জনপ্রিয় পোস্টসমূহ

সোমবার, ১১ জানুয়ারি, ২০১৬

সম্পর্কের গল্পটা

শীতের বিকেলটা বড্ড দ্রুত ফুরিয়ে যায়,সন্ধ্যে টা হুট করে কখন নেমে আসে টের ই পাওয়া যায় না। ঘড়ির দিকে একবার তাকিয়ে আবার কাজে মনোযোগ দেয় নিতু। দ্রুত হাতে টাইপ শেষ করে প্রিন্টে দিয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। এক টানা অনেক ক্ষন বসে আছে,এক কাপ কফির জন্য মনটা ভীষন ছুটছে কিন্তু উপায় নেই। ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস ফেলে নিজেকে নিজেই সুধায়
- কেবল কফি খাওয়ার জন্যই জীবন না,জীবনে রিপোর্ট ও লিখতে হয়,একটা দুইটা না অনেক গুলো! 
পেপার গুলো হাতে নিয়ে স্যারের রুমের সামনে যেয়ে দেখলো দরজা বন্ধ,চলে গেলেন নাকি! হাতের ঘড়ির দিকে তাকালো,আহহ... ৫টা বাজতে দেরি বসের অফিস ছাড়তে দেরি না কিন্তু অন্যদের বেলায় ৭টা বাজলেও অফিস আওয়ার আর ফুরায় না! 

সেকশন ইনচার্জের কাছে রিপোর্ট গুলোা বুঝিয়ে দিয়ে ব্যাগ গুছাতে লাগল, 6.25 বেজে গেছে,বাসে উঠা যাবে কি না কে জানে! দ্রুত পায়ে হেঁটে সায়েন্স ল্যাবের মোড়ে এসে দাঁড়ালো। বাস আসার নাম গন্ধও নেই,কানে হেড ফোন গুজে রাস্তার এক পাশে দাঁড়ালো। চোখ থেকে চশমটা খুলে টিস্যু দিয়ে মুছতে মুছতে ঝাপসা চোখে একবার চারপাশে তাকালো,আহ! কি ব্যস্ত জীবন সবার,কেউ বাড়ি ফিরছে তো কেউ এক কাজ ছেড়ে আরেক কাজে কেউ বা আবার বেরিয়েছে অন্য কোন গন্তব্যে। ফুটপাথের ফেরিওয়ালা হিসেব কষছে দিনের আয় কেমন হলো,রাতে বাকী টাকা উসূল হবে তো? ব্যাগে বাজার নিয়ে হাটতে হাটতে কেউ বা আবার হিসেব কষছে কতো খরচ হলো,বাজেট ঠিক আছে তো? 
- চশমা নিলি কবে? 
পরিচিত কারো কন্ঠ শুনে ঘাড় ফেরালো,চশমাটা চোখে দিয়ে তাকিয়ে মুখটা দেখলো কিন্তু কোন কিছু বলল না। 
- বাসের জন্য অপেক্ষা করছিস? কেমন চলছে চাকরী? তোর লেখা পড়ি মাঝে মাঝে,ভালোই তো লিখিস,তোদের পোর্টালটা ও বেশ ভালোই পপুলার দেখি।  
অনেকক্ষন মুখের তাকিয়ে থেকে আবারো রাস্তার দিকে চোখ ফেরালো। 
- তোকে দেখে বেশ সুখী মানুষ মনে হচ্ছে,ভালো আছিস তো? 
নিতুর কথায় হেসে ফেলল নবনী। 
- চেহারায় সুখী সুখী ভাব রাখাটা খুব কঠিন কাজ না,আর আমি মানুষটাকে আল্লাহ সুখী চেহারার করে পাঠিয়েছেন তাই ভেতরে সুখ না থাকলেও মুখ দেখে সুখীই মনে হয়। তোর বাসা কি এখনো আগের জায়গাতেই আছে? 
-হুম! তোর?
-বদলেছে। 
নিতু আর কিছু বলল না। অথচ অনেক প্রশ্ন করার ছিলো,কিছু প্রশ্নের জবাব জানার ছিলো কিন্তু ইচ্ছে করলো না কিছু বলতে। হাঁটবে কিনা ভাবতে লাগল,আবার মনে হলো হেঁটে কতোদূর ই বা যাওয়া যাবে? তারচেয়ে এখান থেকেই রিকশা পাওয়া যায় কি না। 
- নবনী,আমার বাসে আজকে আর যাওয়া হবে বলে মনে হয় না,রিকশা নিবো ভাবছি। 
-ওহ! ঠিক আছে যা তাহলে। 
রিকশায় বসে নিতুর মনে হলো,এতোটা কাঠখোট্টা না হলে পারতো! একটা সময় ছিলো যখন নবনীর সাথে গল্প করতে করতে সময় ফুরাতো না,ক্লাস-ক্যান্টিন কিংবা রিক্সা ,ইনবক্স কতো জায়গায় কতো শতো কথা যে বলার থাকতো,আর আজ?কিছু সময়ের জন্যে কথাই যেনো খুঁজে পাওয়া গেলো না!  
অনেক ভেবেও মাঝে মাঝে খুঁজে পায় না,আসলে কি এমন হয়েছিলো যার কারণে দু'জনের মাঝে এতো দূরত্ব হয়ে গেলো! নিতুর এখনো মনে পড়ে,ক্যাম্পাসের সেই দিন গুলোর কথা। যথেষ্ট ভীতু টাইপের মেয়ে ছিলো নবনী,পলাশী থেকে শাহাবাগ আসতেও সাথে কাউকে তার লাগতো, সারাটা সময় নিতুর সাথে আঠার মতো লেগে থাকতো! নিতু সবচেয়ে বেশি ভয় পেতো নবনীর সাথে শপিং এ যেতে। একটা কাপড় পছন্দ করতে যে কি পরিমাণ সময় লাগতো নবনীর সেটা চিন্তা করলে এখনো মাথা ঘুরায় নিতুর! আচ্ছা,এখন ও কার সাথে যায় শপিং এ? ওর বরের সাথে নাকি একা?
দোকানের খাবার নিয়ে হাই লেভেলের এলার্জি ছিলো নবনীর,অন্য দিকে নিতুর জন্য রাস্তা-গলির সব খাবারই সুস্বাদু ছিলো, এ নিয়ে কতো খুঁনসুঁটি! এসাইনমেন্টে-প্রেজেন্টেশনের কাজ গুলো কিংবা সার্ভে রিপোর্ট সময় গুলো সব মিলিয়ে দু'জনের জন্য কি বর্ণিল ই না ছিলো। এখনো কি এতো ব্যস্ত থাকে মেয়েটা?  
আসিফ কে বিয়ে করার ব্যাপারে নিতুর কোন রকম সায় ছিলো না বলে নবনী যথেষ্ট বিরক্ত ছিলো ওর উপর। কিন্তু নিতু অনেক চেষ্টা করেও পারেনি মন থেকে ওদের বিয়েটা মানতে। আসিফ কে লিমিটলেস মানুষ বলে মনে হতো,আর নবনীর মতো নাকওয়ালা কেউ আসিফের সাথে এডজাস্ট করতে পারবে এটা কেন জানি বিশ্বাস হয়নি কিন্তু কি করার? 
নবনীর পরিবারের ধারণা,অনার্স শেষ করার মধ্যে মেয়ের বিয়ে না হলে আর বিয়ে হবে না,বয়স বেড়ে যাবে চেহারা নষ্ট হয়ে যাবে ইত্যাদি! তাই ফোর্থ ইয়ারে উঠতেই বিয়ের জন্য প্রস্তুত নবনী। আর অন্য দিকে ফাইনাল পরিক্ষা,বিসিএস প্রিপারেশন নিয়ে মহা ব্যস্ত নিতুর জন্য নবনী কাকে বিয়ে করছে,কেন এখন বিয়ে করছে এসব নিয়ে অতো ভাবার সময় নেই। 
আসিফের ব্যাপারে যখন নবনী নিতুর মতামত চাইলো,তখন সব কিছু শুনে একবার কথা বলেই নিতু না করে দিয়েছিলো!লোকটাকে দেখে,তার সম্পর্কে শুনে নিতুর মনে হয়েছে,বাহিরে অনেক কিছু থাকলেও ভেতরটা একেবারেই ফাঁকা কিন্তু এরচেয়ে বেশি কিছু নবনীকে বোঝাতে পারেনি। আর তাই বিয়ের পর থেকে নবনী যোগাযোগ কমিয়ে দেয়,আর অন্যদিকে খানিকটা অভিমান আর ব্যস্ততার ভারে নিতুও যোগাযোগ ধরে রাখার চেষ্টা করেনি! জীবনের ঐ এক সিদ্ধান্তই যেনো বদলে দিয়েছিলো প্রায় সাড়ে ৪ বছরের বন্ধুত্ব। শুধু মাঝে মাঝে সোশ্যাল নেটওয়ার্কে স্ট্যাটাস-ছবি দেখে আর গেট টুগেদারে টুকটাক কথার মাঝেই আটকে যায় কয়েক বছর।   

'পাঠক সমস্যা' বিভাগে কাজ করতে নিতুর বরাবর ই এলার্জি! মানুষের ভয়াবহ রকমের সমস্যা গুলো পড়তে পড়তে মনে হয় মানুসিক রোগী হয়ে যেতে হবে কিন্তু এই সেকশনে নিয়মিত ইনচার্জ না থাকায় প্রায়ই ঘুরে ফিরে ওর কাছেই কাজ গুলো আসে। ইনবক্স চেক করতে যেয়ে ছদ্মনামের একটা ম্যাসেজে চোখ আটকে যায়,ম্যাসেজটা একবার না কয়েকবার পড়ল ভাষা গুলো খুব বেশি পরিচিত।  একটা সময় খেয়াল করলো দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসছে।  
রাতে সব কাজ শেষ করে এক মগ কফি নিয়ে বারান্দায় এসে বসলো,রাত দীর্ঘ হবার এই এক শান্তি সব কাজ শেষ করে অনেকটা সময় হাতে থাকে। মোবাইলটা হাতে নিয়ে নবনী কে কল দেবার কথা ভাবলো কিন্তু নাম্বারটা ডায়াল করা হলো না,খুব কাছের সম্পর্ক থেকে যখন কেউ দূর সম্পর্কের হয়ে যায় তখন কেন যেনো আর চাইলেও তাকে কাছে ভাবা যায় না,মানুষটার ভেতর বাহির সব জানা সত্ত্বেও তাকে অনেক বেশি অচেনা মনে হয়।  ল্যাপটপ টা অন করে নবনীর প্রোফাইলে গেলো, অনেকটা সময় ঘুরাঘুরি করল তারপর আবারো ব্যালকনিতে এসে বসল। 
এক সময়কার সবচেয়ে কাছের বন্ধুটা এখন ভালো নেই জেনেও তাকে কিছু বলতে পারছে না,জিজ্ঞেস করতে পারছে না কি হয়েছিলো?এখন কেমন আছে সে? প্রতিনিয়ত কি করে কষ্ট সহ্য করে বেঁচে আছে? এতোদিনের বন্ধু হওয়া সত্ত্বেও একটাবার ও কি ওর সাথে শেয়ার করতে পারতো না?  
সংসার-চাকরী,ঘরে-বাইরে নিজ নিজ অবস্থান আর ভালো থাকার ব্যস্ততা গুলো অজান্তেই কতো কিছু বদলে দিয়েছে। নবনী ভাবছে এখন হয়তো নিতু তাকে মূল্যহীণ ভাবছে কিংবা সে যে ভালো আছে এটা জানলে এখন খারাপ লাগবে! আর নিতুর মনে হচ্ছে,তার কঠিন সময়টা তে নবনী স্বার্থপরের মতো পাশে থাকেনি এখন কি করে সে দাঁড়াবে? এখন তার হাসিটাও হয়তো নবনীর কাছে আগের মতও আপন মনে হবে না! 
আমিত্ব কিংবা অপরাধবোধ আর সাথে সময়ের চলে যাওয়া অনেক দিনের চিরচেনা সম্পর্ক গুলো বদলে দেয়। মাঝে শুধু থেকে যায় কিছু সুখ স্মৃতি আর অপ্রকাশিত দুঃখ! এক সময়কার মজবুত বন্ধুত্বের সম্পর্কটা তাই খুব বেশিই ঠুনকো হয়ে যায়। চাইলেও তখন আর জানা যায় না,আমার এক সময়কার সুখ-দুঃখের নিত্য সাথী বন্ধুটা এখন কেমন আছে? 

মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০১৫

মমত্বের ভাগাভাগি


ঘুম আসি আসি অবস্থায় তীব্র কোন শব্দ কানে আসা মানেই হয় ঘুম একেবারেই চলে গেছে আর না হলে ঘুমটা ফিরে আসছে কিন্তু একটা অনুভূতি নিশ্চিত হয় আর তা হলো,মেজাজ টা বিগড়ে যাবেই যাবে!
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিছানায় উঠে বসলো নিতু। এলোমেলো চুল গুলো ঠিক করতে করতে মেজাজটা শান্ত করার চেষ্টা করলো কিছুক্ষন কিন্তু নাহ,পুরোপুরি শান্ত করা গেলো না।
 টলমলে পায়ে রুম থেকে বের হয়ে দেখলো,যা অনুমান করেছিলো ঠিক তাই! রিদমি আবারো ওর খেলনা গুলোকে আছড়ে নিচে ফেলে দিয়েছে,এবং এবার আর একটা খেলনাও আস্ত নেই। খেলনা গুলোর সাথে নতুন কেনা টিভির রিমোর্টটা ও আছে,উফফ!
নিতু কিছুক্ষন আবারো চেষ্টা করলো মেজাজটা কন্ট্রোল করতে,এই মুহুর্তে মেজাজ বেড়ে যাওয়া মানে কাজও বেড়ে যাবে,তারউপর মাথায় অলরেডী অনেক টেনশন চলছে,এনার্জি লেভেল অনেক কম এমনিতেই! রিদমি কে বারান্দায় রেখে এসে চুপচাপ খেলনা গুলো বাকেটে ভরতে লাগলো,ঠিক তখন ই ভাবির রুমের দরজা খোলার শব্দ পাওয়া গেলো।
- হায় আল্লাহ!একি অবস্থা?!! কেমন করে হলো?
নিতু স্বাভাবিক গলায় জবাব দিলো,
- রিদমি ফেলে দিয়েছে।
-কখন করলো এই কাজ? তুমি কোথায় ছিলে?বুয়া কোথায়?
-আমি ওকে নাশতা করিয়ে দিয়ে কিছুক্ষনের জন্য একটু শুয়ে ছিলাম রুমে,আর বুয়া বোধহয় কিচেনে মশলা পিষছে।
নিতুর কথা শুনে রিনির মেজাজ তীক্ষ্ণ হলো! এটা কি ধরনের কাজ? একটা ঘন্টার জন্য দু'জন মানুষ মিলে ৪বছরের বাচ্চাটা কে সামলাতে পারলো না? এই নিতু সারাটা সময় বাসায় করেটা কি?আর বুয়াও একটা! রিদমি কে রাখার জন্য তাকে আলাদা করে যেখানে টাকা দেয়া হয় সেখানে সে ওকে রেখে কিভাবে চলে যায় অন্য কাজে?
নিতুর নিরবতা দেখে রিনি আরেকটু বিরক্ত হলো। বুঝাই যাচ্ছে সে রেগে আছে কিন্তু কেন? নিজের দোষটা কি তার চোখে পড়ে না?আর এখন এভাবে কার উপর রাগ দেখাচ্ছে? রিদমির উপর নাকি রিনির উপর? 

ছুটির দিন দুপুরে খেয়ে একটু আয়েশ করে টিভি দেখতে বসলো পলাশ। কিন্তু টিভির রিমোর্ট দেখতে পাচ্ছে না কোথাও!
-এই নিতু?রিমোর্ট কইরে?
ডায়নিং গোছাতে গোছাতে নিতু জবাব দিলো,
-সকালে রিদমি ভেঙ্গে ফেলেছে!
-ভেঙ্গে ফেলেছে মানে?ও রিমোর্ট কিভাবে পেলো? তোরা থাকিস কোথায় সব!
নিতু কিছু বলার আগেই রিনি দ্রুত বেরিয়ে এসে বলল,
-সবার কি আর কোন কাজ নেই?তোমার ছেলে কে পালবার জন্য কি সবাই বসে আছে? রিদমি কি করে না করে তার খোঁজ রাখার এতো সময় আছে কার শুনি?
খোঁচাটা যে ভাবি তীব্রভাবে তাকেই দিচ্ছে বুঝতে পেরে নিতুর মেজাজটা প্রচন্ড চড়ে গেলো! কথায় কথায় ভাবি এই খোঁচা কেন দেয় যে,সে রিদমি কে একদমই সময় দেয় না? জন্মের পর থেকে বাচ্চাটা কে তো বেশির ভাগ সময় সে ই দেখাশুনা করে,ভাই-ভাবি ভালো করেই জানে রিদমি নিতুর কতোটা ভক্ত,একবেলা কেন এক সপ্তাহ নিতুর কাছে রেখে গেলেও রিদমি মোটেও কাঁদবে না। কিন্তু তারপরেও সুযোগ পেলেই ভাবি এভাবে কথা শোনাবে কেন?
- ভাইয়া,আমি বিকেলে টিউশনি শেষ করে আসার সময় রিমোর্ট কিনে নিয়ে আসবো। তুমি বরং এখন রেস্ট নাও!
কথাটা বলেই নিজের রুমে চলে আসলো নিতু। ওর এভাবে চলে যাওয়া দেখে রিনির মনে হলো মুখের উপর নিতু তাকে অপমান করলো! পলাশের দিকে তাকিয়ে রিনি বলল,
- অবস্থাটা দেখতে পাচ্ছো? আমার কিন্তু ধৈর্য্যের একটা সীমা আছে,ও কিভাবে মুখের উপর জবাব দিলো?কেন?রিদমি কি ওর কেউ না,ওকে একটু সময়ের জন্য নিজের কাছে রাখতে পারে না সে?ও যদি একটু খেয়াল রাখতো তাহলে কি আজকে এতগুলো আর সাথে রিমোর্টটাও ভাঙ্গতো?
পলাশ একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
- তুমিও তো পারো রিদমি কে নিজের কাছে রাখতে,নিতুকে একা কেন দায়িত্ব দাও?
-বাহ! ভালোই বলেছো,আমি তো আমার ছেলেকে একদমই সময় দেই না,সব শুধু নিতুই করে! ঠিক আছে,আজ থেকে রিদমি নিতুর ধারে কাছেও যাবে না,আমার ছেলে আমিই পালবো!
দুপুরে খেয়ে রিদমি সব ফুপ্পির কাছে ই ঘুমায়, ঘুমন্ত ছেলেকে টেনে হেঁচড়ে নিয়ে যেতে দেখে নিতুর অসম্ভব কান্না পেলো! অনেক কষ্টে কান্না আটকে বলল,
-ভাবি প্লিজ!ও ঘুমাচ্ছে তো!
-আমার ছেলে আমার কাছেই থাকবে,আর কাউকে চিন্তা করতে হবে না!
-আমি কি ওকে আদর করি না? তুমি ভালো করেই জানো আমার ফাইনাল পরীক্ষা চলছে,রাত জেগে পড়াশুনা করে দিনের বেলা একটু শোয়ার দরকার হয় আমার,আমি কি ইচ্ছে করে ওকে একা একা খেলতে দিয়েছিলাম?আর খেলনা-জিনিসপত্র তো রিদমি আজকে নতুন ভাঙ্গে না,কেন সিনক্রিয়েট করছো?
-নিতু শোন,আমার বাচ্চাকে কেউ অযত্ন করবে এটা সহ্য করা আমার পক্ষে সম্ভব না,পড়াশুনা আমিও করছি,আমাকে বুঝাতে এসো না আর তোমাকে কয়টা বাচ্চা পালতে হয় শুনি? লাগবে না,আমিই পারবো রিদমি কে রাখতে,তুমি থাকো তোমার মতো।
বলতে বলতে ছেলেকে নিয়ে রুম থেকে চলে গেলো রিনি।  

বিয়ের পর থেকেই রিনিকে কেন জানি ভালো লাগে না নিতুর,ওর ধারনা ভাবি খুব বেশি লোক দেখাতে পছন্দ করে,আন্তরিকতা বোধ তার ভেতরে নেই বললেই চলে অন্যদিকে রিনির ধারনা একমাত্র বোন হিসেবে নিতু বেশি স্বার্থপর,সব কিছু নিজের মতো করে চায় সে! মেজাজের দিক থেকে রিনি-নিতু যখন একই লেভেলের তখন দীর্ঘদিন এক সাথে থাকার পরেও দু'জনের মাঝে দূরত্ব কোনভাবেই কমার কথা না! এরই মাঝে রিদমি আসলো,শুরু হলো আরেক অধ্যায়।
মা নাকি ফুপ্পি কে বেশি আদর করে,কে বেশি খেয়াল রাখে এ নিয়ে অদৃশ্য একটা প্রতিযোগীতা চলছে দু'জনের মাঝে গত চার বছর ধরে,কিন্তু আশ্চর্য্যের বিষয় হলো,যখন নিজেদের প্রয়োজন সামনে আসে তখন অটোম্যাটিক্যালি রিনি ও চায় রিদমি কে নিতু সময় দিক আর নিতুও চায় তখন রিনি সময় দিক রিদমি কে!এবং এর ফলাফল হয় আরো ভয়াবহ!

স্কুল থেকে ফিরেই ব্যাগ রেখে টিভি দেখতে বসলো রিদমি। যেহেতু ফুপ্পি এখনো বাসায় ফেরেনি সেহেতু টিভি দেখার এটাই সময়!ফুপ্পির সামনে টিভি দেখতে বসা মানেই এত্ত গুলো বকা শুনতে হবে!
চিপস খেতে খেতে রিদমির মনে হলো,ওর বন্ধু মৃন্ময় অনেক ভালো আছে,ওকে ওর বাসার সবাই কি আদর ই না করে অন্যদিকে ওর ফুপ্পি? সারাক্ষন ওকে রুটিনের মধ্যে রাখে আর একটু কিছু হলেই বকা! একই অবস্থা আম্মুর ও! বাসায় থাকা মানেই হয় মা বকবে আর না হয় ফুপ্পি!উফফ...
ক্লাসে রিমন বলছিলো,ওর বাসায় ওর আব্বু-আম্মু ওকে অনেক আদর করে,ওর ফুপ্পি কানাডা থাকে,ওর জন্য বার্থডে তে প্রতি বছর চকলেট-খেলনা পাঠায়। রিদমির মনে হলো,ওর ফুপ্পিও দূরে থাকলে ভালো হতো,তাহলে ওকে অনেক আদর করতো! মাঝে মাঝে ফুপ্পির রাগ দেখলে রিদমির খুব কান্না পায়,কিন্তু ফুপ্পি সেটা যেনো বুঝেই না! 

সব সম্পর্কই সময়ের সাথে সাথে বদলে যেতে শুরু করে,আর তাই নিজের অনেক চিরায়ত স্বভাব কে ও তখন বদলে ফেলতে হয়,না হলে সম্পর্কটা ই কেবল থাকে শূণ্য বাক্স হয়ে। কিন্তু বেশিরভাগ সময় ঠুনকো বা পুরনো রাগ-অভিমান আর ইগোর কারণে মানুষ সেটা বুঝতে পারে না।

আজকাল রিনির মনে হয়,রিদমি ওর চাইতে নিতু কে বেশি পছন্দ করে! ছেলেটা সারাক্ষন ফুপ্পির পেছনে ঘুর ঘুর করে আশ্চর্য্য! সেদিন অনেক মাস পর গেলো খালার বাসায় বেড়াতে,ওমা এক বেলা যেতে না যেতেই ছেলে অস্থির হয়ে গেলো নিতুর জন্য! এ নিয়ে ভাবি-আপাদের সে কি হাসাহাসি,কি এক অবস্থা!
নাহ,এখন থেকে নিতুর কাছ থেকে একটু দূরে দূরে রাখতে হবে রিদমি কে!শত হলেও ছেলে তো তার নিজের।

নিতু অসম্ভব অবাক হলো যখন দেখলো,রিদমি হোমওয়ার্ক করতে ভুল করেছে বলে বকা দেয়া মাত্রই সোজা মায়ের কাছে চলে গেলো! কি অদ্ভুদ! সে দিনের ছেলে এই ছ'বছর বয়সে এসে এখন আর ফুপ্পিকে পছন্দ করে না! আগে মা বা বাবা কেউ বকা দিলে সোজা ফুপ্পির কাছে চলে আসতো আর এখন? দিনে দিনে রিদমি আরো দূরে সরে যাচ্ছে অথচ এই ছেলেকে কোলে-পিঠে মানুষ করেছে!
আজকাল ছুটির দিনে যখন রিদমি খুশীমনে বাবা-মায়ের সাথে বেড়াতে চলে যায়,আর নিতুকে 'আল্লাহ হাফেজ' ও বলে যায় না কিংবা রাতে কোন রকমে হোমওয়ার্ক শেষ হওয়া মাত্রই দৌড়ে মায়ের কাছে চলে যায় তখন খুব অভিমান আর অসম্ভব রাগ হয় নিতুর! শেষ পর্যন্ত এই ছেলে ওর মায়ের মতোই অকৃতজ্ঞ হলো!বড় হচ্ছে আর মায়ের মতো স্বার্থপর হচ্ছে!থাকুক মায়ের সাথেই।

এক বছর পর,
আজ রিদমি ওর বাবা-মায়ের সাথে চিটাগং চলে যাচ্ছে,বাবার প্রমোশন হয়েছে সেই সাথে বদলী। ফুপ্পি যাচ্ছে না ওদের সাথে কারণ তার পড়াশুনা শেষ হয়নি এখনো। পিসিতে ওদের নতুন বাসার ছবি দেখেছে,অনেক বড় আর সুন্দর বাসাটা। বিশাল একটা খেলার মাঠও আছে সেখানে,ঢাকা থেকে তাই স্ট্যাম্প-ব্যাট-বল কিনেছে যেনো ইচ্ছে মতো খেলতে পারে বিকেলে। ফুপ্পি যাবে না শুনে প্রথমে একটু খারাপ লাগলেও এখন লাগছে না,ওখানে যেয়ে অন্তত ফুপ্পির কঠি রুটিন থাকবে না আর বকা ও খেতে হবে না!
মনকে অনেক কষ্টে শক্ত করে রিদমির ল্যাগেজ গুছিয়ে দিচ্ছে নিতু! কিন্তু বারবার চোখ ভিজে উঠছে,কেমন করে থাকবে ছেলেটা কে ছাড়া?দিনের পর দিনে ওকে না দেখে কি করে ভালো থাকবে সে? ধীরে ধীরে  রিদমির দিকে তাকালো নিতু! কষ্টে বুকটা হু হু করে উঠলো। কিন্তু রিদমির সেদিকে খুব একটা খেয়াল নেই,সে নিজের সুখে বিভোর। আচ্ছা,আরেকটু বড় হলে রিদমি কি একদমই ভুলে যাবে ফুপ্পি যে ওকে কত্ত আদর করেছে,কতটা ভালোবাসে? 

ধীরে ধীরে ট্রেনটা চলে গেলো। নিতুর মনে হলো,ওর আর রিনির এতো বছরের মমত্বের ভাগাভাগি অধ্যায়টার এখানেই সমাপ্তি হলো। একে অন্যকে প্রচন্ড অপছন্দ সত্ত্বেও কেবল এই একটা বন্ধন কে আঁকড়ে ধরে এতো বছর এক সাথে থাকার দিন গুলো এখন থেকে শুধুই গল্প।
তবে রিদমি এখন না হলেও কিংবা পাঁচ বছর পর না হলেও আজ থেকে অনেক বছর পর হয়তো বুঝতে পারবে,হয়তো মনে পড়বে,ওকে নিয়ে ওর মা আর ফুপ্পির এই ভাগাভাগির কথা,তাদের ভালোবাসার কথা এবং তখন হয়তো নিতুর কড়া শাসন,রাগ আর রিনির ক্ষোভ-হিংসার কারণ গুলোও সে বুঝতে পারবে কিন্তু মমত্বের এই বিচ্ছেদের কষ্টটা হয়তো একান্তই নিতুর একার হয়ে থাকবে।




মঙ্গলবার, ২ জুন, ২০১৫

বৃষ্টি কাব্য- ৩


শহুরে জীবন কাঁদা-পানিতে চলতে করে অভ্যস্থ
আর বৃষ্টিতে ভিজতে?অনেকটা অনভ্যস্থ!
বৃষ্টি আর মেঘলা আবেশ ধুয়ে যায় বারোমাস
যখন শহুরে জমাট পানিতেই গড়তে হয় আবাস!

তবু বৃষ্টি ভালো লাগে, কখনো কাব্যে কিংবা
রবি বাবুর রেখে যাওয়া সুরে
কি লাগে না ভালো?

হুম,লাগে মাঝে-সাঝে,এক-আধটুকু
তবে তা বৃষ্টি না,মেঘলা দিনের টেনশন ফ্রি ঘুম!
বৃষ্টি তো বৃষ্টি ই,তারে ভালো লাগলেই কি?আর ভালোবাসলেই কি?
বৃষ্টি বিলাসের দিন গুলো সেই কবেই ফেলে এসেছি আর কি!

তবুও তো মানুষের ই মন,যা বৃষ্টি ছুঁইয়ে যায় অনেকটাক্ষণ
কি যায় না ছুঁয়ে? বৃষ্টিদিনের একলা বিকেল আর ভীষণ মায়াময় সন্ধ্যা
হয় না প্রিয়?

হুম,হয়তো ঐ মাঝে-সাঝে,এক-আধটুকু
তবে বৃষ্টিবিলাস না,বরং ফাঁকা রাস্তা ধরে
অন্য দিনের চেয়ে একটু তাড়াতাড়ি
ভীড়-ভাট্টা কমে বাসে চড়ে বাড়ি ফেরার আনন্দ!

দিনের সাথে সাথে অস্ত যাওয়া অনুভূতি গুলো
ইতিবৃত্তের চক্রাকারে এভাবেই ঘুরে যায়
কফি মগের ধোঁয়ার আবেশ আর শব্দহীন সময়
কলম-কী বোর্ডে আঙ্গুল ছুঁয়ে বৃষ্টি বন্দী রয়।

শুক্রবার, ৬ মার্চ, ২০১৫

শুকনোপাতার কাব্য- ২০


রোদ্দুরে রোজ জল শুকোয়
মেঘ হয়েছে কাঠ
ফ্যাকাশে সব আলোর ভীড়ে
লুকায় দীর্ঘশ্বাস!

এখানে-ওখানে রোজ পড়ে থাকে
টুকরো শুকনোপাতা
মরে যাওয়া সব জল গুলো হয়
ছেঁড়া ডায়রীর পাতা!

প্রান্তিকের রেখা ছুঁয়ে যায় রোজ
সবুজ কালির শব্দ
ঝুড়িতে জমা কাগজের দলায়
প্রাণ হয়ে থাকে জব্দ!

থাকুক নির্বাকদের ভীড়ে
থাকে শব্দের তীর ছুঁয়ে
জানলায় জমে দীর্ঘশ্বাস
অবেলার কুয়াশা হয়ে!  

ফোঁটায় ফোঁটায় জড়ায় যখন
শব্দের সাইক্লোন
রঙিন মেঘের গর্জনে ভাঙ্গে 
অনুভূতির দর্পন! 

শুকনোপাতা উড়ে চলে যায়
মেঘ ভাঙ্গাদের সাথে
নিয়ন ভীড়ে অরুন জড়িয়ে
থাকেনা কোন ধাতে!



বৃহস্পতিবার, ৬ নভেম্বর, ২০১৪

পার্থক্য-বৈপরিত্য!


শীত নাকি আসি আসি করছে,অথচ রোদের তেজ দেখে তো মনেই হয় না,যে এবার শীতের পোষাক পড়ার সুযোগ তেমন হবে! কি রোদরে আল্লাহ!বাধ্য হয়ে ব্যাগ থেকে ছাতা বের করল,এই রোদে আর কিছুক্ষন হাঁটলে মাথা ঘুরে পড়ে যেতে হতে পারে! ছাতা বের করতে করতে মোবাইলে ঘড়ির দিকে তাকালো, ১২.১০ বাজে,হাটার গতি বাড়িয়ে দিলো নাতাশা। দ্রুত বাসায় যেতে হবে,সকালে কোন রকম নাশতা বানিয়ে রেখে বেরিয়েছিলো,টেবিলে রেখেও আসতে পারেনি,দুপুরে কি রান্না হবে তাও ঠিক করেনি। তার উপর আজকে ছুটির দিন,বাসা ভর্তি মেহমান!
হরতালের কারণে এ ক'দিন স্কুলে ক্লাস হয়নি,তাই আজ শুক্রবারে ক্লাস নিতে যেতে হয়েছে,ওদিকে গ্রাম থেকে দুই ননদ আর দেবরের বউ এসেছে বাচ্চাদের কে নিয়ে বেড়াতে। শ্বাশুড়ি নাতাশার কাছেই থাকেন,তাই সবাই এই বাসাতেই উঠেছে।
এ ক'দিন খুব একটা সমস্যা হয়নি মেহমানদারি করতে,কিন্তু বিপত্তিটা বাঁধল আজকেই! রাতেই নাতাশা চেয়েছিলো সব কিছু রেডি করে রাখতে কিন্তু বাজার করা ছিলো না বলে ঝামেলাটা বেশি হলো!
সকালে ফজর পড়ে এ মাসের বাজারের লিস্ট করে শরীফ এর দিকে দিতেই বান্দা হাই তুলে বলল,
- রেখে যাও টেবিলে,আমি ৯টার দিকে বের হবো।
নাতাশা বিরক্ত কন্ঠে বলল,
- তো রান্না করবো কখন?! আজকে আমার স্কুল খোলা,সকালের নাশতার সাথে সাথে দুপুরের খাবারের অন্তত ২টা আইটেম হলেও তৈরী করে রেখে যেতে হবে,বাসায় মেহমান আছেন,তার উপর আজকে শুক্রবার, বুঝো না তুমি?
শরীফ মনে হলো না খুব একটা বুঝলো,বালিশে মাথা রাখতে রাখতে বলল,
- তুমি একটু দ্রুত চলে এসো তাহলেই হবে,আমি অনেক টায়ার্ড আজকে না ঘুমালেই না!প্লিজ ডিস্টার্ব করো না।
নাতাশা একটা নিঃশ্বাস ফেলে কিচেনের দিকে চলে গেলো! সবাই শুধু সবার টা ই বুঝে,এর মধ্যে নাতাশা নিজেই বা কি করবে? শরীফ তার দিক বুঝলো,শ্বাশুড়ি তার মেয়েরা বেড়াতে এসেছে,সে দিক বুঝবেন,স্কুল তাদের রুলস-ফায়দা বুঝবে এর মধ্যে সব কিছু ম্যানেজ করতে গেলে নাতাশার অবস্থাটাও যে কাউকে বুঝতে হবে এমন কোন অবস্থা ই নেই!
মাসের শেষের দিক থেকে শরীফ কে তাগাদা দিচ্ছে বাজার করার জন্য,বাট তার ছুটির দিন ছাড়া সময় নেই,অন্যদিকে নিজের ২বাচ্চা অসূস্থ থাকায় ওদের নিয়ে ব্যস্ততা সাথে মেহমানদের ঝামেলার কারণে নিজেও পারেনি কিছু টুকটাক বাজার করে রাখতে,তার উপর আজকে ছুটির দিনেও স্কুল খোলা,মিস করার কোন চান্সই নেই। ২টা ক্লাসে পরীক্ষা নিতে হবে,কিছু খাতা পেন্ডিং ছিলো সে গুলোও জমা দিতে হবে,নতুন চ্যাপ্টার পড়ানো শুরু করতে হবে,কত্তো কাজ! উফফ...... এর নাম নাকি জীবন,সংসার!!

নাশতা বানাতে বানাতে দেখলো ঘড়ির কাঁটা ৮টা ছুঁই ছুঁই! একেক জনের একেক রকমের পছন্দ,কেউ পরোটা তো কেউ রুটি,কেউ ডিম শুধু ভাজি,কেউ আবার পেঁয়াজ-মরিচ দিয়ে করা ভাজি,কেউ আবার আলুভাজি ছাড়া খাবেই না! শ্বাশুড়ি রুটি খান না,তার জন্য আলাদা করে সবজি-খিঁচুড়ি তৈরী করে কিচেনে থাকা অবস্থাতেই বাইরে যাওয়ার জন্য তৈরী হলো নাতাশা! পেটে ক্ষুধা জানান দিলেও এই মুহুর্তে মুখে দেয়ার মতো সময় নেই,ফ্রিজ থেকে একটা আপেল নিয়ে ব্যাগে ঢুকিয়ে দ্রুত বের হয়ে আসার সময় মনে পড়লো,মেয়েটা কে ঔষুধ খাওয়ানো হয়নি,গত ২টা রাত মেয়েটা জ্বর-পেটের অসুখের কারণে নিজেও ঘুমাতে পারেনি,সাথে নাতাশাও!
জা'কে ডেকে ফলের জুস আর ঔষধ বুঝিয়ে দিয়ে অনুরোধ করলো,মেয়েটা উঠলেই যেনো একটু জোর করে হলেও খাওয়ায়,আর কষ্ট করে যেনো সবাই একটু নাশতাটা করে নেয়। বলেই দ্রুত বেরিয়ে পড়লো,৯টার ক্লাস শুরু হতে বেশি সময় বাকী নেই বলে!
রিকশায় বসে আপেল টা খেতে খেতে মনে হলো, ছেলে-মেয়ে দু'টো ফুপি-চাচীর হাতে নাশতা খাবে তো? শরীফ যদি নিজে খাওয়ার সময় সাথে নিয়ে একটু আদর করে খাইয়ে দেয় তাহলে অনেকটা নিশ্চিন্ত হওয়া যেতো,কিন্তু শরীফের বাচ্চাদের সাথে বসে ওদের খাওয়ানোর মতো ধৈর্য্য খুব একটা নেই,আর তারউপর এখন বাচ্চা গুলো অসূস্থ,ওদের মুড তো আরো খারাপ!
বড় বড় করে বার কয়েক নিঃশ্বাস নেয় নাতাশা,মাথাটা হালকা করার জন্য! স্কুলে ঢুকা মানে এ আরেক দুনিয়া,এখানে সংসার নিয়ে মাথা ঘামানোর সুযোগ নেই! বছর পাঁচেক হয়ে গেলো স্কুলে চাকরীর কিন্তু এখনো এমপিও ভুক্ত হতে পারেনি,অনেক কষ্টে নিবন্ধনটা করেছে তবুও হই হই করেও হচ্ছে না!ভালোলাগে না আর এভাবে!
খাঁটুনি ঠিকই করছে কিন্তু ফল তেমন পাচ্ছে না,চাকরি টা যে ছেড়ে দিবে তারও উপায় নেই! সংসারের যা খরচ তার উপর শরীফের কোম্পানী প্রায় মাসেই বেতন আটকে দেয়,সে দিক থেকে সংসার চালাতে তার এই এই ৭হাজার টাকা অনেক কিছু।

রোদের পুড়ে বাসায় ঢুকে ডায়নিং এ ব্যাগ রেখে ২গ্লাস পানি খেয়েই সোজা কিচেনে ঢুকলো নাতাশা। কিচেনে কোন বাজার না দেখে কপাল কুঁচকে উঠলো!শরীফ কি বাজার করেনি??!! আশ্চর্য তো!!
বেড রুমে এসে দেখলো বাচ্চারা বিছানা-মেঝে একাকার করে রেখেছে,শরীফ সম্ভবত বাথরুমে গেছে গোসলের জন্য। শ্বাশুড়ির রুমে দেখলো ননদ এর সাথে গল্প করছেন,ড্রয়িং রুমে টিভি দেখছে বাকীরা! নাতাশা ধপ করে চেয়ারে বসে পড়লো!
কি করবে বুঝতে পারছে না,এদিকে খুব ক্লান্ত লাগছে,আবার ক্ষুধাও লেগেছে! ভাবতে ভাবতে ডায়নিং টেবিলের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে গেলো!!!
দ্রুত হাতে সেগুলো খুলে বিস্ময়ে-আনন্দে চোখে পানি চলে আসলো নাতাশার! ৩টা টিফিন ক্যারিয়ার ভর্তি খাবার রান্না করে পাঠিয়েছেন আম্মু! পোলাউ,দু'রকমের মাংস,সবজি-ফিরনি সবই তৈরী করে দিয়েছেন! কিন্তু কখন পাঠালেন এগুলো?!!
বেডরুমের বাথরুমের দরজা খোলার আওয়াজ পেলো,নাতাশা আরো অবাক হলো,ভেবেছিলো বাথরুমে শরীফ ঢুকেছে এখন দেখলো না আম্মু ঢুকেছিলো! ওকে দেখে মায়া ভরা হাসি দিয়ে বললেন,
-এসেছিস? জলদি হাত মুখ ধুয়ে ক'টা মুখে দিয়ে বাচ্চাদের গোসল করা,ঐ যে আমি খাবার নিয়ে এসেছি।
আবেগে কণ্ঠরুদ্ধ হয়ে আসছিলো যেনো!অনেক কষ্টে নাতাশা বলল,
-তুমি এগুলো কখন করলে? সেই উত্তরা থেকে এই মিরপুর তুমি কার সাথে আসলে?
-কাল রাতে তুই যখন বললি,আজ স্কুল খোলা-বাজারও করা নেই,তখন ঠিক করলাম,সকালে উঠে বাসার সবার জন্য রান্না করে,তোর জন্য খাবার নিয়ে ১০টার দিকে আসলাম,নিয়াজ সিএনজি ঠিক করে দিলো। এসে তো দেখি পুরো বাসা অগোছালো,তোর শ্বাশুড়ি-ননদরা রাগে ফুলে একাকার,বাচ্চারাও কিচ্ছু খায়নি,শরীফ ঘুমাচ্ছিলো! পরে আমি এসে নানুমনিদের খাওয়ালাম,ওদের কে টেবিলে নাশতা দিলাম,তোর শ্বাশুড়ির সাথে কথা বলে তার অভিযোগ-রাগ হালকা করলাম,সব কিছু গোছগাছ করলাম! এখন শরীফ বাজারে গেছে,এসেই আবার নামাজে যাবে,এবার তুই ঝটপট কিছু খেয়ে নিয়ে কাজে নেমে পর,আমি আবার বিকেলে চলে যাবো।
বলতে বলতে মা নাতাশার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বাচ্চাদের রুমের দিকে চলে গেলেন।
নাতাশা আর নিজেকে সামলাতে পারলো না,টেবিলে মাথা রেখে হু হু করে কেঁদে ফেলল! এই না হলে মা? কেমন করে,কতো সহজেই সব কিছু ম্যানেজ করে ফেললেন। সেই কোথা থেকে মেয়ের জন্য রান্না করে নিয়ে এসেছেন,মেয়ের অগোছলো সংসার সামলেছেন! শুধু মাত্র রাতে ফোনে মেয়ের মুখ থেকে একটু শুনেই বুঝে গেছেন,তার মেয়ের জন্য আজকে সব কিছু ম্যানেজ করতে কতো ঝামেলা হবে!
মাঝে মাঝে নাতাশার আফসোস লাগে,শ্বাশুড়ি যদি ওর কষ্টের একটু ভাগ নিতেন,কিংবা শরীফ যদি আরেকটু সাহায্য করতো,তাহলে কতো কিছুই না সহজ হয়ে যেতো!
প্রথম প্রথম নাতাশা কিছু হলেই মা কে ডাকতো সাহায্যের জন্য,কিন্তু যখন দেখতো তার নিজের মা তার বাসায় এসে মেঝেতে বসে বসে পেঁয়াজ কাঁটে আর শ্বাশুড়ি পাশেই চেয়ারে বসে পান খেতে খেতে তার নামে অভিযোগ করেন,অন্যদের বদনাম করেন তখন অসম্ভব খারাপ লাগতো নাতাশার! মনে হতো,এভাবে ও নিজের মা কে নিজেই অপমান করছে! তারপর থেকে আর মা কে ডাকে না,সমস্যা হলেও বলে না। বরং সমস্যার সমাধান করে সেটার গল্প মা কে শোনায় তাতে মা ও আনন্দ পায় নিজের কাছেও শান্তি লাগে।

নাতাশা জানে,মা আসলে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে কেন চলে গেলেন,কারণ তার চোখও ভিজে উঠেছিলো,আর তা আড়াল করার জন্যই চলে গেছেন! কলিংবেলের শব্দ পেয়ে দ্রুত চোখ মুখে দরজা খুলে দিলো,শরীফ বাজার করে এসেছে,ওকে দেখে বলল,
- এই নাও,তোমার সংসার! কিছু কি বাকী পড়লো নাকি তা পরে দেখো,এখন আগে আমার পাঞ্জাবি বের করে বিছানায় রাখো,নামাজের সময় বেশি বাকী নেই,মসজিদে যেতে হবে।
বাজার গুলো কিচেনে রাখতে রাখতে নাতাশা শুনতে পেলো শ্বাশুড়ি বলছেন,
- ও বউ,পোলাটা বাজার থেইকা আইলো,এক গ্লাস শরবত বানাই দিছোনি?
আনমনে একটা হাসি ফুটে উঠলো নাতাশার ঠোঁটে! তাতে বুঝি কিছুটা তাচ্ছিল্যো আর গর্বও মেশানো ছিলো!
সমাজ আসলে বদলায় না,আজো ছেলের মা,মেয়ের মা বলে কিছু আলাদা রূপ সমাজে এখনো আছে,যার কাছে শহুরে-গ্রাম,শিক্ষিত-অশিক্ষিত বলে কিছু নেই! কি অদ্ভুত একটা বৈপরিত্য!
একদিকে তার মা বনাম তার শ্বাশুড়ি,আরেক দিকে শরীফের মা বনাম শরীফের শ্বাশুড়ি!এর আগে দেখেছে নিজের দাদী আর নানীকে,দেখেছে তার শ্বাশুড়িকে তার ননদের শ্বাশুড়িকেও! পরিবারে-সমাজে মা'দের এই ভিন্ন ভিন্ন রূপ আর পার্থক্য-বৈপরিত্য কতো অদ্ভুদ ভাবে মিশে থাকে যুগের পর যুগ।  

[অনেক দিন পর ছোট খালার বাসায় যেয়ে,তার সংসার দেখে বাসায় এসে ৪মাস আগে কবরে রেখে আসা নানুর কথা ভেবে বার বার চোখ ভিজে উঠছে শুধু! নাতাশারা সত্যিই সৌভাগ্যবতী,ওমন মা পেয়েছিলো বলে,ওমন মায়ের মেয়ে হয়েছিলো বলে! ]  

রবিবার, ২৬ অক্টোবর, ২০১৪

চাই নারীর যথার্থ মূল্যায়ন,ঘর থেকে রাষ্ট্রে।


নারী ঘরে করেন এমন কাজের আর্থিক মূল্য গত অর্থবছরে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৭৬ দশমিক ৮ শতাংশের সমান। চলতি মূল্যে টাকার অঙ্কে তা ১০ লাখ ৩৭ হাজার ৫০৬ কোটি টাকা। স্থায়ী মূল্যে এটা পাঁচ লাখ ৯৪ হাজার ৮৪৫ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রাথমিক হিসাবে, ওই বছর চলতি মূল্যে জিডিপির আকার ছিল ১৩ লাখ ৫০ হাজার ৯২০ কোটি টাকার।
গবেষণায় বলা হয়েছে, একজন নারী প্রতিদিন গড়ে একজন পুরুষের তুলনায় প্রায় তিন গুণ সময় এমন কাজ করেন, যা জাতীয় আয়ের হিসাবে অন্তর্ভুক্ত হয় না। একজন নারী এমন কাজ করেন প্রতিদিন গড়ে ৭ দশমিক ৭ ঘণ্টা। আর পুরুষ করেন মাত্র আড়াই ঘণ্টা। একজন নারী প্রতিদিন গড়ে ১২ দশমিক ১টি কাজ করেন। পুরুষদের ক্ষেত্রে এ কাজের গড় সংখ্যা ২ দশমিক ৭। জাতীয় আয়ে নারীর যে পরিমাণ কাজের স্বীকৃতি আছে, তার চেয়ে ২ দশমিক ৫ থেকে ২ দশমিক ৯ গুণ কাজের স্বীকৃতি নেই। - প্রথম আলো।

সিপিডির এই তথ্যটা পড়ার পর থেকে,প্রচন্ড হাসি পাচ্ছিলো আমার!তবে হাসি পেলেও আসলে মানতে হবে,যে নারীবাদী সংগঠন গুলো মাঝে মাঝে কিছু কাজ করেন,যা এই সমাজ কে চোখে আঙ্গুল দিয়ে অনেক কিছু দেখিয়ে দেয়! অনেক কিছু নিয়ে নতুন করে আমাদের কে ভাবতে শেখায়। মাঝে মাঝে চারপাশে তাকালে মনে হয়,নারী কি আদৌ সৃষ্টির সেরা জীব?তাকে কি আসলেই সুপার কম্পিউটারের চাইতে অনেক গুণ বেশি ক্ষমতা সম্পন্ন মেধা দেয়া হয়েছে! পশ্চিমা থিউরী,ইসলামের নিজস্ব মডিফাই থিউরী,সমাজের তৈরী থিউরী ইত্যাদি নানা থিউরীতে ফেলে আমরা ভুলেই যাই,
নারীরাও 'আশরাফুল মাখলুকাত',রাব্বুল আ'লামীনের সৃষ্টির সেরা জীব। তাকেও দেয়া হয়েছে,মানুষ হিসেবে সর্বোচ্চ মেধা,যোগ্যতা। রাহমানুর রাহিম তাকেও সৃষ্টি করেছেন সর্বোচ্চ সুন্দর অবয়বে। তাকেও দেয়া হয়েছে,চিন্তা শক্তির দিক থেকে একজন মানুষ হিসেবে পূর্ণ স্বাধীনতা।

একজন নারী তার প্রত্যেকটা পরিচয়ে সর্বোচ্চ দিতে সক্ষম ব্যক্তিত্ব। হোক তা 'মা' পরিচয়,হোক তা 'বোন,স্ত্রী,মেয়ে' হোক সে 'একজন কর্মী তার অফিসে,সমাজে'। এবং নারীর সেই দেবার ক্ষেত্র টা তার দেয়ার পরিধিকে বেঁধে রাখতে পারে না। তা সে ঘরেই থাকুক,কি বাইরে! সে সব জায়গা থেকেই তার সাধ্যের সব টুকু দিতে পারে।
প্রশ্ন আসে, নারী কেমন করে পারে এতো দিতে??? সোজা বাংলায় এর উত্তর হতে পারে,কারণ,দিতে হলে সইতে জানতে হয়! দেয়া খুব সহজ কাজ না, এমনি এমনি কাউকে নিজের শ্রমের বিনিময় দিতে মানুষ চায় না,এটা দিতে হলে অনেক সহ্য করার ক্ষমতা থাকতে হয়। আর রাব্বুল আ'লামীন নারী কে সহ্য করার সেই অসীম ক্ষমতা দিয়েছে এবং তার সাধ্যের সর্বোচ্চ দেবার ক্ষমতাও অসীম করে দিয়েছেন। নারী যা যা,যতটুকু সইতে পারে,এবং তার বিনিময়ে কতটুকু দিতে পারে তা চিন্তা করতে হলেও অনেক কিছু সহ্য করতে হয়,যেটার ক্ষমতা আমাদের সমাজের নেই!

সিপিডির এই অনুষ্ঠানে পরিকল্পনা মন্ত্রী আক্ষেপ করে বলছিলেন, ‘আমার মা অনেক কষ্ট করে আমাকে হিসাববিদ বানিয়েছেন। কিন্তু বাংলাদেশের অর্থনীতি তাঁর অবদানকে স্বীকৃতি দেয়নি, মায়ের অবদান জিডিপিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।’ আমার কথাটা পড়ে মনে হচ্ছিলো,ঐ অনুষ্ঠানে থাকা পুরুষদের কে যদি জিজ্ঞেস করা হতো,'আপনি আপনার স্ত্রীর কাজের কতটুকু মূল্যায়ন করেন?আপনি যদি স্ত্রীর কাজের মূল্যায়ন না করতে পারেন,তাহলে আপনার সন্তান কি করে পারবে,তার মায়ের কাজের মূল্যায়ন করতে?' তাহলে মনে হয়,সিপিডি আরেকটা গবেষণা করে ফেলতে পারতো!

নারীর ঘরের কাজ কে কেমন করে স্বীকৃতি দিবে দেশ?? একটা দেশ তো সমাজের উপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে থাকে,আর সমাজ হচ্ছে পরিবারের সমষ্টি। যেখানে পরিবার থেকে কোন স্বীকৃতি দেয়া হয় না, সেখানে আমাদের সমাজ কেন মেয়েদের কাজের কোন মূল্যায়ন করবে?,হোক তা ঘরে কি বাইরে!
ঘরে কাজ করলে ঘরের মানুষেরাই বিশ্বাস করে, 'ঘরে থাকা মহিলারা কি কাজটা করে শুনি??' 'সারাটা দিন ঘরে করো কি শুনি?'
আর বাইরে কাজ করলেও ঘরের মানুষেরা বিশ্বাস করে,' এই মেয়ে তো নিজেকে ছেলেদের সাথে তুলনা করতে চায়' 'চাকরী করা মেয়ের আবার ঘরে কিসের সম্মান?সে তো টাকা ইনকামের জন্য কাজ করে,বিনিময়ে টাকা তো পাচ্ছেই!'
'বাইরে কাজ করে,মানে এই মেয়ে কে দিয়ে সুখের সংসার হবে না!'
বেশির ভাগ সময় দেখা যায়, সমাজ নারী কে একজন মেয়ে হিসেবে জীবনে চলতে পথে তার মতামতের সম্মান দিতে পছন্দ করে না!তারা তাকে অধিনস্ত্য হিসেবে ভাবতে চায়! একজন স্ত্রী হিসেবে তার অধিকার তার কাজের সম্মান দিতে পছন্দ করে না,তাকে অনেকটা হুকুমের দাসী কিংবা জীবন্ত মেশিন ভাবতে বেশি পছন্দ করে! এবং একজন মা হিসেবে যথার্থ মর্যাদা না দিয়ে,বরং সব কষ্টের দায়ভার তাকে দিয়ে,সব ক্ষেত্রে তার নীরব সম্মতি চায়!!
আর যেসব মেয়েরা বাইরে কাজ করতে আসে,তাদের কে নিজেদের মুনাফা-ভোগের মাধ্যম এবং সমাজের অবাঞ্ছিত কেউ হিসেবে তুলে ধরে রাখতে চায়!

ইউনিভার্সিটি লাইফের প্রথম দিকে,ভার্সিটির এক সেমিনারে এসেছিলেন দেশের প্রখ্যাত একজন অর্থনীতিবিদ। তখন চারপাশে সম্পত্তিতে নারীর সমান অধিকার আইন নিয়ে বেশ ঝড় চলছিলো। তো সেই স্যার তার বক্তব্যে বলছিলেন,
'আমি ৩২ বছরের সংসার জীবনে আমার স্ত্রীর পেছনে যতটাকা খরচ করেছি,তার তুলনায় বিয়েতে দেয়া মোহরানা টা কিছুই না,এবং এখন যদি সে সম্পত্তিও দাবী করে আর পরিমানও সে ক্ষেত্রে অনেক কম!'
তখন আমি হাত তুলে বলেছিলাম,'স্যার কথাটা অনেক বেশি গদবাঁধা হয়ে গেলো না? আপনি ৩২বছর আপনার স্ত্রীর পেছনে খরচ করা টাকার পরিমাণ,মোহরানার পরিমাণ,সম্পত্তির পরিমাণ উল্লেখ করলেন,কিন্তু আপনি চিন্তা করে বলুন তো স্যার,আপনার স্ত্রী এই ৩২বছর আপনার জন্য যা করেছে তার পরিমাণ কতটুকু? রোজ আপনার খাবার তৈরী করা,আপনার কাপড় রেডি করা,আপনার বাড়ী-সন্তানদের দেখা শুনা করা,আপনার সব রকমের চাহিদা পূরণ করা এই সব কাজের পরিমাণ= আপনার খরচ করা টাকার পরিমাণ আসলে কতো এটা উল্লেখ করবেন না?'
আমার প্রশ্ন শুনে স্যার হেসে বলেছিলেন, ' কিন্তু তোমরা তো টাকা টা ই বড় করে দেখো!তোমরা টাকাও চাও আবার সম্মানও চাও!' আমি বলেছিলাম,
'সরি স্যার,আমরা টাকা চাই না,চাই স্বীকৃতি! যখন একজন নারী হিসেবে কোন অবস্থানেই নারীরা নূন্যতম স্বীকৃতি টুকু পাচ্ছিলো না তখন পশ্চিমারা এসে শিখিয়ে গেলো, টাকা= সম্মান+স্বীকৃতি! নারী,তোমার কাছে টাকা আছে?থাকলে তোমার আছে সম্মান,আছে তোমার কাজের মর্যাদা! ব্যাস,আমরা তাই লুফে নিলাম আর সেই সুযোগে সমাজের মুখোশধারী পুঁজিবাদী অধিপতিরাও প্রতিষ্ঠা করে ফেলল সেই থিউরী! সমাজ দূরে ঠেলে দিলো সেই থিউরী,যা টাকার ভিত্তিতে নয় ১৪০০ বছর আগে নারীকে মানুষ হিসেবে দিয়েছিলো উপযুক্ত সম্মান এবং স্বীকৃতি। যে থিউরী সমাজে নারীকে টাকা ইনকামের মাধ্যম হিসেবে নয়,বরং নারী কে রেখেছিলো সুন্দর সমাজ তৈরীর উপযুক্ত কারিগরের অবস্থানে!'  
স্যার সেদিন আমার কথা এক্সসেপ্ট করেছিলেন এবং সব শেষে বলেছিলেন,'এই অবস্থার যদি পরিবর্তন চাও তাহলে তোমাদের কে ই এগিয়ে আসতে হবে,মনে রেখো।'  

আজ পর্যন্ত গবেষণা করে অনেক কিছুই বের করলেও খুব ইম্পোর্টেন্ট কথাটাই বের করতে পারে না,আর তা হলো
কারা এবং কোথায় আসলে নারীর কাজের মূল্যায়ন করতে গেলে,তার উপযুক্ত সম্মান দিতে সবচেয়ে বেশি বাঁধা দেয়?? এই ৭৫শতাংশ নারীরা কি আদৌ জানে?এজ এ হোমমেকার,তারা যা করে তা কতোটা মূল্যবান! কিংবা ঐ ২৫শতাংশ যে বাইরে কাজ করছে,তারা কি আদৌ জানে?ঘরের কাজ-বাইরের কাজ দু'টোই এক সাথে সামলানো কতোটা মূল্যবান কাজ!
যেখানে নারী ঘরে-বাইরে উভয়ক্ষেত্রেই সম্মানিত,মূল্যবান সেখানে কেন তারা ভাবে? যে,আমি ঘরে থাকলেই মূল্যহীণ আর বাইরে গেলেই মূল্যবান! কেন নারীকে এভাবে ভাবতে হয়,যে আমি ইনকাম করি না বলে পরিবারে আমার মূল্য কম?!! আবার কেন যে সব নারীরা ঘরে কাজ করেন,তারা বাইরে কাজ করা নারীদের কাজের মূল্যায়ন করতে চান না?আবার কেন যারা বাইরে কাজ করেন,তারা ঘরে কাজ করা নারীদের কাজ কে মূল্যবান ভাবতে পারেন না?
নারীকে পুরুষের তুলনায় দায়িত্ব কম দেয়া হতে পারে,তাকে শারিরীক ক্ষমতা কম দেয়া হতে পারে,কিন্তু মানুষিক সক্ষমতা,সম্মান পাবার অধিকার,উপযুক্ত মূল্যায়ন পাবার যোগ্যতা কোন অংশেই কম তো নয়,বরং বেশিই দেয়া হয়েছে। দায়িত্বের দিক থেকে পরিবার,সমাজ এ কোন পরিমাণে কম দায়িত্ব নারীকে দেয়া হয়নি। তাহলে নারীরা কেন এটা বিশ্বাস করতে চায়,যে সে বাইরে কাজ করলে তার দায়িত্ব বেশি,আর ঘর এ করলে কম?!
এই সব প্রশ্নের উত্তর গুলো একটা জায়গা কে আর একটা বিষয় কে দায়ী করে,তা হলো,
নারীকে তার ঘর উপযুক্ত সম্মান-স্বীকৃতি দেয় না,আর তাই সে পারে না নিজের ঘরে থেকেও নিজের সম্মান আর স্বীকৃতি আদায় করে নিতে,ফলে নারী বাইরে এসে সম্মান খুঁজে আর সমাজ আজো নারীকে টাকার মাপে মাপতে শেখায় প্রজন্মের পর প্রজন্মকে!

আজ কর্মজীবি নারী হিসেবেই হোক কি ঘরে থাকা নারী,রাষ্ট্র যদি নারীর কাজের উপযুক্ত স্বীকৃতি দিতে চায়,তাহলে সবার আগে নারীর কাজে স্বীকৃতি দিতে হবে তার ঘর কে,তার আপনজনদের কে। একজন নারীর প্রতি যে দায়িত্ব দিয়ে পুরুষ কে পাঠানো হয়েছে,যে কারণে তাকে নারীর চাইতে কিছু ক্ষেত্রে উপরে মর্যাদা দেয়া হয়েছে পুরুষ কে আগে সে দায়িত্ব পরিপূর্ণ ভাবে পালন করতে হবে, একজন নারী কে মানুষ হিসেবে সম্মান,তার অর্থনৈতিক নিশ্চয়তা এবং তার কাজের যথার্থ স্বীকৃতি দেবার দায়িত্ব একজন পুরুষ কে দেয়া হয়েছে বলেই,পুরুষের দায়িত্ব বেশি। আর পুরুষকে এই কাজ গুলো করতে শেখাতেও হবে একজন নারী কে ই!
সুতরাং ঘরে যখন নারী তার এই অধিকার গুলো পরিপূর্ণ ভাবে পাবে,তখনই সম্ভব হবে সমাজে এবং রাষ্ট্রে নারীর কাজের উপযুক্ত সম্মান প্রতিষ্ঠা হওয়া। তখন নারীকে মানুষ হিসেবে সম্মান করতে শিখবে সমাজ,টাকার অংকে নয়!
টাকা ইনকামের মাধ্যম হিসেবে নয়!




বৃহস্পতিবার, ৯ অক্টোবর, ২০১৪

মুখোশের ভীড়ে সম্পর্কের গল্প

ঈদের ছুটির আমেজ চারপাশে বিরাজ করছে। সকালে আসার সময় বেশ কিছু ঘর মুখো মানুষদের সাথেও দেখা হয়েছে,আবার ফেরার সময় হবে। বাহিরের সেই ছোঁয়া ভেতরেও লেগেছে বলা যায়!  অফিসে এসে চেয়ারে বসা মাত্রই অপজিটের কলিগ রিয়াদ ভাই বলল,
- ম্যাডাম আপনি ছুটি নিয়েছেন?
আমি ব্যাগ রেখে টেবিল সাজাতে সাজাতে মাথা নাড়লাম। আমি মানুষটা সব কিছুতে স্বচ্ছ ভাব পছন্দ করি,রোজ যাওয়ার সময় টেবিল গুছিয়ে যাই,কিন্তু প্রতিদিন এসেও আবার টেবিল টা যত্ন করে গুছিয়ে তারপর কাজ শুরু করি। আবার লাঞ্চ আওয়ারে বের হয়ে যাওয়ার সময়,এবং এসেও একই কাজ করি। মাঝে মাঝে আমার কাজ দেখে কলিগরা মজা করে খুব। ঈদের আর খুব বেশি দেরি নেই,তাই সবাই ছুটি নিয়ে খুব ব্যস্ত। কে আগে নিবে,আর কে পরে নিবে এই সবার মাথায় চিন্তা ঘুরছে! টেলিফোনটা বেজে উঠলো টেবিলে! সালাম দিয়ে বললাম,
- হ্যাঁ লোপা'পু বলো।
-ছুটি নিয়েছিস?
-নাহ,আমার তো ছুটির স্টাইল সেই একই। আগে ১দিন আর পরে ১দিন।
-তুই ই শান্তিতে আছিসরে! গ্রামে যাওয়ার ঝামেলা নেই!
কথা বেশি বাড়াতে পারলাম না,ইনচার্জ স্যার ডেকে পাঠালো তাই! লাঞ্চ আওয়ারে কথা হবে বলে রেখে দিলাম ফোন।
এবারের ঈদের ছুটিটা লোপা'পুর জন্য অনেক স্পেশাল বটে! বিয়ে বলে কথা!

বাসায় ঢুকার সময় মালামাল শিফট করতে দেখলাম,বুকটা ধক করে উঠলো! তাহলে কি সত্যিই চলে যাচ্ছে? এমন সময় মাগরিবের আযান পড়লো,আমি দ্বোতালায় বাসায় ঢুকে সালাম দিয়েই আম্মুকে জিজ্ঞেস করলাম,
-বাইরে মালামাল কাদের শিফট হচ্ছে?
-কাদের আবার?৩ তলার।
বলেই আম্মু শরবতের গ্লাসটা এগিয়ে দিয়ে চলে গেলেন। আমি ধীরে ধীরে নিজের রুমে আসলাম। মনে হচ্ছে স্লো-মোশনের কোন রোবট হয়ে গেছি! মন চলে গেছে অন্য জগতে! খাওয়া-দাওয়া শেষ করে আজকে আর কফি নিয়ে পিসির সামনে বসলাম না। ভালো লাগছে না কোন কিছুই,সব কিছুতেই কেমন যেনো বিরক্তি কাজ করছে!
রুমের লাইট অফ করে ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ালাম,আকাশটা খুব স্বচ্ছ নীলে সেজেছে আজ,তার মাঝে হাসছে নতুন চাঁদ,মোহনীয় একটা পরিবেশ! ছাদে যাওয়া যায়।
৩তলার সিঁড়িতে গাছের টব গুলোর দিকে তাকিয়ে মনে হলো,কাল এগুলোকে ছাদে রেখে আসতে হবে। এখন আর রোজ এখানে কে পানি দিবে! আম্মুকে বলতে হবে,কাল যেনো এগুলো ছাদে পাঠিয়ে দেয়।
সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে চেয়ারে বসে অনেকটাই আনমনা হয়েছিলাম,তাই ভাবি কখন এসেছে ছাদে টের ই পাইনি! আমার চমকে যাওয়া দেখে খানিকটা হাসার চেষ্টা করে বললেন,
-ঘরের মধ্যে বিরক্ত লাগছিলো খুব,তুমি ছাদে এসেছ তাই ভাবলাম আমিও আসি।
-ভালো করেছো এসে! কথা বলা যাবে কিছুক্ষন।
খানিকটা সময় চুপ থেকে আবার বললাম,
- কি ঠিক করলে ভাবি? কি করবে এখন?
ভাবি ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস ফেলে বললেন
-আপাতত তাই করবো যা আর দশজন মেয়ে করে,সোজা বাবার বাড়ি যেয়ে উঠবো!তারপর দেখি চাকরী-বাকরী কিছু জুটাতে পারি কি না।
-চাকরী টা তুমি এখানে থেকেও করতে পারতে,দেখোই না চেষ্টা করে।
-নারে,এখানে থাকলে হৃদি-রায়ানের জন্য কষ্ট হয়ে যাবে। আর আশে-পাশের মানুষের সাথেও ওরা এডজাস্ট করতে পারবে না,বাবার বাসায় গেলে অন্তত ওদের কে রেখে আমি নিশ্চিন্তে কাজে যেতে পারবো।
আমি একটু চুপ থেকে বললাম,
-ভাবি,তোমার কি কোন একশন নেয়া উচিত না?
-কার বিরুদ্ধে? আর একশন নিয়েই বা কি হবে?ফিরে পাবো কিছু? নারে,যা হারিয়েছি তা আর ফিরে পাবো না! হয়তো আমার ই কপাল খারাপ না হলে কেন এমন হবে?জীবনে কোনদিন তো কারো কোন ক্ষতি করিনি,কিন্তু আজ আমার এতো বড় ক্ষতি হয়ে যাবে তা যদি বুঝতাম!' বলতে বলতে ভাবি দীর্ঘশ্বাস ফেলল!
আর আমি আবারো চুপ হয়ে গেলাম। কতো কিছুই তো বলতে ইচ্ছে করে,কিন্তু বলা আর হয় না,বলা যায়ও না।

৮বছর আগে যখন সুমা ভাবিরা আমাদের বাসায় শিফট হয়,তখন হৃদির বয়স ১বছর হবে। ভাবি আর শিমুল ভাইয়া যেদিন প্রথম আম্মুর সাথে কথা বলার জন্য এসেছিলেন,আম্মু ভেতরে এসে আমাকে বলেছিলো,
-মাশাআল্লাহ,চমৎকার জুটি,কি সুন্দর আন্ডার্স্ট্যান্ডিং!দেখলেই মন ভালো হয়ে যায়।
দীর্ঘ আট বছর ধরে দেখছি এদের কে।এদের টুনাটুনির সংসার কে। এর মাঝে রায়ান এলো,ভাবির পড়াশুনা শেষ হলো,হৃদি স্কুলে যাওয়া শুরু করলো। ভাবির সাজানো সংসারটায় প্রাচুর্য্য না থাকলেও সুখের কোন কমতি ছিলো না বলেই জানতাম। শিমুল ভাইয়ার ছোট ব্যবসাটা ধীরে ধীরে বড় হলো,সংসারে সব দিক থেকেই পূর্ণতা আসা শুরু হয়েছিলো ওদের,দেখতে দেখতে সুখে-দুঃখে এতো গুলো বছর একসাথেই কেটেছে আমাদের।  কিন্তু সেই সময় গুলো যে এভাবে কিছু স্মৃতিতেই আটকে যাবে কে জানতও?!
প্রায় ৬মাসের বেশিই হবে শিমুল ভাই বাসায় আসে না,ফোনও করে না। ভাবি প্রথম দিকে খুব অস্থির হয়ে যেতো,বাচ্চারাও বাবাকে দেখার জন্য ছটফট করতো কিন্তু ধীরে ধীরে ওরা এখন অভ্যস্থ হয়ে গেছে। শিমুল ভাইয়ের এভাবে হঠাত বদলে যাওয়াটা সবার জন্য মেনে নেয়া অনেক কষ্টকর ই ছিলো বটে! যে মানুষটার মাঝে কোন দিন কোন অস্বাভাবিকতা দেখা যায়নি,সেই মানুষটা এতো বদলে যাবে কে জানতো?!
নিজের ২য় বিয়ের খবরটা শিমুল ভাই নিজেই ফোন করে জানিয়েছিলেন। এবং খুব স্বাভাবিক ভাবেই বলেছিলেন, সুমা ভাবিকে এখন আর তার সেভাবে ভালো লাগে না,তিনি এতোদিন ধরে ভেতরে ভেতরে প্রচন্ড বিরক্ত এবং হতাশ ছিলেন এর ই মাঝে ঐ মহিলা তার জীবনে আসে এবং তিনি নতুন করে বাঁচতে শুরু করেছেন! বাচ্চাদের জন্য তিনি আগের মতোই খরচ ভাবির একাউন্টে দিয়ে দিবেন,তবে সুমা ভাবি যদি চলে যেতে চায় তাহলে যেনো বাচ্চাদের কে দাদার বাড়ি রেখে যায়।
এক ঝাটকায় একটা টর্নেডো এসে যেনো সব তছনছ করে দিয়ে গেলো! ব্যাস,সেদিন থেকে বদলে গেলো সব কিছু,বদলে গেলো মানুষ গুলো।
খবরটা শুনে আমি যখন সকালে দৌড়ে ভাবির রুমে এসেছিলাম,দেখলাম পারিবারিক এলবামটা সামনে নিয়ে ভাবি ঠায় বসে আছেন। টানা তিন দিন ভাবি কিছু বলতে পারেননি,কেবল ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকতেন। একটা সময় হৃদি-রায়ান কে বুকে নিয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়তেন।
রোজ মানুষ গুলোর মুখ দেখতাম আর ভাবতাম,এতো কষ্ট বুকে নিয়ে মানুষ কেমন করে বাঁচে? যাকে পুরো জীবন সঁপে দেয় আর সে ই যখন ছুঁড়ে ফেলে দেয় তখন কেমন করে বুক ভরে নিঃশ্বাস নেয়া যায়?
যায় সবই যায়,যাবে না কেন?মানুষ ই তো! সব সহ্য করার ক্ষমতা মানুষের অবশ্যই আছে,আর আছে বলেই এমন সীমাহীন কষ্ট আছে। মাঝে মাঝে নিজেকে দেখে অবাক হতাম!আমি এখনো অভ্যস্থ হচ্ছিনা কেন এসব দেখে?! আমার তো এতোদিনে একদমই সয়ে যাওয়ার কথা,এসব কি নতুন কিছু দেখছি?
কিন্তু পারিনি! আমি অভ্যস্থ হতে পারিনি। কতোদিন রাতে ঘুম ভেঙ্গে যায় আমার,মনে হয় কেউ কাঁদছে! হৃদি অথবা রায়ান কে দেখলে বার বার চোখ ভিজে উঠে শুধু! মাঝে মাঝে হৃদির মাথায় হাত রেখে খুব কাঁদতে ইচ্ছে করে! এই ছোট্ট হৃদি যখন আরো বড় হবে,তখন ওর বুকে যে কতো বড় কষ্ট চাপা থাকবে তা কি শিমুল ভাই কখনো বুঝবে?
বাবা যে সন্তানের জন্য কি,তার অভাব টা যে কতোটা প্রকট তা কি কখনো ভাবি পারবে পূরণ করতে?!

ভাবির বাবার বাড়ি চলে যাবার সিদ্ধান্তটা শুনে আমার কেন জানি মনে হচ্ছিলো, সবাই এভাবে হার মেনে নেয় কেন?
আবার মনে হলো,হার না মেনেই বা কি করবে? বেচারী একা একা কতো ফাইট করবে? আঙ্গুল তো বরাবরের মতো ভাবির দিকেই উঠেছে!
'নিশ্চয়ই জামাই কে সময় দিতো না,শ্বশুড় বাড়ির সাথে ভালো সম্পর্ক ছিলো না!আজকাল কার বউদের মতো খালি টিভি দেখতো আর শাড়ি-গয়না চেয়ে চেয়ে জামাইয়ের মাথা খারাপ করে দিতো! 'আরে তালি কি আর এক হাতে বাজে নাকি?এখন তো নিজেকে অনেক ভালো বলে মানুষ কে বলবে,কিন্তু এর জামাই কে জিজ্ঞেস করলে জানা যাবে আসল কাহিনী!' 'শুনেন,মুরুব্বীরা কি সাধে বলছেন,যে পুরুষ মানুষ হইলো,মাথার সিঁদুরের মতো একবার মাটিতে পড়লে আর উঠানো যায় না,সময় থাকতে জামাইয়ের মর্ম বুঝে নাই,এ জন্যই চলে গেছে আরেক জনের কাছে!' 'কি এমন অন্যায় করছে শুনি?বিয়েই তো করছে আরেকটা!আর এমন তো না বাচ্চাদের দায়িত্ব ফেলে দিছে,টাকা তো দিচ্ছেই,এই ই বা আজকাল ক'জন করে!'
চারপাশের এমন হাজারো মন্তব্য শুনে মাঝে মাঝে আমি ভাবিকে বোকার মতো বলে বসতাম,
-ভাবি তুমি কেন তোমার জীবনটা শেষ করবে?তোমার প্রতি ফিলিংস নাই বলে একজন তোমাকে ছেড়ে আরেকজনের কাছে চলে গেছে,তাহলে তুমি কেন একা একা তার বাচ্চাদের কে নিয়ে বাকী জীবন পার করবে?
ভাবি ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলতো,
-আমি যে মা! মা কি পারে কখনো নাড়ি ছেঁড়া ধন ছেড়ে থাকতে? ওদের বাবা আমার সাথে অন্যায় করেছে,তার শাস্তি অবশ্যই সে পাবে,আমি এই জন্য তাকে মাফ করবো না কিন্তু আমি যদি চলে যাই আর আমার বাচ্চা গুলো যখন মন খারাপ করে,হতাশ হয়ে ঘরে আসবে তখন ওদের কে বুকে টেনে কে নিবে বল? আমি ওদের সুখ দিতে না পারলেও ওদের দুঃখ তো ভাগ করে নিতে পারবো!
ভাবির কথা শুনে আমার তখন চোখ ভিজে উঠতো! রাব্বুল আলামীন কতো ভাবেই না মানুষকে বেঁচে থাকার অবলম্বন দিয়েছেন। সব কিছু নিয়েই মানুষ কে বেঁচে থাকতে হয়,সময় গুলো কে সাথে নিয়েই সময় পার করতে হয়। কিন্তু হৃদি-রায়ান কি বড় হয়ে পারবে,ওদের মা ওদের জন্য যা করেছেন তার উপযুক্ত প্রতিদান দিতে? নাকি অন্যদের মতো ওরাও বলবে,
'তোমারো নিশ্চয়ই দোষ ছিলো মা!' কখনো ভুলে যাবে না তো,ওদের মায়ের কথা!! সমরেশ মজুমদারের সেই উক্তিটা খুব মনে পড়ে,
'জীবন বড় মধুময় শুধু এই জন্য যে এই মাধুর্যের অনেকটাই স্বপ্ন আর কল্পনা দিয়ে গড়া।'

৪দিন পর অফিসে এসেই হাঁক ছাড়লাম,'এই হান্নান... জলদি ব্রাশ নিয়ে আসো,আমার টেবিল-চেয়ার ক্লিন করতে হবে!' ওপাশের টেবিলের আনোয়ার ভাই নিজের চেয়ার মুছতে মুছতে বললেন,
- হান্নান মিয়া গোশত খেয়ে ভুলেই গেছে,যে নিতু ম্যাডামের চেয়ার-টেবিল ক্লিন করতে হবে!ওরে এবার ঈদের বকশিশ দেয়া হবে না!ঠিক আছে?
আমি হাসতে হাসতে বললাম,
- বকশিশ আর এখন কি দিবো বলেন?ঈদের আগেই তো দিয়েছি,এবার তা উসূল করবো।
দুপুরের দিকে তেমন কোন কাজ নেই বলে সোশ্যাল সাইট গুলো তে ঢূঁ মারছিলাম,হঠাত জয়নাল ভাই আমার টেবিলের অপজিটে ফটোকপি মেশিনের সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলল,
-নিতু ঘটনা কিছু শুনছো?
আমি সালাম দিয়ে মাথা ডানে-বামে নাড়লাম!
-কি ঘটনা জয়নাল ভাই? নতুন কোন রুলস আসছে নাকি অফিসে?
-আরে না,ঘটনা আমাদের এক সম্মানিতা এমপ্লোয়ির। ঈদের ছুটিতে তার বিয়ের অনুষ্ঠান হইলো শুনলাম,এবং ইন্টারেস্টিং ঘটনা হলো,সে বিয়ে করতে যাকে তার আগে বউ এবং ২বাচ্চাও আছে!
আমি কপাল কুঁচকালাম! আগে বউ-বাচ্চা আছে জেনেও ঐ লোককে বিয়ে করছে এমন ক্রিমিনাল আমাদের অফিসে কে আছে?!!
- কি বলেন?আগে বউ-বাচ্চা আছে এটা কি মহিলা জানতো না?
-জানবে না কেন?অবশ্যই জানে,ঐ ভদ্রলোকের সাথে নাকি বউ এর সেপারেশন চলতেছে,মানে ঐ বউ এরও নাকি এফেয়ার আছে!এখন ঐ ব্যাটা একলা,টাকা-পয়সাওয়ালা,এবং ইমোশনওয়ালাও বটে,ব্যাস মেয়ে হাসতে হাসতে চলে গেলো!
আমার মেজাজটা ই এবার খারাপ হয়ে গেলো! এটা কোন কথা হইলো? দেশে কি আজকাল ছেলের অনেক আকাল পড়ে গেছে যে ঐ মেয়েকে একটা সেকেন্ডহ্যাণ্ড লোকের গলায় মালা পড়াতে হবে!
- জয়নাল ভাই শুনেন,আরেকটা বিয়ে করার জন্য পুরুষরা সব সময়ই এমন কাহিনী ফাঁদে এটা নতুন কিছুই না,দেখেন যে প্রথম বউ এর আসলে কোন সমস্যা ই নাই,ব্যাটার মাথায় শয়তান চাপছে আর ঐ মেয়ে কে সে ইমোশনালী স্টুপিড বানাইছে আর কিচ্ছু না! আজকাল পরকীয়ার কাহিনী গুলো তো এমনই।
-হুম,ইউ আর রাইট! ছেলে বলো মেয়ে বলো,সব গুলো এই সেইম কোন রিজন দেখায়ে আরেকজনের সাথে সম্পর্ক শুরু করে! বাট লোপার জন্য দয়াই হচ্ছে এখন! দেখতে-শুনতে মেয়েটা কোন দিক দিয়ে কম ছিলো বলো?অথচ কি একটা বিয়ে করলো!কি গ্যারান্টি আছে,যে এই লোক ওকে ছেড়ে চলে যাবে না?
আমি অনেকক্ষন হতভম্বের মতো পিসির দিকে তাকিয়ে রইলাম!!! জয়নাল ভাই কার নাম বলল এটা???
লোপা আপু????? এটা কিভাবে সম্ভব! কিছুক্ষন পর আস্তে আস্তে নিজেকে স্বাভাবিক করলাম! যা হওয়ার হয়েছে,এগুলো নিয়ে মাথা ঘামিয়ে নিজের এনার্জি-টাইম নষ্ট করার কোন দরকার নাই! ইয়া আল্লাহ,কি সব মানুষ থাকে আশে-পাশে!বুঝাই যায় না যে এদের ভেতরে এতো কুৎসিত মানুষ থাকতে পারে!

পরের দিন লাঞ্চে যেতে একটু দেরি হয়ে গিয়েছিলো,তাই অন্য ফ্লোরের কলিগদের সাথে বসতে হলো,যাদের মধ্যে লোপা'পুও আছে। আমি ইচ্ছে করে এক পাশে সরে বসলাম কিন্তু আমাকে দেখেই লোপা'পু হাসতে হাসতে দৌড়ে আমার পাশে এসে বসলেন,
-আরে নিতু কেমন আছো?ভালোই হইছে দেখা হলো!দাড়াও আমার বিয়ের অনুষ্ঠানের ছবি দেখাই,ও হ্যাঁ শোন,বিয়ের স্টেজটা তোমার আইডিয়া মতোই সাজাতে বলেছিলাম,কিন্তু লোকগুলো পারেনি!
কিছু না বলে মুখে একটা হাসি ঝুলালাম! আর মনে মনে নিজেকে ঝাড়লাম,
-স্টুপিড দ্যা গ্রেট নিতু! আরেকজনের সংসার ভেঙ্গে নিজের সংসার সাজাচ্ছে আর তুই গেছিলি এই মাইয়া কে স্টেজের আইডিয়া দিতে!
লোপা'পু একটার পর একটা ছবি দেখাতে লাগল,আমিও মুখে হাসি ঝুলিয়ে দেখতে লাগলাম কিন্তু হঠাত ই আমার হাসি বন্ধ হয়ে গেলো!! ৪৮০ ভোল্টেজের শকড খেয়ে আমি লোপা'পু কে জিজ্ঞেস করলাম
- তোমার জামাইয়ের নাম কি?
আপু লাজুক হেসে বলল,
- শিমুল! মেয়েলি টাইপের নাম অনেকটা!তাই না? হিহিহি
লোপা'পুর হিহিহি দেখে মুখে অনেক কষ্টে ক্ষীণ হাসি ফুটিয়ে দ্রুত উঠে দাঁড়ালাম! তা দেখে আপু বলল,
-আরে কই যাও?সময় আছে তো এখনো! শোন,তোমাকে একটা কাজ দেই,প্লিজ করে দাও না! আমার আর তোমার ভাইয়ার কিছু ছবি একটু এডিট করে দিবা?তুমি তো পারো এসব কাজ,একটু দাও না করে!
আমার চোখ ফেটে তখন পানি আসতে চাচ্ছিলো!অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে বললাম,
-আমার পিসিটা এখন নষ্ট,ঠিক হলে আপনাকে বলবো! আমি এখন আসি,আল্লাহ হাফেজ।
ডেস্কে বসে অনেকক্ষন দু'হাতে মাথা ঢেকে রইলাম। দুর্ভাগ্যবশত আমার আশে-পাশে কোন ফিমেল কলিগ নেই যে,কিছুক্ষন তার সাথে কথা বলবো! অসম্ভব ক্লান্ত লাগছিলো,মনে হচ্ছিলো আমি অনন্ত কাল ধরে কাজ করে যাচ্ছি!
অনেক চেষ্টা করেও কাজে মনোযোগ দিতে পারলাম না দেখে দ্রুত ছুটি নিয়ে বের হয়ে আসলাম। কিন্তু রিকশায় বসে আর নিজেকে সামলে রাখতে পারলাম না! ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলাম!খুব অবুঝের মতো মনে হচ্ছে,
আমার জীবন টা এমন কেন?কেন আমাকে এসব এতো এতো দেখতে হয়?? আমার আর ভাল্লাগে না,আর ভাল্লাগে না এইসব মানুষ দেখতে! আমাকে কেন সুমা ভাবির কান্না সহ্য করতে হয় কেনই বা লোপা'পুর খুশী দেখতে হয়? মানুষ গুলো এমন কেন? এতো স্বার্থপর,আর মুখোশধারী হয় কেন?

অফিস পাড়া পার হয়ে রিকশা আবাসিক এরিয়ায় ঢুকতেই অসময়ে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি শুরু হয়,রোদের মাঝে বৃষ্টি হলে আমাদের দেশে বলা হয় 'খেশিয়ালের বিয়ে হচ্ছে'! 'বিয়ে' 'সম্পর্ক' গুলোকে নিয়ে আজকাল আর মাথায় কাব্য-গদ্য খেলে না! আজকাল আর মনে হয় না,'সম্পর্ক হচ্ছে একটা শক্তিশালী চুম্বক বিন্দুর মতো আর ভালোবাসা-মায়া হলো চুম্বকের আকর্ষন শক্তি।' একটা সম্পর্ক কে ঘিরে কতো কিছু গড়ে,আর আবার একটা সম্পর্ক কতো কিছু ভেঙ্গে ফেলে!
মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের অনেক বড় একটা এচহিভমেন্ট বোধহয় এটাই যে,সে সম্পর্ক তৈরী করতে পারে,ভালোবাসা দিয়ে মায়া-মমতা দিয়ে। আর মানুষের অক্ষমতার এচহিভমেন্ট হলো,সে সম্পর্কের ভালোবাসা-মায়াকে ঘৃণায় পরিণত করতে পারে।
মাঝে মাঝে খুব হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করে!অনেক দূরে... আবার মনে পড়ে যায়,হিমুর সেই কথাটা,
"মানব সম্প্রদায়ের সব সদস্যর একটাই আকাঙ্ক্ষা। হারিয়ে যাওয়া। সবাই হারিয়ে যেতে চায়। হারিয়ে যাবার মত জায়গাটা কোথায়!"
জায়গা নেই কোথাও হারিয়ে যাবার। তাই ফিরে আসি রোজ,বারবার। সেই শহরে,যেখানে বৃষ্টির পানির সাথে মিশে একাকার হয়ে যায়,শহরে হাজার মানুষের ভীড়ে থাকা অনেক না জানা নিতুর কান্না,সুমার দুর্ভাগ্যের অশ্রু!