জনপ্রিয় পোস্টসমূহ

সোমবার, ২ সেপ্টেম্বর, ২০১৩

বিরক্তি যোগ প্রাপ্তি!অতঃপর...-১


মিতুল প্রাণপণ চেষ্টা করছে পূর্ণ মনোযোগের সাথে পত্রিকা পড়তে,যাবতীয় শব্দ থেকে কান-মগজকে দূরে সরিয়ে রাখতে! কিন্তু বেচারা পারছে না!তার ধারনা,এই মূহুর্তে সে যা যা শুনতে পাচ্ছে তা এক প্রকারের 'কাউ কাউ' ছাড়া আর কিছুই না,কিন্তু সেটা যে তুলি এতো ভালো করতে পারে এটা জানা ছিলো না!! আবারো ঝড়ের বেগে বেড রুমে ঢুকলো তুলি,
-তুমি কি জানো?তুমি কি পরিমাণ অলস একটা লোক!
মিতুল কোন জবাব দিলো না,তার দৃষ্টি পত্রিকার দিকে। তুলি আবারো চেঁচিয়ে বলল,
-তোমার মতো অলস,অতি মাত্রায় অপরিচ্ছন্ন পাবলিকের সাথে আমার পক্ষে থাকা অসম্ভব!বুঝতে পারছো?
মিতুল মুখ তুলে একবার তাকালো তুলির দিকে,রাগে মুখ লাল হয়ে আছে! এক হাত কোমড়ে রেখে আরেক হাতে মিতুলের শার্ট নিয়ে যেটা সে গত তিনদিন যাবত একাধারে পড়েছে সেটা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে!
-কোকিল আর কাকের মধ্যে খুব একটা পার্থক্য নেই!এটা তোমাকে দেখলে বুঝা যায়!
-তাই না?তুমি কি বলতে চাচ্ছো?আমার কন্ঠ আগে কোকিলের মতো ছিলো এখন কাকের মতো শোনাচ্ছে?!
মিতুল আবারো পত্রিকার দিকে তাকাতে তাকাতে বলল,
-অনেক টা তাই!ছুটির দিন মানেই তোমার চেঁচামেচি শুনতে হবে!
তুলি আরেকটু এগিয়ে এসে বিছানায় বসল,মিতুলের হাত থেকে পত্রিকা একটানে নিয়ে ওর দিকে সরু দৃষ্টিতে তাকালো,
-ছুটির দিন মানে বুঝ তুমি?তোমার কাছে ছুটির দিন মানে কি?দেরি করে ঘুম থেকে উঠা,নাস্তা শেষ করে এক গাদা পেপার-বই নিয়ে বসে থাকা,তারপর আযান দিলে নামায পড়তে যাওয়া,বাসায় এসে খেয়ে আবারো বিদ্যাসাগরের পানিতে ডুব দেয়া,এভাবে করে সন্ধ্যা,তারপর কি?তারপর কিছুক্ষন ল্যাপটপে বসে টিপাটেপি করা,এবং নামাজ পড়ে খেয়ে-দেয়ে আবারো ঘুমিয়ে যাওয়া!তাই না? সারাটা সপ্তাহ তো জ্বালাও আমাকে তারপর এই ছুটির দিনে এসেও এক গাদা বই-পেপার দিয়ে বাড়িটা জঙ্গল বানিয়ে ছাড়ো!
মিতুল একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
-তো কি আর করবো আমি?তোমার মতো সকাল থেকে নিয়ে 'কাউ কাউ' করবো?
-কি বললে?আমি কাউ কাউ করি?
-আহ!এখন তো সামনেই আছো,এখন আস্তেই বলো,এতো জোরে বলার কি আছে?!
-শোন,তোমার কান নষ্ট হয়ে গেছে,সে জন্য আমি কথা বললেই 'কাউ কাউ' মনে হয় তোমার কাছে!তুমি একটা কি বলতো?কোন ধরনের মানুষ তুমি?২টা শার্ট দিয়ে সপ্তাহ চালাও ছিঃ! তোমার কাপড় ধুতে গেলে আমার হাত ব্যাথা হয়ে যায়,এতো ময়লা কাপড় মানুষ কিভাবে পড়ে?!
মিতুল অসহায় ভঙ্গিতে বলল,
-আমার মতো মানুষ আরো আছে দুনিয়াতে,কিন্তু তোমার মতো বউ মনে হয় না তাদের আছে!! গত একটা বছর ধরে প্রতি শুক্রবার তোমার এই ভাষন শুনতে শুনতে আমি ত্যাক্ত!
তুলি এক দৃষ্টিতে কিছুক্ষন মিতুলের দিকে তাকিয়ে রইল,তারপর পেপারটা ওর দিকে ছুঁড়ে দিয়ে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো,
-ঠিক আছে,তুমি অনেক ত্যাক্ত তাই না?আমি শুধু কাউ কাউ করি না?ওকে,দেখবো এবার কত শান্তিতে থাকতে পারো তুমি!
মিতুল একটা হাই তুলে পেপার পড়ায় মনোযোগ দিলো। কিন্তু প্রচন্ড ঘুম পাচ্ছে তার,বেলা বাজে ১১টা,এখন ঘুমাবে?নাকি এক কাপ চা খাবে? চিন্তা করে দেখল,চা চাইতে গেলে যদি আবারো তুলির ঝাড়ি শুনতে হয়!বলা তো যায় না,বলবে, 'এই মগটা না ধুয়ে চা নিলে কেন?এতো বেশি চিনি খাও কেন? চিনি নেয়ার সময় আশে-পাশে ছড়ালো কেন?' ইত্যাদি ইত্যাদি!
তারচেয়ে ঘুমানো ভালো!
পেপারটা একপাশে রেখে বালিশটা টেনে নিলো,চোখ বন্ধ করতেই মনে হলো একটু পরেই তো তুলি আসবে রুমে,এসেই ফ্যান টা অফ করে দিয়ে বলবে, 'অন্য রুমে যাও,রুম ঝাড়ু দিবো,ঘর মুছবো!' ভাবতে ভাবতেই তুলির গলার আওয়াজ পেয়ে চোখ খুলল,
-সকাল ৯টা পর্যন্ত ঘুমানোর পরেও আবার ঘুম পাচ্ছে?বাহ...! উঠার আর কি দরকার ছিলো তাহলে?এই নাও,ধর,চা নাও!
মিতুল শোয়া অবস্থাতেই ঘাড় ঘুরিয়ে দেখতে পেলো,তুলি বিছানার পাশে চেয়ার টেনে চা এর মগটা রেখে গেলো। মিতুল মুচকি হেসে উঠে বসল!

এমন সময় মোবাইলটা বেজে উঠলো,হাতে নিয়ে দেখলো বড় বোনের ফোন। রিসিভ করে সালাম বিনিময়ের পর আপু বলল,
-কি খবর?ছুটির দিনে বাসায় কি করিস?
-কিছু না রেস্ট নিচ্ছি,আর এখন চা খাচ্ছি। তোমাদের কি খবর?
-আমাদের খবর তো তোকে আমার ফোন করে জানাতে হবে তাই না?একই এলাকায় থাকিস,ছুটির দিন একটু বোনের বাসায় আসবি তাও পারিস না,তাই না?
মিতুল হেসে বলল,
-তোমরাও তো আসো না।
-হইছে,আমার সাথে তুলনা করতে হবে না,বউ নিয়ে দুপুরে আমার এখানে খাবি,তুলি কে বল,কিছু রান্না করতে না,তোর প্রিয় তেহারী রান্না করছি আজকে,সোজা নামাজ শেষে চলে আসবি।
মিতুলের আবারো হাই আসল! আপুর বাসায় গেলে আজকে দুপুরের ঘুম মাটি!
-ইয়ে আপু,এক কাজ করো তুমি বরং আমার জন্য বক্সে করে পাঠিয়ে দাও!আমার আসলে কোথাও বের হতে ইচ্ছে করছে না!
-কি বললি?তুই এভাবে আমার দাওয়াত রিফিউজ করতে পারলি?তুই আগেও ছিলি একটা ঘরকুনো,অলস বিয়ের পর তো দেখি আরো খারাপ অবস্থা হয়েছে তোর?!! দাড়া,তোর আসার ব্যাবস্থা করছি,রাখ তুই ফোন!
বলে আপু খট করে লাইন কেটে দিলো। মিতুল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চা খাওয়ায় মনোযোগ দিলো। তুলির মোবাইল বাজার আওয়াজ পেলো! খানিক সময় পরেই তুলি আসল,
-শোন,বাজারে যাও,একটু পর সব নামাজে চলে যাবে,কিছু পাওয়া যাবে না,বাজার থেকে কিছু ফল কিনে নিয়ে আসো।
-তুমি কি অসুস্থ?ফল খেতে হবে?
-নাহ,দাওয়াতে যাবো বোনের বাসায়,তাই!খালি হাতে কারো বাসায় দাওয়াতে যেতে হয় না,জানেন না আপনি?
মিতুল বালিশে হেলান দিয়ে বলল,
-আপুর বাসা পুরানো হয়ে গেছে যেতে যেতে,এখন খালি হাতে গেলে সমস্যা নাই!
-তোমার কি কোমড়ের হাড় ভেঙ্গে গেছে?হাঁটা-চলা করতে কষ্ট হয়?একটা কাজ যদি তোমাকে দিয়ে করাতে পারি? তোমার বোনকে যেয়ে দেখো,একাই ঘর-বাহির কিভাবে সামলায়,আর ভাই হইছে একটা!
-এই জন্যই তো দুলাভাই বাসায় অবসর সময়ে শান্তিতে ঘুমাতে পারেন!তোমার মতো আপু দুলাভাই কে ঘুমাতে দেখলে বাসা মাথায় তুলে রাখে না!
-তুমি কথায় কথায় আমাকে টেনে কি বুঝাতে চাও বলোতো?আমাকে কি মনে হয় তোমার?চল আজকে আপুর বাসায়,তোমার ক্লাস নেয়া হবে আজকে!
মিতুল আবারো হাই তুলতে তুলতে বলল,
-এই জন্যই তো তোমাকে নিয়ে কোথাও যেতে চাই না! আমার বাড়ির লোকজন,বন্ধু-আত্নীয় সবাই তো খালি তোমার সাপোর্টেই কথা বলে!আমাকে যে তুমি কি শান্তিতে রাখছো সেটা তো আর কেউ বুঝে না!!
মিতুল কথাটা শেষ করতে না করতেই তুলি চোখ-মুখ কুঁচকে মিতুলের মাথার নিচ থেকে বালিশ টান দিলো,তারপর সেই বালিশ দিয়ে ওর মাথায় ধাম-ধাম করে কতোক্ষন মেরে রুম থেকে হন হন করে বেরিয়ে গেলো!
মিতুল কিছুক্ষন 'অ্যা উ' করতে করতে তুলির চলে যাওয়া দেখল!মনে মনে বলল, কি দজ্জাল টাইপের মেয়েরে আল্লাহ!

নামাজ পড়ে এসে বাসায় ঢুকে দেখলো তুলির নামাজ এখনো শেষ হয়নি! ড্রয়িং রুমে এসে সোফায় পা তুলে বসল মিতুল। পুরো বাসাটা কি সুন্দর করে ঘুছিয়ে রেখেছে তুলি! কিন্তু মিতুলের এতো ঘুছানো দেখলেই হাত নিশপিশ করে সব কিছু এলোমেলো করে দিতে!! মিতুল সব সময়ই এরকম অগোছালো টাইপের,কখনো কোন কিছু এক জায়গা থেকে নিয়ে তা আবার সেখানে রাখার অভ্যাস ওর নেই,বিছানা-টেবিল সব জায়গায় সব কিছু ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রাখতেই অভ্যস্থ! এ নিয়ে মা-বোনদের কম বকা শুনতে হয়নি,কিন্তু মিতুলের মাঝে কোন পরিবর্তন নেই। সে অনেকটা 'কোন রকম চলে,একটা হইলেই হলো'টাইপ চিন্তার মানুষ। সে জন্য পর পর তিন দিন গরমে ঘেমে একাকার হওয়া স্বত্তেও একই শার্ট পড়তে তার কোন অস্বস্তি নেই! একাধারে চারদিন গোসল না করলেও তার কোন সমস্যা হয় না! ধুলোবালি যুক্ত জায়গায় থাকতে বা সেরকম গ্লাস-প্লেটে কিছু খেতেও তার কোন অস্বস্তি লাগে না!
সেদিক থেকে তুলি খুবই গোছানো,মিশুক একটা মানুষ। বিলাসিতা নয়,পরিপাটি জীবন পছন্দ তুলির। সব কিছু সাজিয়ে গুছিয়ে,পরিচ্ছন্ন করে রাখতে ওর কোন ক্লান্তি নেই। সেদিক থেকে বলায় দু'জন দু'জনের একদমই বিপরীত। বিয়ের পর থেকে তুলি মিতুলের এই ব্যাপার গুলো বদলানোর জন্য পেছনে লেগেই আছে,চেষ্টা করতে করতে বেচারী ক্লান্ত বলা যায়! কিন্তু মিতুলের মাঝে তেমন কোন পরিবর্তন নেই!




রবিবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০১৩

ভিন্ন ভাষা্র অশ্রু


-কি করছো তুমি?'
-দেখতেই তো পাচ্ছো?জিজ্ঞেস কেন করছো আবার?
-মিলা এগুলো তোমার শখের চূড়ি,কেন ফেলে দিচ্ছো?!
-আমার ইচ্ছে! আর এগুলো আমার শখের চূড়ি ছিলো,এখন নেই! কেন নেই তা তুমি ভালো করেই জানো।
-কেন নেই?আমি কিনে দিয়েছিলাম তাই?
-রায়হান,তুমি এই মূহুর্তে আমার সামনে থেকে যাও!না হলে এই চূড়ি গুলো আমি তোমার সামনে ভেঙ্গে গুঁড়ো করবো!
-তুমি এগুলো কিছুই করবে না!আমি বলছি,করবে না...
-তুমি যাবে?!!
প্রচন্ড আক্রোশ আর রাগ নিয়ে কথাটা বলেই পেছন ফিরলো মিলা!নাহ,রায়হান কে দেখতে পেলো না। চলে গেছে? মিলা চোখ দু'টো বন্ধ করলো। খানিকবাদে চোখ মেলে ড্রেসিং টেবিলের আয়নাটার দিকে মুখোমুখি হলো। নিজের প্রতিবিম্বটার দিকে তাকিয়ে নিজেকে খুব ক্লান্ত মনে হলো যেনো! হাতের চূড়ি গুলো রেখে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালো।
বারান্দায় এসে মনটা খুব হালকা হয়ে আসল,শরতের শেষ বিকেলের হিম হিম বাতাস যেনো ছুঁইয়ে গেলো খুব! নীচে রাস্তার দিকে তাকালো মিলা,কিছু ছেলেরা একপাশে খেলছে,একটা কাপলকে হেঁটে যেতে দেখল,কিছুটা খেয়াল করে দেখে চিনতে পারল,৪নং রোডের নিশাত আর ওর বর। বেশিদিন হয়নি বিয়ের,খুব হাসি-খুশী মনে হচ্ছে দেখে! অজান্তেই ঠোঁটের কোণে হাসি ফুঁটে উঠলো মিলার! খানিক সময় পর ধীরে ধীরে হাসিটা মিলিয়ে গেলো,কেমন একটা বিষাদ এসে দখল করে নিলো হাসিমাথা মুখটা!
মিলার খুব কাঁদতে ইচ্ছে করছে,কিন্তু আশ্চর্য হলো কেন জানি একটুও কান্না পাচ্ছে না!অথচ সারাটা জীবন সে 'ছিঁচ কাঁদুনে মেয়ে' কথাটা শুনে এসেছে,অথচ আজ যখন একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস নেবার জন্য হলেও কান্না করার প্রয়োজন তখন কি না চোখে এক ফোঁটা পানিও আসছে না!
-'মিলা,চা করেছি,খাবি?'
মায়ের ডাক শুনে রুমে আসল। দেখলো মা দু'কাপ চা নিয়ে ওর রুমে এসেছেন। চুপ চাপ বসে চা এ চুমুক দিয়ে মিলা বলল,
-তুমি কষ্ট করে বানাতে গেলে কেন?আমাকে বললেই পারতে!
-নাহ,এমনি কিছু করতে ইচ্ছে করল,তাই বানালাম। যদিও অনেক গুলো খাতা দেখা এখনো বাকী আছে,তবুও ভাবলাম,তোর সাথে কিছুক্ষন কথা বলি।
মিলা কিছু না বলে চুপচাপ চা খেতে লাগল। খানিক সময় পর বলল,
-আম্মু,আমি এখনো কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারছি না!
মা কিছুক্ষন চুপ থেকে বললেন,
-এখনো সময় আছে,ভাবতে থাক,তবে যাই করিস,ভেবে চিন্তে কর। আমি চাই না,তুই বাকী জীবন একা একা পার কর,কিন্তু আমি এটাও চাই না,তুই ভেতরে ভেতরে কষ্ট নিয়ে অভিনয় করে যা।
-আম্মু তোমার কি মনে হয় না?রায়হানের উচিত,কিছুটা স্যাক্রিফাইস করা? একটু হলেও অনুতপ্ত হওয়া?
আমিনা আহমেদ খানিকটা হাসলেন মেয়ের কথা শুনে!
-তোমার আব্বু যখন তার সাথে আমার ২২বছরের সংসার ভেঙ্গে দিয়ে অফিস কলিগের বিধবা স্ত্রী কে বিয়ে করে চলে গিয়েছিলেন,তখনো তোমার মতোই আমার মনে হয়েছিলো,তোমার আব্বুর উচিত অনুতপ্ত হওয়া! কিন্তু আজ দেখো,গত সাত বছরেও তোমার আব্বু কোন ভাবেই স্বীকার করেননি যে সে কোন অন্যায় করেছে!কিংবা আমার প্রতি,তোমাদের প্রতি কোন অবিচার করেছ!তার ধারনা,সে তার দুই সংসারের মাঝে ইনসাফ করছে,ভালো ভাবে তা মেইন্টেন করছে!! মাসে মাসে একটা নির্দিষ্ট এমাউন্টের টাকা দিচ্ছে,ফোন করে খোঁজ নিচ্ছে! কি হাস্যকর তাই না?
বলতে বলতে আমিনা আহমেদের গলা ভারী হয়ে আসল। একটা নিঃশ্বাস ফেলে আবারো বলতে লাগলেন,
-যেদিন আমি শুনলাম,রায়হান বিবাহিত হওয়া সত্ত্বেও,বিয়ের দেড় বছর পর নিজের ফুপাতো বোনের সাথে সম্পর্ক তৈরী করেছে আমার কেন জানি সেদিন চোখে ঐদিনটার ছবি ভেসে উঠেছিলো,যেদিন আমি জেনেছিলাম তোমার আব্বুর অন্য কারো সাথে সম্পর্ক আছে!আমি হতভম্বের মতো তাকিয়ে ছিলাম,আমার দীর্ঘ ২২বছরের ভালোবাসা আর বিশ্বাসেপূর্ণ মানুষটির দিকে!আর যেদিন জানলাম,রায়হান তোমার কাছে আরেকটা বিয়ে করার অনুমতি চাইছে সেদিন অনেক বছর পর আরেকবার আমি জায়নামাজে বসে সারা রাত কেঁদেছিলাম!
মিলার চোখ দুটো ভিজে উঠলো,কিছু বলতে পারলো না,শুধু টপটপ করে জল গড়িয়ে পড়তে লাগল চায়ের কাপে!

রায়হানের সাথে মিলার বিয়ে পারিবারিক ভাবেই হয়েছিলো। বিয়ের আগে রায়হানদের অফিসে মিলা ইন্টার্নী করেছিলো,সেখান থেকেই পরিচয়। ইন্টার্ণী শেষ করে মিলা ওর মামার অফিসে জয়েন করে,তার কিছুদিন পরেই রায়হানদের পরিবার থেকে প্রস্তাব আসে। অনেকটা অল্প সময়ের মধ্যেই বিয়ে হয়ে যায়।
মিলার আজো চোখে ভাসে,কি স্বপ্নের মতোই না কাটছিলো দিন গুলো...! রায়হান কে মিলার মনে হতো ঠিক রাজপুত্র যেনো! ঠিক তেমন কেউ,যেমন কাউকে সে আশা করেছিলো। আত্নীয়-স্বজন,প্রতিবেশি সবাই ওদের খুব প্রশংসা করতো,দোয়া করতো। কি ভালোবাসা আর আনন্দ নিয়ে না কাটছিলো দিন গুলো!
কিন্তু ছন্দপতনটা শুরু হয়েছিলো সেইদিন থেকে,যেদিন রায়হানের বদলী হলো মতিঝিল থেকে উত্তরা ব্রাঞ্চে! ওর অফিস বিল্ডিং এরই চারতলায় অফিস ছিলো,রিমুর। রিমু ছিলো রায়হানের বছর তিনেকের ছোট ফুপাতো বোন,দু'জনেই দু'জনকে পছন্দ করতো কলেজ জীবনে! কিন্তু বাবা-ফুপার সম্পর্কটা দা'কুমড়ো ছিলো বলেই চিন্তাটা বেশি দূর আগায়নি। একই বিল্ডিং এ অফিস হওয়ায় আসতে-যেতে দেখা হতো রোজ। প্রায় দিনই দেরি করে,থমথমে একটা মুখ নিয়ে বাসায় ফিরতো রায়হান। আস্তে আস্তে রিমুর সাথে ঘনিষ্টতা বাড়তে লাগল তবে সুপ্ত আবেগ যে কখনো এভাবে প্রকাশ্য রুপ নিবে তা ভাবেনি কেউই!
মিলা চাকরী ছেড়েছিলো বিয়ের দু'মাসের মাথায়,শুধু দুপুরে একটা টিউশনী করাতো। একদিন,ওর ছাত্রীর মা নিজের রুমে ডেকে নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
-রায়হান কে তুমি কি বিয়ের আগে থেকে চিনতে?
-উম,ঠিক অনেকদিন চিনিতাম তা না,তবে চিনতাম।
-তোমরা কি একই সাথে পড়তে?
-না তো!কেন আন্টি?এই কথা কেন জিজ্ঞেস করছেন?
-নাহ,তোমরা তো আজকালকার ছেলে-মেয়ে,ভাবলাম একসাথে পড়তে কি না!তুমি ছাড়াও রায়হানের তেমন কোন মেয়ে বন্ধু আছে কি না!
মিলা কপাল কুঁচকালো!
-আন্টি ঠিক বুঝতে পারছি না,কি বলছেন?!
-দেখ,সরাসরিই বলি,আমার বোনের বাসা উত্তরাতে আমি দু'দিন পর পরই যাই,আমি গত দুই মাসে কয়েকবার রায়হানকে দেখেছি একটা মেয়ের সাথে রিকশায়। আমি ভাবলাম কলিগ বা ক্লাসমেট কেউ হবে!কিন্তু তোমাকে তো চিনি,ওরকম মেয়ে তো তুমি না,সুতরাং রায়হানও নিশ্চয়ই তোমার মতোই হবে। সে জন্যই জিজ্ঞেস করলাম।''
মিলা খুব শকড হলো!তাৎক্ষনিক কিছু বলতে পারল না!কোন মতে চলে আসল।
সন্দেহ ব্যাপারটা মিলা খুব অপছন্দ করে,সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিশ্বাস আর শ্রদ্ধাবোধ এই দুটো জিনিসকেই সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দেয় সে। বিয়ের আগেই এটা রায়হানকে সে বলেছে,এবং রায়হানকে সে ঠিক সেভাবেই বিশ্বাস করে,শ্রদ্ধা করে। আজ এতোদিনেও তো কখনো রায়হান ওকে তেমন কারো কথা বলেনি,বিয়ের অনুষ্ঠান গেল,ওর সাথে এতো এতো বন্ধু-বান্ধবের বাসায় গেলো কই,কখনো তো তেমন কোন মেয়ের কথা শোনেনি!! তাহলে কি আন্টিই ভুল বললো!
দ্বিধা-দ্বন্দে দোদুল্যমান অবস্থায় চারদিন কাটালো মিলা! এর মধ্যে এক কাজিন ছোট ভাইকে দিয়ে খোঁজ নেয়ালো। তারপর যা শুনলো তাতে মনে হয়েছিলো, মিলা পায়ের তলায় কোন মাটি নেই!একদমই শূণ্যে ভাসছে সে!
এখনো সে দিনটা চোখে ভাসে মিলার,যেদিন রায়হানকে সামনে বসিয়ে জিজ্ঞ্রেস করেছিলো,সে এখন কি চায়?তার সঙ্গে সব ভুলে থাকতে চায় না কি রিমুর সাথে থাকতে চায়?
মিলার মনে মনে কেন জানি নিজের ভালোবাসার প্রতি খুব বিশ্বাস ছিলো,ওর মন বলছিলো রায়হান ওর কাছেই ফিরে আসবে! কিন্তু নাহ...! মিলা হেরে যায়! হেরে যায় ওর ভালোবাসা!
রায়হান জানিয়ে দেয়,সে রিমু কে বিয়ে করবে,মিলা যদি অনুমতি দেয় তো ভালো আর না হলে ওকে যেনো মিলা ডিভোর্স দেয়।

প্রায় তিন মাস হলো মিলা চলে এসেছে মায়ের বাসায়। ভাই-ভাবি চাকরীর সুবাদে খুলনা থাকায় কলেজের চাকরী নিয়ে মা বাসায় একাই থাকতেন। গত তিন মাসে মিলা খুব চেষ্টা করেছে সব ভুলে স্বাভাবিক হবার। প্রথম প্রথম খুব আশা নিয়ে ঘুম থেকে উঠতো,মনে হতো আজ হয়তো রায়হান আসবে,ওর কাছে স্যরি বলবে,ওকে বাসায় ফিরিয়ে নিয়ে যাবে! কিন্তু নাহ।
আসেনি রায়হান। দিনের পর দিন কেটেছে,কোন জবাব জবাব পায়নি ওর ম্যাসেজ গুলোর। ফোন করলে,'খুব ব্যাস্ত আছি,পরে ফোন দিচ্ছি' বলে এড়িয়ে গেছে!'
রায়হানের বাসায় সব জানার পর ওর বাবা ওকে তার বাড়ির সীমানায় আসতে বারণ করেছেন। রায়হানের মা আর বড় বোনকে খুব আশা নিয়ে মিলা ফোন করেছিলো,কিন্তু তারাও নিরাশ করে বলেছে,মিলা যেনো রায়হানের দ্বিতীয় বিয়েটা মেনে নেয়,ক্ষতি কি?ওর মা ও তো ওর বাবার বিয়ে মেনে নিয়ে আছেন! মিলার বাবারো একই মত!
সব দিক চিন্তা করে মিলা তাই রায়হান কে ডিভোর্স দেবার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। শুধু শুধু একটা সম্পর্কের নাম ঝুলিয়ে রাখার কোন মানে হয় না! যে সম্পর্কটাকে রায়হান গলা টিপে মেরে ফেলেছে,মিলার উচিত সেটাকে কবর দিয়ে দেওয়া। কিন্তু অনেক চেষ্টার পরেও পারেনি ডিভোর্স পেপারে সাইন করতে!
মিলার মাঝে মাঝে মরে যেতে ইচ্ছে করে! খুব ইচ্ছে করে!  কি করে পারে একটা মানুষ এভাবে বিশ্বাসঘাতকতা করতে? কি করে পারে সব কিছুকে একেবারে অস্বীকার করতে?
খুব জানতে ইচ্ছে করে,কেন ওকে বিয়ে করেছিলো রায়হান? মিলাকে তো সে ই আগে পছন্দ করেছিলো,তাহলে আজ কি করে পারছে ওকে চলে যেতে বলতে? রিমু কি করে পারল,সব জানার পরেও রায়হানের জীবনে ফিরে আসতে?! কাকে দোষ দিবে মিলা বুঝে না!
মামা বলেছেন,অফিসে জয়েন করতে। মা ও তাই বলেছেন,ব্যাস্ত থাকলে সময়টাও কাটবে আস্তে আস্তে সব ঠিকও হয়ে যাবে। কিন্তু মিলা কোন ভাবেই কিছু ভুলতে পারে না! রায়হানের স্মৃতি সারাক্ষন যেনো তাড়া করে ফিরে! পারে না মিলা স্বাভাবিক হতে! প্রায় সময়ই রায়হানকে পাশে কল্পনা করে একা একা কথা বলে,ঝগড়া করে,কখনো কাঁদে!
আমিনা আহমেদ সবই বুঝতে পারেন। কিন্তু দীর্ঘশ্বাস ফেলা ছাড়া আর কিছুই করতে পারেন না! নিজে তো পেরেছিলেন,ছেলে-মেয়েদের কে আঁকড়ে ধরে বেচে থাকতে,কিন্তু মেয়েটা কি করবে?কিভাবে বাকী জীবন কাটাবে?! আল্লাহর কি ইচ্ছা তিনি বুঝতে পারেন না।

অফিস থেকে ফিরতেই রায়হানকে দাড়োয়ান খামটা ধরিয়ে দিলো,বললো মিলা এসেছিলো এগুলো দিয়ে গেছে। ফ্ল্যাটে ঢুকে কাপড়-চোপড় ছেড়ে খামটা খুলল রায়হান। প্রথমেই ডিভোর্স পেপারটা পেলো,পাতা উল্টিয়ে দেখল মিলা সাইন করে দিয়েছে। কেন জানি,বেশ কিছুক্ষন সিগনেচারটার দিকে তাকিয়ে থাকল রায়হান!
খামের ভেতর আরেকটা ছোট ভাঁজ করা কাগজ পেলো,ধীরে ধীরে সেটা খুলল,
''অনেক চিন্তা করেও সম্বোধনের কোন ভাষা খুঁজে পেলাম না,তাই সম্বোধন ছাড়াই লিখলাম। তোমার দেয়া ডিভোর্স পেপারটাই সাইন করে দিয়েছি,আজ থেকে তুমি মুক্ত! কি?খুশী এবার? আমি নিজেও খুব খুশী কাজটা করতে পেরে!
আমি আরো খুশী,কারন আমি নতুন করে জীবনটা শুরু করতে যাচ্ছি তাই! কিভাবে জানো? না না,তোমার মতো অন্য কারো হাত ধরে না! আমি নতুন জীবন শুরু করতে যাচ্ছি,আমার আরেক আমির সাথে! এই 'আমি'টার নাম হচ্ছে 'মা'।
গতকাল ডাক্তারের রিপোর্ট পেয়েছি,ডাক্তার জানিয়েছে,খুব দ্রুতই আমার কোল জুড়ে আল্লাহ আমাকে বেঁচে থাকার অবলম্বন হিসেবে একজনকে পাঠাচ্ছেন! আমি খবরটা শোনার সাথে সাথেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি,যে আমি তোমাকে মুক্ত করে দিবো! আমার তোমার দেয়া কষ্টের বোঝা বয়ে বেড়ানোর আর কোন দরকার নেই। আমি আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ সুখটা পেয়ে গেছি,আমার ভালোবাসার সেরা উপহারটা পেয়েছি,যেটার ভাগ নিতে তুমি পারবে না!চাইলেও না!
রায়হান,আমি দুঃখিত! বলতে পারলাম না,যে তুমি বাবা হতে যাচ্ছো! আমার সুখানুভুতির এক ফোঁটা ভাগও তোমাকে দিতে পারলাম না। আফসোস তোমার জন্য!আজ বুঝতে পারছি,তোমার সাথে থাকায় আমার সুখ নেই,তোমার দূরত্বেই আমার সুখ,তোমার হারিয়ে বিলীন হয়ে যাওয়াতেই আমার সুখ!''

অনেক রাত এখন এই শহরে। বাতি নিভে যাওয়া শত শত ঘরের মাঝেও শহরের দু'প্রান্তে দু'টো রুমে আলো জ্বলছে এখনো! একটা ঘরে,কেউ জেগে জেগে তার ভেতরের মানুষটার সাথে কথা বলছে,তারপাশের ঘরে টেবিলে ল্যাম্প জ্বালিয়ে কেউ একজন পুরোনো এলবাম বের করে স্মৃতিচারণ করছে অশ্রু ঝরিয়ে।  শহরের অন্য প্রান্তের একটা ঘরে কেউ এক হাতে চিঠি আরেক হাতে সাইন করা পেপারটা নিয়ে মূর্তির মতো বসে আছে। দু'প্রান্তের মানুষ গুলোর কাজের মাঝে একটা মিল আছে,আর তা হলো ওদের সবার চোখ বেয়েই অঝোরে অশ্রুরা ঝরে পড়ছে!... একই রকম অশ্রু তবে ভাষা ভিন্ন! কোন অশ্রু সব হারিয়ে কিছু পাওয়ার কথা বলছে,আর কোন অশ্রু সব থেকেও সব হারানোর কথা বলছে!

[উৎসর্গঃ আমার জগতে ঠিক এমনই দোদুল্যমান অবস্থায় আছে একজন। আমি বুঝতে পারি তার ভেতরে কতো কষ্ট,অনুভব করতে গেলে বা তাকে দেখলে চোখের পানি আটকে রাখতে পারি না কিন্তু তাকে সান্তনা দেবার বা কি করা উচিত  বলার তেমন কোন ভাষাই আমি খুঁজে পাই না!]