মিতুল প্রাণপণ চেষ্টা করছে পূর্ণ মনোযোগের সাথে পত্রিকা পড়তে,যাবতীয় শব্দ থেকে কান-মগজকে দূরে সরিয়ে রাখতে! কিন্তু বেচারা পারছে না!তার ধারনা,এই মূহুর্তে সে যা যা শুনতে পাচ্ছে তা এক প্রকারের 'কাউ কাউ' ছাড়া আর কিছুই না,কিন্তু সেটা যে তুলি এতো ভালো করতে পারে এটা জানা ছিলো না!! আবারো ঝড়ের বেগে বেড রুমে ঢুকলো তুলি,
-তুমি কি জানো?তুমি কি পরিমাণ অলস একটা লোক!
মিতুল কোন জবাব দিলো না,তার দৃষ্টি পত্রিকার দিকে। তুলি আবারো চেঁচিয়ে বলল,
-তোমার মতো অলস,অতি মাত্রায় অপরিচ্ছন্ন পাবলিকের সাথে আমার পক্ষে থাকা অসম্ভব!বুঝতে পারছো?
মিতুল মুখ তুলে একবার তাকালো তুলির দিকে,রাগে মুখ লাল হয়ে আছে! এক হাত কোমড়ে রেখে আরেক হাতে মিতুলের শার্ট নিয়ে যেটা সে গত তিনদিন যাবত একাধারে পড়েছে সেটা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে!
-কোকিল আর কাকের মধ্যে খুব একটা পার্থক্য নেই!এটা তোমাকে দেখলে বুঝা যায়!
-তাই না?তুমি কি বলতে চাচ্ছো?আমার কন্ঠ আগে কোকিলের মতো ছিলো এখন কাকের মতো শোনাচ্ছে?!
মিতুল আবারো পত্রিকার দিকে তাকাতে তাকাতে বলল,
-অনেক টা তাই!ছুটির দিন মানেই তোমার চেঁচামেচি শুনতে হবে!
তুলি আরেকটু এগিয়ে এসে বিছানায় বসল,মিতুলের হাত থেকে পত্রিকা একটানে নিয়ে ওর দিকে সরু দৃষ্টিতে তাকালো,
-ছুটির দিন মানে বুঝ তুমি?তোমার কাছে ছুটির দিন মানে কি?দেরি করে ঘুম থেকে উঠা,নাস্তা শেষ করে এক গাদা পেপার-বই নিয়ে বসে থাকা,তারপর আযান দিলে নামায পড়তে যাওয়া,বাসায় এসে খেয়ে আবারো বিদ্যাসাগরের পানিতে ডুব দেয়া,এভাবে করে সন্ধ্যা,তারপর কি?তারপর কিছুক্ষন ল্যাপটপে বসে টিপাটেপি করা,এবং নামাজ পড়ে খেয়ে-দেয়ে আবারো ঘুমিয়ে যাওয়া!তাই না? সারাটা সপ্তাহ তো জ্বালাও আমাকে তারপর এই ছুটির দিনে এসেও এক গাদা বই-পেপার দিয়ে বাড়িটা জঙ্গল বানিয়ে ছাড়ো!
মিতুল একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
-তো কি আর করবো আমি?তোমার মতো সকাল থেকে নিয়ে 'কাউ কাউ' করবো?
-কি বললে?আমি কাউ কাউ করি?
-আহ!এখন তো সামনেই আছো,এখন আস্তেই বলো,এতো জোরে বলার কি আছে?!
-শোন,তোমার কান নষ্ট হয়ে গেছে,সে জন্য আমি কথা বললেই 'কাউ কাউ' মনে হয় তোমার কাছে!তুমি একটা কি বলতো?কোন ধরনের মানুষ তুমি?২টা শার্ট দিয়ে সপ্তাহ চালাও ছিঃ! তোমার কাপড় ধুতে গেলে আমার হাত ব্যাথা হয়ে যায়,এতো ময়লা কাপড় মানুষ কিভাবে পড়ে?!
মিতুল অসহায় ভঙ্গিতে বলল,
-আমার মতো মানুষ আরো আছে দুনিয়াতে,কিন্তু তোমার মতো বউ মনে হয় না তাদের আছে!! গত একটা বছর ধরে প্রতি শুক্রবার তোমার এই ভাষন শুনতে শুনতে আমি ত্যাক্ত!
তুলি এক দৃষ্টিতে কিছুক্ষন মিতুলের দিকে তাকিয়ে রইল,তারপর পেপারটা ওর দিকে ছুঁড়ে দিয়ে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো,
-ঠিক আছে,তুমি অনেক ত্যাক্ত তাই না?আমি শুধু কাউ কাউ করি না?ওকে,দেখবো এবার কত শান্তিতে থাকতে পারো তুমি!
মিতুল একটা হাই তুলে পেপার পড়ায় মনোযোগ দিলো। কিন্তু প্রচন্ড ঘুম পাচ্ছে তার,বেলা বাজে ১১টা,এখন ঘুমাবে?নাকি এক কাপ চা খাবে? চিন্তা করে দেখল,চা চাইতে গেলে যদি আবারো তুলির ঝাড়ি শুনতে হয়!বলা তো যায় না,বলবে, 'এই মগটা না ধুয়ে চা নিলে কেন?এতো বেশি চিনি খাও কেন? চিনি নেয়ার সময় আশে-পাশে ছড়ালো কেন?' ইত্যাদি ইত্যাদি!
তারচেয়ে ঘুমানো ভালো!
পেপারটা একপাশে রেখে বালিশটা টেনে নিলো,চোখ বন্ধ করতেই মনে হলো একটু পরেই তো তুলি আসবে রুমে,এসেই ফ্যান টা অফ করে দিয়ে বলবে, 'অন্য রুমে যাও,রুম ঝাড়ু দিবো,ঘর মুছবো!' ভাবতে ভাবতেই তুলির গলার আওয়াজ পেয়ে চোখ খুলল,
-সকাল ৯টা পর্যন্ত ঘুমানোর পরেও আবার ঘুম পাচ্ছে?বাহ...! উঠার আর কি দরকার ছিলো তাহলে?এই নাও,ধর,চা নাও!
মিতুল শোয়া অবস্থাতেই ঘাড় ঘুরিয়ে দেখতে পেলো,তুলি বিছানার পাশে চেয়ার টেনে চা এর মগটা রেখে গেলো। মিতুল মুচকি হেসে উঠে বসল!
এমন সময় মোবাইলটা বেজে উঠলো,হাতে নিয়ে দেখলো বড় বোনের ফোন। রিসিভ করে সালাম বিনিময়ের পর আপু বলল,
-কি খবর?ছুটির দিনে বাসায় কি করিস?
-কিছু না রেস্ট নিচ্ছি,আর এখন চা খাচ্ছি। তোমাদের কি খবর?
-আমাদের খবর তো তোকে আমার ফোন করে জানাতে হবে তাই না?একই এলাকায় থাকিস,ছুটির দিন একটু বোনের বাসায় আসবি তাও পারিস না,তাই না?
মিতুল হেসে বলল,
-তোমরাও তো আসো না।
-হইছে,আমার সাথে তুলনা করতে হবে না,বউ নিয়ে দুপুরে আমার এখানে খাবি,তুলি কে বল,কিছু রান্না করতে না,তোর প্রিয় তেহারী রান্না করছি আজকে,সোজা নামাজ শেষে চলে আসবি।
মিতুলের আবারো হাই আসল! আপুর বাসায় গেলে আজকে দুপুরের ঘুম মাটি!
-ইয়ে আপু,এক কাজ করো তুমি বরং আমার জন্য বক্সে করে পাঠিয়ে দাও!আমার আসলে কোথাও বের হতে ইচ্ছে করছে না!
-কি বললি?তুই এভাবে আমার দাওয়াত রিফিউজ করতে পারলি?তুই আগেও ছিলি একটা ঘরকুনো,অলস বিয়ের পর তো দেখি আরো খারাপ অবস্থা হয়েছে তোর?!! দাড়া,তোর আসার ব্যাবস্থা করছি,রাখ তুই ফোন!
বলে আপু খট করে লাইন কেটে দিলো। মিতুল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চা খাওয়ায় মনোযোগ দিলো। তুলির মোবাইল বাজার আওয়াজ পেলো! খানিক সময় পরেই তুলি আসল,
-শোন,বাজারে যাও,একটু পর সব নামাজে চলে যাবে,কিছু পাওয়া যাবে না,বাজার থেকে কিছু ফল কিনে নিয়ে আসো।
-তুমি কি অসুস্থ?ফল খেতে হবে?
-নাহ,দাওয়াতে যাবো বোনের বাসায়,তাই!খালি হাতে কারো বাসায় দাওয়াতে যেতে হয় না,জানেন না আপনি?
মিতুল বালিশে হেলান দিয়ে বলল,
-আপুর বাসা পুরানো হয়ে গেছে যেতে যেতে,এখন খালি হাতে গেলে সমস্যা নাই!
-তোমার কি কোমড়ের হাড় ভেঙ্গে গেছে?হাঁটা-চলা করতে কষ্ট হয়?একটা কাজ যদি তোমাকে দিয়ে করাতে পারি? তোমার বোনকে যেয়ে দেখো,একাই ঘর-বাহির কিভাবে সামলায়,আর ভাই হইছে একটা!
-এই জন্যই তো দুলাভাই বাসায় অবসর সময়ে শান্তিতে ঘুমাতে পারেন!তোমার মতো আপু দুলাভাই কে ঘুমাতে দেখলে বাসা মাথায় তুলে রাখে না!
-তুমি কথায় কথায় আমাকে টেনে কি বুঝাতে চাও বলোতো?আমাকে কি মনে হয় তোমার?চল আজকে আপুর বাসায়,তোমার ক্লাস নেয়া হবে আজকে!
মিতুল আবারো হাই তুলতে তুলতে বলল,
-এই জন্যই তো তোমাকে নিয়ে কোথাও যেতে চাই না! আমার বাড়ির লোকজন,বন্ধু-আত্নীয় সবাই তো খালি তোমার সাপোর্টেই কথা বলে!আমাকে যে তুমি কি শান্তিতে রাখছো সেটা তো আর কেউ বুঝে না!!
মিতুল কথাটা শেষ করতে না করতেই তুলি চোখ-মুখ কুঁচকে মিতুলের মাথার নিচ থেকে বালিশ টান দিলো,তারপর সেই বালিশ দিয়ে ওর মাথায় ধাম-ধাম করে কতোক্ষন মেরে রুম থেকে হন হন করে বেরিয়ে গেলো!
মিতুল কিছুক্ষন 'অ্যা উ' করতে করতে তুলির চলে যাওয়া দেখল!মনে মনে বলল, কি দজ্জাল টাইপের মেয়েরে আল্লাহ!
নামাজ পড়ে এসে বাসায় ঢুকে দেখলো তুলির নামাজ এখনো শেষ হয়নি! ড্রয়িং রুমে এসে সোফায় পা তুলে বসল মিতুল। পুরো বাসাটা কি সুন্দর করে ঘুছিয়ে রেখেছে তুলি! কিন্তু মিতুলের এতো ঘুছানো দেখলেই হাত নিশপিশ করে সব কিছু এলোমেলো করে দিতে!! মিতুল সব সময়ই এরকম অগোছালো টাইপের,কখনো কোন কিছু এক জায়গা থেকে নিয়ে তা আবার সেখানে রাখার অভ্যাস ওর নেই,বিছানা-টেবিল সব জায়গায় সব কিছু ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রাখতেই অভ্যস্থ! এ নিয়ে মা-বোনদের কম বকা শুনতে হয়নি,কিন্তু মিতুলের মাঝে কোন পরিবর্তন নেই। সে অনেকটা 'কোন রকম চলে,একটা হইলেই হলো'টাইপ চিন্তার মানুষ। সে জন্য পর পর তিন দিন গরমে ঘেমে একাকার হওয়া স্বত্তেও একই শার্ট পড়তে তার কোন অস্বস্তি নেই! একাধারে চারদিন গোসল না করলেও তার কোন সমস্যা হয় না! ধুলোবালি যুক্ত জায়গায় থাকতে বা সেরকম গ্লাস-প্লেটে কিছু খেতেও তার কোন অস্বস্তি লাগে না!
সেদিক থেকে তুলি খুবই গোছানো,মিশুক একটা মানুষ। বিলাসিতা নয়,পরিপাটি জীবন পছন্দ তুলির। সব কিছু সাজিয়ে গুছিয়ে,পরিচ্ছন্ন করে রাখতে ওর কোন ক্লান্তি নেই। সেদিক থেকে বলায় দু'জন দু'জনের একদমই বিপরীত। বিয়ের পর থেকে তুলি মিতুলের এই ব্যাপার গুলো বদলানোর জন্য পেছনে লেগেই আছে,চেষ্টা করতে করতে বেচারী ক্লান্ত বলা যায়! কিন্তু মিতুলের মাঝে তেমন কোন পরিবর্তন নেই!

