ঘুম আসি আসি অবস্থায় তীব্র কোন শব্দ কানে আসা মানেই হয় ঘুম একেবারেই চলে গেছে আর না হলে ঘুমটা ফিরে আসছে কিন্তু একটা অনুভূতি নিশ্চিত হয় আর তা হলো,মেজাজ টা বিগড়ে যাবেই যাবে!
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিছানায় উঠে বসলো নিতু। এলোমেলো চুল গুলো ঠিক করতে করতে মেজাজটা শান্ত করার চেষ্টা করলো কিছুক্ষন কিন্তু নাহ,পুরোপুরি শান্ত করা গেলো না।
টলমলে পায়ে রুম থেকে বের হয়ে দেখলো,যা অনুমান করেছিলো ঠিক তাই! রিদমি আবারো ওর খেলনা গুলোকে আছড়ে নিচে ফেলে দিয়েছে,এবং এবার আর একটা খেলনাও আস্ত নেই। খেলনা গুলোর সাথে নতুন কেনা টিভির রিমোর্টটা ও আছে,উফফ!
নিতু কিছুক্ষন আবারো চেষ্টা করলো মেজাজটা কন্ট্রোল করতে,এই মুহুর্তে মেজাজ বেড়ে যাওয়া মানে কাজও বেড়ে যাবে,তারউপর মাথায় অলরেডী অনেক টেনশন চলছে,এনার্জি লেভেল অনেক কম এমনিতেই! রিদমি কে বারান্দায় রেখে এসে চুপচাপ খেলনা গুলো বাকেটে ভরতে লাগলো,ঠিক তখন ই ভাবির রুমের দরজা খোলার শব্দ পাওয়া গেলো।
- হায় আল্লাহ!একি অবস্থা?!! কেমন করে হলো?
নিতু স্বাভাবিক গলায় জবাব দিলো,
- রিদমি ফেলে দিয়েছে।
-কখন করলো এই কাজ? তুমি কোথায় ছিলে?বুয়া কোথায়?
-আমি ওকে নাশতা করিয়ে দিয়ে কিছুক্ষনের জন্য একটু শুয়ে ছিলাম রুমে,আর বুয়া বোধহয় কিচেনে মশলা পিষছে।
নিতুর কথা শুনে রিনির মেজাজ তীক্ষ্ণ হলো! এটা কি ধরনের কাজ? একটা ঘন্টার জন্য দু'জন মানুষ মিলে ৪বছরের বাচ্চাটা কে সামলাতে পারলো না? এই নিতু সারাটা সময় বাসায় করেটা কি?আর বুয়াও একটা! রিদমি কে রাখার জন্য তাকে আলাদা করে যেখানে টাকা দেয়া হয় সেখানে সে ওকে রেখে কিভাবে চলে যায় অন্য কাজে?
নিতুর নিরবতা দেখে রিনি আরেকটু বিরক্ত হলো। বুঝাই যাচ্ছে সে রেগে আছে কিন্তু কেন? নিজের দোষটা কি তার চোখে পড়ে না?আর এখন এভাবে কার উপর রাগ দেখাচ্ছে? রিদমির উপর নাকি রিনির উপর?
ছুটির দিন দুপুরে খেয়ে একটু আয়েশ করে টিভি দেখতে বসলো পলাশ। কিন্তু টিভির রিমোর্ট দেখতে পাচ্ছে না কোথাও!
-এই নিতু?রিমোর্ট কইরে?
ডায়নিং গোছাতে গোছাতে নিতু জবাব দিলো,
-সকালে রিদমি ভেঙ্গে ফেলেছে!
-ভেঙ্গে ফেলেছে মানে?ও রিমোর্ট কিভাবে পেলো? তোরা থাকিস কোথায় সব!
নিতু কিছু বলার আগেই রিনি দ্রুত বেরিয়ে এসে বলল,
-সবার কি আর কোন কাজ নেই?তোমার ছেলে কে পালবার জন্য কি সবাই বসে আছে? রিদমি কি করে না করে তার খোঁজ রাখার এতো সময় আছে কার শুনি?
খোঁচাটা যে ভাবি তীব্রভাবে তাকেই দিচ্ছে বুঝতে পেরে নিতুর মেজাজটা প্রচন্ড চড়ে গেলো! কথায় কথায় ভাবি এই খোঁচা কেন দেয় যে,সে রিদমি কে একদমই সময় দেয় না? জন্মের পর থেকে বাচ্চাটা কে তো বেশির ভাগ সময় সে ই দেখাশুনা করে,ভাই-ভাবি ভালো করেই জানে রিদমি নিতুর কতোটা ভক্ত,একবেলা কেন এক সপ্তাহ নিতুর কাছে রেখে গেলেও রিদমি মোটেও কাঁদবে না। কিন্তু তারপরেও সুযোগ পেলেই ভাবি এভাবে কথা শোনাবে কেন?
- ভাইয়া,আমি বিকেলে টিউশনি শেষ করে আসার সময় রিমোর্ট কিনে নিয়ে আসবো। তুমি বরং এখন রেস্ট নাও!
কথাটা বলেই নিজের রুমে চলে আসলো নিতু। ওর এভাবে চলে যাওয়া দেখে রিনির মনে হলো মুখের উপর নিতু তাকে অপমান করলো! পলাশের দিকে তাকিয়ে রিনি বলল,
- অবস্থাটা দেখতে পাচ্ছো? আমার কিন্তু ধৈর্য্যের একটা সীমা আছে,ও কিভাবে মুখের উপর জবাব দিলো?কেন?রিদমি কি ওর কেউ না,ওকে একটু সময়ের জন্য নিজের কাছে রাখতে পারে না সে?ও যদি একটু খেয়াল রাখতো তাহলে কি আজকে এতগুলো আর সাথে রিমোর্টটাও ভাঙ্গতো?
পলাশ একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
- তুমিও তো পারো রিদমি কে নিজের কাছে রাখতে,নিতুকে একা কেন দায়িত্ব দাও?
-বাহ! ভালোই বলেছো,আমি তো আমার ছেলেকে একদমই সময় দেই না,সব শুধু নিতুই করে! ঠিক আছে,আজ থেকে রিদমি নিতুর ধারে কাছেও যাবে না,আমার ছেলে আমিই পালবো!
দুপুরে খেয়ে রিদমি সব ফুপ্পির কাছে ই ঘুমায়, ঘুমন্ত ছেলেকে টেনে হেঁচড়ে নিয়ে যেতে দেখে নিতুর অসম্ভব কান্না পেলো! অনেক কষ্টে কান্না আটকে বলল,
-ভাবি প্লিজ!ও ঘুমাচ্ছে তো!
-আমার ছেলে আমার কাছেই থাকবে,আর কাউকে চিন্তা করতে হবে না!
-আমি কি ওকে আদর করি না? তুমি ভালো করেই জানো আমার ফাইনাল পরীক্ষা চলছে,রাত জেগে পড়াশুনা করে দিনের বেলা একটু শোয়ার দরকার হয় আমার,আমি কি ইচ্ছে করে ওকে একা একা খেলতে দিয়েছিলাম?আর খেলনা-জিনিসপত্র তো রিদমি আজকে নতুন ভাঙ্গে না,কেন সিনক্রিয়েট করছো?
-নিতু শোন,আমার বাচ্চাকে কেউ অযত্ন করবে এটা সহ্য করা আমার পক্ষে সম্ভব না,পড়াশুনা আমিও করছি,আমাকে বুঝাতে এসো না আর তোমাকে কয়টা বাচ্চা পালতে হয় শুনি? লাগবে না,আমিই পারবো রিদমি কে রাখতে,তুমি থাকো তোমার মতো।
বলতে বলতে ছেলেকে নিয়ে রুম থেকে চলে গেলো রিনি।
বিয়ের পর থেকেই রিনিকে কেন জানি ভালো লাগে না নিতুর,ওর ধারনা ভাবি খুব বেশি লোক দেখাতে পছন্দ করে,আন্তরিকতা বোধ তার ভেতরে নেই বললেই চলে অন্যদিকে রিনির ধারনা একমাত্র বোন হিসেবে নিতু বেশি স্বার্থপর,সব কিছু নিজের মতো করে চায় সে! মেজাজের দিক থেকে রিনি-নিতু যখন একই লেভেলের তখন দীর্ঘদিন এক সাথে থাকার পরেও দু'জনের মাঝে দূরত্ব কোনভাবেই কমার কথা না! এরই মাঝে রিদমি আসলো,শুরু হলো আরেক অধ্যায়।
মা নাকি ফুপ্পি কে বেশি আদর করে,কে বেশি খেয়াল রাখে এ নিয়ে অদৃশ্য একটা প্রতিযোগীতা চলছে দু'জনের মাঝে গত চার বছর ধরে,কিন্তু আশ্চর্য্যের বিষয় হলো,যখন নিজেদের প্রয়োজন সামনে আসে তখন অটোম্যাটিক্যালি রিনি ও চায় রিদমি কে নিতু সময় দিক আর নিতুও চায় তখন রিনি সময় দিক রিদমি কে!এবং এর ফলাফল হয় আরো ভয়াবহ!
স্কুল থেকে ফিরেই ব্যাগ রেখে টিভি দেখতে বসলো রিদমি। যেহেতু ফুপ্পি এখনো বাসায় ফেরেনি সেহেতু টিভি দেখার এটাই সময়!ফুপ্পির সামনে টিভি দেখতে বসা মানেই এত্ত গুলো বকা শুনতে হবে!
চিপস খেতে খেতে রিদমির মনে হলো,ওর বন্ধু মৃন্ময় অনেক ভালো আছে,ওকে ওর বাসার সবাই কি আদর ই না করে অন্যদিকে ওর ফুপ্পি? সারাক্ষন ওকে রুটিনের মধ্যে রাখে আর একটু কিছু হলেই বকা! একই অবস্থা আম্মুর ও! বাসায় থাকা মানেই হয় মা বকবে আর না হয় ফুপ্পি!উফফ...
ক্লাসে রিমন বলছিলো,ওর বাসায় ওর আব্বু-আম্মু ওকে অনেক আদর করে,ওর ফুপ্পি কানাডা থাকে,ওর জন্য বার্থডে তে প্রতি বছর চকলেট-খেলনা পাঠায়। রিদমির মনে হলো,ওর ফুপ্পিও দূরে থাকলে ভালো হতো,তাহলে ওকে অনেক আদর করতো! মাঝে মাঝে ফুপ্পির রাগ দেখলে রিদমির খুব কান্না পায়,কিন্তু ফুপ্পি সেটা যেনো বুঝেই না!
সব সম্পর্কই সময়ের সাথে সাথে বদলে যেতে শুরু করে,আর তাই নিজের অনেক চিরায়ত স্বভাব কে ও তখন বদলে ফেলতে হয়,না হলে সম্পর্কটা ই কেবল থাকে শূণ্য বাক্স হয়ে। কিন্তু বেশিরভাগ সময় ঠুনকো বা পুরনো রাগ-অভিমান আর ইগোর কারণে মানুষ সেটা বুঝতে পারে না।
আজকাল রিনির মনে হয়,রিদমি ওর চাইতে নিতু কে বেশি পছন্দ করে! ছেলেটা সারাক্ষন ফুপ্পির পেছনে ঘুর ঘুর করে আশ্চর্য্য! সেদিন অনেক মাস পর গেলো খালার বাসায় বেড়াতে,ওমা এক বেলা যেতে না যেতেই ছেলে অস্থির হয়ে গেলো নিতুর জন্য! এ নিয়ে ভাবি-আপাদের সে কি হাসাহাসি,কি এক অবস্থা!
নাহ,এখন থেকে নিতুর কাছ থেকে একটু দূরে দূরে রাখতে হবে রিদমি কে!শত হলেও ছেলে তো তার নিজের।
নিতু অসম্ভব অবাক হলো যখন দেখলো,রিদমি হোমওয়ার্ক করতে ভুল করেছে বলে বকা দেয়া মাত্রই সোজা মায়ের কাছে চলে গেলো! কি অদ্ভুদ! সে দিনের ছেলে এই ছ'বছর বয়সে এসে এখন আর ফুপ্পিকে পছন্দ করে না! আগে মা বা বাবা কেউ বকা দিলে সোজা ফুপ্পির কাছে চলে আসতো আর এখন? দিনে দিনে রিদমি আরো দূরে সরে যাচ্ছে অথচ এই ছেলেকে কোলে-পিঠে মানুষ করেছে!
আজকাল ছুটির দিনে যখন রিদমি খুশীমনে বাবা-মায়ের সাথে বেড়াতে চলে যায়,আর নিতুকে 'আল্লাহ হাফেজ' ও বলে যায় না কিংবা রাতে কোন রকমে হোমওয়ার্ক শেষ হওয়া মাত্রই দৌড়ে মায়ের কাছে চলে যায় তখন খুব অভিমান আর অসম্ভব রাগ হয় নিতুর! শেষ পর্যন্ত এই ছেলে ওর মায়ের মতোই অকৃতজ্ঞ হলো!বড় হচ্ছে আর মায়ের মতো স্বার্থপর হচ্ছে!থাকুক মায়ের সাথেই।
এক বছর পর,
আজ রিদমি ওর বাবা-মায়ের সাথে চিটাগং চলে যাচ্ছে,বাবার প্রমোশন হয়েছে সেই সাথে বদলী। ফুপ্পি যাচ্ছে না ওদের সাথে কারণ তার পড়াশুনা শেষ হয়নি এখনো। পিসিতে ওদের নতুন বাসার ছবি দেখেছে,অনেক বড় আর সুন্দর বাসাটা। বিশাল একটা খেলার মাঠও আছে সেখানে,ঢাকা থেকে তাই স্ট্যাম্প-ব্যাট-বল কিনেছে যেনো ইচ্ছে মতো খেলতে পারে বিকেলে। ফুপ্পি যাবে না শুনে প্রথমে একটু খারাপ লাগলেও এখন লাগছে না,ওখানে যেয়ে অন্তত ফুপ্পির কঠি রুটিন থাকবে না আর বকা ও খেতে হবে না!
মনকে অনেক কষ্টে শক্ত করে রিদমির ল্যাগেজ গুছিয়ে দিচ্ছে নিতু! কিন্তু বারবার চোখ ভিজে উঠছে,কেমন করে থাকবে ছেলেটা কে ছাড়া?দিনের পর দিনে ওকে না দেখে কি করে ভালো থাকবে সে? ধীরে ধীরে রিদমির দিকে তাকালো নিতু! কষ্টে বুকটা হু হু করে উঠলো। কিন্তু রিদমির সেদিকে খুব একটা খেয়াল নেই,সে নিজের সুখে বিভোর। আচ্ছা,আরেকটু বড় হলে রিদমি কি একদমই ভুলে যাবে ফুপ্পি যে ওকে কত্ত আদর করেছে,কতটা ভালোবাসে?
ধীরে ধীরে ট্রেনটা চলে গেলো। নিতুর মনে হলো,ওর আর রিনির এতো বছরের মমত্বের ভাগাভাগি অধ্যায়টার এখানেই সমাপ্তি হলো। একে অন্যকে প্রচন্ড অপছন্দ সত্ত্বেও কেবল এই একটা বন্ধন কে আঁকড়ে ধরে এতো বছর এক সাথে থাকার দিন গুলো এখন থেকে শুধুই গল্প।
তবে রিদমি এখন না হলেও কিংবা পাঁচ বছর পর না হলেও আজ থেকে অনেক বছর পর হয়তো বুঝতে পারবে,হয়তো মনে পড়বে,ওকে নিয়ে ওর মা আর ফুপ্পির এই ভাগাভাগির কথা,তাদের ভালোবাসার কথা এবং তখন হয়তো নিতুর কড়া শাসন,রাগ আর রিনির ক্ষোভ-হিংসার কারণ গুলোও সে বুঝতে পারবে কিন্তু মমত্বের এই বিচ্ছেদের কষ্টটা হয়তো একান্তই নিতুর একার হয়ে থাকবে।






