জনপ্রিয় পোস্টসমূহ

সোমবার, ২ সেপ্টেম্বর, ২০১৩

বিরক্তি যোগ প্রাপ্তি!অতঃপর...-১


মিতুল প্রাণপণ চেষ্টা করছে পূর্ণ মনোযোগের সাথে পত্রিকা পড়তে,যাবতীয় শব্দ থেকে কান-মগজকে দূরে সরিয়ে রাখতে! কিন্তু বেচারা পারছে না!তার ধারনা,এই মূহুর্তে সে যা যা শুনতে পাচ্ছে তা এক প্রকারের 'কাউ কাউ' ছাড়া আর কিছুই না,কিন্তু সেটা যে তুলি এতো ভালো করতে পারে এটা জানা ছিলো না!! আবারো ঝড়ের বেগে বেড রুমে ঢুকলো তুলি,
-তুমি কি জানো?তুমি কি পরিমাণ অলস একটা লোক!
মিতুল কোন জবাব দিলো না,তার দৃষ্টি পত্রিকার দিকে। তুলি আবারো চেঁচিয়ে বলল,
-তোমার মতো অলস,অতি মাত্রায় অপরিচ্ছন্ন পাবলিকের সাথে আমার পক্ষে থাকা অসম্ভব!বুঝতে পারছো?
মিতুল মুখ তুলে একবার তাকালো তুলির দিকে,রাগে মুখ লাল হয়ে আছে! এক হাত কোমড়ে রেখে আরেক হাতে মিতুলের শার্ট নিয়ে যেটা সে গত তিনদিন যাবত একাধারে পড়েছে সেটা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে!
-কোকিল আর কাকের মধ্যে খুব একটা পার্থক্য নেই!এটা তোমাকে দেখলে বুঝা যায়!
-তাই না?তুমি কি বলতে চাচ্ছো?আমার কন্ঠ আগে কোকিলের মতো ছিলো এখন কাকের মতো শোনাচ্ছে?!
মিতুল আবারো পত্রিকার দিকে তাকাতে তাকাতে বলল,
-অনেক টা তাই!ছুটির দিন মানেই তোমার চেঁচামেচি শুনতে হবে!
তুলি আরেকটু এগিয়ে এসে বিছানায় বসল,মিতুলের হাত থেকে পত্রিকা একটানে নিয়ে ওর দিকে সরু দৃষ্টিতে তাকালো,
-ছুটির দিন মানে বুঝ তুমি?তোমার কাছে ছুটির দিন মানে কি?দেরি করে ঘুম থেকে উঠা,নাস্তা শেষ করে এক গাদা পেপার-বই নিয়ে বসে থাকা,তারপর আযান দিলে নামায পড়তে যাওয়া,বাসায় এসে খেয়ে আবারো বিদ্যাসাগরের পানিতে ডুব দেয়া,এভাবে করে সন্ধ্যা,তারপর কি?তারপর কিছুক্ষন ল্যাপটপে বসে টিপাটেপি করা,এবং নামাজ পড়ে খেয়ে-দেয়ে আবারো ঘুমিয়ে যাওয়া!তাই না? সারাটা সপ্তাহ তো জ্বালাও আমাকে তারপর এই ছুটির দিনে এসেও এক গাদা বই-পেপার দিয়ে বাড়িটা জঙ্গল বানিয়ে ছাড়ো!
মিতুল একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
-তো কি আর করবো আমি?তোমার মতো সকাল থেকে নিয়ে 'কাউ কাউ' করবো?
-কি বললে?আমি কাউ কাউ করি?
-আহ!এখন তো সামনেই আছো,এখন আস্তেই বলো,এতো জোরে বলার কি আছে?!
-শোন,তোমার কান নষ্ট হয়ে গেছে,সে জন্য আমি কথা বললেই 'কাউ কাউ' মনে হয় তোমার কাছে!তুমি একটা কি বলতো?কোন ধরনের মানুষ তুমি?২টা শার্ট দিয়ে সপ্তাহ চালাও ছিঃ! তোমার কাপড় ধুতে গেলে আমার হাত ব্যাথা হয়ে যায়,এতো ময়লা কাপড় মানুষ কিভাবে পড়ে?!
মিতুল অসহায় ভঙ্গিতে বলল,
-আমার মতো মানুষ আরো আছে দুনিয়াতে,কিন্তু তোমার মতো বউ মনে হয় না তাদের আছে!! গত একটা বছর ধরে প্রতি শুক্রবার তোমার এই ভাষন শুনতে শুনতে আমি ত্যাক্ত!
তুলি এক দৃষ্টিতে কিছুক্ষন মিতুলের দিকে তাকিয়ে রইল,তারপর পেপারটা ওর দিকে ছুঁড়ে দিয়ে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো,
-ঠিক আছে,তুমি অনেক ত্যাক্ত তাই না?আমি শুধু কাউ কাউ করি না?ওকে,দেখবো এবার কত শান্তিতে থাকতে পারো তুমি!
মিতুল একটা হাই তুলে পেপার পড়ায় মনোযোগ দিলো। কিন্তু প্রচন্ড ঘুম পাচ্ছে তার,বেলা বাজে ১১টা,এখন ঘুমাবে?নাকি এক কাপ চা খাবে? চিন্তা করে দেখল,চা চাইতে গেলে যদি আবারো তুলির ঝাড়ি শুনতে হয়!বলা তো যায় না,বলবে, 'এই মগটা না ধুয়ে চা নিলে কেন?এতো বেশি চিনি খাও কেন? চিনি নেয়ার সময় আশে-পাশে ছড়ালো কেন?' ইত্যাদি ইত্যাদি!
তারচেয়ে ঘুমানো ভালো!
পেপারটা একপাশে রেখে বালিশটা টেনে নিলো,চোখ বন্ধ করতেই মনে হলো একটু পরেই তো তুলি আসবে রুমে,এসেই ফ্যান টা অফ করে দিয়ে বলবে, 'অন্য রুমে যাও,রুম ঝাড়ু দিবো,ঘর মুছবো!' ভাবতে ভাবতেই তুলির গলার আওয়াজ পেয়ে চোখ খুলল,
-সকাল ৯টা পর্যন্ত ঘুমানোর পরেও আবার ঘুম পাচ্ছে?বাহ...! উঠার আর কি দরকার ছিলো তাহলে?এই নাও,ধর,চা নাও!
মিতুল শোয়া অবস্থাতেই ঘাড় ঘুরিয়ে দেখতে পেলো,তুলি বিছানার পাশে চেয়ার টেনে চা এর মগটা রেখে গেলো। মিতুল মুচকি হেসে উঠে বসল!

এমন সময় মোবাইলটা বেজে উঠলো,হাতে নিয়ে দেখলো বড় বোনের ফোন। রিসিভ করে সালাম বিনিময়ের পর আপু বলল,
-কি খবর?ছুটির দিনে বাসায় কি করিস?
-কিছু না রেস্ট নিচ্ছি,আর এখন চা খাচ্ছি। তোমাদের কি খবর?
-আমাদের খবর তো তোকে আমার ফোন করে জানাতে হবে তাই না?একই এলাকায় থাকিস,ছুটির দিন একটু বোনের বাসায় আসবি তাও পারিস না,তাই না?
মিতুল হেসে বলল,
-তোমরাও তো আসো না।
-হইছে,আমার সাথে তুলনা করতে হবে না,বউ নিয়ে দুপুরে আমার এখানে খাবি,তুলি কে বল,কিছু রান্না করতে না,তোর প্রিয় তেহারী রান্না করছি আজকে,সোজা নামাজ শেষে চলে আসবি।
মিতুলের আবারো হাই আসল! আপুর বাসায় গেলে আজকে দুপুরের ঘুম মাটি!
-ইয়ে আপু,এক কাজ করো তুমি বরং আমার জন্য বক্সে করে পাঠিয়ে দাও!আমার আসলে কোথাও বের হতে ইচ্ছে করছে না!
-কি বললি?তুই এভাবে আমার দাওয়াত রিফিউজ করতে পারলি?তুই আগেও ছিলি একটা ঘরকুনো,অলস বিয়ের পর তো দেখি আরো খারাপ অবস্থা হয়েছে তোর?!! দাড়া,তোর আসার ব্যাবস্থা করছি,রাখ তুই ফোন!
বলে আপু খট করে লাইন কেটে দিলো। মিতুল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চা খাওয়ায় মনোযোগ দিলো। তুলির মোবাইল বাজার আওয়াজ পেলো! খানিক সময় পরেই তুলি আসল,
-শোন,বাজারে যাও,একটু পর সব নামাজে চলে যাবে,কিছু পাওয়া যাবে না,বাজার থেকে কিছু ফল কিনে নিয়ে আসো।
-তুমি কি অসুস্থ?ফল খেতে হবে?
-নাহ,দাওয়াতে যাবো বোনের বাসায়,তাই!খালি হাতে কারো বাসায় দাওয়াতে যেতে হয় না,জানেন না আপনি?
মিতুল বালিশে হেলান দিয়ে বলল,
-আপুর বাসা পুরানো হয়ে গেছে যেতে যেতে,এখন খালি হাতে গেলে সমস্যা নাই!
-তোমার কি কোমড়ের হাড় ভেঙ্গে গেছে?হাঁটা-চলা করতে কষ্ট হয়?একটা কাজ যদি তোমাকে দিয়ে করাতে পারি? তোমার বোনকে যেয়ে দেখো,একাই ঘর-বাহির কিভাবে সামলায়,আর ভাই হইছে একটা!
-এই জন্যই তো দুলাভাই বাসায় অবসর সময়ে শান্তিতে ঘুমাতে পারেন!তোমার মতো আপু দুলাভাই কে ঘুমাতে দেখলে বাসা মাথায় তুলে রাখে না!
-তুমি কথায় কথায় আমাকে টেনে কি বুঝাতে চাও বলোতো?আমাকে কি মনে হয় তোমার?চল আজকে আপুর বাসায়,তোমার ক্লাস নেয়া হবে আজকে!
মিতুল আবারো হাই তুলতে তুলতে বলল,
-এই জন্যই তো তোমাকে নিয়ে কোথাও যেতে চাই না! আমার বাড়ির লোকজন,বন্ধু-আত্নীয় সবাই তো খালি তোমার সাপোর্টেই কথা বলে!আমাকে যে তুমি কি শান্তিতে রাখছো সেটা তো আর কেউ বুঝে না!!
মিতুল কথাটা শেষ করতে না করতেই তুলি চোখ-মুখ কুঁচকে মিতুলের মাথার নিচ থেকে বালিশ টান দিলো,তারপর সেই বালিশ দিয়ে ওর মাথায় ধাম-ধাম করে কতোক্ষন মেরে রুম থেকে হন হন করে বেরিয়ে গেলো!
মিতুল কিছুক্ষন 'অ্যা উ' করতে করতে তুলির চলে যাওয়া দেখল!মনে মনে বলল, কি দজ্জাল টাইপের মেয়েরে আল্লাহ!

নামাজ পড়ে এসে বাসায় ঢুকে দেখলো তুলির নামাজ এখনো শেষ হয়নি! ড্রয়িং রুমে এসে সোফায় পা তুলে বসল মিতুল। পুরো বাসাটা কি সুন্দর করে ঘুছিয়ে রেখেছে তুলি! কিন্তু মিতুলের এতো ঘুছানো দেখলেই হাত নিশপিশ করে সব কিছু এলোমেলো করে দিতে!! মিতুল সব সময়ই এরকম অগোছালো টাইপের,কখনো কোন কিছু এক জায়গা থেকে নিয়ে তা আবার সেখানে রাখার অভ্যাস ওর নেই,বিছানা-টেবিল সব জায়গায় সব কিছু ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রাখতেই অভ্যস্থ! এ নিয়ে মা-বোনদের কম বকা শুনতে হয়নি,কিন্তু মিতুলের মাঝে কোন পরিবর্তন নেই। সে অনেকটা 'কোন রকম চলে,একটা হইলেই হলো'টাইপ চিন্তার মানুষ। সে জন্য পর পর তিন দিন গরমে ঘেমে একাকার হওয়া স্বত্তেও একই শার্ট পড়তে তার কোন অস্বস্তি নেই! একাধারে চারদিন গোসল না করলেও তার কোন সমস্যা হয় না! ধুলোবালি যুক্ত জায়গায় থাকতে বা সেরকম গ্লাস-প্লেটে কিছু খেতেও তার কোন অস্বস্তি লাগে না!
সেদিক থেকে তুলি খুবই গোছানো,মিশুক একটা মানুষ। বিলাসিতা নয়,পরিপাটি জীবন পছন্দ তুলির। সব কিছু সাজিয়ে গুছিয়ে,পরিচ্ছন্ন করে রাখতে ওর কোন ক্লান্তি নেই। সেদিক থেকে বলায় দু'জন দু'জনের একদমই বিপরীত। বিয়ের পর থেকে তুলি মিতুলের এই ব্যাপার গুলো বদলানোর জন্য পেছনে লেগেই আছে,চেষ্টা করতে করতে বেচারী ক্লান্ত বলা যায়! কিন্তু মিতুলের মাঝে তেমন কোন পরিবর্তন নেই!




রবিবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০১৩

ভিন্ন ভাষা্র অশ্রু


-কি করছো তুমি?'
-দেখতেই তো পাচ্ছো?জিজ্ঞেস কেন করছো আবার?
-মিলা এগুলো তোমার শখের চূড়ি,কেন ফেলে দিচ্ছো?!
-আমার ইচ্ছে! আর এগুলো আমার শখের চূড়ি ছিলো,এখন নেই! কেন নেই তা তুমি ভালো করেই জানো।
-কেন নেই?আমি কিনে দিয়েছিলাম তাই?
-রায়হান,তুমি এই মূহুর্তে আমার সামনে থেকে যাও!না হলে এই চূড়ি গুলো আমি তোমার সামনে ভেঙ্গে গুঁড়ো করবো!
-তুমি এগুলো কিছুই করবে না!আমি বলছি,করবে না...
-তুমি যাবে?!!
প্রচন্ড আক্রোশ আর রাগ নিয়ে কথাটা বলেই পেছন ফিরলো মিলা!নাহ,রায়হান কে দেখতে পেলো না। চলে গেছে? মিলা চোখ দু'টো বন্ধ করলো। খানিকবাদে চোখ মেলে ড্রেসিং টেবিলের আয়নাটার দিকে মুখোমুখি হলো। নিজের প্রতিবিম্বটার দিকে তাকিয়ে নিজেকে খুব ক্লান্ত মনে হলো যেনো! হাতের চূড়ি গুলো রেখে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালো।
বারান্দায় এসে মনটা খুব হালকা হয়ে আসল,শরতের শেষ বিকেলের হিম হিম বাতাস যেনো ছুঁইয়ে গেলো খুব! নীচে রাস্তার দিকে তাকালো মিলা,কিছু ছেলেরা একপাশে খেলছে,একটা কাপলকে হেঁটে যেতে দেখল,কিছুটা খেয়াল করে দেখে চিনতে পারল,৪নং রোডের নিশাত আর ওর বর। বেশিদিন হয়নি বিয়ের,খুব হাসি-খুশী মনে হচ্ছে দেখে! অজান্তেই ঠোঁটের কোণে হাসি ফুঁটে উঠলো মিলার! খানিক সময় পর ধীরে ধীরে হাসিটা মিলিয়ে গেলো,কেমন একটা বিষাদ এসে দখল করে নিলো হাসিমাথা মুখটা!
মিলার খুব কাঁদতে ইচ্ছে করছে,কিন্তু আশ্চর্য হলো কেন জানি একটুও কান্না পাচ্ছে না!অথচ সারাটা জীবন সে 'ছিঁচ কাঁদুনে মেয়ে' কথাটা শুনে এসেছে,অথচ আজ যখন একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস নেবার জন্য হলেও কান্না করার প্রয়োজন তখন কি না চোখে এক ফোঁটা পানিও আসছে না!
-'মিলা,চা করেছি,খাবি?'
মায়ের ডাক শুনে রুমে আসল। দেখলো মা দু'কাপ চা নিয়ে ওর রুমে এসেছেন। চুপ চাপ বসে চা এ চুমুক দিয়ে মিলা বলল,
-তুমি কষ্ট করে বানাতে গেলে কেন?আমাকে বললেই পারতে!
-নাহ,এমনি কিছু করতে ইচ্ছে করল,তাই বানালাম। যদিও অনেক গুলো খাতা দেখা এখনো বাকী আছে,তবুও ভাবলাম,তোর সাথে কিছুক্ষন কথা বলি।
মিলা কিছু না বলে চুপচাপ চা খেতে লাগল। খানিক সময় পর বলল,
-আম্মু,আমি এখনো কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারছি না!
মা কিছুক্ষন চুপ থেকে বললেন,
-এখনো সময় আছে,ভাবতে থাক,তবে যাই করিস,ভেবে চিন্তে কর। আমি চাই না,তুই বাকী জীবন একা একা পার কর,কিন্তু আমি এটাও চাই না,তুই ভেতরে ভেতরে কষ্ট নিয়ে অভিনয় করে যা।
-আম্মু তোমার কি মনে হয় না?রায়হানের উচিত,কিছুটা স্যাক্রিফাইস করা? একটু হলেও অনুতপ্ত হওয়া?
আমিনা আহমেদ খানিকটা হাসলেন মেয়ের কথা শুনে!
-তোমার আব্বু যখন তার সাথে আমার ২২বছরের সংসার ভেঙ্গে দিয়ে অফিস কলিগের বিধবা স্ত্রী কে বিয়ে করে চলে গিয়েছিলেন,তখনো তোমার মতোই আমার মনে হয়েছিলো,তোমার আব্বুর উচিত অনুতপ্ত হওয়া! কিন্তু আজ দেখো,গত সাত বছরেও তোমার আব্বু কোন ভাবেই স্বীকার করেননি যে সে কোন অন্যায় করেছে!কিংবা আমার প্রতি,তোমাদের প্রতি কোন অবিচার করেছ!তার ধারনা,সে তার দুই সংসারের মাঝে ইনসাফ করছে,ভালো ভাবে তা মেইন্টেন করছে!! মাসে মাসে একটা নির্দিষ্ট এমাউন্টের টাকা দিচ্ছে,ফোন করে খোঁজ নিচ্ছে! কি হাস্যকর তাই না?
বলতে বলতে আমিনা আহমেদের গলা ভারী হয়ে আসল। একটা নিঃশ্বাস ফেলে আবারো বলতে লাগলেন,
-যেদিন আমি শুনলাম,রায়হান বিবাহিত হওয়া সত্ত্বেও,বিয়ের দেড় বছর পর নিজের ফুপাতো বোনের সাথে সম্পর্ক তৈরী করেছে আমার কেন জানি সেদিন চোখে ঐদিনটার ছবি ভেসে উঠেছিলো,যেদিন আমি জেনেছিলাম তোমার আব্বুর অন্য কারো সাথে সম্পর্ক আছে!আমি হতভম্বের মতো তাকিয়ে ছিলাম,আমার দীর্ঘ ২২বছরের ভালোবাসা আর বিশ্বাসেপূর্ণ মানুষটির দিকে!আর যেদিন জানলাম,রায়হান তোমার কাছে আরেকটা বিয়ে করার অনুমতি চাইছে সেদিন অনেক বছর পর আরেকবার আমি জায়নামাজে বসে সারা রাত কেঁদেছিলাম!
মিলার চোখ দুটো ভিজে উঠলো,কিছু বলতে পারলো না,শুধু টপটপ করে জল গড়িয়ে পড়তে লাগল চায়ের কাপে!

রায়হানের সাথে মিলার বিয়ে পারিবারিক ভাবেই হয়েছিলো। বিয়ের আগে রায়হানদের অফিসে মিলা ইন্টার্নী করেছিলো,সেখান থেকেই পরিচয়। ইন্টার্ণী শেষ করে মিলা ওর মামার অফিসে জয়েন করে,তার কিছুদিন পরেই রায়হানদের পরিবার থেকে প্রস্তাব আসে। অনেকটা অল্প সময়ের মধ্যেই বিয়ে হয়ে যায়।
মিলার আজো চোখে ভাসে,কি স্বপ্নের মতোই না কাটছিলো দিন গুলো...! রায়হান কে মিলার মনে হতো ঠিক রাজপুত্র যেনো! ঠিক তেমন কেউ,যেমন কাউকে সে আশা করেছিলো। আত্নীয়-স্বজন,প্রতিবেশি সবাই ওদের খুব প্রশংসা করতো,দোয়া করতো। কি ভালোবাসা আর আনন্দ নিয়ে না কাটছিলো দিন গুলো!
কিন্তু ছন্দপতনটা শুরু হয়েছিলো সেইদিন থেকে,যেদিন রায়হানের বদলী হলো মতিঝিল থেকে উত্তরা ব্রাঞ্চে! ওর অফিস বিল্ডিং এরই চারতলায় অফিস ছিলো,রিমুর। রিমু ছিলো রায়হানের বছর তিনেকের ছোট ফুপাতো বোন,দু'জনেই দু'জনকে পছন্দ করতো কলেজ জীবনে! কিন্তু বাবা-ফুপার সম্পর্কটা দা'কুমড়ো ছিলো বলেই চিন্তাটা বেশি দূর আগায়নি। একই বিল্ডিং এ অফিস হওয়ায় আসতে-যেতে দেখা হতো রোজ। প্রায় দিনই দেরি করে,থমথমে একটা মুখ নিয়ে বাসায় ফিরতো রায়হান। আস্তে আস্তে রিমুর সাথে ঘনিষ্টতা বাড়তে লাগল তবে সুপ্ত আবেগ যে কখনো এভাবে প্রকাশ্য রুপ নিবে তা ভাবেনি কেউই!
মিলা চাকরী ছেড়েছিলো বিয়ের দু'মাসের মাথায়,শুধু দুপুরে একটা টিউশনী করাতো। একদিন,ওর ছাত্রীর মা নিজের রুমে ডেকে নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
-রায়হান কে তুমি কি বিয়ের আগে থেকে চিনতে?
-উম,ঠিক অনেকদিন চিনিতাম তা না,তবে চিনতাম।
-তোমরা কি একই সাথে পড়তে?
-না তো!কেন আন্টি?এই কথা কেন জিজ্ঞেস করছেন?
-নাহ,তোমরা তো আজকালকার ছেলে-মেয়ে,ভাবলাম একসাথে পড়তে কি না!তুমি ছাড়াও রায়হানের তেমন কোন মেয়ে বন্ধু আছে কি না!
মিলা কপাল কুঁচকালো!
-আন্টি ঠিক বুঝতে পারছি না,কি বলছেন?!
-দেখ,সরাসরিই বলি,আমার বোনের বাসা উত্তরাতে আমি দু'দিন পর পরই যাই,আমি গত দুই মাসে কয়েকবার রায়হানকে দেখেছি একটা মেয়ের সাথে রিকশায়। আমি ভাবলাম কলিগ বা ক্লাসমেট কেউ হবে!কিন্তু তোমাকে তো চিনি,ওরকম মেয়ে তো তুমি না,সুতরাং রায়হানও নিশ্চয়ই তোমার মতোই হবে। সে জন্যই জিজ্ঞেস করলাম।''
মিলা খুব শকড হলো!তাৎক্ষনিক কিছু বলতে পারল না!কোন মতে চলে আসল।
সন্দেহ ব্যাপারটা মিলা খুব অপছন্দ করে,সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিশ্বাস আর শ্রদ্ধাবোধ এই দুটো জিনিসকেই সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দেয় সে। বিয়ের আগেই এটা রায়হানকে সে বলেছে,এবং রায়হানকে সে ঠিক সেভাবেই বিশ্বাস করে,শ্রদ্ধা করে। আজ এতোদিনেও তো কখনো রায়হান ওকে তেমন কারো কথা বলেনি,বিয়ের অনুষ্ঠান গেল,ওর সাথে এতো এতো বন্ধু-বান্ধবের বাসায় গেলো কই,কখনো তো তেমন কোন মেয়ের কথা শোনেনি!! তাহলে কি আন্টিই ভুল বললো!
দ্বিধা-দ্বন্দে দোদুল্যমান অবস্থায় চারদিন কাটালো মিলা! এর মধ্যে এক কাজিন ছোট ভাইকে দিয়ে খোঁজ নেয়ালো। তারপর যা শুনলো তাতে মনে হয়েছিলো, মিলা পায়ের তলায় কোন মাটি নেই!একদমই শূণ্যে ভাসছে সে!
এখনো সে দিনটা চোখে ভাসে মিলার,যেদিন রায়হানকে সামনে বসিয়ে জিজ্ঞ্রেস করেছিলো,সে এখন কি চায়?তার সঙ্গে সব ভুলে থাকতে চায় না কি রিমুর সাথে থাকতে চায়?
মিলার মনে মনে কেন জানি নিজের ভালোবাসার প্রতি খুব বিশ্বাস ছিলো,ওর মন বলছিলো রায়হান ওর কাছেই ফিরে আসবে! কিন্তু নাহ...! মিলা হেরে যায়! হেরে যায় ওর ভালোবাসা!
রায়হান জানিয়ে দেয়,সে রিমু কে বিয়ে করবে,মিলা যদি অনুমতি দেয় তো ভালো আর না হলে ওকে যেনো মিলা ডিভোর্স দেয়।

প্রায় তিন মাস হলো মিলা চলে এসেছে মায়ের বাসায়। ভাই-ভাবি চাকরীর সুবাদে খুলনা থাকায় কলেজের চাকরী নিয়ে মা বাসায় একাই থাকতেন। গত তিন মাসে মিলা খুব চেষ্টা করেছে সব ভুলে স্বাভাবিক হবার। প্রথম প্রথম খুব আশা নিয়ে ঘুম থেকে উঠতো,মনে হতো আজ হয়তো রায়হান আসবে,ওর কাছে স্যরি বলবে,ওকে বাসায় ফিরিয়ে নিয়ে যাবে! কিন্তু নাহ।
আসেনি রায়হান। দিনের পর দিন কেটেছে,কোন জবাব জবাব পায়নি ওর ম্যাসেজ গুলোর। ফোন করলে,'খুব ব্যাস্ত আছি,পরে ফোন দিচ্ছি' বলে এড়িয়ে গেছে!'
রায়হানের বাসায় সব জানার পর ওর বাবা ওকে তার বাড়ির সীমানায় আসতে বারণ করেছেন। রায়হানের মা আর বড় বোনকে খুব আশা নিয়ে মিলা ফোন করেছিলো,কিন্তু তারাও নিরাশ করে বলেছে,মিলা যেনো রায়হানের দ্বিতীয় বিয়েটা মেনে নেয়,ক্ষতি কি?ওর মা ও তো ওর বাবার বিয়ে মেনে নিয়ে আছেন! মিলার বাবারো একই মত!
সব দিক চিন্তা করে মিলা তাই রায়হান কে ডিভোর্স দেবার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। শুধু শুধু একটা সম্পর্কের নাম ঝুলিয়ে রাখার কোন মানে হয় না! যে সম্পর্কটাকে রায়হান গলা টিপে মেরে ফেলেছে,মিলার উচিত সেটাকে কবর দিয়ে দেওয়া। কিন্তু অনেক চেষ্টার পরেও পারেনি ডিভোর্স পেপারে সাইন করতে!
মিলার মাঝে মাঝে মরে যেতে ইচ্ছে করে! খুব ইচ্ছে করে!  কি করে পারে একটা মানুষ এভাবে বিশ্বাসঘাতকতা করতে? কি করে পারে সব কিছুকে একেবারে অস্বীকার করতে?
খুব জানতে ইচ্ছে করে,কেন ওকে বিয়ে করেছিলো রায়হান? মিলাকে তো সে ই আগে পছন্দ করেছিলো,তাহলে আজ কি করে পারছে ওকে চলে যেতে বলতে? রিমু কি করে পারল,সব জানার পরেও রায়হানের জীবনে ফিরে আসতে?! কাকে দোষ দিবে মিলা বুঝে না!
মামা বলেছেন,অফিসে জয়েন করতে। মা ও তাই বলেছেন,ব্যাস্ত থাকলে সময়টাও কাটবে আস্তে আস্তে সব ঠিকও হয়ে যাবে। কিন্তু মিলা কোন ভাবেই কিছু ভুলতে পারে না! রায়হানের স্মৃতি সারাক্ষন যেনো তাড়া করে ফিরে! পারে না মিলা স্বাভাবিক হতে! প্রায় সময়ই রায়হানকে পাশে কল্পনা করে একা একা কথা বলে,ঝগড়া করে,কখনো কাঁদে!
আমিনা আহমেদ সবই বুঝতে পারেন। কিন্তু দীর্ঘশ্বাস ফেলা ছাড়া আর কিছুই করতে পারেন না! নিজে তো পেরেছিলেন,ছেলে-মেয়েদের কে আঁকড়ে ধরে বেচে থাকতে,কিন্তু মেয়েটা কি করবে?কিভাবে বাকী জীবন কাটাবে?! আল্লাহর কি ইচ্ছা তিনি বুঝতে পারেন না।

অফিস থেকে ফিরতেই রায়হানকে দাড়োয়ান খামটা ধরিয়ে দিলো,বললো মিলা এসেছিলো এগুলো দিয়ে গেছে। ফ্ল্যাটে ঢুকে কাপড়-চোপড় ছেড়ে খামটা খুলল রায়হান। প্রথমেই ডিভোর্স পেপারটা পেলো,পাতা উল্টিয়ে দেখল মিলা সাইন করে দিয়েছে। কেন জানি,বেশ কিছুক্ষন সিগনেচারটার দিকে তাকিয়ে থাকল রায়হান!
খামের ভেতর আরেকটা ছোট ভাঁজ করা কাগজ পেলো,ধীরে ধীরে সেটা খুলল,
''অনেক চিন্তা করেও সম্বোধনের কোন ভাষা খুঁজে পেলাম না,তাই সম্বোধন ছাড়াই লিখলাম। তোমার দেয়া ডিভোর্স পেপারটাই সাইন করে দিয়েছি,আজ থেকে তুমি মুক্ত! কি?খুশী এবার? আমি নিজেও খুব খুশী কাজটা করতে পেরে!
আমি আরো খুশী,কারন আমি নতুন করে জীবনটা শুরু করতে যাচ্ছি তাই! কিভাবে জানো? না না,তোমার মতো অন্য কারো হাত ধরে না! আমি নতুন জীবন শুরু করতে যাচ্ছি,আমার আরেক আমির সাথে! এই 'আমি'টার নাম হচ্ছে 'মা'।
গতকাল ডাক্তারের রিপোর্ট পেয়েছি,ডাক্তার জানিয়েছে,খুব দ্রুতই আমার কোল জুড়ে আল্লাহ আমাকে বেঁচে থাকার অবলম্বন হিসেবে একজনকে পাঠাচ্ছেন! আমি খবরটা শোনার সাথে সাথেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি,যে আমি তোমাকে মুক্ত করে দিবো! আমার তোমার দেয়া কষ্টের বোঝা বয়ে বেড়ানোর আর কোন দরকার নেই। আমি আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ সুখটা পেয়ে গেছি,আমার ভালোবাসার সেরা উপহারটা পেয়েছি,যেটার ভাগ নিতে তুমি পারবে না!চাইলেও না!
রায়হান,আমি দুঃখিত! বলতে পারলাম না,যে তুমি বাবা হতে যাচ্ছো! আমার সুখানুভুতির এক ফোঁটা ভাগও তোমাকে দিতে পারলাম না। আফসোস তোমার জন্য!আজ বুঝতে পারছি,তোমার সাথে থাকায় আমার সুখ নেই,তোমার দূরত্বেই আমার সুখ,তোমার হারিয়ে বিলীন হয়ে যাওয়াতেই আমার সুখ!''

অনেক রাত এখন এই শহরে। বাতি নিভে যাওয়া শত শত ঘরের মাঝেও শহরের দু'প্রান্তে দু'টো রুমে আলো জ্বলছে এখনো! একটা ঘরে,কেউ জেগে জেগে তার ভেতরের মানুষটার সাথে কথা বলছে,তারপাশের ঘরে টেবিলে ল্যাম্প জ্বালিয়ে কেউ একজন পুরোনো এলবাম বের করে স্মৃতিচারণ করছে অশ্রু ঝরিয়ে।  শহরের অন্য প্রান্তের একটা ঘরে কেউ এক হাতে চিঠি আরেক হাতে সাইন করা পেপারটা নিয়ে মূর্তির মতো বসে আছে। দু'প্রান্তের মানুষ গুলোর কাজের মাঝে একটা মিল আছে,আর তা হলো ওদের সবার চোখ বেয়েই অঝোরে অশ্রুরা ঝরে পড়ছে!... একই রকম অশ্রু তবে ভাষা ভিন্ন! কোন অশ্রু সব হারিয়ে কিছু পাওয়ার কথা বলছে,আর কোন অশ্রু সব থেকেও সব হারানোর কথা বলছে!

[উৎসর্গঃ আমার জগতে ঠিক এমনই দোদুল্যমান অবস্থায় আছে একজন। আমি বুঝতে পারি তার ভেতরে কতো কষ্ট,অনুভব করতে গেলে বা তাকে দেখলে চোখের পানি আটকে রাখতে পারি না কিন্তু তাকে সান্তনা দেবার বা কি করা উচিত  বলার তেমন কোন ভাষাই আমি খুঁজে পাই না!]




শনিবার, ৩১ আগস্ট, ২০১৩

শরতের সাদা-নীল


নাম না জানা বেশ অচেনা 
তবু খানিকটা চেনা কিছুটা জানা! 
শরৎ কিছুটা এমনই,
শ্রাবণের রেখে যাওয়া কিছু গল্পের 
শেষাংশের শেষটুকু জানা-জানার
হাওয়ায় দুলিয়ে যায় শুধু! 

সেই শেষাংশে অনেক কথা থাকে
এতো কথা যে গল্প বদলে উপন্যাস হয়ে যায়,
সে উপন্যাসে থাকে,রাগ-অনুরাগ আর অনুভূতির লুকোচুরি
মেঘ-রোদ্দুরের লুকোচুরির মতো অনেকটা ।

সেই শেষাংশে ভুরদুপুরে কাশফুল দোলে খুব
সাদা কাশফুলের শুভ্রতা যেয়ে মিশে অসীম নীলে 
সেখানে নীল,কথা বলে কি যেনো
সাদা বুঝতে পারে খু্ব,তবে থাকে নিরুত্তর! 
সাদা-নীলের সেই কথপোকথন 
গল্পের শেষটা রেখে যায় আধেক আলাপন 

তাই গল্পটা আর শেষ হয় না
গল্পের শেষাংশে এসে লেখক আর সুর খুঁজে পায় না!
তাই গল্পটা রয়ে যায় অসমাপ্ত
গল্পের নাম রয়ে যায় অজানা
গল্পটা হয়ে থাকে,খানিকটা চেনা আর কিছুটা জানা!  

বৃহস্পতিবার, ২৯ আগস্ট, ২০১৩

ছুটে চলা গল্পের একটা অংশ


মাঝে মাঝে দরকার নাই টাইপের কাজ করতে খুব মজা লাগে!এই যেমন এখন,খুব যত্ন করে হাতের নখ গুলোকে সাইজ করছিলাম,কানে হেডফোন গুঁজে নিয়েছি যাতে করে কেউ ডাকাডাকি করলেও শুনতে না হয়! কিন্তু শুনতে হলো,কারণ মোবাইলের গান বন্ধ হয়ে গেছে,কল আসছে তাই! সুপ্তির ফোন।
আমি কল টা রিসিভ করে কাজে মনোযোগ দিলাম,
-কিরে?ডাকোস কেন?
-করতেছিস কি তুই?
-নখচর্চা!তোর কি খবর?কি সমস্যা বলে ফেল?
-দোস্ত,ঝামেলা তো হইয়া গেছে একটা!কি করি এখন?!
আমি কপাল কুঁচকে বললাম,
-ঝেড়ে কাশ,কি হইছে?
-আরে আমি তো ট্যাক্সে ফেল করছি!
আমি একটা হাই তুলতে তুলতে বললাম,
-কইরা ভালোই করছিস,আমাদের এখানে তো যেই প্রশ্ন করছিলো,আর যেভাবে পড়াইছে,সব তো পরীক্ষার খাতায় লেখার আগেই বের হয়ে গেছে মাথা থেকে!আল্লাহ পাকের ইচ্ছায় পাশ করে ফেলছি,বাট ট্যাক্স এর 'ট' টাও এখন আর মাথায় নাই!তুই ই ভালো করছিস,আরেকবার ভালো মতো পড়ার সুযোগ পাইছিস!
সুপ্তি কাঁদো কাঁদো স্বরে বলল,
-দোস্ত,মজা নিস না!কি করুম এখন সেটা বল,আমার তো এখন দুই তিন জায়গায় কথা শুনতে হইবো,ভুইলা যাইস না,আমার বিয়ে হইছে!
-নারে ভুলি নাই,গত একবছর ধইরা তোর বিয়ে খাইছি,কেমনে ভুলি বল?! আর তোরে কে কি বলবে এখন?বিয়ে-সংসারের ঝামেলায় যে তুই ক্লাস করতে পারিস নাই,সেটা দেখে নাই কেউ?ট্যাক্স কি থিউরী,যে এক রাতে পড়ে হইয়া যায়!
-এগুলা কেউ বুঝবো নারে!
-তাইলে কানে তুলা দে,যা খুশী অন্যরা বলে বলুক!এতো কথা শোনার টাইম নাই তোর,বুঝছিস?আর কালকেই কোর্স এড করে ফেল,ঝামেলা শেষ!
-দোস্ত,বাপ-মা হাজার বকলেও গায়ে লাগে না,উল্টো ঝাড়ি দেয়া যায় কিন্তু শ্বশুড় বাড়িতে একটু মুখ কালো করলেই অনেক লাগেরে!কিচ্ছু বলা যায় না!
আমি হেসে ফেললাম!
-এই জন্যই তো বলছি,কানে তুলা দিয়ে রাখ!আরে মানুষ মাত্রই বকা খাইতে হবে,সো ব্যাপার মনে করলেই ঝামেলা!
সুপ্তি আরো কতোক্ষন মিনমিন করে ফোন রাখল। আমারো ততোক্ষনে কাজ হয়ে গেছে,ওদিকে আসরের আযান ও পড়েছে,আমি দ্রুত রুম থেকে বের হলাম।

রাতে আবারো সুপ্তি ফোন করল,আমি ধরেই বুঝলাম,বেচারীর খুবই মন খারাপ!টেবিল থেকে উঠে লাইট অফ করে বিছানায় বসলাম।
-তুই কি ভাইয়া কে বলেছিস?
-হুম,বলেছি।
-কি বলে জনাব?
সুপ্তি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
-বাদ দে তার কথা,সে কি বলবে!বলে,আমার বোন রিমির তো বিয়ের সময় ফাইনাল পরীক্ষা ছিলো,বাট ও তো অনেক ভালো রেজাল্ট করেছে!
-হুম,রিমি আপু তো ন্যাশনালে পল সাইন্সে পড়তো তাই না?
-হুম,এবং তার বিয়ের সাত দিন পর ফাইনাল পরীক্ষা ছিলো,তাই আমার শ্বাশুড়ি নিজে যেয়ে চারদিনের মাথায় আপুকে এ বাসায় নিয়ে এসেছিলেন,এবং পরীক্ষা শেষ না হওয়া পর্যন্ত আপু এখানেই ছিলো!
-বাহ!!ভালো তো!কিন্তু আ্মি তো দেখেছি,তুই ক্লাস থেকে শুরু করে পরীক্ষা সব কিছুই শ্বশুড় বাড়ি থেকেই এসে করিস,এমনকি গ্রুপ স্ট্যাডি করতে তোর বান্ধবীরা তোর বাবার  বাসায় যায়,আর তুই বলে আসিস ক্লাসে যাচ্ছিস,কারন বাবার বাড়ি আসবি শুনলে তোর শ্বাশুড়ি না না করবে তাই!
সুপ্তি কোন জবাব দিলো না। আমি জানি ও সব সময় চুপ করেই থাকে,থাকতে হয় ওকে... আর দশটা মেয়ের মতো সুপ্তি জোর গলায় দাবী করতে পারে না,নিজের প্রয়োজন-অপ্রয়োজন বলতে পারে না!নিজের জন্য কখনো দু'কথা বেশি হবে এটা সুপ্তি কোনভাবেই হতে দিবে না! আর ওর এই সুযোগটাই সবাই নেয়।
ওর জামাই শান্তিপ্রিয় মানুষ!শ্বশুড় সমাজসেবা প্রিয়, শ্বাশুড়ি শাসন প্রিয়,আর সুপ্তি হলো নীরবতার প্রিয়...ব্যাস,সব মিলিয়ে সোনায় সোহাগা অবস্থা!
আমি নরম গলায় বললাম,
-মন খারাপ করিস না,আর সাহস রাখ,দেখবি সব ঠিক হয়ে যাবে। চিন্তা করিস না,আমরা,তারপর তোর ক্লাসমেটরা তো আছি আল্লাহর রহমতে,যা যখন দরকার হেল্প করবো,তুই ক্লাস করা শুরু করে দে,আর টিচার কে বলে রাখিস তোর নিয়মিত ক্লাস করতে সমস্যা,যেহেতু প্রাইভেট,ক্লাস প্রেজেন্ট অনেক ইম্পোর্টেন্ট। ওকে?
-দোস্ত,এখন মনে হয় আমাকে শুধু সব বিষয়ে কোন রকম পাশ করেই দিন পার করতে হবে?!নিয়মিত ক্লাস করার কোন আশা নাই! এ বাসায় কাজের লোক টিকে না,আমার শ্বাশুড়ী খিটমিট করেন বেশি,তাই বেশির ভাগ কাজ তো আমাকেই করতে হয়,এদিকে মেহমান আসা-যাওয়ারও কমতি নেই!আমি তো রাত ১০টার পরেও অবসর হতে পারিনা!দোস্ত,আমি চোখে কিচ্ছু দেখতে পাচ্ছি না!
-তোর না আরো দুইজন ভাসুরের বউ আছেন বাসায়,উনারা কি করেন?উনারা একটু হেল্প করতে পারেন না?
-উনাদেরকে আমার শ্বাশুড়ির খুব একটা পছন্দ না,আর তারাও তাদের বাচ্চার স্কুল-টিচার নিয়ে এমন ব্যস্ত যে,তিন তলা থেকে দোতালায় নামার সুযোগ পান না!,প্রায় সময়ই বিকেলে এক কাপ চা খাবেন,সেটাও আমাকেই বানাতে হয়!
এবার আমি চুপ করে রইলাম!কি বলবো?সংসার যুদ্ধ তো বোধহয় একেই বলে! এভাবে যুদ্ধ করেই পড়াশুনা কোন রকমে শেষ করতে হবে!সামনে আগাতে হবে,যেভাবে আর দশজন মেয়েরা করে।
তবে,সংসার কি আসলেই এমন যুদ্ধক্ষেত্র হওয়ার কথা?সহমর্মিতা,সহোযগিতা,ইনসাফ আর ভালোবাসা পূর্ণ হওয়ার কথা না? বাবা-মায়ের মতো শাসন যেমন থাকবে,তেমনি আদরও থাকবে,পরিবারের অন্যান্যদের সাথে ভালো সম্পর্ক থাকবে,সবার সহোযোগীতা থাকবে সব কাজে এমনটাই তো হওয়ার কথা...! বাট আমাদের সমাজে এসব তো শুধু বইয়ের পাতায় অথবা নীতি কথার লাইনেই সীমাবদ্ধ!
আমি একটা নিঃশ্বাস ফেলে বললাম,
-এতো ভয় পাচ্ছিস কেন?আর মানুষ কি বিয়ের পর পড়াশুনা করে না?তারা কি ভালো রেজাল্ট করে না?এসব কোন ব্যাপার না!ধৈর্য্য ধর,আর একটু বেশি পরিশ্রম করতে হবে এই যা!তবে আত্নবিশ্বাস হারাবি না, তোর নতুন সংসার,তাই এখন একটু বেশি সমস্যা হচ্ছে হয়তো...ধীরে ধীরে সব ঠিক হয়ে যাবে,ইনশাআল্লাহ। দেখবি তখন তোর শ্বাশুড়িও অনেক ছাড় দিবেন,আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইতে হবে আর সাহস রাখবি।
-হুম,আমার আসলে খুব ভয় ভয় লাগেরে!এখন মনে হচ্ছে,বিয়ে-শাদী আসলে পড়াশুনা শেষ করে করলেই ভালো ছিলো! এইরকম টানা-টানি করে কোন রকম একটা সার্টিফিকেট নিয়ে কি লাভ?অথচ টাকা-সময় তো ঠিকই যাচ্ছে!তার উপর কিছু উনিশ-বিশ হলে দুই বাড়িতেই কথা শুনতে হয়!
আমি হাসলাম! আমাদের সমাজে একটা মেয়েকে পড়াশুনা শেষ করা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে গেলে যে সব কষ্ট-সমস্যা সহ্য করতে হয় সে অর্থে বলতে গেলে,সুপ্তি ভালোই করেছে! গলায় কাঁটা নিয়ে খাবার খাওয়ার কষ্টের চাইতে মনে হয় কাঁটা বিহীন গলায় না খেয়ে থাকাও অনেক ভালো!!
ভাবতে ভাবতে লাইট অন করলাম,ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি সাড়ে ১১টা বাজে,কালকে একটা গ্রুপের প্রেজেন্টেশন রেডি করে দিতে হবে!
-সুপ্তি শোন,এতো চিন্তা করবি না,চিন্তা করে কোন লাভ নেই,যা হয় আল্লাহ নিশ্চয়ই তাতে কল্যান রাখেন,মানুষের ইচ্ছেতেই সব কিছু হয় না। আর তুই তোর মা কে দেখ,আমার মা কে দেখ,তারাও এমন সব ঝামেলা ম্যানেজ করে পড়াশুনা শেষ করেছেন,এমন আরো অনেকেই করছে,অনেকে তো ২/৩বাচ্চা সামলে পড়াশুনা করছেন!তোর মেধা আছে,আগ্রহ আছে আর কিছুর তো দরকার নেই,একটু কষ্ট কর দেখবি ইনশাআল্লাহ তোকে আল্লাহ সাহায্য করবেন।
-আমাদের মায়েরা কষ্ট করেছেন,দেখে তো আমাদেরকেও একই কষ্টে ডুবায় দিয়েছেন!দেখেছি তো অনেককে,ওরকম ২/৩বাচ্চা সামলে যারা পড়ছেন ওটাকে পড়া বলে না,কোন রকম একটা কাগজের সার্টিফিকেট আদায় করা জাস্ট!
স্পষ্ট টের পেলাম সুপ্তি ভেতরে ভেতরে অভিমানে ফুঁসছে!
-একটু আগে না বললাম,যা কিছু হয় আল্লাহ অবশ্যই তাতে কল্যান রাখেন,এবং উনার হুকুম ছাড়া কিছু হয় না। মানুষকে কেন দোষ দিস?আল্লাহর কাছে দোয়া কর,দেখবি উনিই ভালো সমাধান দিবেন। কোন রকম আফসোস করবি না।
সুপ্তি আর কিছু বলল না,চুপ করে ফোনটা রেখে দিলো,শুধু এপাশ থেকে আমি ওর একটা গোপন দীর্ঘশ্বাসটা শুনতে পেলাম,যেটা ও কাউকে শোনাতে চায় না!

ব্যাস্ততার মাঝে মাঝে আজকাল খুব একটা সুপ্তিকে ফোন করা হয়ে উঠে না,ও মাঝে মাঝে ফোন করে বই-নোটের কথা বলে,আমি সেগুলো ওর বাবার বাসায় রেখে আসি,ওখান থেকে কেউ দিয়ে আসে ওর বাসায়। ঈদ উপলক্ষে ঈদের আগের দিন ফোন দিলাম,ধরলো না,রাতের নিজেই ব্যাক করলো,কনফারেন্সে আরো দুই বান্ধবী ছিলো। সালাম-শুভেচ্ছা বিনিময়ের পর বললাম,
-তো কবে আসছিস এই বাসায়?ভাবছি তোর বাসায় তুই আসলে একটা গেট টুগেদার রাখবো।
- নারে আসা হবে না। আমার শ্বাশুড়ি ওমরাহ করতে গিয়েছিলেন,গতকাল এসেছেন,এসে আবার অসূস্থ হয়ে গেছেন,এর মধ্যে আবার কাজের লোকও নেই,সো,এবার কোথাও যাওয়ার সুযোগ নেইরে!
নায়লা বলল,
-এক ঘন্টার জন্যেও আসতে পারবি না?তোর আম্মু তো মন খারাপ করবে,একটা মাত্র মেয়ে একই শহরে থেকেও ঈদে আসবি না,কেমন দেখায়?!
-হুমম... মন তো আমারো চাইবে,বাট এই কথা বলাই যাবে না,শ্বাশুড়িকে আর কি বলবো  তোর ভাইয়াই তো অলরেডি না বলে ফেলছে!বলেছে,'এবার কোথাও বের হতে চেয়ো না,আব্বু-আম্মু অসূস্থ!' দেখি ও বাসা থেকে এখন আম্মুরা আসে নাকি!
আমি আর কি করবো,ফোনের এপাশে মুখটা বাংলার পাঁচ করা ছাড়া! কি এক অবস্থা!ঈদের একটা সময় তাও দোস্তের সংসার থেকে ছুটি নেই!ইয়া আল্লাহ,রহম করেন...কি কঠিন অবস্থা! :(
তানি বলল,
-তোর জামাই আর শ্বাশুড়িকে বলবি,রোজ ২রাকাত শুকরানা নামাজ পড়তে,যে এই যুগে তোর মতোন বউ পাইছে তাই!অন্য কেউ হইলে খবরই ছিলো!তোর শ্বাশুড়ির বাকী ২বউএর মতো ভাগতো!হুহ
চারজন এক সাথে হেসে বললাম,'কারররেক্ট!দেখতে হবে না?বান্ধবীটা কাদের!'
ঈদের চারদিন পর সুপ্তি অবশ্য এসেছিলো মায়ের বাসায়,পরীক্ষা তাই ভার্সিটি থেকে এডমিট আনতে যাবার কথা বলে বের হয়েছিলো! দৌড়ের উপর এসে মায়ের হাতের কাচ্চি বিরিয়ানী খেয়ে আর বাবাকে পায়েশ রান্না করে দিয়ে আবার দৌড়েই চলে যায়।

মাঝে মাঝে ক্লাস শেষে বিকেলে বাসে দীর্ঘ সময়ের জার্নিতে বসে জীবনটাকে ভাবতে গেলে,পুরো জীবনটাকে বাস জার্ণিই মনে হয়! দীর্ঘ সময় স্টপেজে দাঁড়িয়ে থাকার পর কাংখিত বাস আসলেও অসম্ভব প্রতিযোগীতে করে উঠতে হয়,তারপর আরো কিছুক্ষন কষ্ট করে বসার সীট পেতে হয়,জ্যাম-পথের দীর্ঘতা সব পেরিয়ে গন্তব্যে পৌছাতে হয়!তবে সেটাও নির্ধারিত গন্তব্য না! ঠিক জীবনটাও এভাবেই অনির্ধারিত গন্তব্যের পেছনে দৌড়েই কাটাতে হয়,মিলুক আর না মিলুক,চাওয়া পাওয়ার হিসেব কে দূরে রেখে প্রয়োজনের সাথে ক্ষণিক সুখের সমোঝতা করে একভাবে দিন গুলো কাটিয়ে দিতে হয়। বাসা ছুটে চলে,জীবনের সময় গুলোও ছুটে চলে,স্বপ্ন-আকাংখা গুলো ছুটে চলার সাথে দূরে মিলিয়ে যায়,সামনে অপেক্ষায় থাকে শুধু অনির্ধারিত বাস্তবতা আর প্রয়োজন!







বুধবার, ২৮ আগস্ট, ২০১৩

অপেক্ষায় রইলো আবেগ গুলো


মোবাইলটা আবারো বেজে উঠলো,এক রাশ বিরক্তি নিয়ে তাকালো,সেই একই নাম্বার! মিসডকলের সংখ্যা জমতে জমতে দশের উপরে উঠে যাচ্ছে! বাধ্য হয়ে কলটা রিসিভ করলো,সালাম বিনিময় করে বলল,
-আচ্ছা ভাবি,তুমি আমাকে কেন এতো ঘন ঘন ফোন দিচ্ছো?! সমস্যাটা কি?
ভাবি হেসে ফেললেন।
-তাহলে কি আরো হালকা হালকা ভাবে ফোন দিবো? 
-হুম,খুবই হালকা ভাবে ফোন দিবে,মাসে একবার!বুঝেছো?
ভাবি আরো জোরে হেসে ফেললেন,
-এইরে পাগলী বোন,এতো রাগ করিস কেন?ধৈর্য্য ধরতে শিখো বুঝলে? 
নুমা একইভাবে মুখ শক্ত করে বলল,
-বুঝলাম,যদি এভাবে তুমি আর তোমার শ্বাশুড়ীও ধৈর্য্য ধরতে শিখতে তাহলে কতোই না ভালো হতো! 
-ওহ,শ্বাশুড়ির কথা বলে ভালো করেছো,শোন,আম্মা বলছিলো,তোমাকে ক'টা দিনের জন্য বাসায় বেড়িয়ে যেতে,মনটাও হালকা হবে,ভালোও লাগবে। আমরা তো আজকে সন্ধ্যায় আসছি,তখন আমাদের সাথে তুমিও চলে এসো।   
নুমা একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
-ভাবি শোন,আমি এখন রাখি,কাজ আছে আমার। আর তোমার শ্বাশুড়িকে বলবে,তার মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে,সে শ্বশুড় বাড়িতে থাকে,সুতরাং তাকে যেনো এতো ঘন ঘন ডাকাডাকি না করে,ওকে?রাখি,আল্লাহ হাফেজ। 
কথাগুলো বলে ভাবিকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে লাইন কেটে দিলো। আরো কিছুক্ষন চুপ করে বসে রইলো নুমা। কেমন জানি দম বন্ধ হয়ে আসছে,ভেতরের অনুভূতি গুলো চেপে রাখতে খুব কষ্ট হচ্ছে!কিন্তু তারপরেও সব কিছুকে চাপা দিয়ে খুব নরমাল ভাবেই থাকতে হবে ওকে,কোন ভাবেই দুর্বল হওয়া যাবে না। 

ওয়াশরুম থেকে রাহাত বের হয়ে দেখল,নুমা ঠিক ওভাবেই এখনো বসে আছে! পরিস্থিতিটাকে কিভাবে যে সহজ করবে রাহাত নিজেও বুঝতে পারছে না!ওকে দেখে নুমা দ্রুত বেড ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো,খুব ব্যস্ত একটা ভাব নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেলো,রাহাত কিছুটা বোকার মতো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ওর চলে যাওয়া দেখল!কিছু বলতে পারলো না! 
নুমা কিচেনে এসে দেখলো,সবজি গুলো সেভাবেই পরে আছে,দুপুরের খাবার এর কোন রকম প্রিপারেশনই শুরু হয়নি,ওদিকে ১২টা বেজে যাচ্ছে! বাসায় এমনিতেই মেহমান আছে। কাজের বুয়াটাকে তাড়া দিয়ে নিজেই ফ্রিজ থেকে জিনিসপত্র নামাতে লাগল,কাঁটা-ছাঁটা করা অবস্থায় শ্বাশুড়ি আসলেন,কিছুক্ষন দাঁড়িয়ে থেকে বললেন,
-নুমা তুমি বরং যাও,আমি সামলাচ্ছি এ দিকটা,ওদিকে দেখো রাহাতটা কিছু লাগে কি না। 
নুমা একমনে কাজ করতে করতে বলল,
-সমস্যা নেই আম্মা,আমি সব সামলে নিতে পারবো আর যদি তার কিছু লাগে ডাক দিবে,তাছাড়া অনেকেই তো আছে বাসায়!  
শ্বাশুড়ি আর কিছু বললেন না,একটা নিঃশ্বাস ফেলে চলে গেলেন। একটু পর বড় ভাসুরের ছেলে সাদ এসে বলল,
-চাচী আপনাকে ছোট চাচ্চু ডাকছে। 
নুমা ওর দিকে তাকিয়ে বলল,
-চাচ্চুকে যেয়ে বল,আমি কাজ করছি। 
সাদ চলে গেলো। একটু পর আবার ফিরে আসল,
-চাচী,চাচ্চু বলেছে ১০মিনিটের জন্য যেতে। 
নুমা কিছুক্ষন চুপ করে থেকে বুয়াকে কাজ বুঝিয়ে দিয়ে দ্রুত নিজের রুমে আসল। এসে দেখে রাহাত ইজি চেয়ারে বসে আছে,সারা বিছানা ছড়ানো জিনিস পত্র দিয়ে! নুমা সেদিকে তাকিয়ে বলল,
-ডেকেছো কেন বল?আর তোমার জিনিসপত্র কি সব গোছানো হয়নি? এগুলো কি নামিয়েছো আবার? 
রাহাত কিছু না বলে নুমার দিকে তাকিয়ে রইল। নুমার কেমন জানি অস্বস্তি লাগছে! কন্ঠে বিরক্তির পরিমান আরেকটু বাড়িয়ে বলল,
-কি হলো?ডেকেছো কেন? 
রাহাত থমথমে মুখে বলল,
- তুমি কি আমার সাথে স্বাভাবিক ভাবে কথা বলবেই না? আমি বুঝতে পারছি তোমার খারাপ লাগছে,কষ্টও হচ্ছে খুব বাট তারপরেও...একটু স্বাভাবিক আচরন করো আমার সাথে প্লিজ! 
নুমার ইচ্ছে হলো রাগে ফেটে পড়তে! কিন্তু কার উপর রাগ করবে?এই মানুষটা আর কয়েক ঘন্টা পর অজানা সময়ের জন্য চলে যাবে সুদূর আমেরিকা তে। তার উপর আর কি রাগ করবে?বেচারার এমনিতেই মন ভীষন খারাপ,তার উপর চারমাস আগে বিয়ে করা বউ যদি যাবার ২দিন আগে থেকে এরকম বিরক্তি আর রাগ নিয়ে সারাক্ষন কথা বলে তাহলে সেই কষ্ট সে কিভাবে সহ্য করবে?!এরকম বলাটাই তো স্বাভাবিক।  
নুমা সবই বুঝতে পারছে,কিন্তু তারপরেও নিজেকে স্বাভাবিক রাখতে পারছে না! সব কিছু কেমন লাগামহীন মনে হচ্ছে! পুরো জীবনটাকে যেনো... 
একে তো সে নিজেই বিয়ের জন্য প্রিপারেড ছিলো না,মা-ভাই-ভাবিদের চাপে পড়ে বিয়েতে মত দিয়েছিলো তার উপর বিয়ের ৩মাসের মাথায় শুনলো তার জামাই ৩/৪ বছরের জন্য উচ্চ শিক্ষার্থে বিদেশে চলে যাচ্ছে!নুমা দেশে থাকবে শ্বশুড়-শ্বাশুড়ির সাথে!... 
সিদ্ধান্ত গুলো নেবার আগে কেউই একবারো নুমার মতামত জানতে চায়নি,না রাহাত চেয়েছে,না বাবার বাড়ির কেউ না শ্বশুড় বাড়ির। সব কিছু মোটামুটি ঠিক হবার পরেই বাবা-মায়ের সামনে ওকে ডেকে কথা গুলো জানানো হয়েছে,সেই সময় মাথা নিচু করে সব শোনা ছাড়া আর কিছুই করতে পারেনি নুমা। সেই মূহুর্তে শুধু মনে হচ্ছিলো,মেঝেটা ফাঁক হয়ে যেতো যদি...!
শ্বশুড় বাড়ির সবার ভাবটা এমন,তারা ছেলে বিয়ে করিয়ে বউ এনেছেন,সুতরাং তারা যে সিদ্ধান্ত নিবেন সেটাই ফাইনাল,আর বাবার বাড়ির ধারনা,থাকুক না জামাই বাইরে কি হয়েছে তাতে?দেশে শ্বশুড়-শ্বাশুড়ি আছে,বাবা-মা আছে এদের সাথে থাকবে এটা নিয়ে মেয়ের আর কথা কিসের?!  
নুমা নিজেকে গত দু'দিন যাবত বুঝানোর চেষ্টা করছে,যা হচ্ছে সবই স্বাভাবিক এতে রাগ-অভিমান করার কিছুই নেই কিন্তু পারছে না! যেখানে রাহাত পারছে সব কিছু স্বাভাবিক ভাবে মেনে নিতে সেখানে নুমা কেন পারছে এটা নিয়েই ওর যত রাগ?!! ও নিজেকে বার বার প্রশ্ন করছে,
'বিয়ে করেছি মানে কি আমাকে আর রাহাতকে এক সাথে থাকতে হবে?আমার অনুভূতি ওকে বুঝতে হবে?আমার ইচ্ছে অনিচ্ছার মূল্য দিতে হবে?কোন দরকার নেই তো এসবের! বিয়ে করেছি,ব্যাস,আমার কাজ এখানে থাকা ওর ফ্যামিলিকে দেখা,ওর কাজ ওর ক্যারিয়ার গড়া!মানুষের কি নিজস্ব কোন জগত থাকতে পারে না?রাহাতের তো কোন দরকার নেই আমার কাছে কোন সিদ্ধান্ত চাইবার,কিংবা জিজ্ঞেস করার!'  
কিন্তু নুমার ভেতর থেকে কোন সাড়া পায় না!বারবার মনে হয়,রাহাত একটা বার আমাকে জিজ্ঞেস করতে পারতো,একটাবার আমার কথাগুলো শুনতে পারতো!কিন্তু সে কিছুই করেনি...ওর কি ধারনা,আমি ওকে সাপোর্ট দিতাম না?ওর স্বপ্ন পূরন করতে দিতাম না?অথচ শুধুমাত্র ওর ফ্যামিলির কথা শুনে আমি অলরেডি আমার পড়াশুনাতে এক সেমিস্টার ড্রপ দিয়েছি!আমার ক্যারিয়ের থেকে ৬টা মাস লস করেছি!বিয়ের পর থেকে এখন পর্যন্ত ভার্সিটি আর যাইনি! 
কই আমি তো আমার জগত নিয়ে,আমার মতো করে সিদ্ধান্ত নেই নি,আমি তো পারিনি তাহলে রাহাত কি করে পারল?
তাহলে কি ওদের কারো কাছেই আমার মনের কোন দাম নেই!...  
ভাবতে ভাবতে নুমার চোখ ভিজে উঠে বারবার। ওয়াশরুমে যেয়ে মুখ ধুয়ে এসে বলল,
-তোমার আর কিছু গোছানো বাকি থাকলে বল,আমি করে দিচ্ছি,তুমি গোসল করে আব্বার সাথে নামায পড়ে নাও,আমি ওদিকে খাবার দিচ্ছি,আজকে সবাই একসাথে খাবে বলেছে। 
রাহাত খুব নরম সুরে বলল,
-নুমা,আই এম স্যরি... প্লিজ একটু হাসি মুখে কথা বল আমার সাথে,প্লিজ! 
নুমা মুখে একটা কৃত্রিম হাসি ফুটানোর চেষ্টা করে বলল,
-হাসলাম,হয়েছে এবার?তুমি চিন্তা করো না,আমি তোমাকে হাসি মুখেই বিদায় দিবো!আমি অনেক শক্ত মেয়ে,এতো সহজে পানি আসে না চোখে! এবার তুমি তোমার কাজে যাও...  
রাহাত হাল ছেড়ে দেবার মতো দীর্ঘশ্বাস ফেলে চলে গেলো। ওর চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে নুমার চোখ দুটো আবারো ছলছল করতে লাগল!

গাড়িতে বসে আড় চোখে কয়েকবার নুমার দিকে তাকালো রাহাত। কিন্তু নুমার সেদিকে কোন ভ্রুক্ষেপ নেই,ও একমনে বাইরে তাকিয়ে আছে,কখনো চোখ বন্ধ করে রাখছে। নুমার ভাবি ব্যাপারটা খেয়াল করে বলল,
-কি গো ভাই?নুমা আর রাহাতের মধ্যে কি ঝগড়া হয়েছে? বিদায় বেলা এসেও দেখছি দু'জনেই দুই জগতে বসে আছে! 
রাহাত ভাবির কথা শুনে হাসল,কিন্তু নুমার মুখে কোন ভাবান্তর নেই! ভাবি নুমার কানে ফিসফিস করলো,
-কিরে?এমন মুখ শক্ত করে বসে আছিস কেন?স্বাভাবিক ভাবে কথা বল,সবাই কি ভাববে?  
নুমা ভাবির দিকে তাকিয়ে বলল,
-আমার মুখে ঘা হইছে,কথা বলতে কষ্ট হয়!!বুঝলে? 
বলে মুখটা জানালার দিকে করে বসে রইল। এয়ারপোর্টে নেমে ভাবি শুধু মাত্র নুমা আর রাহাতকে ভেতরে যেতে দিলেন,বাকীদেরকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে গাড়িতেই অপেক্ষা করতে বললেন। রাহাত কৃতজ্ঞ দৃষ্টিতে একবার ভাবির দিকে তাকালো,নুমা সেটা দেখেও না দেখার ভান করলো! 
কেন জানি ভেতরে আরো অনেক গুলো একই অনুভুতির মানুষদের মুখ দেখে নুমার ভেতরটা আরো দুর্বল হতে লাগল! 
সব ফর্মালিটি শেষ করে রাহাত এসে নুমার মুখোমুখি দাঁড়ালো,নুমা অনেকক্ষন মুখে হাসি ফুটানোর চেষ্টা করে বলল, 
-সাবধানে যেও,আর কি কি করতে হবে সবাই তো অনেকবার বলেছে,তাই আর রিপিট করলাম না! 
রাহাত স্থির দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে বলল,
-সবাই যা বলেছে তার বাইরে কি আর কিছু বলার নেই তোমার?
নুমা ঠোঁটের কোণে হাসি দিয়ে বলল,
-থাকার কথা নাকি?না তো! সবার কথাই আমার কথা। 
রাহাত চুপ করে রইল,নুমা একটু পর আবার বলল,
-তুমি যা কিছু যেভাবে রেখে যাচ্ছো,ফিরে এসে তা সেভাবে পাবে এমনটা আশা করো না!এবং প্লিজ এ নিয়ে কোন অভিযোগও করো না!তবে, আমি চাই না,ঐ দূর দেশে একা একা শত ব্যস্ততার ভীড়ে তুমি এসব ভেবে মন খারাপ করো। তাই বলছি,এখানকার কিছু নিয়ে ভেবো না,সেটাই ভালো।  
একটা বড় রঙ্গিন খাম এগিয়ে দিলো রাহাতের দিকে,প্রশ্নবোধক দৃষ্টি নিয়ে রাহাত তাকালো নুমার দিকে,
-এটা প্লেনে কিংবা ওখানে যেয়ে ফ্রি হয়ে খুলে দেখো। তেমন কিছু না... 
খামটা ব্যাগে ভরে রাহাত নুমার হাত দু'টো নিজের হাতে নিয়ে বলল,
-আমি জানি তুমি অনেক কষ্ট পেয়েছো,তোমার প্রতি এক রকমের অন্যায় করা হয়েগেছে বলা যায় বাট শুধু এতটুকুই বলবো,কখনো কখনো কিছু পরিস্থিতি থাকে,যে অবস্থাটায় মানুষ কিছু চাইলেও করতে পারে না!কোন কিছু বুঝে উঠার আগেই অনেক কিছু হয়ে যায়! 
নুমা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল,'আসলেই,তোমার কিছু করার ছিলো না,তোমাদের কারোরই কিছু করার ছিলো না,দুর্ভাগ্যটা তো আমারই ছিলো!' কিন্তু মুখে শুধু বলল,
-হুম...সেটাই!যা হওয়ার হয়ে গেছে,ওসব নিয়ে ভেবে কাজ নেই!আফসোস করেও লাভ নেই,দুঃখ করেও না। 
রাহাতের ভেতরে যাবার সময় হয়ে যায়। ও চলে যায়... নুমার শুধু মনে হয়,সে ঝাপসা চোখে দেখতে পাচ্ছে,
একটা আস্ত মানুষ ওর চোখের সামনে ছিলো এতক্ষন কিন্তু এখন সে ধীরে ধীরে ছোট হতে হতে একটা বিন্দু হয়ে মিলিয়ে গেলো অনেক দূরে... 
নুমার চোখ জুড়ে বাঁধ ভাঙ্গা অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। বিড়বিড় করে রাহাতকে লেখা চিঠির লাইন গুলো আওড়াতে থাকে,
'অনেক কথা বলার ছিলো তোমাকে,অনেক আবদার-অনুযোগ অনেক অনেক গল্প করার ছিলো তোমার সাথে...
কিন্তু কিচ্ছু করতে পারিনি,করা হয়নি। আমি তাই অপেক্ষায় রইলাম,অপেক্ষায় রইলো আমার আবেগ গুলো,আমার সব কথা তুলে রাখলাম সেই সময়ের জন্য,যেদিন তুমি সব কাজ শেষ করে,আমার জন্য সময় নিয়ে ফিরে আসবে!আমি ঠিক আজকের এই আমি হয়ে রইবো,শুধু তোমার জন্য...' 

সময় চলে যায়,আর কখনো ফিরে আসার জন্য,তবু অপেক্ষায় রয়ে যায় আবেগ গুলো,অপেক্ষায় রয়ে যায় অনুভূতি গুলো। একটা সময় অপেক্ষারা হারিয়ে যায়,অনুভূতিগুলো মরে যায় আর সময়?  


বুধবার, ২১ আগস্ট, ২০১৩

তিতলীর এখন প্রোমোশন হচ্ছে!


তিতলী খুব মনোযোগ দিয়ে কার্টুন দেখছে,সামনে গ্লাসে জুস রাখা আর হাতে চিপস। তবে তিতলীর ভাব সাব দেখে মনে হচ্ছে,সে হলিউডের কোন একশন মুভি দেখছে!বাবা রুমে এসে তিতলীর পাশে বসলেন,ওর হাত থেকে চিপসের বক্সটা নিয়ে চিপস মুখে দিতে দিতে বললেন,
-দেরে মা,খবরটা দে
তিতলী এতো কাছে থেকেও তা শুনতে পেলো বলে মনে হলো না!তা দেখে বাবা আবারো বললেন,
- কিরে মা?শুনিসনি?খবর দেখবো,বাংলা চ্যানেল দে
তিতলী টিভির দিকে তাকিয়ে মুখ কুঁচকে বলল,
-বাবা,বেশি বেশি খবর দেখা ভালো না,হার্টের সমস্যা হয়!!আজকে খবর দেখার দরকার নেই।
বাবা চিপস খেতে খেতে বললেন,
-আজকের খবর দেখাটা দরকার,অন্তত হেডলাইন গুলো দেখি চল।
-বাবা,১১টার সময় দেইখো,খবর তো সব সময় একই তাই না?
-হুম,কার্টুনও সব সময় একই। এখন তুই চ্যানেল পাল্টা...
-বাবা,এটা কার্টুন সিরিয়াল,আমি মিস করতে পারবো না!
-কিন্ত মা জননী,এখন খবর না দেখলে আমার শান্তি লাগবে না!,রাত জাগতে পারবো না তো!সকালে অফিস আছে!
তিতলী বাবাকে [তার ভাষ্য মতে,বাচ্চা বাবাকে!!] আরো কিছু বলতে যাচ্ছিলো,কিন্তু বলতে পারলো না,কারন এমন সময় মা রুমে আসলেন,হাতে খেজুরের বাটি। মুখটা হাসিতে জ্বল জ্বল করছে,বাবা-মেয়ের হাতে খেজুর দিয়ে বললেন,
-নাও,আলহামদুলিল্লাহ বলে খাও।
বাবা বললেন,
-সুখবর আছে নাকি কোন?সেটা আগে বলো।
মা হেসে বললেন,
-তোমার প্রমোশোন হয়েছে,শ্বশুড় থেকে দাদা হতে যাচ্ছো!
বাবা চোখ বড় বড় করে কিছুক্ষন তাকিয়ে থেকে হেসে ফেললেন 'আলহামদুলিল্লাহ' বলে খেজুরটা মুখে দিয়ে মেয়ের দিকে তাকালেন,তিতলী হাতে খেজুর নিয়ে তখনো টিভির দিকে তাকিয়ে আছে!
-এই যে নতুন ফুপি?খেজুর খাবেন না?
তিতলী কপাল কুঁচকে তাকালো বাবার দিকে,কিছুক্ষন পর বুঝতে পেরে চোখ বড় বড় করে ফেলল!
-তার মানে,ভাইয়া-ভাবি আম্মু-আব্বু হবে?
-হুম,আলহামদুলিল্লাহ বল,একটু আগে তমাল ফোন করে জানালো।
-তারমানে,মিশু ও খালামণি হবে?ইয়াহু...
তিনজন এক সাথে হেসে ফেলল। একটু পর তিতলী জিজ্ঞেস করলো,
-আম্মু,ভাবীর ছেলে হবে নাকি মেয়ে?
-এতো তাড়াতাড়ি বলা যাবে নাকি?কয়েকমাস যাক,তারপর...আর আল্লাহ খুশী হয়ে যেটা দিবেন,সেটাই তো যথেষ্ট,ছেলে কি আর মেয়ে কি।
উত্তেজনায় তিতলীর রাতে যেনো ঘুমই আসছে না!ভাবি-ভাইয়া মিশুদের বাসায় বেড়াতে গেছে ক'দিন আগে। কাল বিকেলে হয়তো আসবে,ইশ...কখন যে সকাল হবে,কখন স্কুলে যাবে! সব্বাইকে জানাতে হবে।

টিফিন আওয়ারে রিদিতা হাইবেঞ্চের উপরে বসে সবার দৃষ্টি আকর্ষনের চেষ্টা করছে! কিন্তু সবাই ব্যাস্ত তিতলীকে নিয়ে,সে সবাইকে ক্যাডব্যারি দিচ্ছে,আর বলছে,
-শোন,আমার সাথে সাথে কিন্তু তুইও ফুপি হবি বুঝেছিস?মিশুর মতো খালা হবি না,ও তো দেখ,কেমনে কমিকস পড়তেছে!তোরা শুধু ফুপি হচ্ছিস,খালা না কিন্তু বুঝলি?রেডি হয়ে যা এখন থেকে হুম...!
একটু পর রিদিতা হাত-পা ছুঁড়া শুরু করলো,
-এই তোরা কেউ কি আমার কথা শুনবি?কেউ কেন আমার কথা শুনে না...আআআআ!!
তুবা চকোলেট খেতে খেতে ওর পাশে যেয়ে বসে বলল,
-বল,কি হইছে?শুনতেছি আমি!
-না হবে না,তিতলীকেও শুনতে হবে,ঐ কমিকসওয়ালী মিশুকেও শুনতে হবে!
-চিন্তা করিস না,ওরাও শুনতেছে,তুই বল!
রিদিতা এবার নড়েচড়ে বসল,মুখে হাসি ফুঁটিয়ে বলল,
-একটা গুড নিউজ আছে! আমার ভাইয়ার বিয়ে ঠিক হয়েছে,আমার হবু ভাবিও ডাক্তার,এই ডিসেম্বর মাসে বিয়ে।
তুবা সাথে সাথে হাত তালি চেঁচাতে লাগল,
-মেয়েরা শুন সবাই,আমাদের রিদিও এইবার ননদ হয়ে যাচ্ছে,তার ভাইয়ার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে!তালিইই...সবাই দাও তালি!
মিশু কমিকস থেকে মুখ তুলে বলল,
-ঐ রিদু,তোর ভাবিও কি তোর ভাইয়ের মতো চশমা পড়ে?
রিদিতা কপাল কুঁচকে বলল,
-হুম পড়ে,তবে পাওয়ার কম।
তুবা এক চোখ টিপে বলল,
-ভাবিস নারে মিশু,দুইদিন আগে আর পরে!ভাই-ভাবি দু'জনেই একই পাওয়ারে দেখবে!মুহাহাহা!
রিদিতা নাক ফুলিয়ে বলল,
-ঐ,খবরদার আমার ভাবিরে নিয়ে কিছু বলবি না!আমি কখনো তিতুর ভাবী কে নিয়ে কিছু বলছি?ডাক্তার ভাবির দাম বুঝছ?হুহ... আমার বাসায় এখন দুইইইজন ডাক্তার!একজন হার্ট এর আরেকজন বাচ্চাদের!বুঝেছিস?
তিতলী চকোলেট বন্টন শেষে সামনের হাইবেঞ্চে বসে বলল,
-এতো ঘর ভর্তি ডাক্তার দিয়ে তোরা করবি কি? শোন,তুইও কিন্তু আমার সাথে সাথে ফুপি হচ্ছিস,বুঝলি? তোর ভাবিকে বলসি,ভবিষতে আমাদের বাবুকে যেনো ভালো মতো ট্রিটমেন্ট করায়,এবং সেটা ফ্রি তে!
রিদিতা কিছু বলার আগেই তুবা বলে উঠলো,
-এইরে তিতু,তুই আর ডাক্তার পাইলি না!চশমার পাওয়ার যদি কম হয়,তাহলে তোর ভাইয়ার বাবুকে দেখবে কিভাবে!হেহেহেহে!!
সাথে সাথে রিদিতা ঝাঁপিয়ে পড়লো তুবার উপর! তিতলী ওদেরকে ছাড়াতে ছাড়াতে টিফিন আওয়ার শেষের ঘন্টা পড়ল।

শুক্রবার দিন,সকালে নাশতা করে আম্মুর রুমে এসে তিতলী দেখলো আম্মু আলমারী থেকে অনেক দিনের পুরোনো কাপড়-চোপড় বের করছে!ওকে দেখে আম্মু বলল,
-এই এদিকে আয় তো,এই সুটকেসটা খুলে দেখতো জিনিস গুলো ঐটাতেই আছে কি না!
-কার কিসের জিনিসপত্র?!
-আরে তোর আর তমালের ছোট বেলার কিছু জামা-কাপড় আর খেলনা গুলো।
তিতলী কপাল কুঁচকে সুটকেস খুলে দেখল,কাপড় গুলো ঐটাতেই আছে।
-আম্মু এটাতেই আছে,কিন্তু এগুলো দিয়ে কি করবে? আর এখানে তো কাপড় এর সাথে আমার পুতুল-খেলনা,ভাইয়ার ও কি কি সব জানি আছে!
-হুম,এগুলো ই তো সামনে কা্জে লাগবে! তমালের বাবুর জন্য
-ইইই!এইসব জিনিস আমি বাবুকে ধরতেই দিবো না আম্মু!
আম্মু বিরক্ত হয়ে বললেন,
-বেশি বুঝিস না তো!না দিলে এগুলো জমিয়ে রেখেছিস কোন দুঃখে?!
তিতলী কিছু না বলে জিনিস গুলো নেড়েচেড়ে দেখতে লাগল। বেশ কিছু কাপড়ের পুতুল দেখলো,এগুলো সব নীরা ফুপি বানিয়ে দিয়েছিলো,কিছু ছোট ছোট জামা,যেগুলোতে আম্মু-ফুপি হাতের কাজ করেছিলো সুন্দর করে, বেশ কিছু চুলের বান্ড- ক্লিপ...দেখতে দেখতে হঠাত তিতলীর মনে হলো,ভাইয়ার যদি একটা মেয়ে হয়,তাহলে কি ওর সব কিছুই বাবুকে দিয়ে দিতে হবে?! আম্মুকে জিজ্ঞেস করতেই হেসে বললেন,
-তোর ইচ্ছে,দিবি কি দিবি না!তবে এটাই নিয়ম,আমিও তাই করেছি,তারপর তোর নীরা ফুপি,সেও তো তার কতো কিছু তোকে দিয়ে দিয়েছে,তোর শিমুল মামাকে দেখিসনি?সে ও তো তারা জামা-কাপড়,র‍্যাকেট-ক্রিকেট ব্যাট তোর ভাইয়া কে দিয়ে দিতো!
তিতলী পুতুল গুলো হাতে নিয়ে চুপচাপ নিজের রুমে চলে আসল! ওর হঠাত মনে হলো,
-ভাইয়ার যদি মেয়ে হয়,তাহলে কি ওকে আমার সব কিছু দিয়ে দিতে হবে?এমনকি এই রুমটাও!না,না তা কি করে হয়! ও তো ওর আম্মুর সাথেই থাকবে তাই না?... নাহ,কেমন কেমন যেনো লাগছে তিতলীর! ভাবতে ভাবতে ল্যান্ড ফোন থেকে মিশু কে ফোন দিলো।
-কিরে?ফোন দিছিস কেন?সিসিমপুর দেখিস না তুই?
-পরে দেখবো,আচ্ছা শোন, আমি একটা ব্যাপার চিন্তা করছি!
-কি ব্যাপার?বলে ফেল
-আচ্ছা,ভাবির যদি একটা মেয়ে হয়,মানে ধর যে মেয়ে হলো,তাহলে ও যখন বড় হবে তখন কি ওকে আমার সব জিনিস পত্র দিয়ে দিতে হবে?!
-আপুর কি মেয়ে হবে?তুই বা আপু কেউ কি এমন স্বপ্ন দেখছিস?!
-আরে নাহ,তুই প্যাচাইস না তো!প্লিজ বল না?আমার সব কিছু কি দিয়ে দিতে হবে?
মিশু কিছুক্ষন উমম করে বলল,
-তোকে যদি দিতে হয়,তাহলে তো আমাকেও দিতে হবে!কারন,আমিও তার একমাত্র খালা হবো! এক কাজ করি,তুই হাফ দিস,আমি হাফ দিবো তাহলে হবে না?
-দোস্ত,দিতেই কি হবে?
-সেটাই তো আমার কথা,দিতে হবে এই চিন্তা তোর মাথায় কে ঢুকিয়েছেরে?আর দিলেই বা কি! আচ্ছা,দেখ,তুই তোর বাসার কতো আদরের মেয়ে,একদম প্রিন্সেস!তাই না?
-হুম,তুই ও তো কম আদরের না।
-তাহলে তোর পরে যে বাবুটা আসবে,সেও তো তোর-আমাদের প্রিন্সেসই হবে তাই না?
তিতলী কিছুক্ষন ভেবে বললো,
-হুম,তা তো হবেই। আমি তো ওকে কাউকে কোলে নিতে দিবো না,সারাক্ষন আমার কোলেই থাকবে!
-হুম,হইছে,আমিও আছি,তুই বারবার আমাকে বাদ দিচ্ছিস!ইইই!!
-ওকে,ওকে সরি!এবার বল...
-শোন,আমার কি মনে হয় জানিস,তুই আমি প্রিপারেশন নিয়ে রাখি,যে আপুর যে বাবুটা আসবে,তাকে আমরা হৃদয় উজার সব দিবো্‌ জিনিস থেকে শুরু করে আদর... আমি-তুই কি রিদির মতো নাকি?খালি এটা আমার-ওটা আমার করি!
-অবশ্যই না,আর নীরা ফুপিও কিন্তু কখনোই আমাকে কিছু দিতে না করেনি,চাওয়ার আগেই সব দিতো।
-সেটাই,দেখ,এই জন্যই কিছু নীরা ফুপিকে সবার থেকে একটু বেশিই ভালোবাসিস,আমিও আমার লতা খালামণিকে সে জন্য বেশি ভালোবাসি,কারন,আমি না চাইতেও ওর কাছে সব পেতাম,ওর সব সুন্দর জিনিস গুলো আমাকে দিতো,মুখে আদর-শাসন যতোটা না করতো,দেয়ার বেলায় কখনোই না করতো না।
-আসলেই তো,তাহলে যদি আমরাও দেই,আমাদের বাবুটাও তাহলে আমাদেরকে অনেক ভালোবাসবে তাই না?
-হুম,সেটাই দেখ,তুই-আমি অফিসিয়ালী খালা-ফুপি হতে এখনো অনেক দেরী,আর আমাদের কি ই বা এমন জিনিস আছে,যা ঐ বাবুর কাজে লাগবে!ওর তো নতুন জিনিস নিয়েই কূল পাবে না!শুধু শুধু আমাদের পুরোনো জিনিস দিয়ে ও কি করবে?
তিতলী এবার একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল,
-উফফ,দোস্ত,শান্তি পেলাম!আসলেই বোকার মতো ভাবছিলাম... থ্যাঙ্কস দোস্ত,তুই কি সুন্দর সহজ করে দিলি!জানিস সেদিন পাশের বাসার কেয়া'পু বলছিলো,'কখনো কিছুকে 'আমারই শুধু' ভাবতে নেই,বরং আমার কিছু অন্যদেরকে দেয়ার মাঝেই আনন্দ,তাতে মন বড় হয়।'
-হুম,এটাকে বলে শেয়ারিং মনে হয়! কেয়া'পু কে ভালো করে আরেকবার জিজ্ঞেস করিস,আর শোন,থ্যাংকস বলার কিছু নেই,এইরকম উদ্ভট চিন্তা শয়তান মাথায় দিবেই!ওকে,রাখিরে এখন। আল্লাহ হাফেজ
-ওকে,কাল ক্লাসে কথা হবে,আল্লাহ হাফেজ।

তিতলী আর মিশু আজকাল ক'দিন পর পরই তাদের রুমে টর্নেডো চালায়!! দু'জনেই ওয়ার্ড্রোব,ড্রেসিং টেবিল সব খুঁজে খুঁজে জিনিস পত্র আলাদা করছে,এমনকি কমিকস-গল্পের বইগুলোও...!!
কারন,তারা দু'জনেই খালা-ফুপি হবে,তাই এগুলো সব তাদের অনাগত বাবুটার জন্য...! এমন বেহিসেবি দেয়ার মতো খালা-ফুপি থাকলে আর কিছু কি লাগে?! :)

[অনেকেই মনে করতে পারেন,লেখাটায় আরো অনেক কিছুকে,কিছু তত্ত্বকে সহজ ভাষায় দেয়া যেতো!কিন্তু আমি চেয়েছি সদ্য কৈশোরে পা'দেয়া দুটো মেয়ের মানুষিকতাটাকে ঠিক ওদের মতো করেই তুলে ধরতে। কৈশোর বয়সটা খুব সহজ-সাবলীল এবং বিশুদ্ধ চিন্তা নিয়ে বড় হবার বয়স,এই বয়সে 'অনেক বেশি বুঝতে হবে অন্যদের চেয়ে' এমনটা হওয়া ঠিক না! যেই সময়ে যতটুকু যেভাবে বুঝার দরকার,ততটুকুই বুঝতে পারা উচিত এবং বড়দেরও উচিত,সেভাবেও ওদেরকে বুঝানো,ওদের চিন্তা গুলোকেও সেভাবেই গ্রহন করা]






রবিবার, ১৮ আগস্ট, ২০১৩

স্বার্থের অস্তিত্ব


  দেবার সাধ্য নয় বিবেচ্য
এখানে সবাই অনেক ব্যাস্ত
যতো উজার করে দিতে পারো,দাও
যদি ফুরিয়ে যায়,তবে নীরবে দূরে হারিয়ে যাও। 

কবিতা তখনই বেশি সুন্দর
যখন কবি তা ছূঁইয়ে দেয় নিরন্তর 
যখন কবি চলে যায় কবিতাকে ছেড়ে
কবিতা পরে রয় ফিঁকে সময় জুড়ে। 

এখানে সবাই অনেক ব্যাস্ত
নিজেকে নিয়ে,নিজ স্বার্থ নিয়ে 
লেনদেন এখানে এক তরফা অথবা সামান্য
এখানে পাওয়ার হিসেব সবাই করে দেয়ার হিসেব ভিন্ন! 

এখানে সবাই বুঝে শুধু নিজের স্বার্থ 
কি পেলাম,কে কতোখানি দিলো সেটাই বেশি মুখ্য,
যে দেবার দলে,সে হারাবার দলেও থাকবে
শূন্য প্রাপ্তি নিয়ে সময়ে-অসময়ে কাঁদবে। 

আমি কঠিন করে ভাবছি না 
সহজ জীবন প্রত্যাশিরা কঠিন ভাবনা বুঝে না
তবে তাদের হিসেব সমানুপাতিক হয় না
কারণ,তারা নিজের স্বার্থের অস্তিত্বই খুঁজে পায় না!