টোকিওতে স্কলারশীপ পেয়ে যখন আপু ওখানে ভাইয়া কে নিয়ে গেলেন,কই এ নিয়ে তো কোনদিন আপুকে একটা শব্দ করতে শুনিনি!আপুর দেবর-ননদের পড়াশুনা,বিয়ে থেকে শুরু করে শ্বাশুড়ির চিকিৎসা,ঢাকায় ফ্ল্যাট সব কিছুর ক্ষেত্রে আপু হাত খুলে যেভাবে পেরেছে দিয়েছে,কোন দিন এই নিয়ে মা কে ফোন করেও আফসোস করতে শুনিনি! আর আজ?সময় বদলাতেই সবাই এক ঝাটকায় বদলে গেলো,আর সব দোষ এসে পড়লো আমার বোনের উপর!হায়রে!
মুপ্পুর মোবাইলে আজকাল অদ্ভুদ সব কল আসে!কখনো যদি ও ব্যস্ত থাকে তাহলে আমি ফোন ধরি,আর ধরলেই শুনি,কেউ বলছে,
-হ্যালোওওও,টিচার মিস!আপনি কাল স্কুলে আসবেন না?!
ওরে বাব্বাহ!পিচ্চিরা কত্ত কনসার্ন আজকাল!!মিস ক্লাসে যাবে কি না,সেটা কনফার্ম হচ্ছে!আবার কখনো শোনা যায়,
-হ্যাল্লো,মিস...আপনি কি চকলেট কেক খান?আমার মামণি আজ বানিয়েছি,আপনার জন্য নিয়ে আসিইইই??
কথা শুনে আমি মোবাইলটা মুপ্পুর দিকে দিতে দিতে বলি,
-কি আহ্লাদরে বাবা!এই মেয়ে কি আসলেই পিচ্চি না কি কন্ঠ পিচ্চি!
দিনে দিনে আমি আর মা টের পেলাম,বাচ্চাদের সাথে মুপ্পুর অসম্ভব দারুন সম্পর্ক হতে পারে,যা আমরা আগে কখনো জানতাম না। প্রায় দিন ই দেখা যায়,তার কোন না কোন স্টুডেন্টের মা এটা-সেটা তৈরী করে বাসায় পাঠিয়েছে! কিংবা স্টুডেন্ট স্কুলেই নিয়ে এসেছে,ও আবার সেটা বাসায় নিয়ে এসেছে। হাস্যকর কিন্তু সবার সব কাজ করে ওর স্টুডেন্টরা!
সেদিন ঘটল তেমনি এক কান্ড!মা গেছেন বড় খালার বাসায়,মুপ্পু ছাদে,আমি টিভিতে খেলা দেখায় ব্যস্ত। এমন সময় কলিংবেল বেজে উঠলো! আমি অবাক হলাম,দরজা তো লক করে যায়নি আপু!তো বেল দিচ্ছে কে?খুলে দেখি
দেড় ফুটের এক ব্যাটারী সাইজের পিচ্চি পরী দাড়িয়ে আছে!আশে পাশে আর কাউকে চোখে পড়ছে না,পাশের ফ্ল্যাটের দরজাও বন্ধ!আমি চোখ বড় বড় করে তাকালাম! নিচু হয়ে বললাম,
-কে গো তুমি?কাকে চাও?
পিচ্চি ডানে-বামে ঘুরে বলে,
-সিনড্রা কে চাই!
আমি এবার ভ্রু কুঁচকালাম!
-সিনড্রা!সিনড্রা কে?তুমি কার সাথে এসেছো?
-তাচ্চুর সাথে!
-চাচ্চুর সাথে?কোথায় চাচ্ছু?
সে আঙ্গুল দিয়ে একবার বাইরে,আরেকবার নিচের সিঁড়ির দিকে ইশারা করলো! আমি ঠিক ভাবে ধরতে পারলাম না!
-আচ্ছা,বুঝলাম,বাট এই বাসায় তো কোন সিন্ড্রা থাকে না!
-না থাকে তো!
পিচ্চি ভেতরে আসার জন্য উঁকি দিচ্ছে!কিন্তু কে,কার সাথে এসেছে না বুঝে কিভাবে ঢুকাই!এমন সময় সিঁড়িতে আওয়াজ পেলাম কারো,দেখি লাল চুল ওয়ালা এক লোক উঠছে!উমম,না ছেলেই বলা চলে,আইমিন লাস্ট স্টেজে আছে!!
আমাদের সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলল,
-এটা কি শারমিন ম্যামের বাসা?
আমি মাথা দুলিয়ে বললাম,
-জ্বি,ও কি আপনার সাথেই এসেছে?
-জ্বি হ্যাঁ,আমার ভাইয়ের মেয়ে,নবনী !শারমিন ম্যামের প্রচন্ড ভক্ত সে,আজ এক কারণে স্কুলে যায়নি,তাই দুপুর থেকে জেদ ধরেছে তাকে যেনো তার সিন্ড্রেলা ম্যামের কাছে নিয়ে আসা হয়!সে জন্যই স্কুল থেকে এড্ড্রেস নিয়ে আসলাম,তা আপনি ই কি শারমিন ম্যাম?
আমি মাথা নেড়ে দরজা থেকে সরে দাঁড়িয়ে বললাম,
-ভেতরে আসুন আপনারা,আপু ছাদে গেছে,আমি ডেকে দিচ্ছি!
ওদেরকে ড্রয়িং রুমে বসিয়ে আমার রুমে এসে দেখি,আপু মোবাইল চার্জে দিয়ে গেছে!অগ্যাত কি আর করা,তাদেরকে বাসায় রেখেই আমি ধুপধাপ সিঁড়ি ভেঙ্গে ছাদ থেকে আপুকে ডেকে আনলাম।
নবনী সেদিন খুব বেশি সময় ছিলো না,তবে সেদিনের পর থেকে পিচ্চি প্রায় ছুটির দিনেই চাচা কিংবা মা,কারো না কারো সাথে বিকেল বেলা চলে আসে। মাঝে মাঝে আপুর আর ওর সাথে আমিও যোগ দেই!কিন্তু আমি কেন জানি অতো মজা পাই না!আর নবনী যথেস্ট কথা বলতে জানে,ওর সাথে তাল মিলিয়ে বেশিক্ষন কথা বলতে পারিনা। তবে ওদের কথা-কান্ড গুলোতে বেশ মজা পাই।
৪
আজকাল আপু খুব ব্যস্ত থাকে বলা যায়। স্কুল শেষে ফিরে দুপুরে,আবার প্রায় বিকেলেই কোন না কোন দাওয়াত-গেট টুগেদার থাকে বলে চলে যায়,ফিরে সন্ধ্যার পর,খেয়ে-দেয়ে আবার খাতা দেখায় লেগে যায়!
আমিও আজকাল ক্লাস,টিউশনী নিয়ে ব্যস্ত আছি,তাই খুব একটা আড্ডার সুযোগ তেমন পাই না,ছুটির দিন ছাড়া।
ক'দিন ধরে ভাবছি আপুর সাথে বসবো,কিন্তু বসবো বসবো করেও বসা হচ্ছে না! আজ বৃহঃস্পতিবার দেখে দেরি করে ঘুমাবো ঠিক করলাম,এশার নামায পড়ে রুমে এসে দেখি,আপু ল্যাপটপে কাজ করছে,আমি কিচেনে যেয়ে কফি আর পপ কর্ণ নিয়ে আসলাম।
মুপ্পু বলল,
-কিরে?কিছু বলবি?
-হুম,ক'দিন ধরেই বলবো ভাবছি!আজ একটু দেরি করে ঘুমালে তোমার সমস্যা হবে?
-না না,সমস্যা নেই,বল,কি বলবি?
আমি কফি তে চুমুক দিয়ে বললাম,
-সেদিন মারুফ ভাইয়ের সাথে দেখা হয়ে ছিলো,আজিজ মার্কেটের সামনে।
আপু ল্যাপটপ থেকে একবার মুখ তুলে বলল,
-কে?মুহিনের ছোট ভাই মারুফ?ওহ,তো কি বলল?
-তেমন কিছু বলেনি!জিজ্ঞেস করলো তোমার কথা,কি করছো,কেমন আছো এই আর কি!
আপু স্ক্রিণের দিকে তাকিয়েই বলল,
-ওহ,আচ্ছা,তো কেমন আছে ওদের বাসার সবাই?ওর আম্মা?
-হুম,ভালো আছে সবাই। আরেকটা কথা বলেছে মারুফ ভাই!
-কি কথা?মুহিনের বিয়ে নিয়ে?
আমি খানিকটা চুপ থেকে বললাম,
-ওরা মেয়ে ঠিক করেছে,মুহিন ভাই আসলেই বিয়ে হবে! বিয়ে করিয়ে তাদের মা হজ্বে যাবেন এবার।
মুপ্পু সাথে সাথে কিছু বললো না,আবার ল্যাপটপ থেকে মুখ তুললো না!আমি বুঝলাম,ও আসলে কোন রিএকশন দেখাতে চাচ্ছে না! একটু পর বলল,
-ভালোই তো!সময় তো আর কারো জন্য থেমে থাকে না। বিয়ে যখন আবার করতেই হবে,তো দেরি করে লাভ কি!আচ্ছা, বাদ দে,ওসব,আর কিছু বলবি?
আমি নড়েচড়ে বসে বললাম,
-নবনীর চাচা প্রফেশনালি কি করেন জানো তুমি?সে কি এখনো স্টুডেন্ট?
আপু একটু ভ্রু কুঁচকে বলল,
-কি জানি!মেবি এমবিএ পড়ুয়া হতে পারে,নট শিউর!কেন?
-লোকটা কে প্রায়ই আমার ভার্সিটি এরিয়াতে দেখি,কখনো চা খাচ্ছে আবার কখনো ফোনে কথা বলছে,তবে অফিসিয়াল গেটাপে না!তাই জিজ্ঞেস করলাম।
-ওহ!কথা হয়েছে তোর সাথে?
-নাহ।
মুপ্পু আর কিছু বললো না!। আমিও আর কিছু বলতে পারলাম না। কফির মগটা ধুতে ধুতে কিছুটা বিরক্তি লাগতে শুরু করলো!রাস্তায় কাউকে দেখলে সেটা কি এসে আবার বোনকে বলতে হয়?!এখন যদি মুপ্পু ঐ লোক কে জিজ্ঞেস করে,তাহলে লোকটা কি ভাববে?!ধুর...আর মুপ্পুকে তো বলাও হলো না,ওই লোক দুই বার কথা বলার চেষ্টা করেছিলো বাট আমি ইচ্ছে করেই কোনভাবে এড়িয়ে গেছি!অপরিচিত বা স্বল্প পরিচিত কারো এমন গায়ে পড়ে কথা বলতে আসাটা আমার খুবই অপছন্দের তার উপর অপ্রয়োজনে!
ফাল্গুন শুরু হয়ে গেছে,আর শীত যাই যাই করছে প্রায়,কিন্তু গরমও এসে ভালো মতো পৌছাতে পারিনি!ফলে এই গরম লাগে তো এই শীত।
এরই মধ্যে সর্দি লাগিয়েছি!ক্লাস শেষে লাইব্রেরি থেকে দুটো বই নিয়ে হাচ্চি দিতে দিতে আর নাক মুছতে মুছতে বের হলাম। আজ সাথে সোমা নেই,আদা চা খেতে খেতে দেরি করে ফেলেছি,তাই ওরা চলে গেছে আগেই।এদিকে আমি রিকশা ভালো মতো খুঁজতে পারছি না!অনেক ক্ষন হাঁচি দেয়ার ফলে শরীরটাও খুব উইক লাগছে,কি করবো ভাবছি!
এমন সময় পাশ থেকে কেউ বললো,
-অসূস্থ নাকি আজ?
আমি নাকে টিস্যু ধরা অবস্থাতেই তাকালাম!হায় আল্লাহ!!সেরেছে,নবনীর চাচা! এই লোক আবার এখানে কেন?আপু কি কিছু বলেছে নাকি!ছিঃ,গেছি তাহলে আমি...! বলতে বলতে আবার হাঁচি!হাঁচ্চুউউউউ...!
-জ্বী,কিছুটা!সর্দি লেগেছে আর কি!
-ওহ,আচ্ছা। তো কোথায় যাবেন এখন?বাসায়?
-বাসায় ঠিক না,তবে ওদিকেই যাবো,স্টুডেন্ট কে পড়াতে।
ভদ্রলোক কিছুক্ষন থেমে হঠাত বললেন,
-ওকেই,আমার গাড়ি আছে সাথে,চলুন ড্রপ করে দেই,এট লিস্ট সাইন্সল্যাব পর্যন্ত?
আমি আরেকটা হাঁচ্চি দিতে দিতে মাথা নেড়ে 'না' করলাম!মনে মনে বিরক্ত হলাম,
আরে কি?চিনে আমার আপুকে,লিফট দিতে চায় আমাকে?!আমি কি বলছি,রিকশা-গাড়ি কিচ্ছু পাচ্ছি না!নাকি বুঝালো,নিজের গাড়ি আছে?!হুহ
লোকটা মনে হয় বুঝতে পারলো,
-আচ্ছা,ঠিক আছে,তাহলে রিকশা ডেকে দেই একটা!
আমি না করতে করতেই বান্দা একটা রিকশাওয়ালাকে ডাক দিলো!এমন জোরে ডাকল,যে আমার মাথা মনে হয় একবার চক্কর দিলো!! আজীব লোক...!
আমি রিকশায় বসে বললাম,
-থ্যাংকস!হেল্প করার জন্য।
-ওয়েলকাম,তো কাল সন্ধ্যায় আসছেন তো?আমাদের বাসায়?
আমি ভ্রু কুঁচকালাম,
-কেন?কাল কি আপনাদের বাসায় যাওয়ার কথা?
-কেন?শারমিন ম্যাম কিছু বলেননি?কাল নবনীর আব্বু-আম্মুর এনিভার্সেরি,খুব সিম্পলি আয়োজন করা হয়েছে,আর শারমিন ম্যাম যেহেতু নবনী ফেভারিট মানুষ,তাই তাকেও বলা হয়েছে।
-ওহ,আচ্ছা!
-বাট আপনিও কিন্তু আসবেন।
আমি মনে মনে প্রমোদ গুণলাম!অনুষ্ঠান যাদের তারা আমাকে দাওয়াত করেনি,আর ইনি বলছেন!! আমি হু/হ্যাঁ কিছু একটা বলে রিকশাওয়ালাকে যাওয়ার তাড়া দিলাম।
বাসায় আসতে আসতে আমি রিকশায় বসে পুরো ঘটনাটা মনে করে একা একাই হাসতে লাগলাম! মাঝে মাঝে এমন মজার কিছু ঘটে যেমনটা ঘটার কোন সম্ভাবনা থাকে না,কিন্তু তবুও ঘটে!ক্যানভাসে নতুন রঙের ছোঁয়া দিতে হয়তো!
রাতে মুপ্পু মিট মিট করে হাসতে হাসতে আমার পাশে এসে বসলো। আমি টিভির দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে একবার বললাম,
-ঘটনা কি?!
মুপ্পু কিছু না বলে মাথা নাড়লো। কিন্তু চোরের মন তো পুলিশ পুলিশ!!তাই আবারো জিজ্ঞেস করলাম,
-কি হইছে?বলো না!
মুপ্পু ভ্রু নাচিয়ে বলল,
-বাপরে!এত্ত শোনার আগ্রহ!নাকি আগে থেকেই আন্দাজ করতে পেরেছিস,কোনটা?হুম!
আমার রাগ লাগলো!
-ধুর,লাগবে না বলা যা তুই!
মুপ্পু জোরে হেসে ফেলল!
-শোন,নবনীর আম্মু ফোন দিয়েছিলো,ক'দিন আগে একবার আমাকে দাওয়াত দিয়েছিলো,আজ ফোন করে স্পেশালি তোকে দাওয়াত করলো!হুমম!
বলেই আবার হাসা শুরু করলো!আমি ঠিক সাথে সাথে বুঝতে পারলাম না,আমার কি রিএকশন দেখানো উচিত!আমি একবার খুব অবাক হওয়ার ভান করে বলার চেষ্টা করলাম,
কেন?আমাকে কেন দাওয়াত দিয়েছে?!!
কিন্তু বলতে পারলাম না। বরং বললাম,
-আমি কোথাও যেতে পারবো না!আমার ওসব ফাংশন ভালো লাগে না!আর আমি কাউকে চিনিও না,যেয়ে বোরড হবো!
-সমস্যা কোথায়?নবনীর মা কে চিনিস,নবনীকে চিনিস আর...ওর সেই লাল চুল ওয়ালা চাচাকেও চিনিস!কত্ত মানুষ!
বলতে বলতে আবারো হেসে গড়িয়ে পড়লো আপু! আর ওদিকে আমার রাগ আরো বেড়ে গেলো!সোফার কুশনটা মুপ্পুর দিকে ছুঁড়ে আমি রুমে চলে আসলাম। ভাল মজা পেয়েছে যেনো!
পরদিন আমাকে অনেক জোরাজুরি করেও মুপ্পু ওর সাথে নিতে পারলো না,কিন্তু কি মনে করে যেনো মা কে সঙ্গে নিয়ে গেলো!আর মা ও কোন রকম জোর করা ছাড়াই বিনা বাক্যে রাজী হয়ে গেলো!অদ্ভুদ!
একা বাসায় কোন কাজ নেই দেখে,আপুর ল্যাপটপ টা নিয়ে বসলাম। আপুর মেইল বক্সটা ওপেনই ছিলো,হঠাত তাকিয়ে দেখি,নতুন একটা মেইল এসেছে,স্ক্রীণে মুহিন ভাইয়ের আইডিটা জ্বল জ্বল করছে!!
ওপেন করার লোভটা সামলাতে পারলাম না!ক্লিক করেই ফেললাম,
''কেমন আছো?গত ছয় বছরে দেশে আসার জন্য কতোই না ওয়েট করতাম,কিন্তু এবার যখন সত্যি সত্যি আসছি তখন কেন জানি মন ভালো থাকছে না! সব কিছুই অনেক বদলে গেছে তাই না?তুমিও বদলে গেছো!শুনলাম,বাচ্চাদের স্কুলে চাকরী নিয়েছো!তারমানে তোমার ফিরে আসার আর কোন ইচ্ছে নেই? মিতু,আমার কেন জানি মনে হয়,তুমি আমাকে অনেক ভালো বুঝ আর তাই,আমার রাগ-ক্ষোভের কথা গুলোকে,ভুল গুলোকে ক্ষমা তুমি করতে পারবে।
এক কাজ করি?আমি দেশে আসার টিকেট টা ক্যান্সেল করে ফেলি!তুমি বরং ফিরে আসো,তারপর যা হয় হোক!''
এই মেইল পড়ার পর আমি কি খুশী হবো না কি অবাক হবো?বুঝলাম না! বুকের ভেতর কেমন জানি আনন্দ আর বিস্ময় মিশ্রিত অস্থিরতা কাজ করছিলো! এই মেইলটা পড়ার পর আমি জানি আপুর মুখে হাসি ফুঁটবেই!
সিদ্ধান্ত হয়তো বদলাবে না,কিন্তু মুহিন ভাইয়ের প্রতি যে ক্ষোভ-অভিমান জন্মেছিলো তা নিশ্চয়ই কমবে।
ইশশ...ভালোবাসার গল্প গুলো যদি সত্যি সত্যি এভাবে বদলে যেতো,তাহলে কতোই না ভালো হতো!
৫
আমার ধারণা ঠিক ছিলো!মেইলটা পড়ার পর আপুর মুখে প্রচন্ড আনন্দ ফুঁটে উঠেছিলো!একটা সময় সেল ফোনটাও হাতে নিয়েছিলো কিন্তু খানিক পরেই আবার তা রেখে দিয়েছে!
আমি পুরোপুরি না হলেও এতটুকু বুঝতে পারছি,প্রচন্ড এক ঝড় বয়ে যাচ্ছে মুপ্পুর ভেতরে!যেখানে আছে,ভালোবাসা-অভিমান,পাওয়া-না পাওয়া,আবেগ-বাস্তবতার কালো মেঘ! আজ হয়তো ও ফিরে যাবে,কিন্তু কোন নিশ্চয়তা নেই,কাল আবারো একই ঝড় শুরু হবে না!যে অপূর্ণতার বিষ বৃক্ষ ওদের মাঝে জন্মেছে তা থেকে ভালোবাসা-সম্পর্ককে বাঁচিয়ে রাখা খুব সহজ না। আর তাই আপু না পারছে ফিরে যাবার সিদ্ধান্ত নিতে আবার না পারছে স ভুলে থাকতে!
মুপ্পু আসার পর এত গুলো দিন গেছে,আমি কোনদিন ওকে রাতে একা একা বসে কাঁদতে দেখিনি,কিন্তু আজ মাঝরাতে টের পেলাম ও ব্যালকনিতে বসে কাঁদছে! আজ অনেক বছর আমি ওর এমন ফুঁপিয়ে কান্না দেখলাম।
বাবা চলে যাবার পর,আমাদের ঘরে যে ঝড় বয়ে গিয়েছিলো,সে সময় এই মুপ্পুই মা আর আমাকে প্রচন্ড শক্ত ভাবে আঁকড়ে ধরে রেখেছিলো,আত্নীয় স্বজনরা চেয়েছিলো মুপ্পুকে বিয়ে দিয়ে মা কে ও অন্য কোথাও বিয়ে করিয়ে দিতে!আর আমাদের বাড়ীটা ভাড়া দিয়ে দিতে। সব শুনে মুপ্পু কারো তোয়াক্কা না করে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো,এই সংসারের হাল ধরার।
ও ধরতে পেরেছিলো বটে! কষ্ট সহ্য করার চরম ট্রেনিং বুঝি ও সেই অল্প বয়সেই পেয়েছিলো!সে সময় আমি মাঝে মাঝে টের পেতাম,ও রাতে বালিশ ভিঁজিয়ে কাঁদে!কখনো ঘুমের মাঝে অস্ফুট স্বরে,'বাবা,বাবা'বলে ডেকে উঠতো!
আজো আবার ও কাঁদছে,মুহিন ভাইয়ের জন্য!কে জানে?সাত সমুদ্র তের নদীর ওপারে বসে মুহিন ভাইও হয়তো ওর কথা মনে করে প্রচন্ড কষ্ট পাচ্ছে,দিন শেষে বাড়ি ফিরে ওর মুখটা খুঁজে বেড়াচ্ছে,একা বাসায় ওর সাথে একটু কথা বলার জন্য হয়তো হাঁপিয়ে উঠছে!
গত দু'দিন যাবত খুব চুপচাপ হয়ে আছে মুপ্পু!স্বাভাবিক থাকার আপ্রাণ চেষ্টা করছে ঠিকই কিন্তু ভেতরে ভেতরে দুর্বল হয়ে পড়ছে! আমার নিজেরও খুব কষ্ট হচ্ছে,কিছুই করতে পারছি না বোনটার জন্য!বার বার মনে হচ্ছে,কিছু একটা যদি করতে পারতাম!...
একমাত্র আল্লাহই এখন ভরসা,তার ইশারা থাকলে কিভাবে সব কিছু পাল্টে যেতে পারে তা চিন্তাও করা যায় না!
প্রায় এক সপ্তাহ ধরে আমি খেয়াল করে দেখছি,মুপ্পু কেমন যেনো অসূস্থ হয়ে পড়ছে!চোখের নীচে কালি পড়ে যাচ্ছে,খাওয়া দাওয়া আগের চাইতে অনেক কমে গেছে!মা এর চোখেও ব্যাপারটা ধরা পড়েছে,জিজ্ঞেস করলে বলেছে,শরীর খুব দুর্বল লাগে!আর ক্ষিধে লাগে না!প্রচন্ড পরিশ্রম আর মানুষিক চাপের কারণেই হয়তো...
মা কয়েকবার ডাক্তার দেখানোর কথা বলেছে,কিন্তু ছুটির দিনের অপেক্ষায় আর যাওয়া হয়নি এখনো! আজ ছুটির দিন বিধায় সকালে আমি নিজেই ফোন করে ডাক্তারের চেম্বারে সিরিয়াল দিলাম,বিকেলে মা এর সাথে ও চলে গেলে,আমিও সোমার বাসায় যাওয়ার জন্য বের হলাম।
সন্ধ্যার আগে আগে বাসায় ঢুকে সিঁড়ি বেয়ে ফ্ল্যাটের কাছে এসেই দেখলাম,নবনী আর তার চাচা এসেছেন,ফ্ল্যাটে তালা দেখে সম্ভবত ফিরে যাচ্ছেন! আমাকে দেখে নবনী বলে উঠলো,
-ঐ তো সিন্ড্রার বোন এসেছে!
আমি হেসে বললাম,
-কেমন আছো তুমি?আজ তো সিন্ড্রা বাসায় নেই!
নবনীর চাচা জিজ্ঞেস করলেন,
-বাসায় নেই?কখন ফিরবেন?
আমি ব্যাগ থেকে চাবি বের করতে করতে বললাম,
-আসলে আপু,ক'দিন থেকে কিছুটা অসূস্থ্য তাই বিকেলে ডাক্তারের কাছে গেছে,ফিরবে কখন ঠিক বলতে পারছি না!বসুন আপনারা?
উনি একবার নবনীর দিকে তাকিয়ে বললেন,
-নাহ,আজ বরং আমরা যাই,যেহেতু আজ ম্যাম বাসায় নেই,আবার আরেকদিন আসবো ঠিক আছে?
নবনীও মাথা নেড়ে সায় দিলো। ওরা সিঁড়ি দিয়ে নামতে যেয়েও আবার থকমে দাঁড়ালো!নবনীর চাচা আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,
-আপনি সেদিন গেলেন না কেন?আমরা ভেবেছিলাম আপনি যাবেন!ভাবি আগে কিছু বলেনি দেখেই কি যাননি?
আমি দ্রুত কন্ঠে বললাম,
-না না,তেমন কোন কারণ নেই!আমি আসলে একটু ঘরকুনো!কোথাও খুব একটা যেতে ইচ্ছে করে না!আপু বলেছিলো খুব,বাট ইচ্ছে করলো না,তাই...
-ও,আচ্ছা,ঠিক আছে পরে কখনো সুযোগ পেলে যাবেন আশা করি!আসি তাহলে...
আমি কিছুক্ষন ওদের যাওয়ার পথে তাকিয়ে থাকলাম,একটা সময় আনমনেই ঠোঁটে হাসি ফুঁটে উঠলো!
দুই আর দুই এ চার এর অংক করতে সবাই ই পারে,কিন্তু শূণ্যের সাথে এক যোগ করে সংখ্যার ফল বের করতে সবাই জানে না!তাই সত্যি-মিথ্যার বিচারটা এখানে মূখ্য না।
বাসায় মনে হচ্ছে বোমা ফেটেছে! স্পেশালি মুপ্পু আর মা এর মুখে!ডাক্তারের চেম্বার থেকে আসার পর একটা কথাও ভালো মতো কেউ বলেনি!এমন থমথমে মুখ দেখে আমিও আর বেশি কিছু জিজ্ঞেস করার সাহস পেলাম না!বাট মনের ভেতর কৌতুহলের পাশাপাশি,দুঃশ্চিন্তাও ঘুরতে লাগল,কোন খারাপ কিছু হয়নি তো!কি এমন হয়েছে যে দু'জনেই চুপ হয়ে আছে!!
রাতে একবার মুপ্পুর সাথে কথা বলার জন্য ওর রুমে গেলাম,কিন্তু দেখি ও লাইট অফ করে শুয়ে আছে! মা কে জিজ্ঞেস করলাম,খুব বেশি কিছু বললো না,শুধু বলল,ডাক্তার টেস্ট দিয়েছে কিছু,করার পর বলা যাবে।
এর পরের সপ্তাহ ক্লাস টেস্ট-এস্যাইনমেন্টের ঝামেলায় মুপ্পুর সাথে আর বসা হয়নি,বাট দেখলাম কি কি যেনো টেস্ট করানোর জন্য গিয়েছিলো,আবার রিপোর্ট নিয়েও ডাক্তারের কাছে গেলো,কিন্তু কি যে হচ্ছে তা আর জানার সময় পাচ্ছিনা!
আজ শুক্রবার,সকাল থেকেই আকাশ কেমন মেঘলা হয়ে আছে,কাল রাতে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টিও এসেছিলো,বসন্তের শুরুতে এই আবহাওয়ার মানে কি বুঝিনা! প্রচন্ড ঠান্ডা বাতাসও বইছে দেখে,জানালা লাগিয়ে রাখলাম।
নাশতা শেষ করে,মগে চা ঢালতে ঢালতে ভাবলাম,এখন যেয়ে আপুর সাথে বসবো। কি হয়েছে জিজ্ঞেস করবো। কিন্তু কলিংবেল বেজে উঠলো হঠাত!কে এলো এই সময় আবার? চা রেখে দরজা খুলতে দৌড়ে গেলাম,কিন্তু দরজা খুলে সম্পূর্ণ নির্বাক আর অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম!!!
আগন্তুক আমাকে দেখে ভ্রু নাঁচিয়ে হাসল!স্টাইলটা একদম আগের মতো,একটুও বদলায়নি!আমাকে ইশারায় প্রথমে চুপ করতে বললেন,তারপর দরজা থেকে সরে যেতে বললেন। আমি যন্ত্রচালিত রোবটের ন্যায় সরে দাঁড়ালাম। উনি ভেতরে ঢুকলেন। পুরো ব্যাপারটাই আমার কাছে স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছে!
ঘন্টা খানেকের মধ্যেই আমার মনে হলো,আমাদের বাসাটাতে আজকে ঈদ হচ্ছে! এতো খুশী মনে হয় না লাস্ট অনেক গুলো বছরে এসেছিলো! আমি একদফা খুশীতে কেঁদেছি,এখন মনে হচ্ছে আরেকদফা কাঁদতে হবে!
ওদিকে মুপ্পু কতক্ষন হাসছে,তো একটু পর চেঁচামেঁচি করছে!ওর রাগী রাগী সে মুখটা দেখার মতো মনে হচ্ছে!আর মা?
তার মুখ দেখেই বুঝা যাচ্ছে,আজ তার খুশী সপ্তম আকাশে ছুঁয়েছে!একবার একে-ওকে ফোন করে,আবার ফ্রিজ থেকে মশলা-মাংস নামায়,আজ নাকি অনেক কিছু রান্না করবেন তিনি! আমি এই ফাঁকে যেয়ে চমচম আর রসমালাই নিয়ে এসেছি,মেয়ের জামাইকে নাকি মিষ্টি দিয়ে প্রথমে আপ্যায়ন করতে হয়!!
ফাইনালি আমাদের সবার বিশেষ করে মুপ্পুর ডাক আল্লাহ শুনেছেন,আর তাই খুব শীঘ্রই আমি খালামণি হবো!আর এই খবর শোনার পর মুহিন ভাই দু'দিনও জাপানে থাকতে পারননি,কোন রকমে একটা ল্যাগেজ নিয়ে চলে এসেছেন,তবে হ্যাঁ,আসার সময় মনে করে আপুর জন্য একটি ফিংগার রিং আনতে ভুলেননি!তাও আবার লাভ শেপের!
কিন্তু মুপ্পু ক্ষেপেছে,কেন ফুল আনা হয়নি!অন্তত একটা গোলাপ তো আনতে পারতো নাকি?একটু পর পর ই সে চেঁচিয়ে উঠছে,
-শাহাবাগ হয়ে আসলা,আর একটা ফুল আনতে পারলে না?এমনে সময় দেখি ফুল ছাড়া বাসায় আসো না,আর আজকে?ক'দিন আমি ছিলাম না,আর ওমনি সব ভুলে বসে আছ না?
দুলাভাই এই নিয়ে কত্তবার সরি বললো আল্লাহই ভালো জানে!বেচারা পারলে এখনই দৌড়ে যায় ফুল আনতে,কিন্তু এতোদিন পর বউকে রেখে কোথাও নাকি তার যেতে ইচ্ছে করছে না!! অগ্যাত,আমিই ছাদ থেকে গোলাপ ছিঁড়ে আনলাম!
আর মা করছে আরেক টেনশন!,তার নাতি-নাতনি টা কি এই দেশে হবে,নাকি টোকিও তে!ওখানে হলে মুপ্পুর দেখাশুনা করবে কে?ইত্যাদি ইত্যাদি!
খেতে বসে মুহিন ভাইকে এক দফা খোঁচা দিলাম,
-কি?এখন নিজেকে খুব বাপ বাপ মনে হচ্ছে না?আর যাচ্ছিলেন তো আরেকটা বিয়ে করতে!!একটু সবুরও করা যায়নি না?এই মুপ্পু,একে মাফ এতো সহজে করবি না বলে দিচ্ছি!
মুপ্পু হাসতে হাসতে বলে,
-আসলেই তো!শাস্তি তো দেয়া হয়নি তোমাকে!
দুলাভাই নাক কুঁচকে রুমের দরজায় দাঁড়ানো আমার দিকে তাকিয়ে বলল,
-কূটনামি কম করো!আমি কিন্তু এখন মুরুব্বিও হচ্ছি বুঝলা?
-ইহহ,কি মুরুব্বি!!ধরে আপনাকে আবার আপুর সাথে বিয়ে দিয়ে দিবো দাঁড়ান!
দুলাভাই একটা রসমালাই মুখে দিয়ে বলল,
-আরেকবার কেন,তুমি বরং আরো তিনবার বিয়ে করিয়ে দাও,একবারে ঝামেলা শেষ!হাহাহা!ও হ্যাঁ,সেই সাথে আমার ভায়রা ভাই এর ব্যবস্থাটাও করে ফেলা যায়!এক ঢিলে অনেক পাখী মারা হবে,কি বলো মিতু?ঠিক বলেছি না মা?
মা হাসলেন,আর মুপ্পু খুব উৎসাহ নিয়ে বলল,
-আরে তুমি বিয়ের আয়োজন করো,তোমার জন্য ভায়রা খোঁজার কাজ হয়ে গেছে বলা যায়!!
আমি আর দুলাভাই একসাথে বলে উঠলাম,
-কি????!!!!
আপু হাসতে হাসতে মা এর দিকে তাকিয়ে বললেন,
-আমার এক ছাত্রী আছে বুঝলে,নবনী নাম,ওর এক চাচা আছেন,যারা মাথার চুল নাকি কিছুটা লালচে!তো সেই লাল চুলের লোকটা,আমাদের নিতুর জন্য অনেকদিন ধরে পথচেয়ে বসে আছে!সেদিন তো নবনীর মা আর দাদী,আনুষ্ঠানিক ভাবে প্রস্তাবও দিয়েছেন,এখন শুধু আমাদের 'হ্যাঁ'বলা বাকী!
আমি দাঁতে দাঁত চেপে কপট রাগ দেখিয়ে বললাম,
-ওহ,আচ্ছা?এই কাহিনী না?তাই তো বলি,ঐ ব্যাটা আমার ভার্সিটির সামনে ঘুরে কেন?! ধুর...আর তোমরাও!কথাই বলবো না আর যাও!
বলতে বলতে আমি রুমের দরজা লাগিয়ে বসলাম।মা খুব উচ্ছ্বাসিত কন্ঠে বললেন,
-একেই বলে আল্লাহর রহমত,আজ কতোদিন পর মনে হলো,আল্লাহ আমার মেয়ে দু'টোর উপর অনেক রহম করেছেন!না হলে,এমন দিন দেখতে হবে তার আশা তো ছেড়েই দিয়েছিলাম,আসলে বিশ্বাস রেখে চাওয়ার মতো চাইলে আল্লাহ যে অবশ্যই দেন,তা আরেকবার বুঝতে পারলাম। এখন যেনো সব কিছু আল্লাহ সুন্দর ভাবে সম্পন্ন করেন সেই দোয়াই করি।
আমি মনে মনে বললাম 'আমীন'। আমার আজ অনেকদিন পর খুব ইচ্ছে করছে বাবা কে দেখতে!খুব ইচ্ছে করছে...
ডায়নিং রুম থেকে কানে আমার ঠিকই আসছিলো,আপু আর দুলাভাইয়ের হাসির আওয়াজ,মাঝে মাঝে মায়ের উচ্ছ্বাসিত কন্ঠের কথাও শুনছিলাম,আর এপাশে আমি বোধহয় সুখের কান্নাই কাঁদছিলাম।
সেই সাথে অদ্ভুদ বাঁধনহারা আনন্দে মনটা ভরে উঠলো। বাইরের আকাশের দিকে তাকালাম... মেঘটা আরো গভীর হচ্ছে,সেই সাথে ঠান্ডা বাতাস,তার বৃষ্টি আসছে! এখন মনে হচ্ছে,বসন্তের এই অদ্ভুদ আবহাওয়ার মানে বুঝতে পারছি!
প্রকৃতির এমন হঠাত বদলে যাওয়া রূপের ছোঁয়াতেই বদলে যায় অনেক কিছু। সব বর্ষণ বেলাই কোন কোন না গল্পের সূচনা অথবা সমাপ্তি টানে। এই বসন্তের বর্ষণটাও অনেক দীর্ঘ কোন গল্পের সমাপ্তি ঘটয়ে নতুন আরেক গল্পের সূচনা করলো...