জনপ্রিয় পোস্টসমূহ

বৃহস্পতিবার, ২১ নভেম্বর, ২০১৩

পিঠাপুলির জেফত দিলাম মজা কইরা খাইতে :)

''পিঠাপুলির ধুম পড়েছে বাইতে
আঙ্গ বাইত আইয় পিঠা খাইতে
ব্লগের সবাই আইয় কিন্তু আমার গাঁয়ের বাইতে
পিঠাপুলির জেফত দিলাম মজা কইরা খাইতে।''
আমাদের ক্ষুদে ব্লগার সুমাইয়ার এই কবিতাটার কথা কি মনে আছে? আমার কিন্তু মনে আছে,আর সে জন্যই তো ছড়ার সাথে সাথে সবার জন্য পিঠা-পুলি নিয়ে হাজির হয়ে গেলাম :)   
বর্তমানে শহর-গ্রামে হেমন্তের হিম হিম হাওয়াকে ছাঁপিয়ে শীত আসার জন্য একেবারে উঠে-পড়ে লেগেছে যেনো! রোদের তাপ যেমনই হোক,কুয়াশা আর রাতের ঠান্ডা আবহাওয়া খুব ভালো ভাবেই জানিয়ে দিচ্ছি,শীতের বুড়ি এবার বেশ দাপটের সাথেই আসছে! তবে সে যেভাবেই আসুক,আমাদের জন্য তো শীতের কাঁপুনির সাথে পিঠা খাওয়ার সুখ আছেই... 
শীতের সময় আম্মু-খালামণিদের ব্যস্ততা দেখলে মনে হয়,তাদের জন্য বোধহয় গরমের সময়টাই ভালো!! শীত মানেই তো হরেক রকমের পিঠে তৈরী ধুম প্রায় দিন থাকবেই! 
তবে শীত যেহেতু আসা শুরু হয়েই গেছে,তো চলেন আজকের ছুটির দিনে পিঠা খাওয়া শুরু করেই দেই! :) নবান্ন উৎসব বলেন কি পৌষের আমন্ত্রণ আয়োজন সব গুলো হয়ে যাক একসাথে...  
প্রথমে শুরু করুন ভাপা পিঠে দিয়ে। আমাদের দেশে শীত মানেই ভাপা পিঠে,বলতে গেলে শীতের সময় সব পিঠার প্রধান হচ্ছে এই পিঠা। এই পিঠা কয়েক ভাবে তৈরী করা যায়,এবং সেগুলোর আলাদা নামও হয়।
যেমন,ভাপা পিঠা,খেজুরের রসের ভাপা পিঠা,শাহী ভাপা পিঠা ইত্যাদি। প্রতিটাতেই নানান উপকরণ দিয়ে তৈরী করা হয়,যার স্বাদ কিছুটা আলাদা হলেও অসাধারন। 
এবার খেতে পারেন মজাদার চিতুই পিঠা :) ভাপা পিঠার মতোই আমাদের চিতুই পিঠাও অনেক ভাবেই তৈরী হয় এবং সেগুলোর নামও হয় আলাদা। এই যেমন,দুধ চিতুই,খোলা চিতুই,রসের চিতুই,ডিম চিতুই ইত্যাদি। আমাদের দেশে খোলা চিতুই আর ডিম চিতুই টা বলতে গেলে সারা বছরই পাওয়া যায়,তবে শীতের আমেজ অবশ্যই আলাদা। নানান রকমের ঝাল ঝা ভর্তা দিয়ে শীতের সকালে কিংবা বিকেলে চিতুই পিঠা খেতে খেতে আড্ডা দেবার মজাই আলাদা,কি বলেন? 
শীতের সময় রসের চিতুই আর দুধ চিতুই বেশি তৈরী করা হয়,কারণ সংরক্ষন করতে সুবিধা হয়,নষ্ট হবার ভয় কম থাকে,যেহেতু গ্রামে ফ্রিজের প্রচলন কম,শহরেও অনেকেই ফ্রিজে এই পিঠে রাখতে চান না,স্বাদ কমে যাওয়ার ভয়ে। 

হা হা হা...এসে গেছে আমার অসম্ভব প্রিয় কুলি পিঠা :) কুলি পিঠা যে কতো রকমের হতে পারে,এটা আসলে পিঠা উৎসবে না গেলে আমি জানতামই না!!প্রবীন লেখকরা ঠিকই বলতেন 'বঙ্গ নারীর পরিচয়ের একটা ধারক হচ্ছে তাদের রান্না,তাদের রান্নাতেই খুঁজে পাওয়া যায়,তাদের অসাধারন মেধা-গুণের অপূর্ব সমন্বয়'
আমি এই পর্যন্ত তিন রকমের কুলি পিঠা খেয়েছি,কিন্তু গতবার পিঠা উৎসবে যেয়ে জানলাম,কুলি পিঠা অনেক রকমের হতে পারে। এই যেমন, সিদ্ধ কুলি পিঠা,ভাজা কুলি পিঠা,ঝাল কুলি,তিলের কুলি,দুধের কুলি ইত্যাদি।  তবে যতো রকমেরই হোক,স্বাদের দিক থেকে সব গুলোই সেরা। 
আমাকে যদি কোনদিন আমার চরম শক্রু কেউ দাওয়াত দিয়ে বলে,তোমাকে পাটি সাপটা পিঠা খাওয়াবো,আমি মনে হয় সব ভুলে রাজী হয়ে যাবো!! :P তো নিন,আপনাদের জন্যেও রাখলাম চরম মজার পাটি সাপটা পিঠা :)  
আমাদের নানী-দাদী,মা-খালারা যে কতো বড় জিনিয়াস ছিলো,তা আসলে উনাদের রন্ধন শিল্প জ্ঞান দেখলেই বুঝা যায়। ঐতিহ্য ধরে রাখাই বলেন কি সুস্বাদু খাবার তৈরী সব কিছুকেই তারা ধরে রেখেছেন যত্নের সাথে। কতো যত্ন নিয়ে না তারা,মাথা খাটিয়ে যুগ যুগ ধরে তৈরী করে আসছে,এমন হরেক রকমের পিঠা।তার ফলে, এই পাটি সাপটা পিঠাও কয়েক রকমের হয়ে থাকে,যেমন, ক্ষীরে ভরা পাটি সাপটা,গাজরের পাটি সাপটা,চিংড়ি মাছের নোনতা পাটি সাপটা ইত্যাদি।  
এবার নিতে পারেন, পাকান পিঠা । এটা পাকাইতে যদিও আমার কাছে কষ্টকর মনে হয়,তবে এর স্বাদ...কি বলবো,মুখে দিলে সব কষ্ট দূর হয়ে যায়! 
আমাদের জিনিয়াস নারীদের কল্যাণে,এই পিঠেও অনেক রকমের হয়ে থাকে। যেমন, তেলে ভাজা পাকান পিঠা,সুন্দরী পাকান পিঠা,গোলাপ পাকান পিঠা ইত্যাদি। 
 এবার নিন, নকশী পিঠা । চিনি বা গুড়ের সিরায় ডুবিয়ে হাত-মুখ ভরিয়ে নকশি পিঠা খাবার মজাই আলাদা!! ডিজাইন যেমন ইচ্ছে তেমনই করা যায়,গ্রামে অনেক সময় বিয়ে-শাদীতে বর-কণের নাম লিখে এই পিঠা তৈরী করে থাকে। 

এবার একটু ঝাল কিছু খাওয়া যাক। তো নিতে পারেন, বাদাম-নারিকেল ঝাল পিঠা। বাদাম-নারিকেল দুটোই মিষ্টি উপাদান হলেও,এখানে গোল মরিচ দেয়া হয়,আর তাই হয়েছে নাম ঝাল পিঠা! তবে খেতে কিন্তু ভীষন মজা।  

কি?আর কতো খাবেন? কত্ত গুলো পিঠা খাওয়ালাম!! :D  এবার পিঠা খাওয়া শেষ তবে নতুন চালের তৈরী পায়েস কিন্তু খাওয়ানো হয়নি...তাই না? নো চিন্তা...এই নিন, 

পায়েস পছন্দ করে না,এমন মানুষ থাকাই উচিত না! আমাদের দেশে যে,কতো রকমের আর কতো স্বাদের পায়েস তৈরী হয় তা বলে শেষ করা যাবে না। যেমন ধরুন, গুড়ের পায়েস,ফুলকপির পায়েস,গাঁজরের পায়েস,খেজুরের রসের পায়েস,বাঁধাকপির পায়েস ইত্যাদি। 

কবি সার্থক বলেছে,'এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি/সকল দেশের রাণী সে যে আমার জন্মভূমি' কতো সমস্যা,কতো অভাব তারপরেও আমাদের অপার্থিব আনন্দ-সুখের শেষ নেই।আমাদের দেশে ছয়টি ঋতু আছে,প্রতিটা ঋতুই অসাধারন বৈশিষ্ট্য-ঐতিহ্য নিয়ে আসে,সমস্যার সাথে সাথে আনন্দও নিয়ে আসে। মহান আল্লাহ সত্যিই আমাদেরকে অনেক দিয়েছেন,আর যা দিয়েছেন তার খানিকটা সঠিক ব্যবহার করেই আমরা অনেক সুখে থাকতে।  

হুমম... খুব তো খাওয়া হলো! এবার? এবার রিজিক দাতা আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করেন,আর শুকনোপাতার জন্য কল্যাণ কামনা করে দোয়া করেন। :) :)   

বুধবার, ২০ নভেম্বর, ২০১৩

লোভ

মোরগটা সেই কখন থেকে অকারণেই ডাকছে,বেলা তো শুরু হয়েছে সেই কখন,তো এখনো এতো ডাকার কি আছে?
একরাশ বিরক্তি নিয়ে চোখ দুটো মেললেন নাসিমা,শোয়া অবস্থাতেই মাথা ঘুরিয়ে এদিক-ওদিকে তাকালেন। ছেলে-মেয়েদের কাউকেই দেখতে পাচ্ছেন না,ঘরের ভেতর বলতে গেলে তিনিই আছেন। ঘড়ির দিকে তাকালেন,প্রায় দশটা বাজতে চলছে!উঠে বসার চেষ্টা করলেন নাসিমা,কিন্তু পারলেন না,খুব কষ্ট করে বালিশে হেলান দিয়ে দুর্বল কন্ঠে ডকলেন,
-আরিফ... ও আরিফ,কইরে বাজান,একটু এদিকে আয়
আরিফের কোন সাড়া শব্দ পেলেন না,কিছুক্ষন পর মেঝ ছেলে মুনির কি কাজে যেনো ঘরে ঢুকলো,তাকে দেখে বললেন,
-কিরে বাজান?তোর বড় ভাই কই?
-ভাই তো স্কুলে গেছে,সামনে তার পরীক্ষা।
-তুই যাস নাই স্কুলে?
-নাহ,আইজ আর যামু না,কাইল যামু।
নাসিমার খুব মাথা ঘুরছে,আর নিঃশ্বাস মনে হয় বারবার ভারী হয়ে আসছে!
-তোর মামা ফোন দিছিলোরে আর?
-নাহ,দেই নাই।
নাসিমা আর কিছু না বলে চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকে। মাথায় নানান দুঃশ্চিন্তা ঘুরছে,কি করবে কিছুই বুঝতে পারছে না!এদিকে আরিফের বাবারও কোন খবর নেই,সে পাশে থাকলেও না হয় কিছু একটা উপায় করা যেতো।
চারদিন যাবত লেবার পেইন নিয়ে ঘরে বসে আছেন নাসিমা,ডাক্তারর দেয়া ডেট পার হয়ে গেছে আরো আগেই,গ্রামের ক্লিনিকে গিয়েছিলেন,কিন্তু যেহেতু তার পেইন তেমন বেশি না,এই বাড়ছে তো কমছে অবস্থা তাই তারা বলেছে,ঠিক মতো পেইন না উঠলে তাদের পক্ষে কিছু করা সম্ভব না। গ্রামের সামান্য ক্লিনিক,তেমন অভিজ্ঞ কেউ নেই, কোন রকমে চলে,মাসে দু'এক বার শহর থেকে ডাক্তার আসেন,তখন লোকজন আসে ফ্রি চেকাপ করাতে। বেশি সিরিয়াস কিছু হলে,উপজেলার সরকারী হাসপাতালে যেতে হয়,যদিও সেখানে একই অবস্থা। ডাক্তার থাকে না সব সময়,নার্সরাই সব কিছু সামলায়।
নাসিমা গত তিনদিন যাবত হাঁটা-চলা করতে পারছে না,হাত-পা অবশ হয়ে আসছে মনে হয়,আর মাথা সারাক্ষন ঘুরতেই থাকে!বাচ্চা গুলো ছোট,ওদের বাবা গেছে অন্য জেলায় ধান কাটতে,কবে ফিরবে জানে না,হাতে টাকা পয়সাও নেই,এই অবস্থায় হাসপাতালে কিভাবে যাবে,কি করবে সে কিছুই বুঝতে পারছে না!
মেয়ে আইরিনকে দেখে ইশারায় ডাকদিলো,কাছে এলে মোবাইলটা দিতে বলল,হাতে নিয়ে বড় ভাবীর নাম্বারে কল দিলো,একবার-দুইবার-তিনবার...নাহ,ভাবি ফোন ধরছেই না।
নাসিমা জানে ভাবি আসলে ইচ্ছে করেই ফোন ধরছে না,সে জানে,এখন নাসিমার টাকার দরকার তাই! নাসিমারও ইচ্ছে করে না,ভাইদের কাছে হাত পাততে কিন্তু কি করবে?নিরুপায় হয়েই ভাবিকে ফোন দেয়,কখনো বা বিদেশে অবস্থান করা ভাইকে মিসকল দেয়,ভাইয়ের যদি ইচ্ছে হয় তখন কল ব্যাক করে। বাবা-মা নেই,জামাইও তেমন উপার্জনক্ষম না,এমন অবস্থায় কতো বার ই বা ভাবি চাইবে,নিজের সংসারের টাকা ননদকে দিতে! নাসিমা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে,মনে মনে আল্লাহকে ডাকতে থাকে সে,কোনভাবে যেনো আল্লাহ একটা ব্যাবস্থা করে দেন।

-মা,আমার তো সামনে পিএসসি পরীক্ষা,স্যারেরা কইছে,২০০টাকা কইরা দিতে,নাইলে প্রবেশপত্র দিতো না।
আরিফের গলার আওয়াজ পেয়ে চোখ মেললেন নাসিমা। কিছু না বলে চুপ করে থাকলেন,কি বলবেন?নিজের যে অবস্থা,বাঁচেন কি মরেন তাই বুঝতে পারছেন না,আর সেখানে ছেলে-মেয়েদের প্রয়োজন!কি করবেন জানেন না! ভাবতে ভাবতে হঠাত কি মনে হওয়াতে দ্রুত ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন,
-বাজান,মোবাইল থেইকা তোর আয়শা খালার নম্বরটা বাইর কইরা দে তো,দেখি আফারে ফোন দিয়া!
আয়েশা তার বড় খালার মেয়ে,শহরে থাকেন,তাকে অনেক আদর করেন,আপাকে বলে যদি,ভাইয়ের কাছ থেকে কিছু টাকা ম্যানেজ করা যায়,তাহলে হয়তো হসপিটালে যেতে পারবেন। আর যদি ভাই নাও দেয়,আপা পারবেন বাকী খালা-মামাদেরকে বলে টাকা ম্যানেজ করে দিতে। আল্লাহর অশেষ রহমতে,আপা ফোন ধরলেন,সব কথা শুনে বেশ রাগ হলেন তিনি,
-এটা কোন কথা হইলো?তোর জীবন-মরণের সমস্যা আর তোর ভাই-ভাবি আছে টাকার হিসাব নিয়া!!আর তুইও... চারদিন ধরে ব্যাথা উঠে আছে,আর তুই বাসায় বসে আছিস?ছেলে-মেয়ে গুলোর জন্য কি টান আছে?
নাসিমার খুব কান্না পায় আপার কথা শুনে!
-আফা কি করমু কন?আপনেগো জামাইও বাড়িত নাই,আমার হাতে একটা টাকাও নাই!
খানিক্ষন ভেবে আপা বললেন,
-শোন,আমার কাছে এই মুহুর্তে হাজার পাঁচেক টাকা আছে,আমার বাজারের খরচ,পাঠায় দিচ্ছি,আর তোর ভাইকেও বলতেছি,ও পরে আমাকে এই টাকা দিয়ে দিবে,এখন তুই আসমাকে ফোন দিয়ে আসতে বলে, রেডি হো আর দেরি করসিন না বোন...
মনে মনে আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা জানালেন নাসিমা। প্রতিবেশিদের সহযোগীতায় বিকেল নাগাদ নাসিমা যখন হাসপাতালে পৌছালেন,ততোক্ষনে তার ব্যাথা আরো তীব্র হয়েগেছে,এমন অবস্থায় ডাক্তার ও নেই,হরতালের কারণে,শহর থেকে ডাক্তার আসতে পারেননি! যিনি এসেছিলেন,দুপুরের পর পরই চলে গেছেন। বাধ্য হয়ে নার্সরা অপেক্ষা করতে বললেন।
আল্লাহর অশেষ রহমতে রাতের দিকে নরমাল ডেলিভারি হলো,চতুর্থবারের মতো ছেলে সন্তানের মা হলেন নাসিমা।
সকালের মধ্যে আরো দুই খালাকে ফোন দিয়ে আয়েশা আপা আরো কিছু টাকা ম্যানেজ করে পাঠিয়েছেন,ছোট বোন আসমাও এসেছে। ডাক্তার চেকাপ করে বলে গেলেন,বিকেলে নাগাদ বাড়ি চলে যেতে পারবেন নাসিমা।

দুপুরের বোনের আনা খাবার খেয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন নাসিমা,হঠাত এক নার্স এসে বললেন,
-আফনের নাড় পরিস্কার করতে হইবো,সোজা হইয়া শুয়েন দেখি!
নাসিমা অবাক হয়ে বললেন,
-আমার তো নরমালেই বাচ্চা হইলো,আর ডাক্তার আফা তো সকালে দেইখা গেলো,কই?কিছুতো কইলো না!
-সব কথা কি হেরা আফনেরে কইয়া যাইবো?তাইলে আমরা আছি কি করতে?যা কইতাছি শুনেন!
অগ্যাত বাধ্য মেয়ের মতোই নাসিমা শুয়ে পড়লেন। বুঝতে পারলেন না,এসব লোভী নার্সদের একটা কৌশল!এরা গ্রামের সহজ-সরল রোগী পেলে তাদেরকে বেশি সময় হসপিটালে রাখার জন্য এরা সিজার/নরমালে ডেলিভারি হবার পর সেলাইয়ের জায়গাতে অথবা নাজুক জায়গা গুলোতে হাত লাগিয়ে ক্ষতের সৃষ্টি করে! অনেক সময় এদের এইসব লোভের বলি হয়ে রোগীনি মারাও যায়! কিন্তু তাতে কি?এদের দরকরা টাকা!
কিন্তু নাসিমা যখন বুঝতে পারলো,ততোক্ষনে অনেক দেরি হয়ে গেছে!! নাসিমা তাকিয়ে দেখলো,তার চারপাশ রক্তে ভেসে যাচ্ছে! এতো রক্ত...মনে হচ্ছে কোরবানীর সময় গরু জবাই করলে যেমন রক্তে চারপাশ ভেসে যায়,ঠিক তেমন!
নাসিমা অসহায়ের মতো নার্স মহিলার দিকে তাকিয়ে বললো,
-বইন,কি করলেন আফনে?আমারে মাইরাই ফালাইলেন?!আমার পোলাপাইন গুলার কি হইবো এখন!!
বলতে বলতে জ্ঞান হারালেন নাসিমা। চতুর নার্স এর বুঝতে সময় লাগলো না অবস্থা আসলে কি!আর কি করতে হবে তাকে!
দ্রুত নাসিমার বোনের জামাইকে ডেকে বললেন,
-ইনারে জলদি শহরের হাসপাতালে নিয়ে যান!এর অবস্থা ভালো না!জলদি নিয়া যান!
কোন রকমের রক্ত বন্ধ করে নাসিমাকে নিয়ে যখন শহরের হাসপাতালে ছুটা হলো,ততোক্ষনে নাসিমার প্রাণ শক্তি অনেকটাই নির্জীব হয়ে গেছে!
অস্পষ্ট চোখে নাসিমা দেখতে পায়,তার বাড়ীটাকে,তার বাচ্চাদেরকে উঠোনে খেলতে,জাল বুনাতে ব্যস্ত তাদের বাবাকে!
বড় বড় করে নিঃশ্বাস নিতে চেষ্টা করে নাসিমা!তার মনে হচ্ছে,অনেক দিন পর তার প্রিয় মা পাশে বসে আছেন। বলছেন,
-মা গো,কষ্ট হইতাছে অনেক?আরেকটু সবুর কর,আমি তোরে লইয়া যামু আমার লগে!
নাসিমার চোখের কোণ গুলো ভিজে উঠে বার বার! জ্ঞান হারানোর পূর্বে নাসিমা কেবল শুনতে পায়,তার বোন বলছে,
-ও আফা,এই যে আইছি আমরা হাসপাতালো!কিচ্ছু অইতো না তোমার!
এম্বুলেন্সটা তখন সত্যি সত্যি হসপিটালের গেট ধরে ভেতরে প্রবেশ করে ছিলো।

[উপরের ঘটনাটা সত্যি। আমাদের দেশে এভাবেই প্রতিদিন অনেক নাসিমারা প্রাণ হারাচ্ছেন,অকালে চলে যাচ্ছেন আমার শাহানা মামীর মতো অনেকেই। এইসব দালাল-নার্সদের অমানুষিক কাজ-কর্ম আর লোভের কারণেই,অনেক অবুঝ সন্তানেরা মা হারা হচ্ছে! আমাদের দেশের গ্রাম গুলোতে চিকিৎসা ব্যাবস্থা এখনো অনেক অনুন্নত!বেশিরভাগ সময়ই,হয় দেরি হয়ে যায় অনেক!রক্ত পাওয়া যায় না,না হলে চিকিৎসা পাওয়া যায় না!তার উপর এই সব মানুষরুপি পশুগুলো!জানিনা,আমাদের সমাজের নাসিমারা ঐ সব লোভী-সাইকো মানুষ গুলোর অত্যাচার থেকে কবে মুক্তি পাবে!শুধু নাসিমাদের মুখের দিকে তাকালে,চোখের পানি ধরে রাখতে পারি না!]  

বৃহস্পতিবার, ১৪ নভেম্বর, ২০১৩

আঁধারে ইরাবতীর আলো...


কাঠফাঁটা দুপুরের রোদটার তেজ অনেকটাই কমে এসেছে মনে হচ্ছে,সময়ের নিয়মে সূর্যটা এখন ফিরে যাবার পথে এগুচ্ছে। দিন শেষের এই সময়ে সবাই ই নীড়ে ফেরার পথে আছে,কিন্তু আজ যেনো রাজ্যের ক্লান্তি যেনো এসে ভর করেছে চোখে,এতোটা দুর্বল কেন লাগছে?দুপুরে খাওয়া হয়নি বলেই বোধহয়! আরশি সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে পা চালানোর চেষ্টা করতে করতে একটা সময় বাসার সামনে এসে পৌছায়। অভিদের বাসা থেকে তার বাসার দুরত্বটা এমন যে,না রিকশায় আসা যায়,আর না কম সময়ে হেঁটেও আসা যায়!বাসা থেকে বেরোবার সময় ইচ্ছে করলে দুপুরে খেয়েই বের হতে পারতো,কিন্তু খুব একটা ক্ষুধা ভাব মনে হচ্ছিলো না দেখে এসেই খাবে,ভেবে বেড়িয়ে গিয়েছিলো টিউশনীর উদ্দ্যেশ্যে।
বাসার দরজার সামনে এসে কলিংবেলে চাপ দিতে যাবে ঠিক তখনই কানে ভেসে আসল,কান্নার শব্দ!আরশি কিছুক্ষন চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। এই মূহুর্তে তিনতলায় উঠার মতো অবস্থা নেই তার,কিন্তু কান্নার শব্দটা খুব করে যেনো বাঁধছে বুকে! ভাবতে ভাবতে কখন যে তিন তলায় উঠে এসেছে সে টেরই পায়নি!কলিংবেলে কয়েকবার চাপ দিলো একসাথে,দরজা খুলে দিতেই কান্নার শব্দটা আরো জোরে ভেসে আসল,আরশি নিজের ক্লান্ত মুখে হাসি ফুটিয়ে বলল,
-কি হয়েছে গো?এতো কান্না কেন?!হুম?
বলতে বলতে দু'হাত সামনে বাড়তেই কোলে চলে আসল,৮মাস বয়সি ইরা। আরশি ওকে কোলে নিয়ে বুকে চেঁপে ধরলো,
-কি হয়েছে ইরাবতী?কাঁদছো কেন?কেন এতো দুঃখ আপনার চোখে?
ছোট্ট ইরা কি বুঝলো কে জানে,আরশিকে দেখে মনে হলো,তার প্রাণ ফিরে এসেছে,অস্পষ্ট সব শব্দে কি কি যেনো ঠোঁট ফুলিয়ে বলতে লাগল,যেনো কতো কথা তার আরশির সাথে!
আরশি মুচকী হেসে আবারো বুকে জড়িয়ে ধরলো। কাজের মেয়েটাকে জিজ্ঞেস করলো,
-সকালে যে খিঁচুরী রেখে গিয়েছিলাম,দুপুরে খাইয়েছিলে তা?
-সেটা খাওয়ানোর চেষ্টাই তো করতেছি! কিন্তু কিছুই তো খাইতে চায় না আমার হাতে!
-হুম,আচ্ছা,বাটিটা নিয়ে একটু আমার সাথে নিচে আসো,আমিও দুপুরে খাইনি কিছু,আমি খেতে খেতে ওকে খাওয়াবো,ঠিক আছে?
মেয়েটা মাথা নেড়ে রাজী হলো। সে ও মনে হলো হাফ ছেঁড়ে বেঁচেছে! ইরাকে নিয়ে ঘরে ঢুকে ক্লথ বিছিয়ে বিছানার মাঝখানে বসাতে বসাতে নীচু স্বরে বলল,
-ইরাবতী,গুড গার্লের মতো এখানে বসে থাকো ওকে?খালামণি,হাত মুখ ধুবো,তারপর আমরা একসাথে খাবো,ঠিক আছে?একদম নড়াচড়া করবে না কিন্তু হুম?
কিন্তু ইরাকে রেখে আরশি দু'কদমও আগাতে পারলো না,মেয়েটা হামাগুড়ি দিয়ে দ্রুত বিছানার কিনারে চলে আসল!বাধ্য হয়ে সে বিছানায় বসলো,
-ওরে ইরাবতী?এতো চঞ্চল হলে হবে?খালামণি অনেক টায়ার্ড যে,খুব ক্ষুধা লেগেছে তো?একটু বসো মা,আমি এক্ষুনি আসছি!
ইরা ততোক্ষনে আরশির চুল নিয়ে খেলা শুরু করে দিয়েছে! ওদের কথার শব্দে বিছানার ওপাশে শুয়ে থাকা তিথীর ঘুম ভেঙ্গে গেছে ততোক্ষনে,সে এপাশ ফিরে আরশির দিকে তাকিয়ে বললো,
-ওকে আবার এখন আনার কি দরকার ছিলো?
-খুব কাঁদছিলোরে,কিচ্ছু খায়নি দুপুরে,তাই নিয়ে আসলাম!
অনেকটা কৈফিয়ত দেবার মতো করে বললো আরশি। তিথী কপাল কুঁচকে বললো,
-কেন ওদের কাজের মেয়েটা কি করে?আস্ত ফাঁকিবাজ একটা!একটা ঘন্টাও সামলাতে পারে না ওকে!আর তুমিও একজন,সারাক্ষন নিজের কাছে রাখো,বদঅভ্যাস হয়ে যাচ্ছে তো,পরে কিন্তু আর দূরে রাখতে পারবে না,দেখো!
আরশি কিছু না বলে চুপ করে থাকলো। তিথী সব সময় এমনই করে,বাচ্চাদেরকে ওর খুব একটা পছন্দ না,আর তাই ইরা কে বাসায় দেখলেই এমন অনেক মন্তব্য করবে! বড় বোনকে চুপ থাকতে দেখে,শোয়া থেকে উঠে বসল, আগের মতো গলায় ঝাঁঝ নিয়েই বললো,
-বসে আছো কেন?আমি উঠেছি তো,যাও এখন,হাত-মুখ ধুয়ে খেয়ে নাও আমি দেখছি ওকে। এই যে আহ্লাদী বেগম,আসেন এদিকে,ওরটা ছেড়ে এখন আমার চুল ছিঁড়েন!
ইরা ভূবন ভুলানো হাসি দিয়ে তিথীর দিকে দৌড়ে গেলো,আর তা দেখে তিথীও বিরক্তি ভুলে হাসতে লাগল!

গত চারমাস যাবত আসিফ আপ্রাণ চেষ্টা করে অফিস থেকে যতোদ্রুত সম্ভব বাসায় ফেরার। কিন্তু যতো দ্রুতই বের হোক না কেন,জ্যাম পেড়িয়ে বাসায় ফিরতে ফিরতে তার সন্ধ্যে হবেই! আজো আধা ঘন্টা যাবত জ্যামে বসে প্রচন্ড ভাবে রাগে ফুঁসছিলো,হঠাত মোবাইলটা বেজে উঠলো,হাতে নিয়ে দেখলো বড় খালার ফোন। রিসিভ করে সালাম বিনিময়ের পর খালা জিজ্ঞেস করলেন,
-কিরে তুই এখনো বাইরে?
-হ্যাঁ খালা,অনেক জ্যাম রাস্তায়!
-হায়রে,ওদিকে মেয়েটা না জানি কি করছে!আমি ফোন করেছিলাম,কাজের মেয়েটা বললো,বাড়ীওয়ালার মেয়েটা নাকি এসে নিয়ে গেছে ওদের বাসায়,আচ্ছা আসিফ,এভাবে আর কতোদিনরে?এভাবে কি চলে?
আসিফ চুপ থেকে বলল,
-আমি তো চেষ্টা করছি,ট্রান্সফার হয়ে বাসার কাছাকাছি পোষ্টিং নিতে,হয়ে গেলে খুব একটা চিন্তার কিছু নেই আর!তখন ইরা কে সামলাতে বেশি সমস্যা হবে না।
-গাধার মতো কথা বলিস না!একটা বাচ্চা কিভাবে পালতে হয় জানিস কিছু?মা ছাড়া বাচ্চা মানুষ করা যায়?বাসায় একজন মুরুব্বী নেই,নিজে থাকিস অফিসে,ঐটুকু দুধের বাচ্চাটা কি করে সারাদিন থাকে কাজের মেয়ের কাছে শুনি?''
এই জাতীয় কথা গত চার মাস ধরে শুনতে শুনতে আসিফ ক্লান্ত হয়ে গেছে!চারপাশে সবার একই কথা,'আবার বিয়ে করো,আর কিছু না হোক,মা মরা বাচ্চাটার দিকে তাকিয়ে হলেও!' কিন্তু আসিফ কোন কিছু ভাবতে পারে না!
আর কি করেই বা পারবে? কলেজে থাকতে সে নিজেও মাকে হারিয়েছে,ক'দিন পর ভাই-বোনের দিকে তাকিয়ে বাবা বিয়ে করেছিলেন,কিন্তু তারপরের দিন গুলো ওদের জন্য সুখের ছিলো না!সৎ মায়ের সংসারে একের পর এক অশান্তির কারণে বাধ্য হয়ে মা হারানোর কষ্ট বুকে নিয়ে বাড়ি ছেড়েছিলো সে। তারপর বলতে গেলে একাই কাটিয়েছে অনেক গুলো বছর। পড়াশুনা শেষ করে চাকরী নেয়ার বছর খানেক পরেই বড় খালা বিয়ে দিয়েছিলেন মিরার সাথে।
আসিফের মনে হয়েছিলো এতো বছর করা কষ্টের বিনিময়েই বোধ করি আল্লাহ তার জীবনে সুখ ফিরিয়ে দিয়েছিলেন,তার জীবনে দিয়েছিলেন মিরার মতো কাউকে,যাকে নিয়ে আসিফ নতুন করে শুরু করেছিলো সব কিছু।
কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছে বোধহয় তা ছিলো না,আর তাই তো আসিফকে রেখে,সাজনো সংসার রেখে,ইরার মতো একটা ফুঁটফুঁটে পরীকে রেখে চারমাস আগে রোড একসিডেন্টে মিরা চলে যায় চিরদিনের জন্য।
আসিফ ইরার মুখের দিকে তাকিয়ে ভেবেছিলো আবারো বিয়ে করার কথা,কিন্তু নিজের জীবনের দুঃসহ দিন গুলোর কথা মনে করে সাহস পায়নি! নিজের ফেলে আসা অতীতের মতো ইরার জীবনটা হোক তা চায়নি সে। অন্যদিকে ঠিক মতো ইরার যত্ন নিতে পারছে না দেখে মনে মনে আফসোস আর অপরাধবোধেরও শেষ নেই তার! কি এক উভয় সংকটের মধ্যে সারাটা সময় পার করছে সে!

ইরার মুখটা অসম্ভব মায়াবী মনে হয় আরশির কাছে,ঠিক ওর মায়ের মতো হয়েছে। বাচ্চাটার মুখের দিকে তাকালেই মনটা ভরে যায় যেনো,এমন মায়াবতী একটা মেয়ে এই অবুঝ বয়সেই মা কে হারিয়েছে,ভাবতেই বুকটা কষ্টে ভরে যায় আরশির।সে ইরার নাম দিয়েছে 'ইরাবতী',ইরা-মায়াবতীর সংক্ষিপ্ত রূপ।ইরাবতীর দিকে তাকালে আরশির মনের চোখে আরেকটা মুখ ভেসে উঠে! অনেক বছর আগের সেই ছোট্ট 'রাত্রীর' মুখটা।
৮বছর বয়সে ক্যান্সারে নিজের মা কে হারিয়েছিলো আরশি,ছোট বোন রাত্রীর বয়স তখন দেড় কি দুই বছর। আরশির এখনো মনে আছে,আম্মু মারা যাবার ক'দিন পর এসে নিঃসন্তান সেঝ খালা রাত্রীকে নিয়ে চলে যান সুদূর লন্ডনে। যাবার সময় ওর কোল ছেড়ে যেতে চাইছিলো না রাত্রী,খালা এক রকম জোর করেই নিয়ে গিয়েছিলেন...!! আজ এতো গুলো বছর পরেও কাঁদতে থাকা সেই ছোট্ট নিস্পাপ রাত্রীর মুখটা আরশির মনে ভাসে! বছর খানেক পর বাবা বিয়ে করেছিলেন আবার,কিন্তু রাত্রীকে আর ফিরিয়ে আনা হয়নি,কতো রাত যে বোনের জন্য চুপিচুপি কেঁদে কাটিয়েছে তা শুধু সে ই জানে। একসময় তিথী আসল দুনিয়ায়,ওকে কোলে নিয়েই রাত্রীর জন্য হাহাকার করা বুকে স্বান্তনা খুঁজে ফিরেছে আরশি।
কিন্তু কেন জানি মনে হয়,আজ এতো বছর পরে এসে সে যখন ইরাকে বুকে চেপে ধরে,কেমন জানি পূর্ণতা অনুভব করে যেটা অনেক বছর আগে রাত্রীকে কোলে নিলে মনে হতো! আর তাই যতক্ষন সে বাসায় থাকে,যতক্ষন ইরাবতীর বাবা না আসে,ততোক্ষন সে ইরাকে নিয়ে সময় কাটায়। যদিও আশে-পাশের লোকজন,এমন কি আম্মা-তিথীও বিষয়টা বেশি ভালো চোখে দেখেন না,খুব বিরক্ত বোধ করেন,তার উপর আরশি নিজে একটা অবিবাহিত মেয়ে হয়ে,আরেকজনের বাচ্চার জন্য এতো দরদ বোধ করবে,স্বাভাবিক ভাবেই বিষয়টা সবাই ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখে! আরশি সবই বুঝে কিন্তু সেসবে মাথা ঘামায় না!তার ইরাবতীর মুখের হাসি দেখলেই সব কষ্ট দূর হয়ে যায়।
আরশি জানে না,ইরার জন্য ওর এই ভালোবাসাটাকে কি বলবে?কিংবা ইরার বাবা যখন আবার বিয়ে করবেন,তখন ইরাকে ছাড়া সে কিভাবে থাকবে! কিন্তু এতটুকু সে বুঝে,তার নিঃসঙ্গ আর কষ্টের আঁধারে জমা এই জীবনটাতে ইরাবতী হচ্ছে একখন্ড চাঁদের হাসি!

আসিফ বরাবরের মতোই খানিকটা অস্বস্তি নিয়ে তিথীদের বাসার কলিংবেল চাপল। এই পরিবারে কোন ছেলে নেই বলে,চাচা ছাড়া আর কারো সাথে খুব একটা কথা তার কখনো হয়নি,যদিও মীরার সাথে চাচার বড় মেয়ে আরশির খুব ভালো বন্ধুত্ব ছিলো,সেই সুবাদেই ইরা কে সে আরশির কাছে থাকতে দেয়। কিন্তু তার সাথে কখনোই খুব একটা কথা তার হয়নি।
দরজা খুলেই ক্লাস নাইনে পড়ুয়া তিথী আসিফকে দেখে বরাবরের মতো হড়বড় করে বলা শুরু করলো,
-এই আপনার আসার সময় হলো?আপনার মেয়েটা তো আমার বোনকে জ্বালিয়ে শেষ করে ফেলছে,আরেকটু হলে পাগল বানিয়ে ছাড়তো!!কি যে দস্যি মেয়ে আপনার,উফফ...নালিশ দিয়ে শেষ করা যাবে না,বুঝলনে?
আসিফ মুচকি হেসে বলল,
-ভাগ্যিস,তোমাকে জ্বালায় না!যাইহোক,কোথায় সে,দাও নিয়ে যাই'' আসিফের কন্ঠ শুনে আরশি তিথীকে ডেকে বলল,ইরা এখন খাচ্ছে শেষ হলে উপরে দিয়ে আসবে। আসিফ উপরে চলে গেলো,ফ্রেশ হয়ে খেতে বসে তার মনে হলো,যা খাচ্ছে তার চেয়ে না খাওয়াই ভালো!!এইরকম খাবার এর চেয়ে হোটেলের রান্নাও অনেক ভালো! ভাগ্যিস,আরশি ছিলো,না হলে ইরাটা কে যে কি খেয়ে দিন কাটাতে হতো কে জানে!আসিফ ভাবতে ভাবতে কিছুটা অবাক হয়!!তিথীকে যেমন দেখেছে,আরশি মনে হচ্ছে সম্পূর্ণ তার বিপরীত। খুব চুপচাপ,আর আত্ননির্ভর্শীল মনে হয়েছে,আজ এতো গুলো দিন ধরে সে ইরাকে সঙ্গ দেয়,রাত নেই দিন নেই,যখনই দরকার হয় ইরার জন্য হাজির কিন্তু কোন দিন বিরক্তির কোন ছাপ দেখেনি সে! মেয়েটা বেশ ভালোই,কিন্তু শুধুমাত্র ইরার জন্যই হয়তো।

আরশি গত দু'দিন যাবত বলতে গেলে সারাটা সময় ধরেই বারান্দায় বসে আছে!! সারাটা ক্ষন সে অপেক্ষায় আছে,কখন কলিংবেলটা বাঁজবে! দু'দিন আগে ইরাকে নিয়ে খালার বাসায় গেছে আসিফ,খালা ইরাকে দেখতে চেয়েছেন তাই। কথাটা শুনে আরশির খুব রাগ লেগেছে!''কেন যাবে ইরা কে নিয়ে?নিজে যাচ্ছে যাক,ইরা কে নিয়ে কেন যাবে?'' পরক্ষণেই আবার মনে হয়েছে,তার মেয়ে সে নিয়ে যেখানে খুশী যাবে,এতে আরশির রাগ হওয়ার কি আছে?! কিন্তু ইরাকে না দেখে থাকতে হবে মনে হতেই বুকটা বার বার গুমরে কেঁদে উঠছিলো!যাওয়ার সময় লজ্জার মাথা খেয়ে আরশি নিজেই আসিফের কাছ থেকে মোবাইল নাম্বার চেয়ে রাখে,আর দু'দিনে কতো বার যে সে আসিফকে ফোন করেছে তার হিসেব নেই!!
''ইরা কাঁদছে কি না,ইরা খেয়েছে নাকি,ওর খিঁচুরীতে ঝাল যেনো দেয়া না হয়'' এমন হাজারো খবর বলার-জানার জন্য,ইরার কন্ঠ শোনার জন্য ব্যাকুল হয়ে থেকেছে আরশি। ইরাকে ছাড়া পুরো বাসাটাই ওর কাছে অসহ্যকর ঠেকছে যেনো!ওর এমন ছটফটানি দেখে আম্মা-তিথি খুবই বিরক্ত! এমন করছে কেন মেয়েটা?মনে হচ্ছে সে ই ইরার মা!কলিংবেলের আওয়াজ শুনলে ওর ছটফটানি দেখে তিথী বলেই ফেলেছে,
'মনে হচ্ছে,তোমাকে ইরার বাবার সাথে বিয়ে দিতে হবে!!আগেই বলেছি,এতো মায়া বানিও না পরের মেয়ের জন্য,নাহ শোননি,এখন বুঝ!' ওর সাথে সায় মিলিয়ে আম্মাও বলেছেন,
'আমিও কতো না করেছি,কিন্তু এই মেয়ে তো শোনেই না কারো কথা!মেয়ে মানুষের মন হচ্ছে মায়ের মন,বাচ্চার জন্য মায়া লাগবেই,কিন্তু তাই বলে আরেকজনের বাচ্চার জন্য??এসব পাগলামী বন্ধ কর,না হলে কিন্তু ঝামেলায় পড়বি!''
ওদের কথার কোন জবাব আরশি দেয়নি। কি বলবে সে?সে নিজেও তো অবাক!এমন কেন করছে সে? তার ইরাবতী আরেকজনের বাচ্চা,ওর কোন দরকার নেই এতো ব্যাকুল হবার,কিন্তু সে কেন পারে না?কেন ইরার কান্না শুনলে অস্থির হয়ে যায়? আরশি লাইট অফ করে বারান্দায় বসে বাচ্চাদের মতো ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে! ওর বারবার মনে হয়,ইরার সাথে ওর রক্তের সম্পর্ক নেই তো কি হয়েছে,আত্নার টান আছে!ইরাকে দেখলে,নিজের মা হারানোর কষ্টটা কমে আসে,ছোট বোন রাত্রীকে ছাড়া থাকার কষ্টটা কম অনুভব হয়,অন্যদিকে ইরাও ওকে দেখলে উচ্ছ্বাসিত হয়ে উঠে,মা কি জিনিস এই বাচ্চা না বুঝলেও বার বার ওকেই মা মা বলে ডাকে,একটা বাচ্চা যতোই অবুঝ হোক,এমনি এমনি কি কাউকে মা বলে ডাকে? এই এতো মায়া-ভালোবাসা এই সব কিছু কি স্রেফ আপন-পরের হিসেবেই চলবে?কোন মূল্য নেই এসবের,শুধু মাত্র এই জন্য,যে সে ইরার কেউ না?!! আরশি কিছু ভাবতে পারে না আর,বুকের ভেতরে কান্নার ঝড় উঠতে থাকে শুধু!

সন্ধ্যার আগে আসিফ ইরাকে নিয়ে ফিরলো,ইতস্তত করতে করতে দোতালায় কলিংবেলে চাপ দিতে নিয়েও দিলো না,চুপচাপ ঘুমন্ত ইরা কে কোলে নিয়ে উপরে চলে গেলো। রাত দশটার দিকে ইরার কান্নার শব্দ পেয়ে এক প্রকার দৌড়েই তিনতলায় এসে নক করলো আরশি,আসিফ দরজা খুলতেই অনুমতির অপেক্ষা না করেই ভেতরে ঢুকে কোলে তুলে নিলো ইরাকে। কি এক রাগে অভিমানে লাল হয়ে গেছে আরশীর মুখটা,ক্ষুব্ধ কন্ঠে আসিফের দিকে তাকিয়ে বলল,
-কেমন মানুষ আপনি?এসেছেন,কিন্তু একটা বার জানালেনও না!আমি কি অস্থির হয়ে আছি এদিকে সে খবর আছে?
আসিফ শান্ত কণ্ঠে বলল,
-সরি,আমি ভাবলাম,জার্ণি করে এসেছি শুধু শুধু আপনাদেরকে আর ডিস্টার্ব না করি,আর ও তখন ঘুমাচ্ছিলো।
-ডিস্টার্ব?আমার অস্থিরতাটা কে আপনার কাছে ডিস্টার্ব মনে হয়?আপনি কি বুঝবেন?ছোট বেলায় এমন ইরার মতো আমিও মা হারিয়েছি,ছোট্ট বোনটা থেকেও অনেক দূরে,আজ এতো বছর পর ইরাকে কোলে নিতে পারলে যে আমি কি শান্তি পাই সেটা কি আপনি বুঝবেন?বুঝবেন না,কেউ বুঝবেন না আপনারা!আপনারা তো শুধু...
বলতে বলতে কন্ঠ রুদ্ধ হয়ে আসে আরশীর,ফুলে উঠা চোখ দু'টো আবারো অশ্রুতে ভরে উঠে। কিছু না বলে, ইরাকে কোলে নিয়ে দ্রুত দরজা খুলে বের হয়ে আসে,পেছন থেকে অবাক চোখে সেদিকে তাকিয়ে থাকে আসিফ।
ধীরে ধীরে তার সেই অবাক চোখে খেলা শুরু করে,কিছু পাওয়ার আনন্দ আর নির্ভরতার খুশী,অনেক দিন পর বুক চিরে বেরিয়ে আসে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস।







শুক্রবার, ৮ নভেম্বর, ২০১৩

মেঘ কেটে রোদ হেসেছে অতঃপর...

''আবেগ বস্তুটা কিছুটা লবনের মতো - বেশী থাকলে জীবন বিষের মত হয়ে যায়, আর কম থাকলে জীবন হয়ে যায় স্বাদ বিহীন '' 
কথাটা যে কে বলেছিলো তা এই মুহুর্তে মাথায় আসছে না,তবে কথা গুলো এডিট করে যদি,এভাবে বলা হতো,
''মানুষ হচ্ছে লবনের মতো!! বেশি থাকলে জীবনটা হয় বিষের মতো আর কম থাকলে স্বাদহীন'' তাহলে এই স্ট্যাটাসটাতে লাইক দেয়া যেতো! ভাবতে ভাবতে নাবিলা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল,তারপর ফেবু থেকে লগ আউট করে পিসিটা অফ করে দিলো। এই মুহুর্তে তার নিজেকে খুব অপরাধী মনে হচ্ছে!আসলে এতোটা রিএক্ট না করলেও মনে হয় পারতো!আবার মনে হলো,নাহ খুব একটা ভুল মনে হয় করেনি সে,স্বাভাবিক রিএকশন বলা যেতে পারে! কিন্তু স্বাভাবিক বা অস্বাভাবিক যেমনই হোক না কেন,সকালে যা ঘটেছে তার ফলাফল এখন পর্যন্ত ভালো বলা যাচ্ছে না। নাবিলার মনটা ক্রমেই খারাপ থেকে কান্নার দিকে যাচ্ছে! ইচ্ছে করছে,বাচ্চাদের মতো হেঁচকি তুলে কাঁদতে! 
মোবাইলটা হাতে নিয়ে দেখলো,নাহ...কোন সাড়া-শব্দ নেই! নাবিলার মনে হলো,তার মুড আবারো মন খারাপ থেকে মেজাজ খারাপের দিকে ফিরে যাচ্ছে,যেকোন মূহুর্তে প্রচন্ড রাগ উঠবে,কিন্তু রাগটা উঠলে সেটা ঝাড়বে কার উপর?!! 
কথাটা মনে হতেই আবারো হেঁচকি তুলে কান্না পেলো! 
ঘরের এ মাথা থেকে ও মাথা পায়চারী করতে করতে মনে পড়লো,সে দুপুরে কিছু খায়ওনি এবং রান্নাও করেনি! রাতে কি কিছু রান্না করবে?যদি পরিবেশ ঠিক না হয়,তাহলে তো রান্না করে লাভ নেই,কেউ খাবে না,শুধু শুধু খাবার নষ্ট হবে!
সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে মোবাইলটা হাতে নিলো,নিপা ভাবির নাম্বারে কল দিবে না দিবে না করেও কল দিয়েই ফেলল!
সালাম দিয়ে কুশলাদি বিনিময়ের পর ভাবিই বলল,
-তো কি করছো তুমি?পড়াশুনা?
নাবিলা একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
-নাহ,বসবো পড়তে,আপনি কি করছেন ভাবি?অনেক আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি!
-হুম,বাচ্চারা খেলছে দাদা-দাদীর সাথে!তাই শব্দ আসছে। জানো,আজকে আমি আর আম্মা মিলে অনেক রকমের খাবার বানিয়েছি,মুড়ির মোয়া,লাড্ডু,সেমাই পিঠে তারপর ঝাল হিসেবে চাপটি পিঠা আর শুঁটকি ভর্তা,তপুকে ফোন করেছিলাম,বলেছি অফিস শেষে যেনো আমাদের বাসা হয়ে যায়,তোমার জন্য খাবার দিয়ে দিবো,কিন্তু ও বলল,আজ পারবে না,কি নাকি কাজ আছে। তো এক কাজ করো,কাল পরীক্ষা দিয়ে তুমিই চলে এসো,দুপুরে এক সাথে খাবো আমরা,কেমন?
নাবিলা সাথে সাথে কিছু বললো না। নিপার কাছে ব্যাপারটা অস্বাভাবিক ঠেকলো!নাবিলা কেমন চুপ হয়ে আছে,দুপুরে তপুও কেমন যেনো দায়সারা ভাবে কথা বললো!ঘটনা কি?
-হ্যালো নাবিলা,কি ব্যাপার?সব কিছু ঠিক আছে তো?
নাবিলা নিষ্প্রাণ ভাবেই বললো,
-হুম ভাবি,ঠিক আছে সব,আচ্ছা,আমি এখন রাখি ভাবি,কাল আসবো। ওকে,আল্লাহ হাফেজ।
ও পাশ থেকে কিছু বলার আগেই ফোন রেখে দিলো নাবিলা,নিপা খুবই অবাক হলো!সেই সাথে নিশ্চিত হলো,কিছু একটা হয়েছে দেবর আর তার বউ এর মধ্যে!

রাতের জন্য অল্প পরিমানে ভাত রান্না করে নাবিলা পড়তে বসলো,কাল পরীক্ষা আছে,কিছুই রিভিশন দেয়া হয়নি এখনো তার,সব ভুলে পড়ায় মনোযোগ দেয়ার চেষ্টা করলো। পড়তে পড়তে কখন যে ১১টা বেজে গেছে টেরই পেলো না! ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সে যতোটা না অবাক হলো,তার থেকে বেশি অবাক হলো,এখন পর্যন্ত কলিংবেল বাজে নাই কেন এটা ভেবে!
তপু তো কখনো এতোটা রাত করে না বাড়ি ফিরতে,আর ২/১বার হলেও ওকে তা ফোন করে জানায়। কিন্তু আজ কোন সাড়া শব্দই নেই!আশ্চর্য মানুষ তো! রাগ-ঝগড়া যাই হোক,একটা এসএমএস তো করে জানাবে? নাবিলা দ্বিধা ঝেড়ে তপুকে ফোন করলো,দু'বার রিং বাজলো কিন্তু কেউ রিসিভ করলো না,নাবিলার টেনশন লাগতে শুরু করলো! তিন বারের বেলায় তপুর আওয়াজ শুনতে পেলো,
-কি ব্যাপার?কোথায় তুমি?কয়টা বাজে?
-আমি আছি নাদিমদের মেসে,আজকে আসবো না,তুমি রাত না জেগে লাইট নিভিয়ে শুয়ে পড়।
নাবিলা পুরোপুরি হতভম্ব হয়ে গেলো!!
-তুমি আজকে বাসায় আসবে না?কেন?
-আমার ইচ্ছে!আর তোমার সমস্যা কি?তুমি তো একা থাকতেই পছন্দ করো তাই না?
-আমি একা থাকতে পছন্দ করি?তপু,তোমার ঝগড়া করতে ইচ্ছে করছে,সো বাসায় এসে করো।
-আমার কোন কিছুরই ইচ্ছে নাই আর!তোমার যখন আমার আব্বা-আম্মার বাসায় থাকা নিয়ে অনেক আপত্তি,তোমার বাসায় বাড়তি মানুষ থাকা পছন্দ না,তো থাকো তুমি তোমার বাসায় একলা!আমি থাকি না থাকি তাতে তোমার কি?
নাবিলার মনে হলো কেউ ওর গলা চেপে ধরেছে!কোন শব্দ করতে পারছে না সে!এভাবে বলতে পারলো তপু?!! নাবিলা আর কোন কথা না বলে নিঃশব্দে লাইনটা কেটে দিলো। ধীরে ধীরে বিছানায় লুটিয়ে পরে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল!

নাবিলার এভাবে কিছু না লাইন কেটে দেয়ায় কিছুটা অবাক হলো তপু!মোবাইলটা রেখে হাতে বই নিয়ে পড়ার চেষ্টা করলো কিছুক্ষন,কিন্তু পারলো না। ঘুরে ফিরে সকালের দৃশ্যগুলো আর নাবিলার ফোন রেখে দেয়া মাথায় ঘুরতে লাগল!
ঝগড়ার শুরুটা নাবিলাই করেছিলো,একটা পর্যায়ে তপুও ক্ষেপে যায় খুব। গ্রাম থেকে বাবা-মা এসেছেন চেকাপ করাতে,উঠেছেন বরাবরের মতো বড় ভাইয়ের বাসায়,তপু চাচ্ছিলো বাবা-মা তার বাসাতে থেকেই চেকাপ করুক,কিন্তু বাধ সাধে নাবিলা!তার কথা,এখন তার ইয়ার ফাইনাল পরীক্ষা চলছে,তাই সে চায়,পরীক্ষা শেষ না হওয়া পর্যন্ত বাসায় কোন গেস্ট না আসুক। কিন্তু তপু কোন ভাবেই মানছিলো না,তার কথা এতোদিন ব্যাচেলর ছিলাম ভিন্ন কথা,এখন বিয়ে করেছি বাসা নিয়েছি,সুতরাং বাবা-মা এসে তার বাসায় উঠবে,সব সময়তো ভাইয়ের বাসায়ই উঠেছে,আর কতো?যদিও বাবা-মা কিংবা ভাই-ভাবি কেউই তেমন কিছু বলেনি,কিন্তু মনে মনে ঠিকই অপেক্ষায় আছেন,যে কবে তপু বলবে!
এক কথা-দু'কথায় কথা বাড়তে লাগল,বাড়তে বাড়তে তা চূড়ান্ত ঝগড়ায় পরিণত হলো!রাগের মাথায় তপু বলেই বসলো,
-তোমার মন যে এতো ছোট তা আগে বুঝিনি!শহরে একলা থাকতে থাকতে মনটা একদমই ন্যারো হয়ে গেছে তোমার!আসলে ভুল আমারই হয়েছে,তোমাকে বিয়ে না করে গ্রামের অল্প শিক্ষিত জয়েন্ট ফ্যামিলির একটা মেয়ে বিয়ে করাও অনেক ভালো ছিলো!!
কথা গুলো নাবিলার কাছে প্রচন্ড অপমান জনক মনে হলো!
-তাই না?ভুল করেছো তুমি আমাকে বিয়ে করে?বাহ!বছর ঘুরলো না আর তোমার কাছে এখন ভুল মনে হচ্ছে?!!ছিঃ, কি খারাপ বলেছি আমি?আমি জাস্ট বলেছি,আব্বা-মা ক'টা দিন পরে আসুক আমার বাসায়,তুমি তাদেরকে বলো,যে আমার পরীক্ষা চলছে এখন,শেষ হলেই আমি-তুমি নিজে যেয়ে নিয়ে আসবো উনাদেরকে! আর এজন্য তুমি বলছো,আমার মন ছোট?আমি ন্যারো মানষিকতার?!!
-তুমি শুধু ছোট মনেরই না,তুমি ডমিনেটেড মানুষিকতারও!সব সময় সব কিছু তোমার ইচ্ছে মতো চালাতে চাও!অন্য কারো ইচ্ছে-অনিচ্ছার মূল্যই নেই তোমার কাছে!এই সংসার কি শুধু তোমার একার? আজ যদি তোমার বাবা-মা হতেন তাহলে কি করতে এমন?বিয়ের পর অবস্থার সাথে নিজেকে এডজাস্ট করে নিতে হয়,শিখো নাই এটুকু?
নাবিলার মনে হলো রাগে সারা দুনিয়াটা ওলোট-পালট হয়ে যাচ্ছে!এসব কি বলছে তপু?
-আমি কি শিখেছি সেটা না দেখে নিজের দিকে তাকাও!স্বার্থপরের মতো আমার দোষটাই দেখে যেও না!সামান্য একটা বিষয়কে নিয়ে তুমি কি রকম বাড়াবড়ি করছো দেখো!কোথায় এটার সমাধান বের করবে তা না!আশ্চর্য!!শোন, এই রকম মানুষিকতা নিয়েই যদি থাকো,তাহলে তোমার সাথে সংসার করা ইম্পসিবল!আমার পক্ষে,এইসব বাজে কথা শোনা সম্ভব না!
এ কথা শুনে তপু সাথে সাথে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাড়ালো,রাগে চেহারা লাল হয়ে গেছে তার,কিছু বুঝে উঠার আগেই হঠাত পানির গ্লাসটা 'ধাম' করে মেঝেতে ফেলে দিলো তপু!!নাবিলা ভয়ার্ত চোখে হতভম্ব হয়ে মেঝের দিকে তাকিয়ে রইল!
কিছুক্ষন পর দেখলো তপু রেডি হয়ে অফিসের জন্য বের হয়ে গেলো,নাবিলা যেভাবে ছিলো সেভাবেই বসে রইলো,ডায়নিং টেবিলে পড়ে রইলো তপুর জন্য রেডি করে রাখা লাঞ্চ বক্সটা।

কলিংবেলের আওয়াজ পেয়ে চোখ মেলল নাবিলা,দ্রুত উঠে বসল। কাঁদতে কাঁদতে কখন ঘুমিয়ে গেছে টেরই পায়নি সে!
ঘড়ি দেখল,রাত ১টা। এতো রাতে কে কলিংবেল দিচ্ছে,মোবাইলটা হাতে নিলো,নাহ কোন মিসডকল/এসএমএস নেই!তাহলে দরজায় কে?!
লাইট অন করে নাবিলা,জিজ্ঞেস করলো,
-কে?
কোন জবাব নেই!কি-হোলে তাকালো,কিন্তু ঘুটঘুটে অন্ধকারের মধ্যে কিছুই দেখতে পারছে না!আবারো জিজ্ঞেস করলো,
-কে বাইরে?তপু?
কোন জবাব নেই,কলিংবেল আর বাজারো শব্দ নেই। মনে হচ্ছে মনের ভুল!কিন্তু ঘুম তো ভেঙ্গেছে এই আওয়াজেই,তাহলে কি তপুই এসে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে?! সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে ভয়ে ভয়ে দরজা খুললো নাবিলা!কাউকেই দেখতে পাচ্ছে না,তারমানে কেউই না। মনটাই খারাপ হয়ে গেলো!কি ভেবে আবার যেনো দরজাটা খুলে বের হলো,সিড়ির সামনে যেয়ে নীচে উঁকি দিলো,কিন্তু কোথাও কাউকে দেখলো না!দীর্ঘশ্বাস ফেলে দ্রুত পায়ে পেছন ফিরে আসার পথেই ঘটলো বিপত্তিটা!
অন্ধকারে কারো ফেলে যাওয়া কলার খোসায় পা দিয়ে ফেলে,আর সাথে সাথেই কিছু বুঝে উঠার আগেই যা ঘটার ঘটে যায়!

নাবিলা যখন চোখ মেলল,তখন দেখলো সে একটা অপরিচিত বাসায়। চারপাশে তাকালো,সব পরিচিত মুখ,আশে-পাশের ফ্ল্যাটের লোকজন। ওকে তাকাতে দেখেই বাড়িওয়ালী খালাম্মা বললেন,
-এইতো চোখে মেলেছে,এই কেউ যাও তো,ওর জামাইকে পাশের রুম থেকে আসতে বলো। কি মেয়ে?কেমন লাগছে এখন?
নাবিলা মনে করার চেষ্টা করলো কি ঘটেছিলো!আস্তে আস্তে মনে হলো,ওর সারা শরীরে প্রচন্ড ব্যাথা,আর মাথা এবং ডান পা টা মনে হচ্ছে অনেক ভারী হয়ে আছে!
কিছু বলতে যাচ্ছিলো,এমন সময় হন্তদন্ত হয়ে তপু ঘরে ঢুকলো। দ্রুত ওর পাশে বসে মাথায় হাত রেখে বললো,
-এখন কেমন লাগছে?হসপিটালে যেতে হবে মনে হচ্ছে?
নাবিলা আস্তে করে বলল,
-প্রচন্ড ব্যাথা হচ্ছে বিশেষ করে মাথায়,এবং পায়ে!আচ্ছা,কি হয়েছিলো?
-রাত দেড়টার দিকে বাড়িওয়ালা চাচা ফোন দিয়ে বললেন,তুমি নাকি সিঁড়ি গড়িয়ে পড়ে জ্ঞান হারিয়েছো!এতো রাতে কোন ডাক্তার খুঁজে পেলাম না,তাই সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করছি,চল এখন,হসপিটালেই চলো।
নাবিলার সব মনে পড়লো। তারমানে তখন তপু কলিংবেল দেয়নি!ওটা তার মনের ভুল ছিলো! নাবিলা কিছু না বলে চুপ করে থাকলো। তপু বের হয়ে গেলো ক্যাব ভাড়া করতে,ফিরে এসে ফ্ল্যাটে তালা দিয়ে নাবিলা কে নিয়ে বের হলো।
তপু খেয়াল করলো,নাবিলা কোন কথা বলছে না,কিন্তু নিঃশব্দে কাঁদছে!চেহারাটা কেমন ফুলে গেছে ব্যাথায় নাকি কান্নার কারণে বুঝতে পারলো না। তপু ধীরে ধীরে নাবিলার হাতটা চেপে ধরলো,কিন্তু নাবিলা হাত ছাড়িয়ে নিলো,কান্না চাপতে সে অন্যদিকে মুখ ফেরালো।
তপুর নিজেকে অপরাধী মনে হলো,আসলে একটু বেশিই বাড়াবাড়ি হয়ে গেছে! ঝগড়া-ঝাটি একটু আধটু হতেই পারে,তাই বলে এতোটা রাগ না দেখালেও পারতো,কিন্তু মেজাজটা এতোই খারাপ হয়েছিলো যে,কোন সমাধানের চিন্তা মাথায় আসেনি! যদিও এখন মনে হচ্ছে,এতোটা অবুঝের মতো আচরন করাটা তার ঠিক হয়নি।
বেলা দশটার দিকে মাথা-পা ব্যান্ডেজ করে,প্রেসক্রিপশন নিয়ে বাসায় ফিরলো দু'জন। কথা তখনো বন্ধ,শুধু হু/হ্যাঁ চলছে!
১২টার দিকে নিপা ভাবি আসলেন,সাথে তপুর মা,তার একটু পরেই নাবিলার আম্মু-বোন আসলেন। সবাই বার বার জিজ্ঞেস করছে,কি হয়েছিলো,কিভাবে ঘটলো,এতো রাতে নাবিলা সিঁড়ির সামনে কি করছিলো ইত্যাদি। নাবিলা ক্লান্তি আর ঘুমের অযুহাতে এড়িয়ে গেলো,আর তপুও নানাভাবে এড়িয়ে গেলো। নিপা সারাটা সময় ধরে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দু'জনকে দেখলেন। কিছুটা রাগও লাগল তার,কি এমন বিষয় নিয়ে ঝামেলা হয়েছে যে,কারো সাথে শেয়ারও করছে না,আবার দু'জন স্বাভাবিক ব্যাবহারও করছে না!
দুপুরে খাওয়া-দাওয়া করে নাবিলার আম্মুরা চলে গেলেন,নিপা শ্বাশুড়িকে পাশের রুমে বিশ্রামে রেখে নাবিলার রুমে এসে দেখলেন,তার দেবর বারান্দায় বসে আছে,আর নাবিলা চোখে পানি নিয়ে চুপ করে শুয়ে আছে! নিপা স্বাভাবিক কন্ঠে নাবিলাকে বলল,
-নাবিলা,কি সমস্যা হয়েছে?আমাকে বল। আমি তোমাদের বড় বোনের মতো,দ্বিধা ফেলে বলতো,কি হয়েছে?
নাবিলা এবার ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
-ভাবি আসলে দোষ আমারই!আমিই সেলফিস এর মতো ভেবে ওর সাথে খুব বাজে বিহেভ করেছি,আমার এতোটা একপেশে ভাবা উচিত হয়নি,কিন্তু বিশ্বাস করুন,আমি কাল সারাটা দিন-রাত খুব অপরাধী ফিল করেছি,আমি আসলে বুঝতে পারিনি! আমি...
কান্নার দমকে আর কথা বলতে পারছে না নাবিলা,নিপা ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,
-ভুল তো মানুষেরই হয়,ভুল হবে সেটা বুঝতে পারলে সংশোধন করে নিবে এটাই তো নিয়ম। কিন্তু হয়েছেটা কি সেটা আগে বলো?
নাবিলা সব খুলে বললো। সব শুনে নিপা মুচকী হাসল!হাসিতে কিছুটা লজ্জাও ছিলো...অনেক দিন আগে নিজের এই অবস্থাটার কথা মনে পড়ে গেলো!

তার নিজেরও বিয়ে হয়েছিলো,পড়াশুনার মাঝখানে,তখন শ্বশুড়-শ্বাশুড়ি ঢাকায় আসলে তপুও মেস ছেড়ে তাদের বাসাতেই থাকতো। এসব নিয়ে তপুর ভাইয়ের সাথে মন কষা-কষি তার নিজেরও কম হয়নি!
কিন্তু এসব বিষয়ে তপুর ভাই বেশ ধৈর্য্য আর সহযোগীতার পরিচয় দিতেন,কখনো ধৈর্য্য ধরে বুঝাতেন,কখনো বা চুপ করে থাকতেন,তপুর আম্মাও এসে বউকে কোন কাজ করতে দিতে চাইতেন না,বুয়াকে নিয়ে নিজেই সব কাজ করতেন, সে সময় এই মানুষ গুলো এতো সহানুভূতিশীল আর আন্তরিকতার পরিচয় দিয়েছিলেন বলেই নিপা পেরেছিলো নিজের ভেতর ব্যাপারগুলোর সাথে এডজাস্ট করে নিয়ে বিরক্তির বদলে ভালোবাসা তৈরী করতে। আর তাইতো এখন নিজের পরিবারের কেউ আসবে শুনলে যতোটা না আনন্দ লাগে তার থেকে বেশি আনন্দ লাগে শ্বশুড়-শ্বাশুড়ি আসবেন শুনলে।
সেদিক থেকে অবশ্য নাবিলাকে খুব বেশি দোষ দেয়া যায় না,কারণ,ওর বিয়ের পর আব্বা-আম্মা যতবার এসেছেন অল্প সময়ের জন্য এসেছেন,আর বেশির ভাগ সময় নিপার বাসায়ই থেকেছেন,তাদের সাথে খুব বেশি সময় নাবিলা কাটায়নি,অবশ্য বিয়ে হয়েছে ওদের তেমন দীর্ঘ সময়ও হয়নি। নিপা বুঝতে পারছে,নাবিলার মনের অবস্থাটা,বেচারী এখনো পুরোপুরি সংসারের হাওয়ার সাথে খাপ খাইয়ে নিতে পারেনি,আর অন্যদিকে তপুও সংসারের কোন সমস্যার কেমন সমাধান তার ধারা বুঝেনি! বাড়াবাড়িটা আসলে দু'জনেই করেছে,এর মধ্যে যদি দু'জনের একজন ব্যাপারটা ভাই/ভাবি কারো সাথে শেয়ার করতো তাহলে অন্তত এতোটা সিরিয়াস অবস্থা হতো না।
ভাবতে ভাবতে নিপা শ্বাশুড়ির রুমে গেলেন,সব কিছু খুলে বললেন তাকে। শ্বাশুড়ি আসরের নামাজ পড়ে নাবিলা-তপুকে নিয়ে একসাথে বসালেন,
-বুঝলে ছোট বউ,আমার এই ছেলেটা সব সময় কাজের চেয়ে রাগ বেশি করে!এত বড় হয়েছে ঠিকই কিন্তু এখনো কোন সমস্যায় পড়লে মেজাজ সামলাতে পারে না,তাই না বাপ?
তপু কিছু না বলে মাথা নিচু করলো। তা দেখে মনোয়ারা বেগম হেসে বললেন,
-শোন বাপ,আমার এই বউ কে কিন্তু আমি চিনেছি!ও কোনদিনই আমাকে তোর বাবাকে পর মনে করে না,ও শুধু একটু বুঝতে ভুল করেছে,আর ভুল তো হবেই,একে তো নতুন সংসার তার উপর আমরা থাকি দূরে,কিভাবে বুঝবে?সময় লাগবে না একটু? কি বউ,তুমি কি আমাদেরকে পর মনে করবে কখনো?
শ্বাশুড়ির কথা শুনে নাবিলার চোখে পানি চলে আসল,
-না আম্মা,আমি কোনদিনই এমন ভাবতে পারবো না!আমি আসলে বুঝতে পারিনি,আপনি প্লিজ মনে কিছু করবেন না!আমি তো একলাই থাকি,আপনারা আসলে আমার অনেক ভালো লাগে!আমি ভেবেছিলাম,আমার তো পরীক্ষা আসলে আপনাদেরকে ঠিক মতো সময় দিতে পারবো না,তাই বলেছিলাম পরীক্ষাটা শেষ হলে আসতে,কিন্তু দেখেন আল্লাহর কি ইচ্ছা,এমন অবস্থাই হলো,যে আর পরীক্ষা দেয়াই হলো না আমার!'' বলতে বলতে কন্ঠরুদ্ধ হয়ে আসল।
মনোয়ারা বেগম,ছেলের বউয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে এবার ছেলের দিকে ফিরলেন,
-কি?এবার বুঝেছিস? বাবারে,সংসার করতে হলে ধৈর্য্য ধরতে হবে,একটু বুঝে শুনে কাজ করতে হবে এমন হুটহাট ক্ষেপে যেয়ে বাড়ি ছাড়লেই সমস্যার সমাধান হবে না! হয়েছে,এবার এই রাগ-অভিমান বন্ধ কর,বউটা কি ব্যাথা পেয়েছে দেখেছিস? আল্লাহ না করুক,যদি আরো খারাপ কিছু হতো?!এমন করবি না আর,বুঝদার হও বুঝলি?
নিপা দরজার পাশে দাঁড়িয়ে বললো,
-আর একটা কথা আমি বলি,যেকোন সমস্যা হলে চেষ্টা করবে,বড়দের সাথে একটু পরামর্শ করতে। সংসারে রাগ-অভিমান সবারই হয়,এসব ব্যাপারে কম-বেশি অভিজ্ঞতা তো তাদের আছে, তাই সংকোচ না করে শেয়ার করবে,দেখবে ইনশাআল্লাহ সমাধান পেয়ে গেছো। সমস্যা জমিয়ে না রেখে দ্রুত সমাধান করে ফেলবে,দেখবে সব ঠিক হয়ে গেছে,সমস্যা জমিয়ে রাখা বুদ্ধিমানের কাজ না,বুঝলে? আর ভালোবাসার মাঝে এতো রাগ আসে কোথা থেকে,আর এতো সময় ধরে থাকে ই বা কিভাবে শুনি? তপু,সেদিক থেকে তোমার ভাই তো মাশাআল্লাহ,অনেক ভালো,আর যাই হোক,এক ঘন্টার উপরে আমার উপর রাগ করে কখনোই থাকেনি!
বলেই নাবিলার দিকে তাকিয়ে মুখ টিপে হাসলেন ভাবি!শ্বাশুড়িকে অন্য রুমে চলে যেতে দেখে বললেন,
-বুঝলে নাবিলা,তোমার জামাই এখনো তোমাকে অনেক ভালোবাসে না!!এজন্যই এতো রাগ দেখায়!জামাইকে শক্তভাবে ভালোবাসায় বাঁধো,বুঝলে? না হলে কিন্তু এমন হাত-পা প্রায়ই ভাংতে হবে! হাহাহা!''
ভাবির কথা শুনে দু'জনের হেসে ফেলল। আড়চোখে একজন আরেক জনের দিকে তাকালো কয়েকবার। ভাবি চলে গেলে,তপু হঠাত বলল,
-এই রুমের কেউ কি চকলেট খাবে?আমি নিচে যাচ্ছি,কেউ যদি খেতে চায় তাহলে যেনো বলে,আমি নিয়ে আসবো!
নাবিলা এবার রাগের ভান করে হাসি চাপতে চাপতে বালিশ ছুঁড়ে মারল তপুর দিকে,দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
-কেউ টা কে শুনি?আমার নাম নাই?আর আনতে হবে এটা জিজ্ঞেস করার কি আছে?জানো না আনতে হবে যে! ঢং না?
তপু বালিশ হাতে নিয়ে হাসতে হাসতে বলল,
-একটু আগে না ভাবি বললো,জামাইকে ভালোবাসতে!আর এখনই বালিশ ছুঁড়ছো না?দাড়াও ভাবিকে বলছি!
নাবিলা এবার হাসতে হাসতে বলল,
-ইইহহ,আসছে...যাও ভাগো!
তপু মোবাইলটা নিয়ে বের হতে হতে বলল,
-যাই যাই,ভালোবাসা তো আর নাই!
নাবিলা হাসতে হাসতে সেদিকে তাকিয়ে রইল। আর মনে মনে বলল,
'অনেক অনেক ধন্যবাদ আল্লাহ,কঠিন একটা সমস্যার সুন্দর সমাধানের জন্য আর এমন চমৎকার কিছু মানুষদেরকে পরিবার হিসেবে দেবার জন্য।'   :)









বৃহস্পতিবার, ৭ নভেম্বর, ২০১৩

মায়ায় জড়ানো অনুভূতি গুলো...


প্রচন্ড ক্লান্তি যেনো চোখে এসে ভর করেছেন,কোনভাবেই চোখ মেলতে পারছেন না রোকেয়া!কিন্তু তার খুব ইচ্ছে করছে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা প্রিয় মুখ গুলোর দিকে একটা বার চোখ খুলে তাকাতে। তিনি জানেন,চোখ মেলে একটিবার তাকালেই প্রচন্ড ভাবে কাঁদতে থাকা এই মানুষ গুলোর মুখে হাসি ফুঁটে উঠবে,তাদের ভীতিগ্রস্থ মনে আশার আলো জ্বলে উঠবে কিন্তু তিনি পারছেন না,চোখ মেলতে। রোকেয়ার কেন জানি মনে হচ্ছে,এখন সকাল বেলা,কেমন হিম হিম লাগছে তার কাছে,কিন্তু সকালে তো অনেক ব্যস্ত থাকেন তিনি!কতো কাজ তার সকালে,ভাবতে ভাবতে মনের চোখে ভেসে উঠলো তার প্রিয় সংসারে কাটানো রোজকার দিন গুলো...

সকালের এই সময়টা বড্ড বেশিই ব্যস্ত বলা চলে। চারপাশ জুড়ে যেনো শুধু ছুটাছুটি আর শোরগোল,সবাই খুব ব্যস্ত। ৪নং রোডের একদম শেষ মাথার এই বাড়িটাতেও এই সময় সবাই প্রচন্ড ব্যস্ত থাকে। সবচেয়ে বেশি ছুটোছুটিতে থাকেন রোকেয়া,যিনি এই বাড়ির গিন্নী। যতক্ষন পর্যন্ত না তিনি হাঁক-ডাক শুরু করবেন ততোক্ষন পর্যন্ত কেউই রুম থেকে বের হবে না,না ছেলে-মেয়ে না তাদের বাবা। রোকেয়ার মনে হয়,সে এই মানুষ গুলোর জন্য ঘড়ি হিসেবেও কাজ করে!
যতোক্ষন সে ডাক না দিবে,কেউ ঘুম থেকে উঠবে না,যতক্ষন তাড়া না দিবে,কেউ রেডি হয়ে খেতে আসবে না,আবার যতোক্ষন ফোন করে সময় মনে করিয়ে না দিবে কেউ সময় মতো বাসায়ও ফিরবে না!
মাঝে মাঝে অসম্ভব বিরক্ত হলেও এক ধরনের অভ্যস্থতাও কাজ করে। রোজকার মতো তাই আজো,নাশতা রেডি করে টেবিলে রাখতে রাখতে একবার করে সবার রুমের সামনে যেয়ে ডেকে আসলেন। ছেলের রুমের সামনে হয়ে আসার সময় দেখলেন,হাতে ব্রাশ নিয়ে ছেলেটা বিছানায় বসে ঘুমে ঢুলছে!ভাব দেখে মনে হচ্ছে যেকোন মূহুর্তে সে বিছানায় আবার শুয়ে পড়বে! রোকেয়ার ইচ্ছে হলো,যেয়ে কানটা ধরে বসা থেকে উঠে দাঁড় করাতে। কিন্তু সদ্য ভার্সিটিতে ভর্তি হওয়া ছেলেকে কি আর কান ধরে বকা দেয়া যায়?তাই দরজায় দাঁড়িয়ে কড়া গলায় বললেন,
-হুম,এভাবেই ঝিঁমাতে থাক ঘুমে,বেলা বাজে ৮টা ক্লাসে যাওয়ার জন্য রেডি হওয়া বাদ দিয়ে সে ঘুমে ঢুলছে!এমনই কর,বুঝলি?
মায়ের গলার আওয়াজ পেয়ে ছেলে রাহী হাই হাই তুলতে মুখে ব্রাশ পুরলো।
-আম্মু আমি যাচ্ছি,আসসালামু আলাইকুম।
মেয়ের আওয়াজ পেয়ে দ্রুত রান্না ঘর থেকে বের হলেন রোকেয়া,দৌড়ে এসে জিজ্ঞেস করলেন,
-কিরে তুই যাচ্ছিস,পানির বোতল নিয়েছিস?
রুবা উল্টো দৌড় দিয়ে টেবিলের কাছে এসে দ্রুত ব্যাগে পানির বোতল ঢুকালো। রোজই সে এই কাজটা করে,রোকেয়া খেয়াল না করলে সে পানি না নিয়েই বের হয়ে যায়,রুবা বাইরের পানি খেতে পারে না,যেদিন বাসা থেকে পানি নিয়ে যাবে না,সেদিন দরকার হলে সারাদিন সে পানি না খেয়ে থাকবে,তবুও বাইরের পানি খাবে না।
রুবা চলে গেলে,রাহীকে আরেকবার ডাক দিয়ে রোকেয়া ইসলাম নিজের রুমে গেলেন। রহমান সাহেবের তখনো পেপার পড়া শেষ হয়নি,তিনি প্রচুর পড়ুয়া মানুষ। পেপার পড়ার বেলাতেও তার একাধিক পেপার পড়তে হয়,বাসায় একটা পরেন,অফিসে যেতে যেতে একটা পড়েন,আবার অফিসে যেয়ে একটা পড়েন। হকার সকালে পেপার দিয়ে যাবার পর সেটাকে এনে বেড রুমে রাখাটা যেমন রোকেয়ার কাজ,তেমনি সব কিছু রেডি করে এসে হাত থেকে পেপারটা নিয়ে ভাঁজ করে রাখাটাও তারই কাজ,যতক্ষন তিনি এটা না করবেন রহমান সাহেবের মনে পড়বে না,যে তাকে অফিসে যেতে হবে!

এমন সব বেখবর,অগোছালো আর ভুলো মনের মানুষদের মাঝে রোকেয়রা মতো একজন কর্মঠ,দায়িত্বশীলা,চতুর্দর্শী মানুষ যে বছরের পর বছর কিভাবে আছেন তা কোনভাবেই কাজের বুয়া মতির মায়ের মাথায় আসে না! বেচারী প্রায়ই একা একা বিড়বিড় করেন,
-কি সব আজব লোকজন এরা!বাপ-ছেলের একই কাপড় চাইরদিন পড়লেও হুঁশ হয় না ধুইতে দেয়ার,মাইয়া একজন এই মোটা মোটা বই হাতে নিয়া ঘুরতেছে অথচ জামা পড়ছে এক তো সালোয়ার আরেক!চুলার পাড়ে চা নিতে আইসা ওড়নায় আগুন লাইগা যায় আর সে চুপচাপ চা খাইতে খাইতে বাইর হইয়া যাইতেছে! বাপ না হয় এমন মানলাম,কিন্তু তাই বইলা,পোলা-মাইয়া গুলা একটাও মায়ের মতোন হইবো না?হইলো কিছু?! মা টা সারাদিন তাগো পিছনে দৌড়ায় দেইখা,না হইলে খবরই আছিলো!
রুবার মাঝে মাঝে বায়োক্যামস্ট্রির বই পড়তে পড়তে,কিংবা দূর থেকে তাকিয়ে অথবা বিকেল বেলা রিকশায় ফিরতে ফিরতে মাথায় খুব ঘুরে,তার মা আসলে কতোটা গুণবতী,সহনশীলা মানুষ!কতোটা ভালোবাসা থাকলে তিনি পারছেন ওদের এমন যন্ত্রণা গুলো হাসিমুখে সহ্য করে নিতে,এসবের সাথে অভ্যস্থ হয়ে দিন কাটাতে। অথচ সে তো মনে হয়,এই মা এর মেয়ে হিসেবে তার এক ভাগ গুনও পায়নি!
কিন্তু রুবা যতোটা ভাবে তার এক ভাগও রাহীর মাথায় ঢুকে না!তবে ঢুকুক না ঢুকুক,মা কে ছাড়া তার একদিনও চলবে না,দিন শেষে বাড়ি ফিরে যতক্ষন না মা ভাত মাখিয়ে এনে সামনে রাখবেন,ততক্ষন পর্যন্ত খাওয়ার কথা তার মনে হবে না! কোন কিছু করতে বা আনতে ভুলে গেলে সোজা এক বাক্যে নির্দোষী সে,'আম্মু তো আমাকে মনে করিয়ে দেয়নি!আমার কি দোষ?!'
রহমান সাহেব মাঝে মাঝে অফিসে কলিগদের সাথে গল্প করতে গেলে খেয়াল করেন,অফিসের সবাই থাকে খুব সেলডিপেন্ডেন্ট মানুষ হিসেবে ভাবে,সব কিছুতে বেশ নিয়ম মেনে চলেন,অথচ রহমান সাহেবের মনে হয়,তার এই গোছালো জীবন,যা কিছু অর্জন তার পেছনে তেইশ বছর আগেও একমাত্র তারই অবদান বেশি ছিলো,কিন্তু বিয়ের পর এই ২৩বছরের বিবাহিত জীবনে যা কিছু তিনি করেছেন তার পেছনে নিজের থেকেও বেশি অবদান রোকেয়ার। আজ তার ভালো চাকরী,যা কিছু এসেট,সততা আর নিষ্ঠার সম্মান সব কিছুর পেছনেই অর্ধেকের বেশি অবদান রেখেছেন রোকেয়া।
রহমান সাহেব চাপা স্বভাবের মানুষ,অনুভূতি প্রকাশের ক্ষমতা তার খুবই কম,আর তাই কোনদিন মুখে তার পরিবারের কারো প্রশংসা করেন না,করতে পারেন না,কিন্তু যতোবারই জীবনে প্রাপ্তির আনন্দ পেয়েছেন,মন ভরে রোকেয়ার জন্য দোয়া করেছেন। যদিও কোনদিনই তিনি বুঝাতে বা বলতে পারেননি তার জীবনে রোকেয়া আল্লাহর দেয়া কত বড় নিয়ামত।
ছেলে-মেয়ে দুটোও তার মতোই হয়েছে,সারাক্ষন মা মা করবে কিন্তু মায়ের সামনে আসলে মুখের হাসি-মায়া সব উড়ে যায়!আবার মা একটু দৃষ্টির আড়াল হলেই অস্থির হয়ে যায়! কিন্তু মায়ের সামনে কোন কথা নাই,কোন অনুভূতির প্রকাশ নেই।

রোকেয়ার মনে হলো তার আবারো দম বন্ধ হয়ে আসছে যেনো!কিন্তু চোখ খোলার খুব চেষ্টা করছেন তিনি। সবাইকে খুব দেখতে ইচ্ছে করছে,সেই যে রান্নাঘরে হঠাত করে মাথা ঘুরে পরে গেলেন,তারপর থেকে তো আর চোখই খুলতে পারছেন না তিনি। রোকেয়া নিজের স্বাস্থ্যের ব্যাপারে কখনোই উদাসীন ছিলেন না,তার মাথায় একটা চিন্তাই ঘুরতো,
'আমি অসূস্থ হয়ে পড়লে আমার সংসারের মানুষ গুলোকে দেখবে কে?ওদের খেয়াল রাখবে কে?'
কিন্তু হঠাত করে যে কি হলো বুঝতে পারেননি!বাসায় ও সেই সময় কেউ ছিলো না। চূলোর তরকারী নাড়তে নাড়তে হঠাত করেই মাথা ঘুরে পড়ে গেলেন। প্রায় অনেক সময় পড়েছিলেন,বুয়া ছিলো ছাদে,সে এসে দেখে দ্রুত পাশের বাসার ভাবিকে ডেকে এনে সবাইকে খবর দেয়।
রোকেয়ার মনে হলো,তার মাথার কাছে তার নানী বসে আছেন,সেই অনেক বছর আগের মতো। তাকে বলছেন,
-হ্যাঁরে বুবু,এভাবে শুয়ে থাকলে হবে?মেয়ে মানুষের এতো শুয়ে থাকা চলে না,কতো কাজ করতে হয়। ঐযে দেখ,বাইরে তোর ছেলে-মেয়ে দুটো কিভাবে কাঁদছে,আর তোর জামাই টা... আহা,বেচারা তো তোর শোকে কাহিল হয়ে যাচ্ছে!
রোকেয়ার খুব ইচ্ছে করছে,সেই ছেলে বেলার মতো করে নানীর কোলে মাথা রেখে ঘুমোতে!কিন্তু কেন জানি অনেক শব্দ কানে বাজছে! মনে হচ্ছে,রুবা ডাকছে,
-আম্মু...কি হলো তোমার?ও আম্মু...
রোকেয়ার কপাল কুঁচকে এলো!আরেকবার চেষ্টা করলেন চোখ দুটো খোলার কিন্তু নাহ!পারছেন না এবারও। কেউ মনে হচ্ছে চোখের পাতার উপর বরফ দিয়ে রেখেছে!
সেই তখন থেকে রুবা কেঁদেই যাচ্ছে! লায়লা আন্টি স্বান্তনা দেয়ার চেষ্টা করছেন,একটু দূরে চেয়ারে বসে ফুঁপিয়ে কাঁদছে রাহী,আর বাবা সেই তখন থেকে মুখ কালো করে আসেন।
বুয়া এসে রুবাকে বলল,
'এতো কান্দে না,ভাবির কিছু হয় নাই,বেশি খাঁটা-খাঁটনি করে তো এই জন্য মনে কয়,মাথা ঘুইরা পইড়া গেছে! ডা তো কয়া গেলোই,শুনো নাই?'
রুবার কান্না দ্বিগুণ বেগে বাড়লো যেনো! রুবার বারবার মনে হতে লাগল,আম্মু ওদের জন্য কষ্ট করতে করতে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন! সারাটা দিন-রাত শুধু ওদের জন্য ব্যয় করতেন,নিজের দিকে একটুও খেয়াল করেননি!আর ওরাও কেউ আম্মুর দিকে খেয়াল রাখেনি,যদি রাখতো তাহলে আজ আর আম্মুর এই অবস্থা হতো না!
ধীরে ধীরে রোকেয়া চোখ মেললেন,সবাই তার পাশে ছুটে আসল,রোকেয়া রুবা কে ইশারায় কাছে ডেকে খুব আস্তে আস্তে বললেন,
-কয়টা বাজে এখন?
-৪টা বাজে আম্মু। তুমি এখন কেমন ফিল করছো?
রোকেয়া আগের মতোই বললেন,
-ভালো,তোরা দুপুরে খেয়েছিস?
রুবা কিছু বললো না। রহমান সাহেব বললেন,
-তুমি চুপ করে রেস্ট নাও,কথা বলো না।
রোকেয়া তার দিকে তাকিয়ে বললেন,
-কয়টা বাজে এখন?তুমিও খাওনি,ছেলে-মেয়ে গুলোও খায়নি!জলদি খেয়ে নাও,আমি ঠিক আছি।
লায়লা আন্টি হেসে বললেন,
-আপনার এই অবস্থা দেখে কি কারো খাওয়া হবে?কি ভয়টাই না পেয়েছে সবাই!ঠিক আছে,আমি যাই এখন পরে আবার আসব,ওকে?
রোকেয়া একবার সবার দিকে তাকালেন,হাতের ইশারায় সবাই কে আবারো খেতে যেতে বললেন। রুবা দ্রুত টেবিলে খাবার সাজিয়ে,মায়ের জন্য প্লেটে খাবার নিয়ে রুমে আসল।
-আম্মু,একটু উঠে বসো,খাবে এখন।
-তুই খেয়েছিস?
-না তুমি খাবে,তারপর খাবো,আমি খাইয়ে দেই?
রোকেয়া কিছু না বলে উঠে বসলেন।
রুবা মাকে খাইয়ে দিচ্ছে,রাহী পানির জগ-গ্লাস নিয়ে পাশে বসে আছে। দরজায় এসে দাঁড়ালেন রহমান সাহেব। রোকেয়া তার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসি দিলেন,তারপর ছেলে-মেয়ের দিকে তাকালেন,মনে মনে বললেন,
'মাঝে মাঝে এমন অসূস্থ হওয়াটা খারাপ না আসলে!যদি এভাবে প্রিয়জনদের ভালোবাসা পাওয়া যায় তবে...!' :)



সোমবার, ৪ নভেম্বর, ২০১৩

প্রশ্নটা প্রশ্নই থেকে যায়!


আবার দেখা হবে কোন দিন
আবার কথা হবে কখনো,
মাঝখানে জমা রয়ে যাবে
অনেক গুলো বছরের গল্প!

হয়তো কোন একদিন কথা হবে
হয়তো কোন এক তপ্ত দুপুরে
আবারো দেখা হবে,
তখন একই প্রশ্নই হয়তো ঘুরে ফিরে আসবে
আজ এতোদিন পর কে বেশি বদলেছে মনে হয়?
সময়?নাকি আমি?

তারপর আবারো কোন একদিন দেখা হয়ে যাবে
কোন এক মধ্য দুপুরে
হয়তো লেকের পাড়ের ব্রিজটিতে
অথবা শপিং মলের পাশে সেই গাছগুলোর নীচে!
ঘুরে ফিরে আবারো সেই একই প্রশ্নই থাকবে,
কে বেশি বদলে গেছে? সময় নাকি আমি?

উত্তর খুঁজতে খুঁজতেই সময় ফুরিয়ে যাবে
যাবার বেলায় তখন শুধু একটু হেসে বলা হবে,
'প্রশ্নটা তোলা রইল,আবার কখনো দেখা হলে
উত্তরটা দিবো,আজ বরং আসি'

তারপর আবার হয়তো কোনদিন দেখা হবে
কোন এক দ্বিপ্রহরে
ব্যস্ত সড়কের পাশে ক্লান্ত সময় ছুঁয়ে,
সেদিনও প্রশ্নটা একই রকম থাকবে,
কে বেশি বদলে যায়?সময় নাকি আমি?

সেদিন হয়তো সময় আর ফুরোবে না
তবুও উত্তরটা পাওয়া হবে না,
শুধু বলা হবে,
'উত্তরটা খুঁজে পেয়েছিলাম,কিন্তু দীর্ঘ সময়ের ভীড়ে
হারিয়ে ফেলেছি!প্রশ্নটা না হয় প্রশ্নই থেকে যাক!

উত্তর খোঁজার দায় থেকে পালাতে পালাতে
আজ অনেক প্রশ্নই এভাবে ঘুরে ফিরে,
ঠিক সেখানটায়,একইভাবে সামনে এসে দাঁড়ায়
যেখানটায় প্রশ্ন গুলো জন্মেছিলো!

নিরুত্তর আমি দিনের পর দিন
এভাবেই পালিয়ে বাঁচি,
এভাবেই দিন-মাস আর বছর কেটে যায়
প্রশ্ন গুলো প্রশ্নই থেকে যায়!





রবিবার, ২০ অক্টোবর, ২০১৩

এইতো আমি...!

জানি দেয়ালের ওপারেও আছে আকাশ
তবে দেয়াল ভাঙ্গার নেই অবকাশ,
চার কিংবা চতুর দেয়াল
থাকি নিয়ে আপন খেয়াল!
ভালো মন্দের হিসেব কষতেও 
থাকে দ্বিধাদ্বন্দ্ব!  
তাই তো আমার দেয়াল জুড়ে
বাজে নানান ছন্দ! 

দিন বদলায় মাস চলে যায় বছর ফুরায় কালে
আমার থাকা এই আমাতেই আমার আপন তালে,
শীত-গ্রীষ্ম ঢেউ খেলেনা ব্যস্ত জোয়ার ভেঙ্গে
শরত-বর্ষা ঘুম ভাঙ্গায় না থাকলেও রাত জেগে! 
এইতো আমার এইতো আমি এই আমাতেই সারা
আমার জন্য আমায় গড়তে কাটিয়ে দেই বেলা! 

জানি আলোর ওপাশেই আছে আঁধার 
নিকষ কালো বেশে,
তবু আমার মাঝে নেই বিকার 
থাকি আলো ঝলমল রেশে! 
বাঁচতে শেখার এই খেলাতে 
প্রতিক্ষণেই যেনো মরছি!
মরতে মরতেই কোন ভাবে বেঁচে থাকাটা শিখছি। 

আয়না ছাড়াই দিব্যি দেখি আমার সাজানো মুখটি
আয়না দেখলেই পালিয়ে বাঁচি অথবা মারি ঘাপটি!