জনপ্রিয় পোস্টসমূহ

সোমবার, ৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৪

কাব্যানুভূতি

অনুভূতি কখনো একবারে হারিয়ে যায় না
একটু একটু করে,ক্ষয়ে ক্ষয়ে
তারপর সূর্যি মামার মতো টুপ করে ডুবে যায় বিস্মৃতির সাগরে!

তাই কখনো নিজের লেখা কবিতা গুলোই
বড্ড অচেনা মনে হয়!
কবিতার অনুভূতি গুলো ভীষন অপ্রিয় ঠেকে
শুরু হয় অন্য কবিতার যাত্রা।

এই অন্য কবিতা গুলোর ভাষা হয় অন্যরকম
লেখা শেষে কিংবা প্রহরের পরের প্রহরে এসে
অন্যরকম কবিতাটা আবার একই রকম ঠেকে!
কবিতা গুলো জীবন্ত হয় সেই একই বেশে।

মাঝে মাঝে কাব্য গুলো পুরনো অশ্রুতে ভাসে
মান-অভিমান,রাগ-অনুরাগ আবারো জোয়ার তোলে!
এই জোয়ার কখনো পুরনো অনেক কিছুকে আবারো ফিরিয়ে আনে
আবার কখনো নতুন কিছুকে অনেক দূর ভাসিয়ে নিয়ে চলে।






শনিবার, ১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৪

নিরুপমা


:নিরু,এই নিরু...চা এর ট্রে টা নিয়ে এদিকে আয় তো।
খানিকটা নড়েচড়ে নিরু আবারো চেয়ারে বসে থাকে। এই মুহুর্তে উঠে কোথাও যাবার ইচ্ছে নেই,এমনকি পাশের ঘরেও না। হাতের বইটার দিকে রাখা মনোযোগটা আরেকটু মজবুত করার চেষ্টা করে,কিন্ত পাশের ঘর থেকে আবারো মা ডাক দিলেন,
:নিরু,তাড়াতাড়ি আয়,তোর খালা চলে যাবে। 
বাধ্য হয়ে বইটা রেখে উঠে দাঁড়ায় নিরু,বের হওয়ার আগে আয়নার সামনে এসে একবার দাঁড়ায়!ভেজা চুল গুলো কেমন অগোছালো হয়ে আছে,কিন্তু তার মাঝেও চেহারায় এক ধরনের স্নিগ্ধ আভা ফুঁটে আছে ওতেই কি চলবে না?নাহ,চলবে না!চিরুনী দিয়ে মাথা আঁচড়ালও,তারপর রান্না ঘরে চেয়ে ট্রে তে চায়ের কাপ রাখল। আজ বেবি খালা চা বানিয়েছে,নিরু আন্দাজ করতে পারে,এই চা মুখে দেয়ার অযোগ্য!কিন্তু তবুও ট্রে সাজায়। 
-সেকি!নিরু দেখি আগের চেয়েও কালো হয়ে গেছে!কিরে?গত মাসে যে চন্দন গুড়োর প্যাকেট দিয়ে গেলাম,নিয়ম করে মুখে মাখিস না?
মতি খালার কথা শুনে মেজাজটা খারাপ হয়ে যায় নিরুর!এই মহিলার সমস্যা কি?নিজের চেহারা কি আয়নায় দেখে না কখনো? সারাক্ষন খালি মানুষের চেহারা নিয়ে তার চিন্তা!নিরু কিছু বলার আগেই মা বলে উঠলেন,
-মাখে তো,অবশ্য রোজ পারে না,ক্লাস থাকে যে সারাদিন!
-না না,রোজ দিবি,না হলে চেহারা হাল দেখেছিস?এমন হলে চলবে?এই যে দেখ,যত বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসছি,সবার খালি একটাই কথা,'একটু ফর্সা'!বুঝলি,রুপের দাম যুগে যুগে,বিদ্যার দাম কে দেখে! 
নিরু কোন কথা না বলে চলে আসে নিজের ঘরে। এসব কথা শুনতে শুনতে এখন আর গায়ে লাগে না। শুধু মাঝে মাঝে মায়ের উপর খুব রাগ লাগে! 

-নিরু শুনেছিস?মুক্তার বিয়ে হয়েছে নাকি গত সপ্তাহে!
-কোন মুক্তা?
-আরে ঐ যে তোর আফজাল চাচার মেয়ে।
-ও না মাত্র এসএসসি দিলো?
-হুম,খুব ভালো ঘরে বিয়ে হয়েছে,দেখলি?সবাই কিভাবে বিয়ে শাদি করে সংসারি হচ্ছে,আর তুই?
নিরু রাগে-অপমানে মুখ লাল করে নিজের রুমে চলে আসে! 'সবার বিয়ে হয়ে যাচ্ছে!কিন্তু সবাই কতো সুখে আছে শুনি?' মাঝে মাঝে নিরুর খুব রাগ লাগে নিজের প্রতি!সে এমন কেন?চারপাশে সবাই খালি মত্ত'বিয়ে' নিয়ে আর সে?এসব নিয়ে ভাবতেই ইচ্ছে করে না!আর করবেই বা কেন?এই পর্যন্ত যা যা দেখেছে তার পর আর কি করেই বা ভাবা যায়!কিন্তু সবাই কি আর তা বুঝে?আছে শুধু গরুর হাটের গরু বেচা-কেনার মতো,রুপের বিনিময়ে অন্যের কাছে গোছাবার চিন্তায়!  

:নিরুপমা...বাহ,খুব সুন্দর নাম!কে রেখেছে নামটা?
নিরু নিরস কন্ঠে জবাব দেয়,
-আমার ছোট মামা। 
-উনি বুঝি সাহিত্যিক মানুষ ছিলেন?
-হুম।
-আপনিও কি সাহিত্যচর্চা করেন
-করি টুকটাক। 
-নিরুপমা,আপনার কি আমার সাথে কথা বলতে বিরক্ত লাগছে?
নিরু কিছু না বলে না। কি বলবে সে?একটু আগে সে শুনে এসেছে,ছেলের মা,মতি খালাকে বারান্দায় ডেকে নিয়ে বলছে,
-এই মেয়ে তো মোটেও ফর্সা না,শ্যামলাও বলা যায় না!তুমি তো বলেছিলে উজ্জ্বল শ্যামলা,কই?দেখো আগেই তোমাকে বলেছি,আমার ছেলের জন্য ফর্সা মেয়ে চাই,আর তুমি কি দেখাতে নিয়ে আসলে?
-আরে বিয়ের পর আরো ফর্সা হয়ে যাবে,আরে ভাবি আপনিও তো বিয়ের আগে এমন ছিলেন দেখতে,এখন আপনাকে দেখে কি কেউ বলবে?আপনার বড় মেয়ে শিমু কি দেখতে একদম ফর্সা?তো কি হয়েছে,এই মেয়েও দেখবেন আপনার ছেলের জন্য ভালো হবে। 
মহিলা মহা বিরক্ত হয়ে যায়!
-আমার মেয়ের হিসেব আলাদা! মেয়ের বিয়ে আর ছেলের বিয়ে কি এক?কিসের সাথে কি মিলাও তুমি?শোন,এই মেয়ে আমার পছন্দ হয়নি,আর এরকম মেয়ে দেখাবে না,ফর্সা হলে বলবে,না হলে না,শুধু শুধু সময় নষ্ট! 
নিরু মাকে ইশারায় বুঝাতে চাইছিলো,যে তার ছেলের সাথে দেখা করার ইচ্ছে নেই কোন,কিন্তু মা এর তো ছেলে এমন পছন্দ হয়েছে যে কমনসেন্স হারিয়ে বসে আছেন!কে কি বুঝাচ্ছে বুঝতেই পারছেন না! তাই বাধ্য হয়ে নিরু এখন শাকিলের সামনে বসে আছে,আর শাকিলও আলাপ জমানোর অযথা চেষ্টা করেই যাচ্ছে,যা নিরুর রাগ আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে! করবে না বিয়ে,অযথাই আসলো,আবার এখন খাতির করার ঢং দেখাচ্ছে! 
-নিরুপমা,আপনার কি আমার সম্পর্কে কিছু জানার আছে?থাকলে প্রশ্ন করুন।
নিরু খুব দ্রুত মাথা নাড়ল। ভেতরে ভেতরে দম বন্ধ হয়ে আসছে!নাহ,আর ভদ্রতার নাটক চালানো সম্ভব না। 
-আচ্ছা,শুনুন আমি বরং যাই,শুধু শুধু এখানে বসে থাকতে আমার অনেক বিরক্ত লাগছে! 
শাকিল কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে গেলো মনে হয়!সাথে সাথে কিছু বলতে পারল না,তা দেখে নিরু ই বলল,
-না না,ঘাবড়াবেন না,আমি বুঝেছি,আপনাদের কারোর ই আমাকে পছন্দ হয়নি,বাট ভদ্রতার খাতিরে আপনারা এখনো আমাদের বাসায় আছেন!আমি আবার অতো ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে কথা বলতে পারি না,তাই সোজা ভাবেই বললাম। আমি এরকম পরিস্থিতির সাথে পরিচিত! 
শাকিল চুপ করে থাকলো,কিছু বলল না। নিরু কিছুটা অবাক হলো! 
-আপনি কি আমার কথায় রাগ করলেন?
শাকিল খানিকটা হাসি ফুঁটিয়ে বলল,
-নাহ,নিরুপমা,আপনি যদি বিরক্ত না হোন আপনাকে একটা ছোট্ট গল্প শোনাই? 
নিরু কিছুটা অবাক হয়েই মাথা নেড়ে সায় দিলো। 
-আমার দেখা পৃথিবীর অসম্ভব ভালো মেয়েদের মধ্যে একজন হচ্ছে আমার বোন শিমু। বেশ গুণি,মায়াবতী একটা মেয়ে,কিন্তু জানেন?আমার এই বোনটাকে শুধু মাত্র কারো বউ হবার জন্য গায়ের রঙ কালো বলে কি পরিমাণ অপমান হতে হয়েছে!আমি দেখেছি,আমার বোনকে নিরবে চোখের পানি ফেলতে,ওর ভালো একটা বিয়ের চিন্তায় আবার আব্বা-আম্মাকে হতাশ আর পেরেশান হতে!আল্লাহর রহমতে শিমুর বিয়ে হয়েছে,ভালোই আছে আর তাই এখন আমার মা ও ঐ সময়ের দুঃখ গুলো বেমালুম ভুলে গেছেন হয়তো!এটাই হয়,মানুষের সুসময় আসলে দুঃসময়ের কথা ভুলে যায়। কিন্তু ওই দুঃসময় গুলোই অনেক কিছু নতুন করে শিখিয়ে দিয়ে যায়,যেমন আমি শিখেছি।''
নিরুর একবার মনে হলো,'লোকটা শুধুই বক বক করছে,এসব কথা এখন তার সামনে বলছে,একটু পর তার মা সামনে আসলে সব ভুলে যাবে!' আবার মনে হলো,'লোকটার ভালো একটা মন আছে,না হলে মায়ের মতো সেও পারতো সব ভুলে যেতে!' নিরুকে চুপ থাকতে দেখে শাকিল আবার বলতে শুরু করলো,
-নিরুপমা,আমি আজকেই প্রথম মেয়ে দেখতে আসলাম,এর আগে আম্মাই গিয়েছেন,আপনার সিভি টা দেখে আমার পছন্দ হয়েছিলো,তারপর যখন আপনার পরিবার সম্পর্কে শুনলাম,তখন আমি আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছি,আমি...
-শুনুন
কথা শেষ না করেই শাকিল থেমে যায়। তাকে চুপ করিয়ে নিরু বলল,
-আমি আপনার কথা বুঝতে পেরেছি,বাট আপনি বরং কথা গুলো আপনার পরিবার কে আগে বুঝান,যদি সবাই বুঝতে পারে আমার কোন আপত্তি নেই,আমি তো গত দু'বছর ধরে এই সামনে আসা-যাওয়া করতে করতে ক্লান্ত!বাট বাস্তবতা ক্লান্তি বা আবেগ বুঝে না! যাইহোক,আমি এখন আসি,ভালো থাকবেন।'
আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে নিরু দ্রুত নিজের রুমে চলে আসল। শাড়ি পাল্টে বারান্দায় যেয়ে বসল,ততোক্ষনে শাকিল সাহেব আর তার মা চলে গেছেন। কোন সিদ্ধান্ত তারা জানিয়ে জাননি,পরে জানাবেন বলেছেন।
নিরুর কেন যেনো খুব জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিতে ইচ্ছে করছে!আবার খুব কাঁদতেও ইচ্ছে করছে!কাউকে বুঝাতে পারছে না বুকের ভেতর তার কেমন করছে!একটা সময় ব্যালকনির গ্রিলটাকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে,যেনো ভেতরের কান্নার বেগটা নিজেকে ভেঙ্গে না দেয়।

ওয়ার্কিং ডে বলে আজ বাণিজ্য মেলায় ভীড় অনেক কম,নিরু স্টল ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত হয়ে পড়লো। একটা সময় আইসক্রিম কিনে নিয়ে নামাজ রুমের দিকে হাঁটা শুরু করলো,যোহরের সময় হয়ে আসছে,কিছুক্ষন রেস্ট নিয়ে,নামাজ পড়ে আবারো বের হবে ভাবলো। তাঁতের স্টলটা অতিক্রম করার সময় এক দম্পতির দিকে চোখ আটকে গেলো!নিরু যদিও মানুষের চেহারা খুব একটা মনে রাখতে পারে না,বিশেষ করে ছেলে মানুষের চেহারা আরো না,কিন্তু এই দম্পতির মধ্যে ভদ্রলোকের মুখটা খুব পরিচিত মনে হলো! একটা সময় নিরুর ঠোঁটে হাসি ফুঁটে উঠলো!
সেদিন শাকিল সাহেব সেই যে গেলেন,আর কখনোই তার খবর পাওয়া যায়নি!নিরুর মা খুব আশা করেছিলেন,কিন্তু বেচারির আশা বরাবরের মতো সেবারও ভেঙ্গে ছিলো। নিরুর খুব একটা খারাপ বোধ হয়নি,শুধু ক'দিন অকারণেই কেমন কান্না পেতো,এক ধরনের ক্ষোভ কাজ করতো বুকের ভেতর!
প্রায় দু'বছর পর আজ দেখলো ভদ্রলোক কে,বেশ সুন্দরী একটা বউ পেয়েছেন,খুব মানিয়েছে দু'জনকে একসাথে। সম্ভবত নতুন সংসারের জন্য কেনাকাটা করছেন। নিরুর মনে হলো তার মন খারাপ করা উচিত,কিন্তু তেমন কিছু মনে হচ্ছে না!বরং ভেতর কেমন যেনো স্বস্তি বোধ কাজ করছে,
যাক,অবশেষে ভদ্রলোক তার পরিবারের মনের মতো একটা বউ পেয়েছে,হয়তো সে নিজেও এমনটাই চেয়েছে,মন্দ কি? সবাইকেই যে 'কালো মেয়ে'বিয়ে করার মতো 'মহান' কাজের অংশীদার হতে হবে এমন তো কথা নেই!তার জন্য হয়তো আল্লাহ এটাই ঠিক করে রেখেছিলেন।
মুখে মৃদু হাসি নিয়ে নিরু আবার হাঁটা শুরু করে।

রাত গভীর হয়,ঠান্ডা কফির মগটা হাত থেকে রেখে গায়ের শালটা আরো ভালো ভাবে জড়ায়। তারপর আবারো কলম চালায়,
''কতো সময় চলে যায়,আমরা ভুলে যাই,আর কতো সময় ভুলেও ভুলতে পারি না!মাঝে মাঝে ইচ্ছে করি,কোন শিল্পীর আঁকা ছবি হয়ে বেঁচে থাকতে!তাহলে হয়তো জীবন্ত অনুভূতি গুলোকে কাগজে মুড়ে ছুঁড়ে ফেলা যেতো!
নিরুপমা...যার কোন উপমা হয় না। নামটার মতোই জীবনটা!নিরুপমাদের অনুভূতি গুলো অদ্ভুদ হয়!মরেও না আবার সতেজ ও থাকে না! মাঝে মাঝে সেগুলো জীবন্ত হয় তখন,পুরনো ডায়েরির পাতা গুলো খুলে চোখের পানিতে লেখা গুলোকে ঝাপসা করে দেয় শুধু! অস্পষ্ট করে দেয় সব জমানো আবেগ গুলো,অনুভূতি গুলো!''




-

বৃহস্পতিবার, ৩০ জানুয়ারি, ২০১৪

বিশ্ব হিজাব দিবস... দূর হোক সমস্ত বিভ্রান্তি,সৃষ্টি হোক সঠিক বিশ্বাস।


১১বছর বয়সে পিতা-মাতার সাথে বাংলাদেশ ছেড়ে উন্নত জীবন যাপনের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে সুদূর আমেরিকায় পাড়ি জমিয়েছিলেন নাজমা খান। নিউইয়র্ক সিটির ব্রুনেক্সে বেড়ে উঠেন তিনি। মূলত প্রবাস জীবনের শুরু থেকেই হিজাব পরিধানের কারণে নানা রকম বৈষম্যের শিকার হতে হয়েছে তাকে,৯/১১ এর পর তাকে আরো বেশি বৈষম্যের শিকার হতে হয়েছে,তার ভাষ্যমতে,
''৯/১১ ঘটনার পর আমি কলেজে উত্তীর্ণ হই। তখন আমার সহাপাঠীরা আমাকে ওসামা বিন লাদেন অথবা সন্ত্রাসী বলে ডাকতো, যা ছিল খুবই ভয়ঙ্কর। এই বৈষম্য রোধে একমাত্র উপায় হিসেবে আমি যে বিষয়টি চিন্তা করলাম তা হলো যদি আমি আমাদের সহকর্মী বোনদের হিজাব পরিধান করতে আহবান জানাই তাহলে কেমন হয়।''
মূলত সেই সময়টাতেই সিদ্ধান্ত হয়,ওয়ার্ল্ড হিজাব ডে পালন কর্মসূচির। এই খবরটি খুব দ্রুত সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে,এবং অভূতপূর্ব সাড়া ফেলে দেয়। নাজমা খানের বক্তব্যটি ২২টি ভাষায় অনুবাদ করা হয়। এরপর খান যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, ভারত, পাকিস্তান, ফ্রান্স ও জার্মানিসহ প্রায ডজন খানেক দেশের জনগণের সাথে এ বিষয়ে যোগাযোগ করেছেন। এবং এই প্রচারণাটিকে সবার মাঝে ছড়িয়ে দেয়ার প্রচেষ্টাকে দ্রুত গতি দিয়েছেন। নাজমা খান অমুসলিম নারীদেরকেও হিজাব পরিধানের জন্য উৎসাহিত করেন। ধর্মীয় পোশাক হিসেবে হিজাব সম্পর্কে চারদিকে যে ভুল ধারণা তা পাল্টে দিতে এবং উন্নত পারস্পরিক সমঝোতা গড়ে তোলার একটি প্রচেষ্টা হিসেবে এই আয়োজনটিকে সাজানো হয়।
ইসলামে মেয়েদের জন্য হিজাব একটি বাধ্যতামূলক ড্রেস কোড। অপরের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য এটি কোন ধর্মীয় প্রতীক নয়,এটি কোন নির্দিষ্ট শ্রেনীর মুসলিমদের জন্য নয়। সুতরাং হিজাব কখনোই উগ্র ধর্মীবোধ কিংবা কোন অন্যায় যুক্তির প্রচার করে না।
আরবি ‘হিজাব’ শব্দের অর্থ পর্দা, গোপনীয়তা, স্বাতন্ত্র্য প্রভৃতি।হিজাব নির্দিষ্ট কোনো পোশাক নয়; বরং এটি নৈতিক পবিত্রতা রক্ষার জন্য একটি সামগ্রিক ব্যবস্থাপনার নাম। প্রাপ্তবয়স্ক নারীদের জন্য হিজাব ফরজ করে আল্লাহ বলেন,''আর মুমিন নারীদেরও বলে দিন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি অবনত রাখে এবং নিজেদের যৌন পবিত্রতা রক্ষা করে চলে এবং স্বীয় সৌন্দর্য প্রকাশ না করে, শুধু ওই সৌন্দর্য ব্যতীত যা সত্যিই প্রকাশিত হয়ে পড়ে।'' (সূরা নূরঃ ৩১)। হিজাব মানে মাথা টা এক টুকরো কাপড় দিয়ে ঢাকাকে বুঝায় না,হিজাব মানে মাথা থেকে পা পর্যন্ত সমস্ত দেহকে এমন একটি আবরণে ঢাকা কে বুঝায়,যা হবে ঢিলে-ঢালা। যার দ্বারা দেহের গঠন স্পষ্ট ভাবে বুঝা যাবে না,সম্পূর্ণ শালীন এবং পবিত্র একটি পোষাক হচ্ছে হিজাব।
মূলত সারা বিশ্বের সব ধর্মের,সব ধরনের মানুষদের কাছে 'হিজাব' সম্পর্কে স্পষ্ট এবং সঠিক ধারনা সৃষ্টি করাটাই হচ্ছে,
'ওয়ার্ল্ড হিজাব ডে'এর মূল উদ্দ্যেশ্য। নাজমা খান ফেইসবুক পেইজে এই সম্পর্কে বলেছেন,
আমাদের লক্ষ্য,১লা ফেব্রুয়ারী হবে,ওয়ার্ল্ড হিজাব ডে,যা সারা বিশ্বে আমাদের এই একত্রিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে সবার পৌছে দিতে পারবে 'হিজাব'সম্পর্কে আমাদের ম্যাসেজ,যা হচ্ছে :
"সচেতনতা,সঠিক ভাবে বুঝার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ বিশ্ব তৈরী . "
আমাদের লক্ষ্য হল হিজাব সচেতনতা মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী ধর্মীয় সহনশীলতা লালন-পালন করা.
আপনার বন্ধু / পরিবার ( মুসলিম / অমুসলিম ) সকলকে অবহিত করুন.
হিজাব মানে মাথা টা এক টুকরো কাপড় দিয়ে ঢাকাকে বুঝায় না,হিজাব মানে মাথা থেকে পা পর্যন্ত সমস্ত দেহকে এমন একটি আবরণে ঢাকা কে বুঝায়,যা হবে ঢিলে-ঢালা।''
এই ব্যাপারে বিখ্যাত স্কলার মুফতি ইসমাঈল মেংক বলেছেন,
'হিজাব ডে পালন করা মানে এই নয় যে,আপনি কোন ধর্মীয় অনুশাসন পালন করছেন,বরং এর মানে হচ্ছে,সারা বিশ্বব্যাপি 'হিজাব' সম্পর্কে যে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে,যেভাবে একে আক্রান্ত করা হচ্ছে তার বিরুদ্ধে সচেতনতা সৃষ্টির উদ্দ্যেশ্যে একটি কার্যকর পদক্ষেপে অংশগ্রহন করা,ইতিমধ্যে এই উদ্যোগ যথেষ্ট সাড়া তৈরী করেছে।'
ইতিমধ্যে গত বছর এই দিনটি সারা বিশ্বে বেশ সাড়া জাগাতে সক্ষম হয়েছে,এবং বিভিন্ন দেশের নারীরা মুসলিম-অমুসলিম ধর্ম নির্বিশেষে হিজাব পরিধানের মাধ্যমে এই দিবসটি পালন করেছে।

যুক্তরাজ্যের নরউইচ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জেস রোডেস (২১) বলেন, তোমরা যেটিকে হিজাব বলো, যেহেতু তা পরিধানের ব্যাপারে আমি খুব দক্ষ নই, তবে আমি আবিষ্কার করেছি যে, এই সুযোগটি সীমাহীন। এছাড়াও এখানে সব ধরনের পছন্দই রয়েছে। জেস রোডেস সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেস বুকের মাধ্যমে এই কার্যক্রম সম্পর্কে তার বন্ধুর কাছ থেকে নিমন্ত্রণ পেয়েছিলেন। তার বন্ধুটি অস্ট্রেলিয়ায় বসবাস করেন এবং তার নাম উদাইয়ান আল উবুদায়।
রোডেস আরো বলেন, সে আমাকে নিশ্চিত করেছিল যে, এর জন্য আমাকে মুসলিম হতে হবে না। এটি একটি শালীনতার ব্যাপার। যদিও বিষয়টি ইসলাম সম্পর্কিত। সুতরাং আমি চিন্তা করে দেখলাম এতে অংশ নেয়া যেতেই পারে। আমার পিতা-মাতার স্বাভাবিক আচরণ ছিল এই যে, যদি এটি একটি ভালো উপায় হয় তাতে বিস্ময়ের কিছু নেই। তবে আমার ওপর রাস্তায় হামলা হতে পারে বিধায় তারা চিন্তিত। কেননা এখানে সহনশীলতার অভাব রয়েছে। রোডেস নিজেও এসব প্রতিক্রিয়ার ব্যাপারে চিন্তিত ছিলেন।
তিনি বলেন, আমি সত্যিই ব্যাপারটি ব্যাখ্যা করতে পারছি না। তবে লোকজন সত্যিই অনেক উপকারী ছিল, বিশেষ করে শপিং মলগুলোতে।মুসলিম পছন্দ হিসেবে হিজাব সম্পর্কে ধারণা পরিষ্কার করার একটি প্রচেষ্টায় ছিল এই অভিযানের মূল লক্ষ্য। প্রাত্যহিক জীবনের চর্চা হিসেবে এই বিশ্বাসের গুরুত্ব সম্পর্কে বুঝতে পেরেছেন ক্যালিফোর্নিয়ার বাসিন্দা মোরমোন ও ডালি। রোডেস বলেন, হেড স্কার্ফকে ঘিরে চারদিকে যেসব কলঙ্ক রয়েছে সে বিষয়ে তিনি অবহিত এবং আশা করছেন যে, এটি একটি সুযোগ এর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সহযোগিতা করার। ডালি বলেন, কারো ওপর ভিত্তি করে যা মুসলিমরা পরিধান করছে সে ব্যাপারে আপনি সঠিক মতামত দিতে পারেন না তাই জনগণকে শিক্ষা দেয়ার এটি একটি ভালো সুযোগ। রোডেস বলেন, নারীরা স্বাধীনভাবে হিজাব গ্রহণ পছন্দ করতে পারে। এটি একান্তই নিজস্ব পছন্দের ব্যাপার। তিনি তার হিজাব সম্পর্কে বলেন, আমি সময়ে সময়ে এটি পরিধান করবো। আমি বিশ্বকে বলতে চাই, আমার সৌন্দর্য আমার পরিবার ও আমার সঙ্গিনীর জন্য। যে কোন নারীই হিজাব পরিধান করতে পারে।
আশা করা যাচ্ছে এই বছরেও বিশ্ব হিজাব দিবসে এই কর্মসূচি অধিকতর ধর্মীয় সহনশীলতা, পারস্পরিক সমঝোতা ও একটি মুসলিম বাছাই হিসেবে হিজাবের গুরুত্বকে বিশ্বের নিকট তুলে ধরবে।


তথ্যসূত্রঃ http://worldhijabday.com/worldwidesupport/।



শনিবার, ২৫ জানুয়ারি, ২০১৪

একটা গোলাপ


গোলাপ টা টেবিলের উপরেই ছিলো
ঠিক তার পাশেই ছিলো একটা খোলা ডায়েরী,
দৃশ্যটা বরাবরের মতোই একই রকম বটে
তবে একই দৃশ্যের ভিন্ন অর্থও থাকে!

ধরি একটা কিশোরীর পড়ার টেবিল
রোজ সন্ধ্যায় পড়তে বসার আগ মূহুর্তে
জানালার ধারের টেবিলটার উপর একখানা গোলাপ থাকে,
এর মানে আগে-পিছে না ভেবেই লোকে অনেক কিছুই বলে!

আবার যখন একটা গোলাপ ড্রয়িং রুমে ফ্লাওয়ার ভাসে থাকে
তখন গৃহবাসীর রুচির পরিচয় বহন করে,
লোকে তখন সেই গৃহ টাকে সমাদর করে।

একটা গোলাপ অনেক রকমের অর্থ বহন করে
অনেক অর্থই তৈরী করে,জন্ম দেয় অনেক ধারনার
খোরাক তৈরী হয় অনেক চটকদার গল্পের
পাতা উল্টে দেয় চলমান জীবন গল্পের!

গোলাপটা যখন দোকানদারের হাতে তখন বিক্রি যোগ্য
যখন এক তরুণীর হাতে তখন ভালোবাসার প্রাপ্য
যখন কোন মধ্য বয়স্কের হাতে তখন আহ্লাদ তুল্য
আর যখন এটা পথের উপর তখন অবহেলার যোগ্য!

গোলাপের অর্থ যতোই হোক,যেমনি হোক
গোলাপ সর্বদাই সব অনেক অর্থ বুঝাতে যোগ্য
কখনো ভালোবাসা আর সাধের সমমান তুল্য
কখনো লেখকের জন্য কাব্যের খোরাক অমূল্য!

শুক্রবার, ২৪ জানুয়ারি, ২০১৪

শুকনোপাতার কাব্য-১৯


এভাবেই অনেক কিছু বদলে যায়
সময় বদলে যায়,কাল বদলে যায়
আর আজ?
খুব সহজেই হারিয়ে যায় অনন্ত কালের গর্ভে!

তুমি কি কিছু খুঁজছো?
কেন খুঁজছো?
কি ই বা অতো ভাবছো!
পাতা ঝরার সেই ক্ষণে অনেক কথাই তো হারিয়েছিলো
তখনও কি এভাবেই ভেবেছিলে?কিংবা খোঁজার চেষ্টা করেছিলে?

জানো শুকনোপাতা?
আমি অনেক খুঁজেছিলাম,খুঁজতে খুঁজতে নিজেকেই হারিয়ে ফেলেছিলাম
তারপর,এক সময় খুঁজে পেলাম অসংখ্য ঝরে যাওয়া পাতা
অশ্রুভেজা অথবা অশ্রুতে ভিজতে ভিজতে শুকিয়ে যাওয়া!

আমি বুঝতে পারলাম,
সময়ের স্রোতে হারাতে হারাতে ডুবে যাওয়া এই পাতা গুলো
একেকটা জীবন্ত অনুভূতি যেনো!
একেকটা অসমাপ্ত গল্প,একেকটা অসমাপ্ত কাব্য।

শুকনোপাতা...
নামটা শুনতে যতোটা না মামুলি শোনায়
তার রং,গন্ধ আর শুকিয়ে যাওয়ার গল্পের গুলো
ততোই অসাধারন,অমূল্য!

আমি অনুভব করলাম,
প্রচন্ড শীতের তীব্রতায় আপন রং,সৌরভ হারানো
এই শুকনোপাতা গুলোই আজ সজীবতার জীবন্ত ধারক!
এই পাতা গুলোই উড়ে উড়ে চিনিয়ে দেয়
রঙ্গিন প্রকৃতির অপরূপ চিত্র,মায়া,
তার বর্ণ-গন্ধহীন বিস্বাদ রূপ বুঝতে শেখায়
সজীবতা কতোটা অপরূপ।

কোন শীতের রাতের মন মুগ্ধকর ভায়োলিনের সুরের মতোই
শুকনোপাতা বুনে যায় অনেক হারানো সজীবতা গল্প,
শেকড়ের গায়ে লিখে যায় অসমাপ্ত কবিতা গুলো
যে কাব্যের ভাষা আর গল্পের কথা ভিনদেশী তারার মতো
জ্বল জ্বল করে প্রকৃতির মাঝে অস্পষ্ট আলোয়!


শনিবার, ১১ জানুয়ারি, ২০১৪

অনুভূতিরা-২(আমার আমি)


'তুমি কি এখানকার স্টুডেন্ট?' প্রশ্নটা শুনে ঘাড় ফেরালাম। উনি কখন এসে আমার পাশের চেয়ারে বসেছেন টের পাইনি,প্রশ্নের উত্তর দেয়ার আগে আমি আরেকবার চারপাশে চোখ বুলিয়ে নিলাম,উনার মতো আরো দু'জন আন্টি বসে আছেন একই সারিতে। এতক্ষন মাথা নিচু করে চিন্তামগ্ন থাকার কারণে আমি তাদের কাউকেই খেয়াল করিনি,আর কানে হেডফোন থাকার কারণে,তাদের কথাবার্তাও খেয়াল করিনি। খেয়াল করে দেখলাম তিন জনের পোষাকে এক ধরণের কম্বিনেশন আছে! আমার ঠিক পাশের আন্টিটা পড়েছেন,ব্ল্যাক-রেড শাড়ি,তার পরের আন্টিটা পড়ে আছেন ব্ল্যাক-অফহোয়াইট শাড়ি,আর সব শেষের আন্টিটা পড়েছেন,ব্ল্যাক-গ্রীন সালোয়ার-কামিজ!ব্যাপারটা অবশ্যই ইন্টারেস্টিং! আমি মুখের ভাব খানিকটা স্বভাবিক করার চেষ্টা করে বললাম,
-নাহ,আমি এখানকার স্টুডেন্ট না।
আন্টি আরেকবার আমার আপাদমস্তক পর্যবেক্ষন করে বললেন,
-তাহলে এখানে বসে আছো যে?
আমি একই ভঙ্গিতে বললাম,
-আমার বান্ধবী এখানকার স্টুডেন্ট,ওর জন্য অপেক্ষা করছি।
-কোন ইয়ারে পড়ে?ফার্স্ট ইয়ার?
আমি মাথা নাড়লাম। উনি আবারো জিজ্ঞেস করলেন,
-কোন ইয়ার তাহলে?
আমি ভেতরে ভেতরে বিরক্ত!কোন ইয়ার সেটা জেনে কি কাজ!
-জ্বী ফিফথ ইয়ার।
-ওহ আচ্ছা,আমার মেয়েটাও এখানে পড়ছে,ফার্স্ট ইয়ার,আর এই আপাদের মেয়েরাও। আজকে ওদের অনেক দেরিতে ক্লাস শেষ হবে এই দেখে নিতে আসলাম,এমনিতেই দিন-কাল ভালো না!তোমার বান্ধবীরও কি রোজই দেরি হয়?
আমি খানিকটা হাসার চেষ্টা করে বললাম,
-ওর তো এখন ওয়ার্ড থাকে তাই দেরি হয়।
-ওহ,আচ্ছা।
আমি ঘড়ির দিকে তাকালাম।৪টা বাজেনি এখনো!এ আর তাহলে কেমন দেরি?ভার্সিটি-মেডিকেলে পড়ুয়া স্টুডেন্টদের জন্য বিকেল ৪টা কি খুব বেশি সময়!মনে তো হয় না!যাইহোক,বসে থাকতে বিরক্ত লাগছে দেখে উঠে দাঁড়ালাম। খেয়াল করলাম,যথারীতি আন্টিদের গল্প তাদের নির্দিষ্ট গ্রাউন্ডে ফিরে গেছে!
-মেয়েটা না মেডিকেলে ভর্তি হওয়ার পর থেকে দিন কে দিন কিভাবে যে শুকাচ্ছে!উফ,আপা!আপনি যদি ওর স্কুল লাইফের ছবি,আর এখনকার ছবি দেখেন,চিনতেই পারবেন না!
-আর বইলেন না গো,আমারটার ও একই অবস্থা!সময়ই পায় না,খাবে আর কখন?
-আমি তো বলতে গেলে,এখন সব খাবার মেয়ের পছন্দেই রান্না করি,যাতে একটু খায়!
আমার মুখে মৃদু হাসি ফুঁটে উঠলো! আহারে...এই হলো মা! কি অদ্ভুদ একটা ব্যাপার,উনারাও একটা সময় আমাদের বয়সে ছিলেন,আমাদের মতোই বান্ধবীরা মিলে আড্ডা দিতেন,মায়েদের শাসন-বারণ নিয়ে আক্ষেপ-বিরক্তি প্রকাশ করতেন!
আর আজ? এখন মনে হয় না,ওরকম কোন চিন্তা উনাদের মাথায় কাজ করে! ঘুরে ফিরে শুধু ঐ ছেলে-মেয়ে,সংসার নিয়েই গল্প!
লিফটের শব্দে ফিরে তাকালাম,কয়েকটা মেয়ে এদিকেই আসছে। যে আন্টিটা আমার সাথে কথা বলছিলো,তার মেয়েটা এসে বইয়ের ব্যাগটা মায়ের পাশে রাখল ধাম করে!
-আম্মু তুমি আবার কেন আসছো?কোন দরকার ছিলো?কি ই বা এমন দেরি হয়েছে আজকে!
-দিন কাল কি যে খারাপ বুঝিস?তোর আব্বু এর মধ্যে ৩/৪বার ফোন দিয়েছে,মেয়ে ফিরেছে কি না জানার জন্য!
-আর এজন্য তুমি চলে আসবা?কি যে আহ্লাদ দেখাও না!উফফ!
মেয়েটা মুখ গোমরা করেই বলল,
-তুমি একটু বসো,আমি ক'টা শীট ফটোকপি করিয়ে নিয়ে আসছি।
বলেই দৌড়ে চলে গেলো মেয়েটা। আমি মনে মনে আরেক দফা হাসলাম! আন্টির এই মেয়ের যদি না খেয়ে শুকাতে শুকাতে স্বাস্থ্যের এই অবস্থা হয়,তাহলে আমার মায়ের উচিত তার মেয়ের স্বাস্থ্য দেখে,হার্ট এট্যাক করা!!
ম্যাসেজ টোন বেজে উঠলো মোবাইলে,হাতে নিয়ে দেখলাম,'দোস্ত আর ৫মি,আসতেছি'! অপেক্ষা জিনিসটা মনে হয় সব এনার্জি খেয়ে ফেলার মতো ভাইরাস!!
আমার এতক্ষনে মনে পড়লো,আমি দুপুরে কিছু খাইনি,সকালেও তেমন কিছু খাইনি!সকালে খাওয়ার মতো অবস্থাও ছিলো না,বলা যায় এক প্রকার রাগ করেই বাসা থেকে বের হয়েছি!যেইসেই রাগ না,প্রচন্ড রাগ তার সাথে অপমানও মিক্সড আছে! >:(  আম্মু আমাকে ইনডাইরেক্টলি খোঁচা মেরে অপমান করেছে,তাও আবার কোন এক আন্টির কথা শুনে!
আমি কোনভাবেই মানতে পারছিলাম না,যে আমি যেমনই হই দেখতে,আমার কি কেমন,কোনটা কি এসব নিয়ে বাইরের মানুষ কি বলল না বলল,সেটা শুনে কেন আম্মু আমাকে এটা-সেটা শোধরানোর কথা বলবে? মানলাম তার কষ্ট লেগেছে,সব মায়ের কাছেই তার সন্তান দুনিয়ার সবার থেকে সেরা,অন্যের মুখে নিজের সন্তানের ত্রুটি শুনতে কোন মায়েরই ভালো লাগে না কিন্তু কে কি বলল,সেটা এতো গায়ে মাখাতে হবে কেন?দোষ কি আমার?আমি কেন কথা শুনবো? আমি যথারীতি চুপচাপ সব কথা শুনে,নিজের রুমে দরজা আটকে বসে ছিলাম,একটা সময় কান্নার শক্তিটাও আর অনুভব করছিলাম না,তখনই রাগের মাথায় বের হয়ে এসেছি,মোবাইলের সিম টাও খুলে রেখেছি! বের হওয়ার সময় চিন্তা করেছি,আর বাসায় যাবোই না!থাকুক আম্মু তার ওমুক-তমুক আপাদের মন্তব্য নিয়ে!
আমি জানি আম্মু ঐ আন্টিকে মুখের উপর জবাব তখনই দিয়ে এসেছেন,তারপরেও আমাকে কথা শোনালেন!আবার আমি এটাও জানি,আমি চলে আসার পরক্ষনেই সে তার ভুল বুঝতে পেরেছেন,যথারীতি বুয়ার সাথে কিংবা নানুকে ফোন করে দুনিয়ার অনুভূতি শেয়ার করছে! এবং আমার ফিরে আসার অপেক্ষায় আছে। কিন্তু তারপরেও ভেতরে ভেতরে প্রচন্ড অভিমান কাজ করছে,চোখ বন্ধ করলে এখনো রাগ অনুভব হচ্ছে! ভার্সিটি থেকে ফেরার পথে বান্ধবীর ফোন পেলাম,অনেক দিন বিকেলে একসাথে চা খাওয়া হয় না,তাই আসলাম দেখা করতে।
ভাবনায় ছেদ পড়লো,সেই আন্টির কথায়!
-দেখেছেন আপা?আমার মেয়ের ব্যাগটা কতোটা ভারী?!আমিই কাঁধে নিতে পারছি না,আর ও প্রতিদিন এই ব্যাগ নিয়ে আসে,সিঁড়ি বেয়ে সারাদিন উঠানামা করে!
-হুম,আপা,আমার মেয়েটাও তো!কাল বলতেছিলো ওর নাকি কাঁধে ব্যাথা করে!
-ইশ!কি কষ্ট!এমন ভারি ব্যাগটা প্রতিদিন আমার মেয়েটা আনা-নেয়া করে! স্কুল-কলেজে তো সাথে সাথে ছিলাম,বই অর্ধেক আমিও নিতাম,কিন্তু এখনো তো একাই আসা-যাওয়া করে,আর এই কষ্ট করে ভারী ব্যাগটা নেয়...তার উপর বাসায় খাওয়া-দাওয়াও করে না ঠিক মতো!''
বলতে বলতে আন্টির কন্ঠটা কান্নায় রুদ্ধ হয়ে এলো!আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখলাম,আন্টির চোখ ছল ছল করছে!
আমি হতভম্বের মতো তাকিয়ে রইলাম!আন্টি এ জন্য কান্না আটকে রাখছে,যে তার মেয়েটা এতো ভারি ব্যাগ বয়ে নিয়ে আসে প্রতিদিন!অথচ একটু আগেই মেয়েটা এসে সবার সামনে তাকে ঝাড়ি দিয়ে গেল,কেন মা তাকে নিতে এসেছে!
আমার মনে হলো,নিজের চোখ দুটোও ছল ছল করছে এখন! মা...তার কি কোন তুলনা হয়?কতো ধৈর্য্য আর ভালোবাসা থাকলে পড়ে মা এমন হতে পারেন! হায়রে মা,অযথাই বকা খায়,দোষারপের স্বীকার হয়,তারপরেও সন্তানের এতটুকু কষ্ট দেখলে চোখে পানি চলে আসে!ঘুরে ফিরে বারবার নিজের মায়ের মুখটা চোখের সামনে ভাসতে লাগল!
আস্তে আস্তে ব্যাগের পকেট থেকে সীমটা বের করে মোবাইলে সেট করলাম। অন করতেই দেখি,আম্মুর ম্যাসেজ,
'খেয়েছো দুপুরে?বেশি দেরি করো না কিন্তু!'
আমার মনে হলো,এবার নাক ফুলতে শুরু করেছে,ঠোঁট দুটোও কাঁপছে! আমি দ্রুত উঠে ওয়াশ রুমের দিকে চলে আসলাম। মিনিট দশেক পর শান্ত হয়ে আম্মুর নাম্বারে কল দিলাম,
'আম্মু আমার আসতে একটু দেরি হবে,তুমি চিন্তা করো না'
-ঠিক আছে,সাবধানে আসিস,ফি আমানিল্লাহ।
আমি একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে হাসিমুখে বের হয়ে দেখলাম বান্ধবী এসে বসে আছে।আমাকে দেখে মুচকী হেসে বলল,
-কিরে?হাসিস নাকি কাঁদিস?চোখ তো কাজল-পানিতে সয়লাব হয়ে গেছে!
আমি কিছু না বলে শুধু হাসলাম। দিন শেষে মনে হচ্ছে,এমন সুখানুভূতির চাইতে সেরা কিছু আর নেই,আল্লাহর শুকরিয়াহ সারাদিনে যা কিছুই হোক,এতটুকু অন্তত অনুভব করতে পেরেছি। চা এর কাপে চুমুক দিতে দিতে মনে হলো,জীবনে কি কি নেই সারাদিন তাই ভেবেছি,কিন্তু এখন মনে হচ্ছে,সব কিছুই আছে শুধু সব না,অনেক অনেক কিছু আছে,এরচেয়ে বেশি কিছুর আর কি দরকার?থাকুক না অতো হিসেব-নিকেষ,থাকুক দূরে অতো নিয়ম-কানুন!







বৃহস্পতিবার, ২ জানুয়ারি, ২০১৪

মুনা-টুনার গল্প


খন্দকার সাহেব বেশ আয়েশ করেই বসলেন এবার চেয়ার। উদ্দ্যেশ্য আজ ছুটির দিন,জুম'আর নামাজের আগ পর্যন্ত এক মনে বইটা পড়বেন,এক কাপ চা সাথে এখন আছে,মুনা কে বলে রেখেছেন ঘন্টাখানেক পর আরেক কাপ দিয়ে যাবে।
কিন্তু বিপত্তিটা বাঁধালেন যথারীতি গৃহকত্রী! এক হাতে তরকারীর চামচ নিয়ে বেড রুমে ঢুকেই বলা শুরু করলেন,
-তোমার সংসারে আমার আসলে আর থাকা হবে না,বুঝলে? আমার পক্ষে আর সম্ভব না!
খন্দকার সাহেব ইচ্ছে করেই বই থেকে মুখ তুললেন না!কারণ,তিনি এখনো জানতে পারেননি রেহানা কেন সংসারে থাকতে পারবেন না!,
-তোমার মেয়ে কি বলছে জানো?একটু খোঁজ খবর কি রাখো সংসারের? 
খন্দকার সাহেব,এবার বই পড়তে পড়তেই বললেন,
-কোন মেয়ে,আমার তো মেয়ে তিনজন,নাম উল্লেখ কর
-তোমার মেঝ মেয়ে,মুনা্র কথা বলছি!কি বলেছে শুনবে?পরশু যে ছেলে পক্ষ দেখে গেলো,ওর নাকি তাদেরকে পছন্দ হয়নি!ও এই বিয়ে করবে না!অথচ তুমিই তো দেখলে,গত কাল রাতে মিনু আপা ফোন করে জানালেন,ও পক্ষের মুনাকে পছন্দ হয়েছে,আর তোমার মেয়ে বলছে,তার পছন্দ হয়নি,সে এই বিয়ে করবে না! 
খন্দকার সাহেব বই থেকে মুখ তুলে স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে শান্ত ভঙ্গিতে বললেন,
-কেন করবে না?ছেলে পছন্দ হয়নি ওর?
-তোমার কি মনে হয়?মুনার কি কোন ছেলে পছন্দ হয়েছে আজ পর্যন্ত?পছন্দ-টছন্দ কিছুই না,ওর তো উদ্দ্যেশ্য বিয়েই করবে না,জানো না তুমি?
খন্দকার সাহেব একটা নিঃশ্বাস ফেলে বললেন,
-মুনা কে আমার কাছে পাঠিয়ে দাও,আমি কথা বলছি,আর আপাতত তুমি এ নিয়ে মিনু'পা কিংবা অন্য কারো সাথে আলোচনা করো না।  
-পাঠাচ্ছি,একটু বুঝাও মেয়েকে,অনার্স শেষ করছে,ক'দিন পর মাস্টার্সও শেষ করবে,এখন আর সেই দিন নাই,যে যতো প্রস্তাবই আসুক,যাচাই-বাছাই করে দিন পার করবে!অনেক হয়েছে ওর নখরা করা,আর না! 
বলতে বলতে রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন রেহানা। খন্দকার সাহেব আরেকবার ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস ফেলে বইয়ের পাতায় চোখ ফেরালেন। কিন্তু চেষ্টা করেও মনোযোগ রাখতে পারছেন না!   

খন্দকার সাহেব ছোটখাট চাকুরীজীবি মানুষ। বৃদ্ধ মা,স্ত্রী আর তিন মেয়ে,এক ছেলে নিয়ে আর সংসার। বড় মেয়ের বিয়ে হয়েছে তিন বছর হতে চলল,ছেলে-সংসার নিয়ে একই পাড়ায় থাকে,বড় ছেলে বিয়ে করে রাজশাহীতে চাকরী সুবাদে সেটেল হয়েছে। বাকী আছে এখন দুই মেয়ে মুনা আর মীম। 
মুনা কে ডেকে পাঠালেও,এই বিষয় নিয়ে খুব একটা আলোচনা করার ইচ্ছে নেই তার। কারণ,তিনি জানেন,মুনা কি বলবে! চার সন্তানদের মধ্যে তার এই মেয়েটা কিছুটা আলাদা,চাপা স্বভাবের হলেও যথেষ্ট ম্যাচিউরড,স্বনির্ভর,আর দায়িত্ববোধ মানুষিকতা সম্পন্ন। কখনো মুখ ফুঁটে কিছু চাওয়ার অভ্যাস নেই,বরং ছোট থেকেই সংসারের প্রয়োজন আর অবস্থান বুঝার চেষ্টা করে খুব! সংসারে কি নেই আর কতটুকু আছে তা কখনোই মুনাকে বলতে হয়নি,আর এই বুঝার চেষ্টাকেই এখন সব সমস্যার মূল মনে হয় খন্দকার সাহেবের!
মা হিসেবে রেহানার চিন্তাকেও তিনি উড়িয়ে দিতে পারেন না,অন্যদিকে মুনার যুক্তির কাছেও হার না মেনে পারেন না,এমন উভয় সংকট অবস্থায় নিজেকে খুব অসহায় মনে হয়!কখনো কখনো খুব অক্ষমও মনে হয়! 
মুনা চুপচাপ বাবার সামনে এসে বসে। বাবার চিন্তামগ্ন মুখ দেখে,আরেকবার চায়ের কাপের দিকে তাকালো। 
-বাবা,আরেক কাপ চা দিবো?
মাথা নাড়ালেন বাবা,শান্ত কন্ঠে বললেন,
-তোর মা বললেন,এই ছেলে নাকি তোর পছন্দ হয়নি? 
-হুম। 
-আমি যতটুকু জেনেছি,ছেলে এবং ফ্যামিলি বেশ ভালোই খুব একটা আপত্তির তো কিছু দেখছি না! 
মুনা দৃষ্টি নত করেই বলল,
-বাবা,আমার অনার্স শেষ হয়ে যাচ্ছে বাট ভালো একটা চাকরী এখনো হয়নি,আর ভালো একটা চাকরী আমার জন্য অনেক জরুরী,আপনি সেটা জানেন,আমার এমবিএ টা আর করা হবে না,যদি ভালো একটা চাকরী না পাই,আর  
ঐ ফ্যামিলি অবশ্যই ভালো,বাট ওরা চাকুরীজীবি মেয়ে চায় না,মুখে ক্লিয়ার না করলেও ছেলে আমাকে বলেছে!খুব বড়জোর কোন কিন্ডারগার্ডেন স্কুলে চাকরীর পারমিশন হয়তো দিবে,কিন্তু সে টাকায় তো এমবিএ কমপপ্লিট করতে পারবো না,ছেলেটা বলেছে,মাস্টার্স করতে এমবিএ না,এতে খরচ কম!তার মানে তিনি বিয়ের পর আমার পড়াশুনার খরচ দিতে পারবেন না,অন্যদিকে চাকরীরও সাপোর্ট দিতে পারবেন না,তো আমি এই অবস্থায় কিভাবে রাজী হই বলেন? '' 
সাথে সাথে কোন কথা বলতে পারলেন না খন্দকার সাহেব! ভেতরে ভেতরে আবারো অস্বস্তি কাজ করতে লাগল! 
চাকরী জীবনের শেষের দিকে এসে সঞ্চয় যা ছিলো তা দিয়ে এই মাথা গোঁজার ঠাঁই টুকু গড়েছেন,তবুও সাথে ব্যাংক লোন লেগেছে। গত একত্রিশটা বছর ধরে,বলতে গেলে একদম শুরু থেকেই টানাটানি করতে করতে কোন রকম জোড়াতালি লাগিয়ে সংসারটাকে এই পর্যন্ত এনে দাঁড় করিয়েছেন। অন্যদের মতো এক্সট্রা সেভিংস বা এসেট তৈরীর সুযোগ তো কখনো আসেইনি! যেখানে ছেলে-মেয়েদের অত্যাবশকীয় প্রয়োজন গুলো পূরণ করতেই হিমশিম খেয়েছেন সেখানে ওদের জন্য বাড়তি কিছু গড়ার চিন্তা কিভাবে করবেন? আল্লাহর রহমতে সন্তানরা নিজেরদের প্রয়োজন পূরন তাকে যথেষ্ট সাহায্য করেছে,কিন্তু তাই বলে এখন...!ভাবতে পারেন না আর কিছু! তবে এই বিষয় গুলো মুনা খুব ভালো করেই বুঝে!সে জন্যই বাঁধছে এতো সমস্যা।
বিয়ে নিয়ে কোন কালেই তার মাথা ব্যাথা ছিলো না!যেখানে তার সহপাঠি-কাজিনরা একে একে বিয়ের পিঁড়ীতে বসেছে,যখন চারপাশে সবাই নিজের বিয়ে নিয়ে জল্পনা-কল্পনা করেছে,মুনা তখন বসে বসে লিস্ট তৈরী করেছে,চাকরীর বেতন পেলে কোন মাসে কি কি করবে!! মুনার ইচ্ছে পড়াশুনা শেষ করে,চাকরী করবে,সংসারের জন্য,নিজের জন্য একটা পজিশন তৈরী করবে। মাসের শেষে বাবা যেমন বেতনটা এনে মায়ের হাতে দিতেন,আর মা সেটাতে বরকতের দোয়া পড়ে ফুঁ দিতেন,ঠিক তেমনি সেও তার বেতন এনে মায়ের হাতে তুলে দিবে,খানিকটা স্বচ্ছলতা আসবে সংসারে,সেই খুশীতে মায়ের চোখ চিকচিক করে উঠবে! ছোট বোনটা ভালো একটা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হবে,দাদী আজন্ম সাধ হ্বজ্জ করবেন,তাকে নিয়ে বাবা-মা দু'জনেই হ্বজ্জে যাবেন,বাবার ব্যাংক লোনটা শোধ হবে,বড় বোনের সংসারটাও স্বচ্ছল না,তাই চাইলেও বোনটার জন্য,ভাগ্নেটার জন্য কিছু করতে পারে না,খুব ইচ্ছে ভাগ্নেটার যত আবদার হবে খালামনি সেটা পূরণ করবে। এমন আরো হাজারো স্বপ্ন মুনার নিজের পরিবারকে নিয়ে!  
মুনা জানে,এসব নিয়ে সে যতোটা ভাবে ভাই ততোটা ভাবতে পারে না!আসলে সংসারের টানাটানির সাথে সে নিজেও কম লড়াই করেনি,আর আজ তাই দূরে যেয়ে এসব থেকেও দূরেই থাকতে চায়,তাছাড়া নিজের বউ-বাচ্চারও তো হক আছে। মুনা এসব নিয়ে ভাইকে দোষারপ করতে চায় না,ভাই তো চেষ্টা কম করে না,বাট একা তার পক্ষে এতগুলো দায়িত্ব পালন করা সম্ভব না,তাই সে চায়,ভাইয়ের দায়িত্বের কিছু ভাগ নিতে। সন্তান হিসেবে তার নিজেরও তো কিছু দায়িত্ব আছে। 

রেহানা বেগম প্লেটে খাবার তুলে দিতে দিতে প্রশ্ন করলেন,
-কথা হয়েছে মুনার সাথে?
খন্দকার সাহেব কিছু বললেন না। রেহানা আবারো বললেন,
-মিনু আপাকে কিন্তু আজকের মধ্যেই জানাতে হবে,কি জানাবে?  
খন্দকার সাহেব অস্থির কন্ঠে বললেন,
-জানিনা! মিতুর মা,আমার আসলে এখন নিজেকে অনেক ব্যার্থ একটা মানুষ মনে হচ্ছে!পুরো জীবনটাই আসলে ব্যার্থ! 
সারাটা জীবন শুধু খেঁটেই গেলাম,কিছু করতে আর পারলাম না! বড় মেয়ের বিয়ে দিলাম,বছর ঘুরতেই জামাই ব্যাবসায় লস খেলো,সেই যে সংসারে অভাব নামলো,আজো গেলো না,কত কষ্ট করে টাকা-পয়সা যোগাড় করে কতো আশা নিয়ে মেয়েটাকে বিয়ে দিয়েছিলাম,আর আজ?মেয়ের ক্লান্তি আর দুঃশ্চিন্তা ভরা মুখের দিকে তাকাতেও সাহস পাই না! ছেলে টা সব সময় নিজের মতো থেকেছে,আজ নিজের সময় মতো বিয়ে করে,নিজের মতো সংসার করছে,মাস শেষ ফিক্সড ৮হাজার টাকা পাঠিয়ে সব দায় চুকাচ্ছে! অন্য দিকে এই মুনা... একাই সব দায়ভার মাথায় নিয়ে বসে আছে! কোন দিক থেকে অযোগ্য না মেয়েটা,শুধু গায়ের রংটা একটু চাপা তবুও ভালো একটা বিয়ে দিতে পারছি না,যাও কিছু ভালো প্রস্তাব আসে,তারাও লেনদেন না হলে চাকরী-পড়াশুনা নিয়ে এমন কিছু শর্ত দিয়ে বসে,যে সব জেনে শুনে মেয়েকে জোর করতেও পারি না!আল্লাহ যে কি এক পরীক্ষায় ফেলেছেন বুঝিনা! ''  
বলতে বলতে কন্ঠরুদ্ধ হয়ে আসে খন্দকার সাহেবের! খাওয়ার প্লেট ওভাবেই পরে থাকে। রেহানা বেগমের ভেতরেও ভাঙ্গন শুরু হয়ে গেছে,তবুও নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন,
-তুমি এতো ভেঙ্গে পড়ো দেখেই কিছু আগাচ্ছে না!এই অবস্থায় কি আমরা একা আছি?এমন বহু পরিবার আছে,তো তাদের মেয়েরা কি কেউ বিয়ে করছে না?সব কি মুনার মতো আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন নিয়ে বসে আছে? যে অবস্থায় আছি,আল্লাহর শুকরিয়া,মানুষ তো এরচেয়েও খারাপ অবস্থায় আছে,নাকি?মিতুর সংসারও এক সময় ঠিক হবে,কিন্তু মুনা?ওর কি বয়স বসে থাকবে?এখন যাও কিছু প্রস্তাব আসছে,ক'দিন পর তো সেগুলোও আসবে না,তখন কি করবে?মেয়ের ইনকামের আশায়,বিয়ে বন্ধ করে রাখবো? ছেলে-মেয়ের ইনকাম খাওয়ার জন্য রাত-দিন খেঁটে এই সংসার গড়ে তুলিনি,এমন মা হতে পারবো না!আমরা চাই,ওরা ভালো থাকুক,সুখে থাকুক এ জন্য যত কষ্ট করতে হয় করবো। 
-কিন্তু মেয়েটা তো রাজি না,কি করে জোর করি? সবই তো বুঝলাম! 
-ওকে রাজি করাতে হবে,অনেক শোনা হয়েছে ওর যুক্তি,আর না!আমি মিনু আপাকে বলবো,আমরাও রাজি,ব্যাস কথা যেনো আগায়। দেখবে আল্লাহই সাহায্য করবেন। 
-না না,আগে মুনাকে বুঝাও,পরে কিন্তু খারাপ অবস্থা হবে!মেয়ে রেগে যেতে পারে। 
রেহানা বেগম হালছাড়ার ভঙ্গিমায় উঠে চলে গেলেন। রান্নাঘরে এসে ধপ করে বসে পড়লেন,চোখের পানি কে এবার আর আটকালেন না! তার খুব মনে পড়ে,ক্লাস নাইনে থাকতে মুনা একবার আবদার করেছিলো,এক জোড়া রূপার পায়েল পড়ার। একবারই বলেছিলো,তিনি বহু কষ্টে টাকা জমিয়ে,তার সাথে মুনার ঈদি যোগ করে বছর খানেক পর কিনে দিয়েছিলেন,পায়েল পেয়ে সে কি খুশী মেয়েটার! কিন্তু সে মাসেই,ওর দাদা অসূস্থ হয়ে যাওয়ায়,মুনার রেজিষ্ট্রেশনের টাকা 
যোগাড় করতে পারছিলেন না,মুনা হাসিমুখে সেই পায়েল জোড়া ফেরত দিয়ে টাকা নিয়ে স্কুলে জমা দিয়েছিলো। রেহানা বুঝেন,তার মেয়েটা খুব সৌখিন,চূড়ি-পায়েল-আংটি এসবের প্রতি খুব ঝোঁক,কিন্তু পারেন নি কখনো খুব সুন্দর দেখে তেমন কিছু কিনে দিতে,আর মেয়েটাও...কোন চাওয়া নেই,শুধু স্বপ্ন দেখে,একদিন নিজে টাকা ইনকাম করবে,তারপর সবার শখ পূরণ করবে,সংসারের এই টানপোড়ন কেটে যাবে!  
বোকা মেয়েটা বুঝে না,এসব স্বপ্ন দেখা সহজ,বাস্তবায়ন করা না। মধ্যবিত্তদের সংসার চিরকাল এমনই থাকে,ঠিক নদীর কূলের মতো,এক পাশ ভাঙ্গে তো আরেক পাশ গড়ে!তবে এ জন্য জীবনটাকে থামিয়ে রাখতে নেই!আল্লাহর উপর ভরসা করে সময়ের সাথে তাল মিলিয়েই এগিয়ে চলতে হয়,আর চলার পথেই যা কিছু হারাবার হারায় আর যা পাওয়ার তা পাওয়া যায়। কোন কিছুর জন্য বসে থাকার সুযোগ নেই। সুখ সব সময় সব কিছু পাওয়ার মাঝেই মিলে না,না পাওয়ার মাঝেও মিলে।   

আমাকে চুপ করে থাকতে দেখে মুনা চেঁচিয়ে উঠলো!
-কিরে তুই কিছু বলিস না কেন?!কি করবো বল না?
আমি চিন্তা করা ভঙ্গিতে বললাম,
-বিয়ে-শাদীর ব্যাপারে আসলে লেট করা ঠিক না,করে ফেল!চারপাশে যা দেখি,তাতে মনে হয়,একমাত্র আমরাই বিয়ে টা কে লিস্টের লাস্ট পয়েন্টে রেখে বসে আছি,বাকী সবাই রাখে টপ লেভেলে!তুইইই বরং বিয়ে করেই ফেল!  
মুনা রেগে যেয়ে বলল,
-তুই আসলে সেলফিশ বুঝলি?!নিজের বেলার ষোল আনা বুঝিস,আর আমার বেলায় বলে ফেললি,করে ফেল!বাহ!শোন,আমার সামনে ভাব না ধরে বাস্তবে এসে কথা বল,কল্পনার দুনিয়ার যুক্তি কল্পনাতেই রাখ।  
-দোস্ত,তোর যে অবস্থা দু'দিন পর আমারো দেখিস একই অবস্থা হবে!সো,ষোল আনা কি আর বারো আনা,যেদিক দিয়েই ভাববি ধাক্কা খেয়ে আবার এখানেই আসতে হবে,সো যদি উপায় না ই থাকে তো বলে ফেল,কবুল!যা হয় হবে! 
মুনার আমার হাত থেকে কমিকসের বইটা টান দিয়ে নিয়ে বলল,
-করে ফেলবো না?যেই ছেলে আম্মা নিয়ে আসছে,সে তার বাড়ির ছোট ছেলে,আমাদের চাইতেও ভালো স্বচ্ছল অবস্থা তাদের,তারা যথেষ্ট ধুমধামের প্রস্তুতি নিয়ে আছে,আর আমার বাসার অবস্থা?লাখ টাকা খরচ করাটাও আব্বুর জন্য পুরাই জুলুম!কিন্তু আব্বু তো তা ঠিকই করবেন,আর তোর কি মনে হয়?কম পক্ষে দু'ভরি স্বর্ণ ছাড়া শ্বশুড়বাড়ি আম্মু আমাকে পাঠাবে?অথচ,আজ ৩২বছরেও আম্মু পারে নাই একটা চেইন গলায় পড়তে!আর আমি তার মেয়ে হয়ে,স্বর্ণের দোকান সাজবো?!ইম্পসিবল!  
আমি গালে হাত দিয়ে নির্বিকার গলায় বললাম,
-দুই ভরি স্বর্ণ পড়লে দোকান সাজা যায় না,আগে খোঁজ নে,ঐ বাড়ির ছোট ছেলে কয় ভরি দিবে!সে যদি কমপক্ষে পাঁচভরির কম স্বর্ণ দেয়,তাহলে তুই আন্টিকে এক ভরিও দিতে দিবি না!!  
মুনা এবার দুই হাত বাড়ালো আমার গলা চেপে ধরার জন্য!আমি দ্রুত দুই হাত তুলে বললাম,
-শান্তি শান্তি!শোন,তুই এক কাজ কর,আরেকবার ইস্তেখারা নামায পড়,আল্লাহর কাছে আরেকবার খুব আন্তরিকতার সাথে দোয়া করে,এই ব্যাপারে একটা সিদ্ধান্ত চেয়ে দেখ,যদি এর পরেও দেখিস বিয়েটা আগাচ্ছে,তাহলে বুঝতে হবে,সিদ্ধান্ত এবার আল্লাহ দিয়ে দিয়েছেন,তুই আর সেটা বদলানোর ট্রাই করিস না,লাভও হবে না। 
-বাট ঐ বাড়ির লোকজনও জানি কেমন!তার মামী আমাকে বলে,'মুখে ভালো কিছু ইউজ করো না নাকি?ব্রণের দাগ বসে আছে যে!আর স্কীনে কেমন পোড়া ভাব হয়ে আছে,নিয়মিত চন্দন লাগাও না?!''চিন্তা করতে পারিস?এসব কথা মেয়ে দেখতে এসে সবার সামনে বলে! 
আমি ঠোঁট ফুলিয়ে মাথা নেড়ে বললাম,
-এসব নিয়ে বলতে বলতে মুখ ব্যাথা হয়ে গেছেরে!কিন্তু কয়লা ধুলে কি আর ময়লা যায়?এসব মানুষিকতা হলো,কয়লার চেয়েও খারাপ,ভিনেগার দিয়ে ঘষেও লাভ নাই!এসব ধরিস না,এক কান দিয়ে ঢুকাবি,আরেক কান দিয়ে বের করবি!
-কিন্তু ঐ লোকের সাথে তো আমার প্ল্যান মিলে না!
এবার আমি দুই গালে হাত রেখে বললাম,
-হায়রে জটিলতা!তাহলে এক কাজ করিস,ডিসিশন ফাইনাল হয়ে যাবার আগে আরেকবার তুই ঐ কুট্টি মিয়ার সাথে  মিটিং এ বসিস। এর আগের বার তো সে এক তরফা তার লেকচার দিয়েছে,মানে,সে কেমন বউ চায়,তার বউ এর দায়িত্ব কর্তব্য কি কি হবে ইত্যাদি নিয়ে বলে গেছেন,এবার তুই তোর লেকচার তাকে শোনা,পজেটিভলি তার কাছে তোর অবস্থান ক্লিয়ার কর,তার পজেটিভ রায় হলে নেগোশিয়েট করবি,না হলে বাটনা পজিশনে যাবি,বাট যেভাবেই হোক,দু'জনে একটা পজেটিভ ডিসিশনে আসবি,দ্যান,আলহামদুলিল্লাহ বলে কবুল বলবি!! 
বাহ,আমি কি দেখি সুন্দর সমাধান দিচ্ছি দেখেছিস?!!মাশাআল্লাহ বল জলদি! 
-চুপ থাক! 
আমি ভেংচি কেটে আবারো কমিকসের বইটা হাতে নিয়ে বললাম, 
-বিনে পয়সায় বহুত মিটিং করছো,এবার বিদায় হও,দ্রুত বাসায় যেয়ে আন্টিকে সিদ্ধান্ত জানা,না হলে কিন্তু তুই কিছু করার আগে তারাই ফাইনাল করে ফেলবে সব! তখন আবার আফসোস করিস না।  
মুনা চিন্তিত মুখ নিয়ে চলে গেলো। আর আমি শুধু মনে মনে আল্লাহকে বললাম,'এই মেয়েটা অসম্ভব ভালো একটা মেয়ে,হে আল্লাহ আপনি তাকে একজন উপযুক্ত জীবন সঙ্গী দিন,না হলে অনেক কষ্ট পাবে মেয়েটা।' 

সপ্তাহ দু'য়েক পর মুনার দাদী অসূস্থ হয়ে পড়ায়,আর ওপক্ষেরও কোন এক মুরুব্বী মারা যাবার কারণে,আল্লাহর অশেষ রহমতে বেশ সিম্পল ভাবেই হুট করে বিয়ে হয়ে যায় মুনার। মাস খানেক আগে জানলাম,ওর বরের দেশের বাইরে চাকরী হয়েছে খুব শীঘ্রই ওরা ওখানে সেটেল হবে। আল্লাহ ইচ্ছেয় মুনার স্বপ্ন গুলোও ইনশাআল্লাহ পূরণ হবে,হয়তো ঠিক যেভাবে সে চেয়েছে সে ভাবে না,বাট যত দূরেই থাকুক,যেখানেই থাকুক মুনা,সবার আনন্দ ওকে অবশ্যই ছুঁয়ে যাবে সেখানেও।

[উৎসর্গঃ মুনা-টুনা কে। ]