জনপ্রিয় পোস্টসমূহ

শনিবার, ২৬ জুলাই, ২০১৪

সময়টা কে তৈরী করুন আমি-আমার-আমাদের জন্য।


হে নবী! #প্রজ্ঞা ও #বুদ্ধিমত্তা এবং #সদুপদেশ সহকারে তোমার রবের পথের দিকে দাওয়াত দাও এবং লোকদের সাথে #বিতর্ক করো সর্বোত্তম পদ্ধতিতে। তোমার রবই বেশী ভালো জানেন কে তাঁর পথচ্যুত হয়ে আছে এবং সে আছে সঠিক পথে। *[সূরা আন্ নাহলঃ ১২৫]*

ছোট্ট একটা উদাহরন দেই,ধরুন আপনি একটা বাসায় গেছেন,যে বাসায় একজন মুরুব্বি মারা গেছেন,শোকার্ত পরিবেশ,কারো মুখে কারো বা মনে কিন্তু সবাই মোটামুটি শোকাহত। আপনি যেয়ে দেখলেন,কেউ খাচ্ছে আর কেউ বসে কোরআন পড়ছে আর কেউ স্মৃতিচারণ করছে। এমন অবস্থায়,আপনি মৃতের আত্নীয়দের বলা শুরু করলেন,
'হ্যাঁ,তোমরা তো বেঁচে থাকতে মানুষটার কদর করনি,সেবা করোনাই আর এখন একটু শোক করবা,তাও ঠিক মতো করো না,তোমাদের দিয়ে আসলে কিচ্ছু হবে না,তোমাদের ছেলে-মেয়েরাও তোমাদের জন্য কিছু করবে না... তবে যদি তোমরা এখন থেকে সঠিক ভাবে নিজেদের কে সংশোধন করো,তাহলে হয়তো তোমাদের উপর আল্লাহ রহম করবেন,যা যা ভুল হয়েছে তা মাফ করবেন।'
তাহলে বলুন তো,উপরের ঐ কোরআনের আয়াতে আল্লাহ যে ভাবে দাওয়াত দিতে বলেছেন,আপনি কি সেভাবে দাওয়াত দিলেন?বা আপনার দাওয়াত টা,সদুপদেশ গুলো কি #গ্রহনযোগ্য হবে? অথচ আপনি কিন্তু বলেছেন,সুন্দর নিয়ত নিয়ে,নিজের কাজের বিনিময়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের পাশাপাশি মানুষ গুলোকেও সঠিক ভাবে চলার জন্যে। কিন্তু মানুষ কি সেটাকে আন্তরিক ভাবে গ্রহন করতে পারবে?
বরং এখানে কি হবে?এক শ্রেণি সুবিধা নিবে এই বলে,' যে ঐ দেখো,আসছে ভালো কথা বলতে!এভাবে মানুষের মুখের উপর দোষ বলে আবার ভালো কথা বলে কেউ?' আরেক শ্রেনী বলবে,' অবস্থা বুঝে আসছে ফায়দা নিতে,সবার সামনে ওদের দোষও বলল আবার নিজে ভালো সেটাও বুঝায় দিলো,নিজে যে কি তা কি মানুষ জানে না?!
মোট কথা দেখা যাবে,৩ভাগের ২ভাগ লোকই আপনার বক্তব্যের নেগেটিভ অর্থ বের করবে,এবং যার ফলে বাকী ১ভাগ যদি ভালোভাবে গ্রহন ও করতে চায় তাহলে তারাও কনফিউসড হয়ে যাবে।

কোরআনে আল্লাহ স্পষ্ট ভাবে বলে দিয়েছেন, প্রজ্ঞা,বুদ্ধিমত্তা,সদুপদেশ এই ৩টি উপাদানের সংমিশ্রনেই আপনি মানুষকে ভালো কাজের দিকে আহবান জানাবেন,আপনার কথায় এই তিনটা বিষয়ের উপস্থিতি অবশ্যই থাকবে। আপনি যা বলবেন,তাতে জ্ঞান থাকবে,সরাসরি নয় তবে কৌশলে আপনি তাদের ভুল গুলো ধরিয়ে দিবেন এবং সে গুলো সংশোধনের জন্য উত্তম উপদেশ দিবেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন,'ইক্বরা' কথাটা কেন বলেছিলেন?যখন তিনি জানতেন,এই জাতি যা জানে তা মানে না,আর যা জানে না তা জানার চেষ্টাও করে না!এর কারণ হিসেবে আমরা সূরা ইমরানে এবং উপরে সূরা নাহলে পড়েছি,আল্লাহ তো চেয়েছেন,এমন একটা দল তার প্রতিনিধিত্ব করবে,যাদের কথায় প্রজ্ঞার পরিচয় থাকবে,তারা যতটুকুই বলবে সঠিক কথা বলবে,যা লোকেরা আন্তরিকতার সাথে গ্রহন করবে। কারণ,আপনি যা দেখছেন তা ই সম্পূর্ণ বা সত্যি না,আপনার রব আপনার চাইতে অনেক গুণ বেশি ভালো জানেন।আর এই জন্যই নুহ (আ) সাড়ে ৯০০বছর তার জাতি কে দাওয়াত দিয়েছিলেন,কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন,আল্লাহ তার চাইতে তার জাতিকে অনেক বেশি ভালো জানেন,সুতরাং তার জন্য হাল ছেড়ে দিয়ে,রাগ হয়ে তাদের দোষ ধরে ক্ষোভ দেখানোর সময় তার জন্য আসেনি। সুতরাং পরিস্থিতি যেমনই হোক,আপনি আপনার সুন্দর নিয়াত কে বাস্তবায়নের জন্য সু-কৌশলের সাথে সুন্দর,প্রোডাক্টিভ অনুভূতি তৈরী করার বদলে লোকদের মাঝে বিরক্তি,দূরত্ব সৃষ্টি করতে পারেন না।

সোশ্যাল নেটওয়ার্ক এমন একটা জায়গা,যেটাকে আমরা উন্মুক্ত মাঠ বলতে পারি,যেখানে সম্ভব বিপ্লব বা পরিবর্তনের জোয়ার তৈরী করা,সত্য-সুন্দরের পথে সময়ের সাথে যুগান্তকারী পদক্ষেপ তৈরী করতে খোরাক ছড়িয়ে দেয়া। আপনি এটাকে নিছক টাইম পাস এর ক্ষেত্র হিসেবে নিলেও এটা আগামী দিনের জাতি তৈরীতে মহামূল্যবান ভূমিকা রাখে।এটা এমন একটা জায়গা,গ্লোবাল ভিলেজের প্রকৃত রূপ,যেখানে আপনি আওয়াজ তুললে,সারা দুনিয়া আপনার সাথে কন্ঠ মেলাবে,জাতি-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই আপনার সাথে,আপনার প্রয়োজনে আপনার পাশে দাড়াতে পারে।  আপনি হয়তো এখানে আসনে,কিছু সময় রিফ্রেশ থাকার জন্যে,অবসরের ক্লান্তি দূর করার জন্য কিন্তু এই জায়গাটা আপনার কাছে যতটা না হালকা,তার চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী অসৎ এবং অন্যায় শক্তিদের জন্য। আর তাই আপনার এই #টাইমপাস' মনোভাবের এই সুযোগটাই অসৎ উদ্দ্যেশ্যে অমানুষরা ব্যাবহার করছে তাদের স্বার্থউদ্ধারের জন্য।

আজ ইসরাঈল তাদের লোকবল জোরে-সোরে লাগিয়েছে শুধু মাত্র এই সোশ্যাল নেটওয়ার্ক সাইট গুলোতে নিজেদের আধিপত্য বিস্তারের জন্য,আমরা দেখেছি মিশরে,তুরস্কে 'আরব বসন্ত' অর্থাৎ পেশির জোরে নয় সত্যিকারের জনগনের বিপ্লবের জোয়ার সৃষ্টি হয়েছিলো,এই সোশ্যাল নেটওয়ার্কের মাধ্যেমে। কিন্তু কেন?তাদের তো মিডিয়া,অস্ত্র,নিজদের লোকের অভাব নেই!তারপরেও তারা কেন সারা দুনিয়া কে মিডিয়ার মাধ্যমে নিজেদের সাথে রাখে? কারণ,সময় বদলে গেছে,প্রযুক্তির উৎকর্ষতা মানুষকে আজ একই বৃত্তে এনে দাড় করিয়েছে। সুতরাং সময় এসেছে,প্রশ্ন তৈরী হবার,
'এই অংগনে আপনার ভূমিকাটা কি এবং কেমন?'  
সময় এসেছে এই অঙ্গন টা কে আপনার এবং আপনার দেশ-জাতির জন্য আপনার কাজের হাতিয়ার বানাবার। রাসূল (স) এর একটা হাদীস আছে,'সমগ্র মুসলিম জাতি হচ্ছে একটি দেহের ন্যায়,তার এক অংশে যদি ব্যাথা হয় তবে তা সারা দেহ অনুভব করতে পারে।' (তিরমিযি)
জ্বি হ্যাঁ,আমরা আসলেই একই দেহ। আর তাই আজ ফিলিস্তিন যখন কাঁদছে,আমরা এখানে অস্থির হয়ে আছি।যে সময়টায় আপনি বসে আড্ডা দিতে পারতেন,তখন আপনি সোশ্যাল সাইট গুলতে হন্য হয়ে খুঁজছেন,আপনার ফিলিস্তিনি ভাই-বোনেরা কেমন আছে তা জানার জন্য,তাদের জন্য বড় বড় মিডিয়াদের দৃষ্টি আকর্ষন করে টুইট-স্ট্যাটাস দিয়ে যাচ্ছেন,নিজের প্রোপিক-কাভারপিক বদলাচ্ছেন। আজ যখন আমি কোন টুইট লিখছি ফিলিস্তিন কে নিয়ে সাথে সাথে সেটা দুনিয়ার ঐ প্রান্তের কোন আরব ভাই-বোন রিটুইট করে দিচ্ছে,আমার অনুভূতির সাথে একমত প্রকাশ করছে। ঠিক তেমনি ভাবে আমরা যখন আমাদের সমস্যা গুলো নিয়ে সোশ্যাল সাইটে গিয়েছে,সেখানেও দেখেছি দুনিয়ার কোণায় কোণায় ছড়িয়ে থাকা নাম না জানা হাজারো মানুষ আমাদের সাথে কন্ঠ মিলিয়েছে। আমাদের সমস্যা কে আমাদের ইস্যুকে ট্রেন্ড লিস্টের শীর্ষে উঠিয়েছে,তাদের নিউজ সাইটের হেডলাইন করেছে।
না,এই সব গুলোকে আপনি নিছক লোক দেখানো আবেগ বলতে পারেন না,কোন ভাবেই না। যদি ঢালাও ভাবে এটা আপনি মনে করেন,তাহলে ধরে নিন,আপনিও এই লোক দেখানো মানুষদের একজন! আফসোস করুন,যে আপনি নিজেও ঐসব সুবিধাবাদীদের দলেই পড়লেন!

বাচ্চার ঘুম কড়া বলে আপনি তাকে গরম পানি ঢেলে জাগাতে পারেন না,বরং তার ভেতরের অনুভূতি কে আপনি নাড়া দিতে পারেন,তাকে সময় মতো সবাই জেগে উঠার পরিবেশ দিতে পারেন, যাতে সে এক ডাকেই ঘুম থেকে উঠার অভ্যাস করতে পারে। ঠিক তেমনি,ওয়েস্টার্ন মিডিয়ার কু-প্রভাবে সমগ্র মিডিয়া হাতছাড়া হয়ে গেছে বলে আপনি আপনার অবস্থান টা ওদের স্রোতে ভাসিয়ে দিতে পারেন না।
একটা সময় ছিলো,যখন আমরা মোবাইল কে নিছক বিলাসিতা বলে ভাবতাম,এখন তা প্রয়োজন। একটা সময় ছিলো,সোশ্যাল মিডিয়া বলতে আমরা স্রেফ,ছবি শেয়ার,পরিচিত বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ রাখার মাধ্যম আর নিজের অনুভূতি শেয়ার করার জন্য কমনপ্লেস বলে জানতাম,বাট এখন তা সব রকমের ইফেক্টিভ প্ল্যাটফরম হিসেবে ব্যাবহৃত হচ্ছে,বিজনেস,এডুকেশন থেকে শুরু করে রিভ্যুলেশন পর্যন্ত। সময় অনেক বদলে গেছে,এবং সামনের দিন গুলোতে আরো বদলাবে। তাই ঘুরে ফিরে প্রশ্ন আসবে,
এই সোশ্যাল মিডিয়াতে আপনার ভূমিকা কি?কেমন হওয়া উচিত?
প্রশ্ন করুন নিজের বিবেক কে,যা আপনি করতে চান,যা আপনার বিবেক করার জন্য সায় দেয় সে উদ্দ্যেশ্য পূরণের জন্য এই সাইট গুলো কি কোন ভূমিকা রাখে?যদি রাখে তাহলে আপনি কি করে এখানে সময় অপচয় করতে পারেন?নিছক বিনোদনের জন্য এটা কে আপনি কি করে ভাবতে পারেন? আসলে সব সময় আমাদের জন্যই ছিলো,আছে শুধু আমরাই সময়টা কে অন্যের ভেবেছি আর তাই আজো সময় খুঁজে ফিরছি,অথচ সময় এখনো আমাদের অপেক্ষাতেই আছে।
আপনি যে জায়গাটা কে তুচ্ছ ভাবছেন সময় স্বাক্ষী,সেটাই এখন অনেক দামী। আপনি পারেন,এখানে বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি তৈরী করতে,নতুন সূর্যের আলোর ছটা এখানেও তৈরী করতে।
আর সে জন্যই,এখানে আপনাকে হতে হবে ঠিক তেমন চিন্তার অধিকারী,যেভাবে আপনি পারেন বাস্তবতা কে বদলাতে।
এখানেও আপনার কথায় থাকতে হবে সেই রকম গুণাবলি,তেমন চিন্তার প্রতিচ্ছবি যেমনটা পারে বদলে দিতে আজকের আগামী। তিক্ততা,স্বার্থান্বেষি মনোভাব,হতাশা নয় বরং ধৈর্য্যের সাথে সঠিক প্রচেষ্টা।

''এখন সময় জেগে উঠবার,জাগাতে ঘুমের পাড়া
এখন সময় তৈরী হবার,আগামী দিচ্ছে সাড়া
সময় এখন নতুন করে নিজেকে গড়ে নেবার
সময় এখন নতুন করে আগামীকে গড়বার।''
ছোট্ট এই জীবনে একটা জিনিস আমাদের কে ভাবতে হয় সব সময়,আর তা হলো যে সময়টাই পার করি না কেন,কিছু না কিছু হোক তা সামান্য তবু কাজ করে যেতে হবে। কোন সময়ই যেনো সম্পূর্ণ বৃথা না যায়,ছটাক পরিমান হলেও যেনো সেখানে উত্তম প্রতিদান পাবার মতো কাজ থাকে। তাই যেই সময় টা 'হোয়াট'স আপ ফ্রেন্ডস' হিসেবে কাটাতে এখানে আসা হয়,তার মাঝেই একটু সময় বদলে নেবার এবং দেবার চেষ্টায় কাজে লাগানো সম্ভব।
চেষ্টা করুন,নিয়্যাত কে বদলাবার এবং পরিশুদ্ধ-আত্নবিশ্বাসি করার। চেষ্টা করুন,সুন্দর-সত্যের সুবাতাস বইতে মনের জানালা খুলে দেবার,নিজের চিন্তা গুলোকে আরো অনেক বেশি উন্নত করার। মুখোশের আড়ালে থাকা নিজের কালো অধ্যায়টা কে চিরতরে দূর করে দেবার। সময় কখনো আপনার মতো করে আসবে না,বরং সময় আপনাকেই তৈরী করে নিতে হবে,তৈরী করে নিতে হবে আপনার জন্য,আমাদের জন্য। আর তাই নতুন করে ভাবতে শুরু করুন,আজ-এই মুহুর্ত থেকেই,তৈরী হোক চিন্তার নতুন অধ্যায়,তৈরী হোক স্বর্নজ্জ্বল অধ্যায়। এবং,
জীবনের প্রতিটা ক্ষেত্রে আমাদের কথা এবং কাজের মাঝে তৈরী হোক, #প্রজ্ঞা_বুদ্ধিমত্তা_সদুপদেশ।     


রবিবার, ১৫ জুন, ২০১৪

এক দিবসের কিয়দাংশ! (আমার আমি)


সন্ধ্যায় বৃষ্টিতে ভিজে আব্বু বাসায় আসার পর ভাবলাম,খাওয়ার পর আব্বুকে এক কাপ চা করে দিবো,ডাক্তারের নিষেধ থাকায় আব্বুকে ইদানিং চা বানিয়ে দেয়া হয় না!আমার চা প্রিয় বাপজান,এক কাপ চা এর জন্য খুব হাসফাঁশ করেন বুঝলেও,নানুর অবস্থা দেখার পর আম্মু আমাকে পই পই করে মান করে দিয়েছেন। আজ আম্মুও বাসায় নেই,তার উপর আজ 'বাবা দিবস',ভাবলাম,এট লিস্ট এক কাপ চা তো খাওয়াতে পারি! একদিন এক কাপ খেলে কিচ্ছু হবে না!  

কিন্তু খানিক পরে বুঝলাম আজকে আব্বুর মনের অবস্থা খুব্বই খারাপ! আর তাই রাত পর্যন্ত হাসপাতালে ছোটবোন আর আম্মুর সাথে থাকার কথা থাকলেও দুঃশ্চিন্তা আর শরীর খারাপের কারণে দেখা না করেই চলে এসেছেন! এক'দিন আসলে ধকলও কম যায়নি,তার উপর সমস্যার তো অন্ত নেই!
এশার নামাজ পড়েই যখন শুয়ে পড়লেন,তখন আমি চায়ের মগটা নিয়ে রুমে এসেছিলাম!কিন্তু বুঝলাম,আব্বু এখন একটা ভালো ঘুম দিতে চাচ্ছেন,যাতে দুঃশ্চিন্তা গুলো মাথা থেকে সরিয়ে সলিউশন বের করতে পারেন। চা আর দেয়া হলো না...

আমি এখন অপেক্ষা করছি,আব্বু কখন ঘুম থেকে উঠবে। কারণ,উনি ঘুম থেকে উঠলে,কয়েকটা ব্যাড নিউজ বা দুঃশ্চিন্তা বাড়িয়ে দেয়ার মতো কিছু নিউজ উনাকে দিতে হবে!! ইচ্ছে থাকলেও নিউজ গুলো না দিয়ে উপায় নেই! সন্তান হিসেবে আমি এখনো সু-সন্তানের প্রথম স্টেজেও পা রাখতে পারিনি,আর তাই আমার পক্ষে সম্ভব না,বাবার দুঃশ্চিন্তা গুলো থেকে অন্তত ১টা দুঃশ্চিন্তাও সলভ করে দেয়ার!

আজ শহর জুড়ে বৃষ্টি মুখর রাত...আজ বর্ষার প্রথম দিন। চারপাশে তাই মেঘ ডাকা মুহুমুহু বাতাসে জড়ানো চমৎকার ওয়েদার। জীবনে প্রথম মনে হচ্ছে,এমন সন্ধার কোন দরকার নেই,দরকার নেই এমন তারাহীন রাতের।
দিন তিনেক আগে,রাতের এমনই সময় আমি নানুর নিথর দেহ টা জড়িয়ে চিৎকার করে বলছিলাম,'ও নানু উঠেন,আমার তো অনেক কথা আছে আপনার সাথে,আপনি তো কিছু বলে গেলেন না,উঠেন নানু উঠেন!' কিন্তু নিষ্প্রান সেই দেহটা থেকে কোন সাড়া পায়নি! আমি অবুঝ না হয়ে পারিনি,আমার আসলেই অনেক কথা ছিলো নানুর সাথে!আমার বিশ্বাস ছিলো একটা বারের জন্য হলেও,নানু যাবার আগে চোখ মেলে আমাদের দিকে তাকাবেন! নানু ছিলেন আমার আরেক মা,যার জন্য আমার অনেক না হোক,কিছু তো করার ছিলো!কিন্তু উনি সময় দিলেন না,শেষ বারের মতো নানু ডাকার সুযোগও দিলেন না!
আজ যখন সাড়ে চার বছরের মামাতো ভাই লাজিম আমাকে বলে,'আপু,আল্লাহকে একটু ফোন দাও না,দাদুর সাথে কথা বলবো!উনাকে তাড়াতাড়ি আসতে বলবো!' আমি তখন ওকে বুঝানোর বদলে আপন মনেই বিড়বিড় করে নানুর সাথে রাগ দেখাই! রাগ দেখাই নানা ভাইয়ের সাথেও!! নানা ভাই সব সময় আম্মুদেরকে বলতেন,
'আমি চাই আল্লাহ যেনো তোর মা কে কবরে রেখে যাওয়ার সুযোগ দেন!তোর মায়ের দায়িত্ব আমার,তাই আমার দায়িত্ব আমি পুরোপুরি শেষ করে যেতে চাই,তোদের দায়িত্বে রেখে যাবো,তোরা যদি ঠিক মতো পালন করতে না পারিস!তখন তো তোর মা ও কষ্ট পাবে,আমিও!'
আল্লাহ ঐ ভদ্রলোকের দোয়াই শুনলেন!আমাদের না...!

নানু চলে যাবার পর আমি প্রিয়জনদের জন্য কিছু করতে পারবো এই আশাটাও করা ছেড়ে দিয়েছি!আমি এখন আরো ভালো ভাবেই বুঝতে শিখেছি,আমাকে দিয়ে আসলে ওমন কিছুই হবে না!বড় আম্মু আসলে ঠিকই বলতেন,ওমন কিছু করতে হলে,কপালওয়ালী মেয়ে মানুষ হতে হয়!
আমার শুধু চেয়ে চেয়ে দেখার কপাল! দুঃশ্চিন্তা করতে করতে অল্পতেই বুড়িয়ে যাওয়া বাবার মুখ! একূল-ওকূল সামলাতে সামলাতে রোগাক্রান্ত মায়ের ক্লান্ত হাঁসি আর সারা জীবন দু'হাত ভরে আদর দেয়া মানুষ গুলোর নিরবে হারিয়ে যাওয়া! আমি আসলেই ওমন কপালওয়ালী কেউ না,আমিও আর দশজন স্বার্থপর মানুষদের মতো!
কেবল নিজের খোরাক জুটাতেই জীবন পার করে দিবো,আর বুকের ভেতর ছাই চাপা আফসোসের আগুন নিয়ে ঘুরবো। সময় পার হবে,বাস্তবতা বদলাবে,তবুও নিজের প্রয়োজনের কিয়দাংশও পূরণ করতে হিমশিম খাবো,দিনের পর দিন পার করে,একদিন ব্যস্ত শহরের বিষাক্ত বাতাসে উড়িয়ে দিবো,নিজের জমানো ইচ্ছে গুলোর লিস্ট! আর দিন শেষে ভাববো,ইনশাআল্লাহ সব ঠিক হয়ে যাবে একদিন... দিনে দিনে ষড়ঋতুর মতোই জীবন থেকে কখন যে হারিয়ে যাবে শরত,হেমন্ত,বসন্ত গুলো টেরও পাবো না! একসময় যা হতাশা মনে হতো,তখন তা ই হবে আশা! হাহাহাহা!! 

মঙ্গলবার, ১০ জুন, ২০১৪

চলে যাওয়া্,চলে যায়! (আমার আমি)


আল্লাহ কতো ভাবে মানুষের সময় গুলো কে বদলে দেন!! অথচ এই সময় গুলো নিয়ে,আমরা কতো রকমের পরিকল্পনাই না করে থাকি!কিন্তু কেই কি আন্দাজ করতে পারি?কখন কিভাবে সব বদলে যাবে...
ছোট বেলায় আমার পুতুল খেলতে ভালো লাগতো না খুব,স্পেশালি পুতুল বিয়ে! আমার সেন্সটা ছিলো,
'আমার পুতুল আমার কাছেই থাকবে,আরেকজন কে দিবো ক্যান?ও যদি আমার পুতুলটাকে হারায় ফেলে?!' তাই পুতুল সাজিয়ে রাখার শখ ছিলো,ঠিক বইয়ের ছবির মতো। কিন্তু বড় হওয়ার পর বুঝেছি,পুতুল আসলে চিরদিন নিজের কাছে রেখে দেয়ার মতো জিনিস না,অন্য কেউ সেটা হারিয়ে ফেলুক কি ভেঙ্গে ফেলুক,পুতুলকে চিরদিন নিজের কাছে রাখা যায় না! আমার নানু খুব সৌখিন মানুষ, ছিলেন বলতে চাই না,আমাকে ভালোবাসার-আদর করার মানুষ গুলো আমার জন্য সব সময়ই আছেন। নানুর প্রথম নাতনী ছিলাম আমি। শুধু তাই না, আমার মা তাদের মামা-খালাদের প্রথম ভাগ্নি ছিলেন,আর সেদিক থেকেও ছিলাম প্রথম নাতনী,জীবনে তাই বড় হবার সাজা,মজা দুটোই পেয়েছি। আমি শুধুমাত্র আমার নানুদের মেয়েদের খেলনা গুলোই পেয়েছিলাম তা না,বরং তাদের ছোট বেলার কয়েকটা পুতুলও আমাকে দিয়েছিলেন। আমি সেগুলো অনেক বছর যত্ন করে রেখেছিলাম,খেলতাম না ওগুলো দিয়ে,যদি নষ্ট হয়ে যায় এই ভয়ে!
আজ অনেক দিন পর আমার খুব ইচ্ছে করছে,আমার ওই মানুষ গুলোর কাছে যেয়ে,আরো ক'টা পুতুল আবদার করতে! কে জানে,হয়তো পুতুল বানিয়ে দেয়ার উসিলায় আল্লাহ মানুষ গুলোকে আরো ক'টা দিন আমার সাথে থাকার সুযোগ দিবেন!আরো ক'টা দিন আমার আবদারের যন্ত্রণায় বিরক্ত হয়ে তাদেরকে বলা সুযোগ দিবেন,
'বুবুরে বড় হবি কবে?কবে বুঝ-বুদ্ধি হবেরে?তুই বড় না?তুই যদি বুঝিস,দেখবি বাকী গুলোও বুঝবে,মায়ের কষ্ট কম হবে!নিজের ভালো বুঝবি যেদিন,দেখবি সব কাজ ঠিক মতো হবে!'
কিংবা শাহানা মামীর মতো বলবে,
-মেয়ের মা আল্লাহ বানায় নাই বলে কি,তুই মেয়ের আদর সব নিয়ে যাবি?!

এই এক বছরের মধ্যে পরিবার থেকে ৩ জন মুরুব্বী কে হারালাম!বিশ্বাসই হয় না এখনো! মনে হয়,আছেন উনারা এখনো,এই তো ও বাসায় গেলেই দেখতে পাবো বুঝি!আমার ঈদের সালামী,রকমারী পিঠা,আমসত্ত্ব-আচার,ঠিক মতো না খাওয়ার জন্য বকা,পরীক্ষার জন্য দোয়া সবই আগের মতোই পাবো!
আমি সব সময় বলি,আমি ভাগ্যবতী যে আমি তিন তিনটা মা পেয়েছি। আমার মা,মায়ের মা,নানুর মা। মজা করে বলতাম,আগের দিনে বাচ্চা বয়সে বিয়ে দেয়ার এডভান্টেজ স্বরুপ আল্লাহ বুঝি,আমাকে তিন তিনটা মায়ের আদর পাওয়ার সৌভাগ্য দিয়েছিলেন! অনার্সে পড়া অবস্থায় বিয়ে হয়েছিলো আম্মুর,আব্বু তখন ছাত্র জীবন শেষ করি করি অবস্থায়,ছোট একটা চাকরী আর ভাই-বোন,সংসারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে যেনো অথৈ সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছিলেন। আর আম্মুর তখন পড়াশুনা,সংসারের প্রয়োজনে চাকরী,দায়িত্ব সব মিলিয়ে আরো করুন অবস্থা! সেই সময় আমার এই মায়েরা আমাকে যে পরিমাণ আদর-শাসন,যত্নের সাথে পালতেন,যে দিন শেষ আমার আর আব্বুর সাথে বাসায় ফেরার ইচ্ছে হতো না। আমার স্কুল কেন নানু বাসার কাছে ছিলো না,কেনো আমাকে মিরপুর থেকে প্রতিদিন নানু বাসায় কেউ নিয়ে আসে না,সেই আফসোসে স্কুলে বসে বালিকা বেলায় খাতায় বড় বড় অক্ষরে লিখে কূল পেতাম না,
'আমাকে কেউ আদর করে না,শুধু নানু আর বড় আম্মু আদর করে!'
বড় হয়ে নিজের সেই সময়কার কীর্তি গুলো ভেবে লজ্জা পেয়ে হাসতাম,কিন্তু এখন আর হাঁসি আসে না!এখন চোখ ভিজে উঠে শুধু!বুকটা খাঁ খাঁ করে উঠে... আমার সেই মানুষ গুলো কই এখন?আমার সেই বেণী গেঁথে দেয়ার মানুষ গুলো,ফুল তোলা ফ্রক বানিয়ে দেয়ার মানুষ গুলোকে আমি তো এখন আর ডাকলেও পাই না!এখনতো আর খাওয়া নিয়ে হাজারো নাক করলেও কেউ বকা দিয়ে ভাতের লোকমা মুখের সামনে এনে ধরে বলে না,
-নে ধর,বুবু মাখায় দিছি!বেত্তুমিজ!না খেয়ে খেয়ে কি হইতেছিস দিন দিন খবর আছে?

২দিন আগে এলাকার এক চাচা মারা গেলেন,মারা যাওয়ার আগের রাতে ছেলেকে বলে গিয়েছিলেন,''বাবা,আমি যে তোমাকে মাঝে মাঝে বকা দেই,তুমি কি কষ্ট পাও?কষ্ট পেয়ো না কিন্তু!আমি ভালোর জন্যই বকি!' সেই বাবা,সকালে নাশতার টেবিলে 'ভালো লাগছেনা'বলতে বলতে চলে গেলেন চিরদিনের জন্য! কবরস্থানের পাশে বাড়ি করেছিলেন,আব্বু জিজ্ঞেস করেছিলেন একবার,
-কি ভাই?বাড়ি যে করলেন একদম কবরস্থানের গা ঘেঁষে?
হেসে বলেছিলেন,
-একটু আগায়ে থাকলামরে ভাই!কষ্ট কম হয় যাতে!যেতে তো হবে ঐখানেই তাই না?
উনি ঠিকই বুঝেছিলেন হয়তো,যে বড় তিন ভাই,বৃদ্ধ শ্বশুড়,বাবা কে রেখে উনাকেই আগে যেতে হবে!তাই সবার যাতে কষ্ট কম হয় সেই জন্য নিজের পার্মানেন্ট বাড়িটার কথা আগে ভেবেছিলেন! 



পরিবারের বড় সন্তান হিসেবে,আমার মুরুব্বীদের সাথে সম্পর্কটা খুব বেশি,উনাদের ভালোবাসা,আদর পেয়েছি বেশি,উনাদের সাথের স্মৃতিও অন্য ভাই-বোনদের তুলনায় অনেক বেশি,এতো বেশি যে,এখন এই স্মৃতি গুলোই আমার জন্য সবচেয়ে বেশি কষ্টকর হয়ে যাচ্ছে! এখনো আমি আমার সামনের কোন দিনের পরিকল্পনা করতে গেলে,উনাদেরকে ছাড়া,উনাদের দোয়া ছাড়া ভাবতে পারি না!আমি পরীক্ষা দিতে যাবো আর আমার মাথায় হাত দিয়ে কেউ দোয়া পড়ে ফুঁ দিয়ে দিবেনা,আমের সিজন চলে যাচ্ছে,কেউ আমার জন্য আম সত্ত্ব বানিয়ে পাঠাবে না আর, এই সত্যি গুলোর সাথে আমি এখনো অভ্যস্থ হতে পারছি না!
আমি এখনো এই বাস্তবতা গুলোর অভ্যস্থ হতে পারিনি,যে একে একে আমার নানুবুবুদের মধ্যে থেকে আজ সকালেও আমি একজন কে বিদায় দিয়ে এসেছি! যখন বাসার সবাই আমরা ধীরে ধীরে প্রস্তুতি নিচ্ছি,হসপিটাল থেকে ফেরত আসা,আমার নানু চলে যাবেন ভেবে তখনই হুট করে কাল রাতে চলে গেলেন আমার আরেক নানু! (আম্মুর সেঝ খালা)  খুব যে অসূস্থ ছিলেন তা না,অন্তত বড় বোনের মতো বিছানায় সেন্সলেস অবস্থায় শুয়ে থাকার মতো তো না ই। কিন্তু সেই মানুষটাই যে আগে চলে যাবেন,কে ভেবেছিল?!
চলে গেলেন মানুষটা! ছেলে-মেয়েরা কাঁদে,মা বুঝি আমাদের সাথে রাগ করে চলে গেলেন!তাই সেবা করার সুযোগও পেলাম না! ভাই-বোনরা কাঁদেন,বছরের শুরুতে মা চলে গেলেন,আর সাথে সাথে দেখি একে একে সব ভাই-বোনেরাই চলে যাচ্ছে!

কিন্তু এই চলে যাওয়াটাই যে সত্য,সেটা মেনে নিতে সবারই খুব কষ্ট!কেউ হুট করে চলে যায়,কেউ অনেকদিন সময় নিয়ে আপনজনদেরকে প্রস্তুত করে যায়,কিন্তু চলে যায়। সবাইকেই যেতে হয়। তাই আজকাল এই 'চলে যাওয়া' শব্দটাই বেশি কানে বাজে! আর মনের ভেতর শুধু আনচান করে,এরপর কে যাবে????!!!
আজকাল প্রিয় মুখ গুলোর দিকে তাকাতে ভয় করে,মনে হয়,বুঝি আর সামলাতে পারবো না নিজেকে!মুখ দেখলেই বোধহয় মায়া বেড়ে যাবে!কিন্তু কাউকেই তো আটকে রাখতে পারবো না। ছেড়ে তো চলে যাবে সবাই...এমনকি আমিও! মাঝে মাঝে মনে হয়,চারপাশে কতো মানুষ আছে,যারা নাকি কোনদিন,দাদী-দাদা,নানা-নানি,মুরুব্বীদের আদর কি জিনিস পাই নাই!এমন হলেই বুঝি ভালো হতো! অন্তত উনাদের চলে যাওয়ার কষ্টটা থেকে বুঝি রেহাই পেতাম!
বাদ ফজর আব্বু আমাদেরকে স্বান্তনা দেবার জন্য সূরা ইমরান এর ওই আয়াতটা শোনাচ্ছিলেন,
''অবশেষে প্রত্যেক ব্যক্তিকে মরতে হবে এবং তোমরা সবাই কিয়ামতের দিন নিজেদের পূর্ণ প্রতিদান লাভ করবে। একমাত্র সেই ব্যক্তিই সফলকাম হবে, যে সেখানে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা পাবে এবং যাকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে। আর এ দুনিয়াটা তো নিছক একটা বাহ্যিক প্রতারণার বস্তু ছাড়া আর কিছুই নয়। '' [সূরা আল ইমরানঃ ১৮৫]
আর বলছিলেন,
'অনেক তো একসাথে থাকা হলো আমাদের সবার,এবার একলা থাকার অভ্যাস শুরু করো সবাই!কারণ,কষ্টের পরেই তো আল্লাহ সুখ দিবেন,এরপর যেনো আল্লাহ সবাইকে আবার একসাথে,পরম সুখের জান্নাতে থাকার তাওফিক দেন তাই।এই দুনিয়াটা কিছু নারে মা,খালি ক'টা দিন থাকার জায়গা,আসল বাড়ি তো ঐটা,চেষ্টা করো যেনো ঐ বাড়িটাতে আল্লাহ একসাথে থাকার যোগ্যতা সবাইকে দেন!' আমীন। 

শুক্রবার, ৬ জুন, ২০১৪

কোন এক অবার্চীনার গল্প

এক,
-চুপ থাকাটা কোন সমস্যার সমাধান না,জানো তো?
-জানি। 
-তাহলে কেন চুপ করে আছো?
আমি সাথে সাথে কিছু বলতে পারলাম না। খানিক টা সময় পর বললাম,
-চুপ থাকাটা যেমন কোন সমাধান না,তেমনি কথা বলাটাও কখনো সমস্যা বাড়িয়ে দেয়,তাই চুপ করে আছি। 
আমার কথা শুনে রিদু আর কিছু বলল না,খানিকক্ষন আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল! তারপর বলল,
-বাসায় জানিয়েছো? 
-নাহ
-জানাবে না?
-আপাতত ইচ্ছে নেই!পরে বাসায় যেয়ে সামনা-সামনি বসে বলবো। এখন মাথায় জাস্ট একটাই চিন্তা,এই জায়গাটা বদলাতে হবে,দ্রুত অন্য কোথাও শিফট হতে হবে।  
-কোথায় যাবে?
আমি আবারো তাৎক্ষনিক কোন জবাব দিতে পারলাম না। কি বলবো?আসলেই তো!কোথায় যাবো আমি? মাসের আজ ১৮তারিখ,এই সময় বাড়ি ছাড়া সম্ভব না,আবার নতুন কোন এলাকায় যে যাবো সেটাও পারবো না,তাহলে কি করবো?
ছোট খালার বাসায় যাবো?কিন্তু সেখানে তো বড়জোর ২দিনের বেশি থাকা যাবে না,খালু হাজারো প্রশ্ন শুরু করে দিবে! 
আমার চিন্তা করা দেখে রিদু বলল,
-শোন,আমার মনে হয় তোমার একবার শিমু ভাবির সাথে কথা বলা উচিত,উনাকে বুঝিয়ে বলা উচিত,আমার মনে হয় কথা বললে অনেক কিছুই সলভ হবে। 
-আর যদি সলভ না হয়?যদি আবার নতুন কোন ঝামেলা শুরু হয় তখন?বাদ দাও রিদু!উনাদের যা খুশী করতে দাও,বেটার আমি আমার মতো চলে যাই এখান থেকে। 
রিদু হাল ছেড়ে দেয়ার ভঙ্গিতে আমার দিকে করুন চোখে তাকিয়ে রইল। আর আমি?
আমার মনে তখন রাজ্যের দুঃশ্চিন্তা আর কষ্ট এর চাইতে ক্লান্তি এসে ভর করেছে!অনেক দিনের পুরনো ক্লান্তি... 

মফস্বল শহর ছেড়ে যখন আমি পড়াশোনার জন্য এই শহরে আসি,তখন আমার মাথায় এক পড়াশুনা ছাড়া আর কোন চিন্তাই বলা যায় ছিলো না। ডায়েরীর পাতায় লুকিয়ে লেখা কিছু স্বপ্ন আর তারুণ্যের উচ্ছ্বাস ছাপিয়ে আমার কাছে শহরটাই মুখ্য ছিলো। এক ফুপি,এক খালা,দুই চাচা যে শহরে আছেন সেখানে থাকা নিয়ে আমার তেমন কোন সমস্যা হবে এটা আমরা কেউ ই ভাবিনি। তাই,এক বিকেলে ল্যাগেজ আর বই এর বোঝা নিয়ে মামার হাত ধরে সোজা চলে এসেছিলাম ফুপির বাসায়। পরের দিন থেকে ভার্সিটির ক্লাস শুরু,নতুন জায়গা,নতুন বন্ধু আর অনেক অনেক কিছু শেখার আনন্দ নিয়েই শুরু হয়েছিলো আমার শহর জীবন। ক্লাস,পড়া,টিচারের কাছ থেকে 'ভেরিগুড' শোনা,বন্ধুদের সাথে আড্ডা আর বিকেলে চা খেতে খেতে ফুপি-বোনদের সাথে গল্প করা। ব্যাস,চলে যাচ্ছিলো দিন দারুন ভাবেই। 
কিন্তু মাস ছ'য়েক যাবার পর আমার মনে হলো,ফুপা আমার এখানে থাকাটা একদমই পছন্দ করেন না! যদিও আমার থাকা বাবদ,আমার স্কুল টিচার মা ফুপির কাছে প্রতিমাসেই কিছু টাকা দিয়ে যান,কিন্তু তবুও আমার মনে হচ্ছিলো,ফুপা খুব বিরক্ত আমার উপর! 
ফুপাতো বোন মৌ কে আসার পর থেকে আমিই পড়াতাম,কিন্তু হঠাত বলা নেই,ফুপা ওর জন্য নতুন টিচার ঠিক করলেন,সামনে মৌ এর পিএসসি পরীক্ষা,তাই ওর নাকি ভালো গাইড দরকার! ফুপি কিছু বলতে পারলেন না। তবে আমাকে শুধু বললেন,হলে সীট পাওয়া যায় কি না দেখতে!  
এর ক'দিন পর হলে সীটের জন্য এপ্লিকেশন করে খালার বাসায় এসে উঠলাম। কিন্তু সেই সময় হলে সীট পেলাম না,ওদিকে খালার বাসাতেও বেশিদিন থাকা সম্ভব না,খালার শ্বাশুড়ি পছন্দ করেন না। খুব্বই খারাপ অবস্থায় পরে গেলাম!না পারছি বাসায় কিছু বলতে,না পারছি কোথাও যেতে তার উপর ইয়ার ফাইনাল পরীক্ষার ডেট দিয়ে দিয়েছে! 
এমন সময় এক ক্লাসমেটের মাধ্যমে পরিচয় হলো সোশ্যাল সাইন্সের রিদুর সাথে। ও আর ওর কয়েক ক্লাসমেট মিলে ভার্সিটির কাছেই একটা ফ্ল্যাট নিয়ে থাকে। যদিও রিদু কে খুব একটা চিনতাম না,তবুও উপায় না দেখে আল্লাহর উপর ভরসা করে চলে আসলাম ওদের ফ্ল্যাটে। বাবা-মা প্রথমে শুনে অবাক হলেও,পরে আমি পড়াশুনায় সুবিধা হওয়ার অজুহাত দিয়ে ম্যানেজ করেছিলাম। 
দিন গুলো মন্দ যাচ্ছিলো না আমার। রিদুদের এখানে আসার পর ২/৩টা টিউশনী পেয়ে যাই। ক্লাস,টিউশনী,সপ্তাহে নিয়ম করে রান্না করা,অনেক রাত পর্যন্ত রুমমেটরা মিলে গল্প করা এই সব মিলিয়ে এই অচেনা শহরেও বেশ সুন্দর কেটে যাচ্ছিলো আমার দিন গুলো। দেখতে দেখতে সেকেন্ড ইয়ার পার করলাম। ইচ্ছে আছে,গ্রাজুয়েশন টা শেষ করেই,চাকরী একটা নিবো,এর মাঝে বিসিএস হয়ে গেলে তো ভালোই,চলে যাবো কোন এক অচেনা শহরে,দিন কাটাবো একদম নিজের মতো করে। কিন্তু সময় গুলো এভাবে যে বদলে যাবে বুঝিনি!
দুই,
ব্রোকেন ফ্যামিলি কথাটা আমার পছন্দ না,তাই আমি বলে থাকি,টুকরো ঘর!
আমি টুকরো ঘরের মেয়ে,যে ঘরটায় সব মানুষ থেকেও থাকে না,কিংবা ঘরের মানুষ গুলোই আর ঘরে থাকতে চায় না,সেটাই 'টুকরো ঘর'।
আমার বাবা থাকেন সূদুর সুনামগঞ্জ প্রায় ৫বছরের বেশি হবে! বাবা আর মায়ের মধ্যে আসলে বোঝাপড়াটা কখনোই ভালো ছিলো না,বিয়েটাও হয়তো নিজেদের ইচ্ছায় ছিলো না! দু'জনেই দু'জনের কাছ থেকে দূরে থাকতে চাইতেন,কি নিয়ে আসল সমস্যাটা ছিলো তা এখন পর্যন্ত জানা হয়নি,বলা যায় জা্নার চেষ্টাই করিনি! শুধু দেখেছি,বাবা-মা দু'জন কখনোই দু'জনকে সহ্য করতে পারতেন না। আর তাই যখন বাবার বদলীর ওর্ডার আসলো তখন সাথে সাথেই মা বলে ফেললেন,
-আমি যাচ্ছি না কোথাও,তোমার চাকরী তুমিই যাও! আর নিতু কার সাথে থাকবে তা ওকেই ডিসাইড করতে দাও।
ক্লাস এইটে পড়ুয়া আমি তখন কমিকস আর তিন গোয়েন্দার জগত থেকে মাথা বের করে কিছু ভাবার আগেই,দেখি এক সকালে বাবা ল্যাগেজ গুছিয়ে চলে গেলেন। ব্যাস,আমার 'টুকরো ঘরের" জীবনের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছিলো সেদিন থেকেই।
তবে আমি একটা ব্যাপারে বাবা-মা এর কাছে কৃতজ্ঞ এই জন্য যে,তারা সব সময় চেষ্টা করেছেন আমি যেনো তাদের মধ্যকার ঝগড়া,ক্ষোভ,ঘৃণা থেকে দূরে থাকি! তারা কখনো আমাকে এটা বুঝতে দিতে চাইতেন না,যে আমি তাদের জন্য এই অসম,যন্ত্রণাকর সম্পর্কের মাঝে একটা বোঝা স্বরুপ কেউ! তাই তারা ঝগড়া করতেন আমার অবর্তমানে!সব রকমের সিদ্ধান্ত নিতেন আলাদা ভাবে বসে,আমার সাথে কখনোই কিছু শেয়ার করতেন না। তবে আমাকে এসব দেখতে না দিলেও,সব সময় তাদেরকে আমি দু'মেরুতেই দেখতাম,দেখতাম বছরের প্রায় ৩৬৫ টা দিন,তাদের জন্য একই রকম!
ছোট থেকেই আমি সব সময় ডুবে থেকেছি বই এর জগতে। বই পড়তে পড়তে আমি তৈরী করে নিয়েছি আমার নিজের আলাদা একটা জগত!এই জগত থেকে বের হয়ে এসে,বাবা-মায়ের রাগ-ঘৃণা বুঝবার মতো ইচ্ছে কোনদিন ই আমার হয়নি। বাস্তব জগতকে আমি সব সময় হালকা ভাবেই নিয়েছি!বাবা চলে গেছেন?যাক!কি এমন হয়েছে তাতে?বরং ভালোই হয়েছে,ছুটিতে সিলেট বেড়াতে যাবার সুযোগ হয়েছে। মা বাবাকে সহ্য করতে পারেন না?তো কি হয়েছে?সবার সবাইকে সহ্য করতে হবে এমন তো কথা নেই!মা তো আমাকে সহ্য করতে পারেন,এই ই অনেক!

কলেজে উঠার পর জানলাম,মা চাইছেন আমি যেনো হোষ্টেল জীবনে অভ্যস্থ হই!উনি উনার মতো করে জীবন সাজাবেন।ব্যাস,শুরু করে দিলাম হোস্টেল লাইফ। সেই যে বাড়ি ছাড়লাম,আর ফিরে যাওয়া হয়নি! এখনো পর্যন্ত কোন ছুটিতে মাঝে মাঝে মায়ের কাছে যাই,মাঝে মাঝে বাবার কাছে কিন্তু এই নিয়ে কখনো আক্ষেপও করিনি।
সিলেট যাবার বছর খানেকে এর মাথায় বাবা বিয়ে করেন তার কলেজ জীবনের এক বান্ধবীকে! ভদ্র মহিলার আগে একটা ৪বছর বয়সের ছেলে ছিলো,বাবার সাথে বিয়ের পর তার আরেকটা ছেলে হয়। নিজের কোন মেয়ে ছিলো না,আবার বাবাও আমাকে খুব ভালোবাসতেন বলেই হয়তো,আমি গেলে মহিলা খুব ভালো ব্যাবহার করতেন!আর আমি নিজের মতো থাকতাম,কোন উচ্চ-বাচ্চ করতাম না বলে তিনি বেশ শান্তি পেতেন।
তবে মা নিজের মতো করে থাকতে চাইলেও বাবার মতো নতুন জীবন শুরু করতে পারেননি। মায়ের এক দুঃসম্পর্কের কাজিন মা কে খুব পছন্দ করতেন,মা চেয়েছিলেন তাকেই বিয়ে করতে কিন্তু ভদ্রলোক তার কথা রাখেন নাই। আর তাই চাকরী আর আমাকে নিয়ে একাই আছেন এখনো।
আমি এখনো যখন ছুটিতে বাবা-মায়ের কাছে যাই,দু'জনেই প্রতিবার জিজ্ঞেস করেন,'কোন কষ্ট হচ্ছে না তো তোর?' আমি দৃঢ় ভাবে মাথা নাড়িয়ে না করি!নাহ, কোন কষ্টই হচ্ছে না আমার! আর হবেই বা কিভাবে?
আসলে আমি তো কোনদিন জানার চেষ্টাই করিনি,যে আমি কিসে কষ্ট পাচ্ছি আর কিসে সুখ!বেঁচে আছি যে সূস্থভাবে এই তো আমার জন্য অনেক!খাচ্ছি,পড়ছি,ঘুমাচ্ছি ব্যাস। এর বাইরে আর কি ই বা আমার চাওয়ার থাকতে পারে? আর দশ জন কি করে আমার জেনে কি হবে?আমার জীবনটা আর দশ জনের মতো যখন না,তখন খামোখা ওসবের আফসোস করার মানে নেই! এভাবেই আমি ভাবতাম,এই বোধ নিয়েই নিজেকে তৈরী করে নিয়েছিলাম।
তবে কলেজে থাকা অবস্থায় একদিন আমার রুমমেট তরু ওর বাবা-মায়ের ডিভোর্সের খবর শুনে সারা রাত যখন ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদেছিলো,তা দেখার পর আমি অনেক গুলো রাত ঘুমাতে পারিনি! কি এক যন্ত্রণা আমার ভেতরটা যেনো কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছিলো,কিন্তু কাউকে বলতে পারিনি...
আমি ছেলে না হয়ে মেয়ে হওয়াতে আমার বাবা-মা বোধকরি অনেকটা নিশ্চিন্ত ছিলেন!যাক,অন্তত নেশা-টেশা করে বখে যাওয়ার ভয় তো নেই!কিন্তু ঐ দিন গুলোতে আমার খুব ইচ্ছে করতো,এমন কিছুতে ডুব দেই,যাতে করে আমি ভুলে যেতে পারি বাবা-মায়ের মুখটা! খানিকটা সময়ের জন্য ভুলে যাই আমি কে!তবে হ্যাঁ,আমি আমার জগতে সব সময় একলা থাকতেই পছন্দ করতাম,আর কাউকে সহ্য করতে পারতাম না,সে জন্যই বোধ করি,বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে বখে যাওয়ার পথটা খোলা হয়নি কখনো। কলেজ বন্ধু তিয়াসী কবিতা লিখতো বেশ! একবার একটা কবিতা লিখে আমার টেবিলের দেয়ালে সাঁটিয়ে রেখেছিলো,
তারচেয়ে একটা স্বপ্ন দেখি চল...
তুই আমি হেঁটে চলেছি সবুজ বুনো ঘাস ছুঁয়ে
প্রিয় লাল অথবা নীল অথবা শুভ্র সাদার আবেশ জড়িয়ে
কাশফুলের ভীড়ে,কোনদিন না হারাবার সুখ নিয়ে...

নাহ,স্বপ্ন বোধহয়  বেশীই দেখা হয়ে যাচ্ছে,
এত স্বপ্ন দেখার কষ্ট স্বপ্ন ভাঙ্গার কষ্টের চেয়েও 
কখনো অনেক বেশী মনে হয়...    

  
রিদুদের এই এলাকার বেশ প্রভাবশালী পরিবারের নাতনী জুহি কে পড়াতাম আমি। জুহির বাবা ব্যবসায়ী,আর মা পেশায় এডভোকেট,দু'জনেই আবার পলিটিশায়ন। আমি যখন পড়াতে যেতাম,তখন বাসায় থাকতো জুহি আর ওর দাদী,কাজের লোক। প্রথম প্রথম আমি ওকে পড়িয়েই চলে আসতাম,কিন্তু ধীরে ধীরে এক সময় ওর দাদীর সাথে খুব ভালো সম্পর্ক হয়ে গেলো। ভদ্রমহিলা আমার সাথে অনেক গল্প করতেন,জীবনের গল্প তার সংসারের গল্প,ইচ্ছে-অনিচ্ছার গল্প। তার একাকী দিন গুলোর গল্প! আমি খুব আগ্রহ নিয়ে শুনতাম। যেদিন তিনি জানলেন,আমার বাবা-মা আলাদা থাকেন,সেদিন তিনি খুব অবাক হয়ে বলেছিলেন,
-তোমাকে দেখলে কখনোই বুঝা যায় না,যে তোমার ভেতর কোন কষ্ট আছে!কি হাসি-খুশী থাকো সারাক্ষন!
আমি হেসে বলেছিলাম,
-দুঃখ তো কম বেশি সবারই আছে দাদী,কিন্তু সেটা নিয়ে বসে থাকলে কি আর দিন যাবে?আমি ওভাবে আসলেই ভাবি না,আপনিও ভাববেন না,ওকে?
দাদী স্নেহের হাঁসি দিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছিলেন। এভাবেই বেশ ভালো একটা সম্পর্ক হয়ে যায় দাদির সাথে আমার।
মাস কয়েক আগে জুহির দাদী কে বৃদ্ধাশ্রমে দিয়ে আসেন জুহির মা-বাবা। জুহি সপ্তাহে একদিন ওর দাদীর সাথে দেখা করতে যেতো,প্রথম কয়েক দিন ওর মা/বাবা সাথে গেলেও,সপ্তাহ কয়েক পর আমাকেই যেতে হতো। আমার কখনোই যেতে খারাপ লাগতো না,বরং জুহির দাদীর মতো মানুষের সাথে সময় কাটিয়ে আসতে ভালোই লাগত। প্রতিবার দেখা করে আসার সময়,জুহির দাদী আমার মাথায় হাত রেখে প্রাণ ভরে দোয়া করে দিতেন। মাঝে মাঝে সেই দোয়ার লোভেই যেতাম,আবার কখনো ঐ একলা মানুষটার খুশীর কথা ভাবতাম। আমরা গেলে তিনি অসম্ভব খুশী হতেন,বলা যায় সারা সপ্তাহ তিনি আমাদের জন্যই অপেক্ষা করতেন।
শেষ বার যখন দেখা করে আসি,ফেরার সময় আমার মনে হলো দাদী খুব দুর্বল হয়ে যাচ্ছেন!আগের মতো নেই!আসার সময় আমার হাত টা শক্ত করে ধরে রেখেছিলেন,আমি যখন বললাম,
-দাদী,আপনি কি অসূস্থ?এখানকার ডাক্তার কি ভালো ট্রিটমেন্ট দেয় না?তাহলে জুহির আব্বুকে বলেন,ভালো ডাক্তার দেখাতে!
উনি মলিন একটা হাঁসি দিয়ে বললেন,
-নারে বোন,এখানকার সবই ভালো!অসুখ তো হলো আমার মনে!তুই আবার জুহিদের বাসার কাউকে কিছু বলিস না,ওরা সবাই অনেক ব্যস্ত,খামোখা আমার জন্য কাজ ছেড়ে আসবে!
আমি জোর গলায় বললাম,
-মায়ের জন্য সময় বের করতে আবার খামোখা কি?আপনি কি তাদের জন্য করার সময়,অতো সময়ের হিসেব করেছেন?আমি আজই বলবো,না হয় আপনি ক'দিন বাড়ি থেকে ঘুরে আসবেন।
-না না,তুই কিছু বলিস না,ওরা রাগ হবে অনেক!বুঝিস না কেন?তুই বাইরের মানুষ,তোর কাছ থেকে মায়ের খবর শুনলে ওদের মাইন্ডে লাগবে!
আমার তখন বলতে ইচ্ছে হলো,
দাদী,আমি জানি আপনার ছেলের সময় হয় না,আপনার খবর নেবার!তারচেয়ে বরং চলেন,আমি ই না হয় আপনাকে নিয়ে যাই!
কিন্তু পারলাম না বলতে। তবে সেদিন ফিরে আসার পর থেকে,আমার ভেতরে ভেতরে খুব আফসোস কাজ করছিলো!ঠিক করলাম,পরের সপ্তাহে যেয়ে দাদীকে বাসায় নিয়ে আসবো,না হয় দু'টো কড়া কথা বলবে জুহির মা! কিন্তু আমার আর পরের সপ্তাহে দাদীকে দেখতে যাওয়া হয়নি,বরং দাদী নিজেই সেখান থেকে বাড়ি চলে এসেছিলেন একেবারে!

তিন,

আমার মাঝে মাঝে মনে হয়,আমি মানুষটা একটু বেশিই আত্নকেন্দ্রিক! মানুষকে আমি আমার কাছে ভীড়তে দেই না!আর তাই কারো সাথে আমার অন্তরঙ্গ বা আত্নার সম্পর্ক হয় না,আমি মানুষকে বুঝলেও মানুষ বুঝতে পারে না আমাকে,বুঝতে পারে না,যে আমিও তার প্রতি আন্তরিক!দাদীও বোধহয় সে জন্যই আমাকে সেদিন আপন ভেবে দাবী খাটিয়ে বলতে পারেননি,'আমায় একটু বাসায় নিয়ে চল'!
এই প্রথম আমার মনে হচ্ছিলো,আমি বোধহয় চাইলে পারতাম আমার বাবা-মা কে একসাথে ধরে রাখতে!আসলে আমার বাবা-মা আমাকে অনেক ভালোবাসেন,কিন্তু আমি তাদেরকে একদমই ভালোবাসি না,কোন দিন বাসিও নাই!
বাবা-মা কে আমি যতটা স্বার্থপর ভেবেছিলাম,আজ মনে হচ্ছিলো আমি নিজে তার চেয়েও অনেক বেশি স্বার্থপর! কোনদিন ভালোবাসা নিয়ে,বাবা কে ডাকিনি,মা কে জড়িয়ে ধরিনি! জানি উনারা আমাকে ভালোবাসলেও একে অন্যকে ভালোবাসতেন না,কিন্তু আমি তো তাদের কাউকেই ভালোবাসিনি! বরং তাদের ব্যাবধানের কারণেই হোক,আমার এই ছন্নছাড়া জীবনটাকেই আমি অসম্ভব ভালোবেসেছি। আর কোন কিচ্ছু নিয়ে ভাবিনি কখনো,কাউকে নিয়ে না। কোন দিন অভিমান নিয়ে বা অধিকার নিয়েও বাবা-মা কে বলিনি,
-তোমরা আমার জন্য হলেও একসাথে থাকো,আমাকে আর দশটা স্বাভাবিক মানুষের মতো বাঁচতে সাহায্য কর!'
জীবনে প্রথম আমার ইচ্ছে হলো,একটু বাবা-মায়ের সাথে কথা বলতে!তাদের কন্ঠ শুনতে!বড্ড অবেলায়। কাঁপা কাঁপা হাতে ফোন দিলাম বাবা কে,বাবা তখন ব্যাস্ত রাতের খবর দেখা নিয়ে। আমার কল দেখে অবাক হলেন!অনেকবার হ্যালো হ্যালো করলেন,কিন্তু আমি এপাশ থেকে কান্নার দমকে কিচ্ছু বলতে পারলাম না! এরপর মা কে ফোন দিলাম,কিন্তু মায়ের সাথেও কথা বলতে পারলাম না!
অনেকক্ষন একা একা কাঁদলাম...অনেকক্ষন! বোধহয়,জীবনে প্রথম আমার মনে হলো,আমি একলা একটা মানুষ!সবার জন্য অনেকেই আছে,সবাই অনেকের জন্য থাকে,কিন্তু আমি কারো জন্যই নই,ছিলাম ও না কোনদিন!
আমার বিশাল সার্কেল আছে বন্ধুদের,কারণ,আমাকে সবার ই দরকার হতো কিন্তু আমার সেভাবে কাউকেই দরকার হতো না!আমি কাছের বন্ধু আমি কাউকেই বানাইনি,আমার জগতটাতে কাউকেই ঢুকতে দিতে চাইতাম না বলে!তারপরেও কিছু বন্ধু ছিলো যারা সারাক্ষন আমার জন্য ভালোবাসা,মায়া নিয়ে অপেক্ষা করতো। কলেজ ছেড়ে যখন চলে আসি,তখন আমার দীর্ঘদিনের বন্ধু রিজ্জু,তিয়াসী ছলছল চোখে বলছিলো,
-দোস্ত,তুই কি আমাদের সাথে দেখা করার জন্য কখনো রাজশাহী আসবি না?
আমি কঠিন স্বরে বলেছিলাম,
-নাহ!ছাড়লাম দেশের আবার মায়া কি?
-তোর কি আমাদের দেখতে ইচ্ছে করবে না কখনো?
-শোন,আমি এসব ইচ্ছে এর মূল্য জীবনে দিতে শিখি নাই!তাই আমাকে এসব নিয়ে ভাবতে বলিস না। আমার একলা থাকতেই ভালো লাগে,জানিস ই তো!
আমি সেদিন মিথ্যে বলেছিলাম!এই এতো গুলো বছরে প্রায় রোজই ওদের কথা অনেক মনে পড়েছে,অনেকবার দেখতে ইচ্ছে হয়েছে,অনেকবার। প্রচন্ড ঝাল মিশিয়ে ফুচকা খাওয়ার সময় অথবা পরীক্ষার সময় পড়ার চাপে মনের ভুলে মরিচ বেশি দিয়ে ভর্তা বানিয়ে ভাত খাওয়ার সময় মনে হতো,এখন যদি সেই সময়ের মতো বলা নেই হঠাত কুলফি আর পানির বোতল হাতে রিজ্জু এসে হাজির হতো!
কিংবা জ্বরের ঘোরে কাঁপা হাতে প্যারাসিটামল খেয়ে,মাথায় পট্টি দিতে দিতে,অথবা বৃষ্টিতে ভিজে হাঁচি দিতে দিতে মনে হতো,এখন যদি হুট করে এককাপ কড়া লিকারের আদার চা কিংবা প্রিয় খিচুড়ী প্লেটে নিয়ে তিয়াসী হাজির হতো!
হাতে টাকা নেই,কিন্তু বই কেনার নেশা চেপেছে তখন খুব মনে হতো,এখন যদি সেতু এসে হাতে একগাদা নতুন বই ধরিয়ে দিয়ে বলতো,'নে ধর,পড়ে বিদ্যান হয়ে আমাকে লেকচার দিস!' কিংবা ক্লাস শেষে সাইকেলটা রেখে যেয়ে বলতো,'সন্ধ্যায় উড়তে বের হইস,তবে চাকা পাংচার যেনো না হয়!'
শহরের ব্যস্ত গলিতে হাঁটতে হাঁটতে যখন বেলী ফুলের মালা খুঁজতাম তখন খুব মনে হতো,পিয়ালী যদি এখন ওর গাছের ফুল ছিঁড়ে মালা বানিয়ে আমার হাতে জড়িয়ে বলতো,'নেরে সখী,ভালোবাসা নে...তুই ই সব নে,আর কাউকে লাগবে না!'
খুব মনে পড়তো ওদেরকে,সময়ে-অসময়ে,চলতে পথে অনেকবার...
কতোভাবেই না ওরা আমাকে খুঁজতো!কখনো ফোনে,কখনো সোশ্যাল সাইটে,কখনো আত্নীয়-বন্ধুদের অনুষ্ঠানে। তিয়াসী কতো করেই না রিকোয়েস্ট করেছিলো,ওর বিয়েতে যাবার জন্য! আর রিজ্জু? মেইলের পর মেইল করেছিলো,দেশ ছেড়ে যাবার আগে যেনো একটাবার দেখা করি!
আমি ভেবেছিলাম,আমার এসব কীর্তির পর ওরা আমাকে আর কখনোই মনে করবে না!ঘৃণা করবে! কিন্তু মানুষ গুলো বড্ড বেশিই পাগল! তাই এখনো প্রতি জন্মদিনে মা ফোন দিয়ে বলে,
-নিতু,তোর জন্য পার্সেল এসেছে,কাবার্ডে রেখে দিলাম,এসে দেখিস!
দিন দিন আমি অপরিচিতদের জন্য যতটা না পরিচিত হয়েছি,তার চেয়ে বেশি অপরিচিত হয়েছি পরিচিতদের জন্য। আজ এতো বছর পর এসে,তাদেরকে যতটা না অপরাধী মনে হচ্ছে,তার পাশে নিজেকেও অনেক অপরাধী লাগছে!

দাদির মৃত্যুর কয়েক সপ্তাহ পর একটা অদ্ভুদ খবর আমার কানে আসলো! জুহির মা আমাকে ডেকে নিয়ে খবরটা দিলেন। আর সেটা হলো, দাদী তার নিজের নামের একটা ফিক্সড ডিপোজিট নাকি আমাকে দিয়ে গেছেন!!!
খবরটা শুনে আমি হতভম্ব হয়ে শিমু ভাবির দিকে তাকিয়ে রইলাম!! কিন্তু তার পরের খবর শুনে আরো হতভম্ব হলাম!যখন শিমু ভাবি আমাকে বললেন,
-শোন মেয়ে,আমার শ্বশুড় এই টাকা আমার শ্বাশুড়ি কে দিয়ে গিয়েছিলেন,নিয়ম অনুযায়ী এই টাকা জুহির বাবার!কিন্তু হঠা করে একটা বাইরের মেয়ে এসে আম্মাকে পটিয়ে সেই টাকা নিয়ে যাবে,এটা তো আমরা মানতে পারছি না!জানি শেষের দিকে তুমি মা কে অনেক সময় দিয়েছো কিন্তু তাই বলে...
ভাবির কথা শুনে আমার মনে হলো,আমি কোন বাংলা সিনেমার দৃশ্য দেখছি!আর না হলে কোন বঙ্গীয় সিরিয়াল! আরে আগে তো ব্যাপারটা আমাকে সুন্দর করে বুঝিয়ে বলবে,তারপর তো জানতে চাইবে আমার মতামত! তা না করে সে কি বলে যাচ্ছে!টাকার জন্য উনারা আমাকে যা খুশী ভাবছেন,এক ঝাটকায় আমাকে কোথা থেকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন! অথচ আমি তো ভাবছি ঐ মানুষটার কথা,যিনি জীবনের শেষ দিন গুলোতে কতটা একলা আর অসহায় ভাবতেন নিজেকে!যার জন্য আমার মতো ক'দিনের পরিচিত মানুষের সঙ্গ পেয়ে এতোটাই খুশী হয়েছিলেন,যে নিজের অর্জিত অংশের একভাগ আমাকে দিয়ে গেছেন!আর এদিকে তার ছেলে-বৌ তো অনেক কিছুই ভেবে বসেছে! মানুষের কাছে টাকা টা এমন করে 'এতকিছু' কেন হয়ে যায়?যে সে সব কিছু ভুলে যায়! আজকের দিন টা চলে যাবে,কাল আমিও চলে যাবো,আস্তে আস্তে দিন,মাস,বছর চলে যাবে। কিন্তু থেকে যাবে এই কথা গুলো!
আর ক'বছর পর যখন জুহির মা ও ঠিক একইভাবে দাদীর মতো একলা হয়ে যাবেন,তখন কি বুঝবেন তার শ্বাশুড়ির কষ্টটা? তার কি তখন মনে পড়বে আমার কথা? নাকি তখনো তার মনে পড়বে এই টাকা গুলোর কথা। আজকের পর জীবনের বাকীটা সময় আমার দাদীর কথা খুব মনে থাকবে,মনে থাকবে তার অসহায় দিন গুলোর কথা,আর রেখে যাওয়া দুঃখ গুলোর কথা।
এরপর থেকে ও বাসায় যাওয়া আমি বন্ধ করে দেই। শিমু ভাবি মানে জুহির মা তবুও সেদিন রিদু কে ডেকে নিয়ে আমার নামে অনেক গুলো কথা শুনিয়েছেন!জুহির মা যখন আমাকে শক্রু ভাবতে শুরু করেছেন তখন আর এই এলাকাতেই আমার থাকার মতো অবস্থা নেই,তাই এখান থেকে চলে যাওয়াই উত্তম।

প্রায় অনেক বছর পর,

বই খুঁজতে যেয়ে বেশ পুরনো অফহোয়াইট মলাটের ডায়রীটা হঠাত হাতে আসল। অনেকদিন হয়ে গেছে,ডায়রি লিখি না,নিজের সাথে নিজে কথাও বলি না! আজকাল কি আসলেই অনেক ব্যস্ত থাকি নাকি ব্যস্ততার মাঝে ডুবে থাকি জানি না,তবে এখন আর ওভাবে নিজের কথা ভাবার সময়ও হয় না!অনেক বদলে গেছে সব কিছু। একটা সময় ছিলো,ডায়রীর পাতায় কালির আঁচড় না বসালে আমার দিন ফুরাতো না! আমার ডায়রী গুলো আমার আমির কথা বলতো...
ভাবতে ভাবতে আনমনে পাতা উল্টাতে উল্টাতে এক পাতায় যেয়ে জুহিদের ঘটনাটা চোখে পড়ল!হঠাত করেই থমকে গেলাম! জুহি...
অনেক দিন পেরিয়ে গেছে,এর মধ্যে বদলে গেছে অনেক কিছু!কেমন আছে এখন জুহিরা? কেমন আছে শিমু ভাবি?
মানুষের একটা স্বভাব হলো,
ব্যস্ততার মাঝেও হঠাত করে যখন কারো কথা মনে পড়ে যায়,তখন কেন জানি অদ্ভুদ অস্থিরতা কাজ করে!মনে হয়,
'ইশ,যদি একটু খোঁজে পেতাম মানুষটার!কেমন আছে,কি করছে এখন? কিছু যদি জানা যেতো!'
এমন হাজারো চিন্তা এসে ভর করে,তারপর এক সময় আবার কাজের ভীড়ে তা হারিয়েও যায়। তবে জুহিদের ব্যাপারটা আমার মাথা থেকে সহজে গেলো না। ইনডেক্স খুঁজে নাম্বার বের করে, রিদু কে ফোন দিলাম,ও এখন আছে খুলনা,বিসিএস দিয়ে ওখানেই জয়েন করেছে এক কলেজে। এতো বছর পর হঠাত জুহিদের খবর জানতে চাওয়ায় বেশ অবাক হলো রিদু! তেমন কোন খবর অবশ্য ও দিতে পারলো না,শুধু জানালো জুহি পড়াশুনা করতে গেছে ইউএস এ,সম্ভবত ওখানেই স্যাটেল হয়েছে।
কেমন আছেন তাহলে শিমু ভাবি এখন?উনিও কি এখন উনার শ্বাশুড়ির মতো একলা দিন কাটাচ্ছেন? কে জানে! হয়তো!
আসলে জীবন কখনো স্বাভাবিক ভাবে,কখনো বা অদ্ভুদ ভাবে বদলে যায়! সেটা মানুষ চায় কি না চায়। আজ হয়তো শিমু বুঝতে পারছেন, নিজের ভুল গুলো,হয়তো...

সময়ের সাথে সাথে আমিও বদলে গেছি! মানুষকে বুঝতে শিখেছি,বাঁচতে শিখেছি মানুষের মাঝে,একা একা নয়। বদলে গেছে বাবা,বদলে গেছে মা ও।
কনভোকেশন প্রোগ্রামের দিন আমার রেজাল্টে খুশী হয়ে বাবা জিজ্ঞেস করেছিলেন,
-কি চাসরে মা?বলে ফেল।
আমি জীবনে প্রথম বাবা কে অবাক করে দিয়ে বলেছিলাম,
-বাকী জীবন,তোমাকে আর মা কে নিয়ে একসাথে থাকতে চাই!
অনেকটা সময়ের জন্য বাবা হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে ছিলেন। আমার অশ্রু ভরা চোখের দিকে তাকিয়ে নিজের ঢেকে রাখা অসহায়ত্ব কে বুঝাতে চাইছিলেন। আর মা?
দেয়ালে হেলান দিয়ে আমার মাথায় শুধু হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলেন। দু'জনে এর বেশি আর কিছুই বলেননি।আর ঐদিনের পর আমিও আর কিছু ভাবিনি। কিছু অসম্পূর্ণতা নিয়েই তো জীবন,এই আধেক সুখ-দুঃখ গুলোই অনুভূতির ভারসাম্য।
তারপর একে একে অসংখ্য সিঁড়ি পেরিয়েছি। 'টুকরো ঘরের' মেয়ে হয়েও অনেক ঘর জুড়তে সাহায্য করেছি,ঐ হাসি-আনন্দ গুলোর মাঝেই নিজের আধেক গুলো পুরো করেছি।


বাসায় ফিরে,নিজের রুমে যাবার আগে দেখে নিলাম পুরো বাসাটা,মা তার রুমে কলেজের খাতা চেক করছেন! মাঝে মাঝে বাবা বেড়াতে আসেন আমার এখানে! তখন মা সহজে রুম ছেড়ে বের হোন না। নাহ,কোন কালেই এদের দূরত্ব আর কমানো গেলো না।
অবশ্য এখন আমার ও নিয়ে আফসোস কম। আমি শুধু অপেক্ষায় থাকি,কবে ছুটিতে বাবা আসবেন,ক'টা দিন তখন আমি রোজ সকালে উঠে,আর রাতে ঘুমাতে যাবার আগে যে,বাবা-মায়ের মুখটা দেখতে পারি,আমার জন্য এই ই তো অনেক!
মায়ের সাথে থেকে আমি বুঝতে শিখেছি,একাকীত্ব কত কষ্টের! যদিও এখন আর জ্বর হলে আমাকে একা একা প্যারাসিটামল খেতে মাথায় পট্টি দিতে হয় না,একা একা কুলফি খেতে হয় না। তবুও বুঝতে পারি,মা এর কষ্ট টা। কিছু করার নেই আমার,এই জীবনটা ই হয়তো তিনি চেয়েছিলেন,অথবা এমন জীবন ই তার প্রাপ্য ছিলো।
খুব বেশি না হলেও একটি-আকটু বুঝতে পারি,বাবা-মায়ের মাঝে সন্তান হচ্ছে খুব শক্ত একটা বাঁধন। এই বাঁধনটার অনেক শক্তি আছে,বছরের পর বছর দু'টো মানুষকে এক করে রাখার শক্তি। এই বাঁধনটা যদি ঢিলে হয়,ছিঁড়ে যায় তাহলে বাবা-মা দু'টো সম্পূর্ণ আলাদা মানুষ হয়ে যেতে একটুও দেরি হয় না। সব সময় যে,বাবা-মা কে ই এই বাঁধন শক্ত করতে হবে এমনটা না,কখনো কখনো সন্তানও পারে।
জুহির দাদীর সেই একলা দিন গুলো আমাকে শিখিয়েছে,বাবা-মায়ের সন্তানকে ছাড়া একলা থাকতে কতো কষ্ট হয়! কত কষ্ট হয় দিনের দিনের পর দিন সন্তানের মুখের ডাক না শুনে থাকতে!আর এখন মা-বাবা কে দেখে শিখেছি,নিজেদের মধ্যে যাই কিছুই থাকুক না কেন,সন্তানের জন্য আসলে আলাদা জায়গা থাকেই,কখনো আবার সেই জায়গা টাই নতুন সুযোগ দেয় আবার কখনো বছরের পর বছর ঐ জায়গাটা বিরান ই থেকে যায়। আর তাই,আমি সারাক্ষন চেষ্টা করি,এই দুই মেরুর মানুষ দু'জন কে সঙ্গ দিতে,তাদের একাকীত্বের ভাগ নিতে।
তিয়াসী এখনো কবিতা লেখে। মাঝে মাঝে মেইল করে,সুযোগ পেলে মুঠো ফোনে ম্যাসেজ করে। আজকাল ঘুরে ফিরে মাথায় তিয়াসীর লেখা কবিতার কিছু লাইন মাথায় ঘুরে,
'আমার সুখ খোঁজার বেলা কই?
যখন আপনাতেই ডুবে রই!
আমার একলা থাকার দুঃখ কই?
যখন এপাড়-ওপাড় থৈ থৈ!
এবার বেলা পড়ে এলো বলে
সঙ্গী তবে হোক সময়,
সুখে-দুঃখের সব জানালায়
চির বসন্তের বাতাস বয়।'





রবিবার, ২৫ মে, ২০১৪

শহর জুড়ে বৃষ্টি


আসি আসি করছে
অপেক্ষারাও জাল বুনছে
এরপর নানা সাজে সাজছে
এই নানা রঙের প্রকৃতির শহর।

এই শহরের,
একটা বৃষ্টি দিনের গল্প শোনাই,শুনবে?
শোন তবে,
শুরুটা ছিলো রোদে জ্বল জ্বল আলোর সকাল
এরপর এলো মেঘ
নিকষ হতে নিকষ কালো
আর বাতাসের দ্বিগুণ বেগ!

তার খানিকটা সময় পরেই
মেঘ আনন্দে উচ্ছ্বল হয়ে গেলো
আর বাতাস যেনো সূর্য হতে মুক্তি পেলো
শুরু হলো এক অনাবিল ছন্দের বৃষ্টি।

ব্যাস!এইটুকুই ছিল গল্প?

হুম,এটুকুই!

সে বৃষ্টি দিনে কোন বাঁধাহীন আনন্দের গল্প ছিলো না?
ছিলো না কোন,ধূসর সময়ের ভীড়ে বর্ণিল গল্প?

হুম,ছিলো বৈকি!
সে গল্পে সূদুরে লুকানো কোন উচ্ছ্বল কিশোরীর হাঁসি ছিলো
অথবা তরুনীর নূপুর পায়ের ছন্দ
বৃষ্টির গান,আর কবিতার ভাঁজে লুকানো কিছু মিষ্টি হাঁসি
আর এক রাশ জমানো ক্ষোভ,অভিমান আর ক্লান্তির বাষ্পীয় মুহুর্ত!

সে গল্পে আরো ছিলো,
কাঠখোট্টা অথবা ইট-পাথরের অফিসের জানালায়
দাঁড়ানো কোন ক্লান্ত অনুভূতি
ছিলো ফাইল হাতে ছুটে চলা মানুষটার
অনেক দিন আগে ব্যস্ততার ভীড়ে ফেলে আসা
কোন সুখস্মৃতি,
বাস্তবতার ভীড়ে হাসতে ভুলে যাওয়া মানুষ গুলোর
ফেলে আসা দুরন্ত শৈশব!

এই শহরের বৃষ্টির গল্প বড্ড রকমের বর্ণিল
নানা রকমের অনুভূতির ভিন্ন ছন্দ মিল
কেউ বৃষ্টি ছুঁয়ে মুগ্ধ,কেউ বা বৃষ্টির ছোঁয়ায় বিরক্ত!
বড্ড ব্যস্ত এই শহর,তার নিজের সাথেই
বৃষ্টি এখানে গল্প বুনে তাই,সবার অজান্তেই।








শনিবার, ২৪ মে, ২০১৪

অকাব্য হোক ইচ্ছে গুলো!


মানুষ তো হারতে হারতেও জিতে
আমি কি তবে মানুষ নই?
ভাবতেও অবাক লাগে,
এতোবার হেরে যাবার পরও
আমি কেমন করে টিকে রই!!


কেমন করে আজো,জলের ঢেউ এ
নিজের অস্তিত্ব খুঁজে পাই! 

এতো সময়ের গ্লানি ভুলে 
কেমন করে আমার দিন চলে যায়!
আমি কি তবে মানুষ নই?


আমার খুব মানুষ হতে ইচ্ছে করে
অনেকবার না হলেও খানিকটা হলেও
জিতে যেতে ইচ্ছে করে,
এতো এতো পথ হাঁটার পর
একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস নিতে ইচ্ছে করে!
একটু মানুষ হতে বড্ড ইচ্ছে করে!

আমার খুব হাসতে ইচ্ছে করে
নির্মল,সারল্যের হাঁসি
যে হাঁসি তে নেই কোন সংশয়,অভিমান,ক্লান্তি
ঠিক মানুষ গুলোর মতো!
খুব কাঁদতে ইচ্ছে করে
পাওয়ার আনন্দে,দেবার সুখে,সাজাবার তৃপ্তিতে
ঠিক মানুষ গুলোর মতো!

এতো কঠিন কেন,মানুষ হওয়া?
এতো কষ্ট কেন,মানুষ হয়ে বাঁচতে?
আমার যে খুব মানুষ হতে ইচ্ছে করে!
খুব মানুষ হয়ে বাঁচতে ইচ্ছে করে!


মঙ্গলবার, ৬ মে, ২০১৪

খেয়ালের ভীড়ে আলো-আঁধারীর গল্প


কাপের চা টা ফুরিয়েছে সেই কখন,কিন্তু আমি এখনো কাপ হাতে নিয়েই বসে আছি!ভাব খানা এমন যেনো কাপ ভর্তি চা আছে আর আমি খানিক বাদে বাদে কাপে চুমুক দিয়ে চা খাচ্ছি!কি অদ্ভুদ কাজ-কর্ম!
তবে আমার জন্য এসবই স্বাভাবিক। বলা হয় মানুষ নাকি বিচিত্র স্বভাবের প্রাণী,তাহলে কিছু অদ্ভুদ স্বভাব থাকাটাই তো স্বাভাবাকি। ইন্টারকমে কল আসার শব্দে আমার অদ্ভুদ কাজে বাধা পড়ল,কিছুক্ষণ লাল ফোন সেট টার দিকে তাকিয়ে রইলাম,বাজতে বাজতে এক সময় ওটা আগের মতো জড় পদার্থে পরিণত হল!আর আমি কাপ রেখে ফাইলটা টেবিলের উপর রেখে কেবিন থেকে বের হলাম।  
আমাকে দেখে আশফাক ভাই খুব ব্যস্ত ভঙ্গিতে বললেন,
-আরে তুমি কই ছিলে?সেই কখন থেকে ফোনে ডাকছি তোমাকে,কিন্তু ফোনই উঠাও না!ডকুমেন্টস গুলো রেডি করেছো?জলদি দাও,আজকের মধ্যে ফাইনাল পেপার রেডি করে বসকে দেখাতে না পারলে ১২টা বেজে যাবে!
আমি খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে আশফাক ভাইয়ের টেবিলের উপর এক পাশে রাখা টিস্যু বক্স থেকে একটা টিস্যু নিয়ে বললাম,
-কিন্তু ঐ ফাইল তো আমি আনিনি আশফাক ভাই!
-হোয়াট??আনো নাই মানে?রেডি করোনাই!হায় হায়,কি বলো?
-কি করবো বলেন?আপনি ৩দিন আগে আমারে ফাইলটা রেডি করতে দিয়েছেন ঠিকই!কিন্তু যতবার আমি ওই ফাইলটা হাতে নিয়েছি,কে যেনো আমার কানের কাছে এসে বলতেছিলো 'এই ফাইল ফালায় দে,ফালতু কাজ!চা খাও চা খাও!'
একটা নামকরা রিয়েল এস্টেট অর্গানাইজেশনের আইডি এর হেড হিসেবে আশফাক ভাই এর উচিত ছিলো এমন কথা শুনে হতভম্ব হয়ে কতক্ষন আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকা!এবং ধীরে ধীরে ক্ষেপে যেয়ে প্রচন্ড রাগী গলায় কিছু বলা!কিন্তু তিনি তেমন কিছুই করলেন না। ল্যাপির দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বললেন,
-বুঝলা কল্লোল,তোমারে চা খাইতে বলা কেউ টা আসলে আমি ই ছিলাম!আরে এইসব ভ্যাজাইল্লা কাজ তোমারে দেয়ার মানুষ এই পুরা অফিসে আমি ছাড়া আর কে হবে বলো?যাইহোক,আসছ যখন,চলো ক্যান্টিনে যাই,চা খেয়ে আসি! 
আমি হেসে বললাম,
-আপনার সঙ্গে চা খাইতে যাওয়া মানেই তো আজকে আরো ২টা ভ্যাজাইল্লা কাজের ফাইল নিজের টেবিলে দেখা!ধুর... আপনিই যান,আমি বরং যেয়ে আপনার ওই ফাইল কমপ্লিট করি,লাঞ্চের আগেই পেয়ে যাবেন। 
আশফাক ভাই ল্যাপি অফ করে,উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বললেন,
-ভাবের খ্যাতাপুড়ো মিয়া!তুমি যে কাম ঠিক টাইমে জমা দিবা আমারে সেইটা আমি না জানলেও আমার ঘাড়ে বসা ইবলিশও জানে!এখন চলো,চা খাইয়া আসি... জিন্দেগী তামা হইয়া গেলো,দেশে খাইটা ঐ বিদেশি গো প্রফিট দিতে দিতে! 
আমিও 'কি আর করা?'টাইপ ভাব নিয়ে আশফাক ভাইয়ের পিছু পিছু লিফটের দিকে আগালাম।

এক দৃষ্টিতে কেউ আমাকে অবজার্ভ করবে এই কাজটা আমার খুবই অপছন্দ!জীবনে আমার সাথে অপছন্দের কাজ গুলো যারা বেশি করতো তারা যত কাছের কেউ ই হোক না কেন,আমি খুব সযত্নে তাদের কাছ থেকে দূরত্ব বজায় রাখতাম। 
কিন্তু আফসোস,অভাগার কপাল পুড়লে একেবারেই পুড়ে,এবং ছারখার হয়ে পুড়ে!আর তাই আমার জন্য এমন কঠিন অপছন্দের স্বভাব ওয়ালী একজনকে সারা জীবনের জন্য পাশে থাকার পারমিশন আল্লাহ দিয়েছিলেন!! 
আমি যখনই অফিস থেকে বাসায় ফিরি,প্রায় ঘন্টা খানেক যাবত নিতু আমার দিকে এক দৃষ্টিতে,খুব শান্ত ভঙ্গিতে তাকিয়ে থাকবে!যেনো তার সামনে কোন ক্রিমিনাল হাঁটা-চলা করছে আর সে ইন্টারপোলের হেড হয়ে তাকে অবজার্ভ করছে! 
আমি অনেকবার ওকে বলেছি,'প্লিজ এভাবে আমার দিকে তাকিয়ে থাকবে না,খুব্বই অস্বস্তি লাগে আমার' শুনে সে আবারো একই ভঙ্গিতে তাকিয়ে থেকে বলতো, 
-অস্বস্তি লাগে কেন তোমার?কেউ তোমার দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতেই পারে!
-গভীর দৃষ্টি?!!এটাকে গভীর দৃষ্টি বলে!! 
-অবশ্যই!কেন?তুমি কখনো রবী-শরৎ বাবুর লেখায় গভীর দৃষ্টির সংজ্ঞা পড়োনি?
আমি জোর গলায় বলি,
-পড়বো না কেন?অবশ্যই পড়েছি,কিন্তু সেগুলো ছিলো ভালোবাসা বা অভিমানের আইমিন,অর্থপূর্ণ ভাষার কোন গভীর দৃষ্টি!বাট তোমারটা সেগুলোর কোন এক ক্যাটাগরিতেও পড়ে না!
নিতু মুখের ভাব আরো গম্ভীর করে,এবং পারলে চোখের দৃষ্টি দিয়ে আমাকে উড়িয়ে দিয়ে বলবে,
-তোমার গভীর দৃষ্টি সম্পর্কে জ্ঞানের লেভেল অনেক খারাপ!সেই জন্যই আমি রোজ এভাবে তাকাই,তাকাবো!আমি চাই আমার জামাইয়ের মাথায় এই সম্পর্কে সঠিক এবং বিশদ জ্ঞানের জন্ম হোক!  
আমি হাল ছেড়ে দেই!এই মেয়ের সাথে আসলে তর্ক করে লাভ নেই!নিতুর এই জাতীয় কথা শুনে একবার আশফাক ভাই গম্ভীর মুখে বলেছিলেন,
-বুঝলো কল্লোল,তোমার বউ 'কথা-দৃষ্টি'বিষয়ে ডাবল পিএইচডি করা!তাও আবার থিউরী বেসড না,কেস স্টাডি বেসড!সুতরাং তার সাথে তর্কে যেয়ে লাভ নাই,উল্টা তোমারেই আবার এই বিষয়ে ক্লাস ওয়ানে ভর্তি হইতে হতে পারে! 
আশফাক ভাইয়ের কথা বেশিরভাগ সময়ই আমার মনে ধরে,এটাই তেমনি একটা। আর তাই আমি এখন আর নিতুর এই 'গভীর দৃষ্টি'বিষয়ে মোটেও কথা বলি না,যতক্ষন খুশী সে তাকিয়ে থাকে,আমি আমার মতোই কাজ করতে থাকি। 
তবে আজ সেভাবে তাকিয়ে থাকতে থাকতে নিতু নিজে থেকেই বলল,
-তোমাদের অফিসে কি কোন সূস্থ-স্বাভাবিক মানুষ কাজ করে?
আমি স্বাভাবিক কন্ঠে ভাবে উত্তর দিলাম,
-নাহ! 
-তাহলে কারা কাজ করে? 
-করে কিছু আধ-পাগলা,রোবটিক কিছিমের লোকজন! 
-বিয়ের আগে তোমার উচিত ছিলো,সিভিতে এই কথাটা উল্লেখ করে দেয়া!তোমার জুনিয়রদের কে বলবে,তারা যেনো এই কাজটা করে। 
আমি ল্যাপির দিকে তাকিয়ে মাথা দোলাতে দোলাতে বললাম,
-নিতু,বর্ষাকাল আসলে বৃষ্টি হবে এটাই স্বাভাবিক!তাই বলে এখন এই স্বাভাবিক কাজের জন্য নিজেদের স্বাভাবিক কাজ রেখে অস্বাভাবিক ভাবে বউকে নিয়ে বৃষ্টিবিলাস করাটা কি সূস্থ মানুষের কাজ হতে পারে?তোমার রবী ঠাকুরও কিন্তু জীবনে এই কাজ করেনাই!  
নিতু আগের মতো ভঙ্গিতেই বলল,
-রবীঠাকুরের সময় মুঠোফোন ছিলো না,থাকলে সে অবশ্যই তার বউকে একটা ক্ষুদে বার্তা পাঠাতেন এমন সুন্দর বৃষ্টি দেখে! 
এবার আমি হো হো করে হাসতে থাকি! এই হচ্ছে নিতু! 
আমার আর নিতুর মাঝে এই একটা জায়গায় এসে বিশাল পার্থক্য কাজ করে। না হলে আমরা দু'জনেই বাহ্যিক দিক থেকে একই ধরনের মানুষ। সে নিজেও সারাদিন ব্যস্ত অফিস-সংসার নিয়ে,পরিবার-ভবিষত,বাস্তবতা-জীবন নিয়ে আমাদের দু'জনের অবস্থান-চিন্তাও প্রায় একই ধরনের কিন্তু সব কিছুর পরেও এই একটা জায়গায় এসে আমি নিতুর থেকে অনেক বেশি আলাদা হয়ে যাই!
আমি বুঝি না,নিতু কিভাবে পারে নিজের ভেতর এমন এক 'আবেগি' সত্ত্বাকে সব অবস্থায় ধারন করে রাখতে! কিভাবে পারে নিজের ভেতরে 'বাউন্ডুলে' সত্ত্বাটাকে খুব যত্নের সাথে লুকিয়ে রাখতে!বুঝি না আমি একদমই! 
আমাদের এই দু'বছরের সংসার জীবনে পারিবারিক,আর্থিক সহ অনেক দিক থেকে যথেষ্ট কষ্টকর,জটিল সময় আমরা পার করেছি,জীবনে বাস্তবতার কঠিন রূপের লড়াই করতে করতে যেখানে আমি মাঝে মাঝে ভুলেই যাই,যে আমি বেঁচে থাকা কোন মানুষ সেখানে নিতু সেই অবস্থাতেও পারে আকাশের মেঘের ভাষা পড়তে,রাতের পূর্ণিমার আলো দেখে মুগ্ধ হয়ে গুণ গুণ করতে,কিংবা ব্যস্ত সময়ে হাজারো কাজের তাড়া উপেক্ষা করে গাড়ি থেকে নেমে বেলী ফুলের মালা অথবা এক ডজন লাল চুড়ি কিনতে,খুব সামান্য খুশিতে হাসতে হাসতে কেঁদে ফেলতে!
অথচ নিতু সম্পর্কে বিয়ের আগে যখন আমি শুনেছিলাম,জেনেছিলাম যথেষ্ট বাস্তববাদী,আর গম্ভীর প্রকৃতির মেয়ে,জীবনে লড়াই করে চলতে অভ্যস্থ,সব অবস্থার সাথে নিজেকে মানিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে। নিতুর সাথে বিয়ে আগে কয়েক বার দেখা করেছিলাম যখন,তখন আমি ওকে হাসতে দেখেনি! কৌতুহলের বশে জিজ্ঞেস ও করেছিলাম,
-নিতু আপনি কি খুব কম হাসেন?
নিতু গম্ভীর মুখে বলেছিলো,
-নাহ,আমি হাঁসি তবে সব সময় না,কারণ আমি হাসলে আমাকে সুন্দর দেখায় না!মানুষের হাঁসি সব সময় সুন্দর হলেও সবাই কে হাসলে সুন্দর দেখায় না,আমি তেমনই একজন!  
আমি সেদিন যথেষ্ট অবাক হয়েছিলাম! কেউ এভাবে নিজের সম্পর্কে বলতে পারে আমার জানা ছিলো না,কিন্তু নিতুর ব্যাপারটা আলাদা। আর তাই তো ২বছরে এই মেয়ের সাথে থাকতে থাকতে আমি নিজেও যথেষ্ট অদ্ভুদ-স্বাভাবিক স্বভাবের মানুষ হয়েছি!মাঝে মাঝে ভেতরে ভেতরে নিতুর মতোই একটা বাউন্ডুলে স্বভাবের মানুষকে খোঁজার চেষ্টা করি!কিন্তু এই এতোদিনেও আমি নিতুকে একবারো বলতে পারিনি,
'তোমার নিজের সম্পর্কে ধারনাটা ভুল ছিলো,তোমাকে হাসলে আসলে অনেক সুন্দর লাগে,কেমন যেনো বাচ্চা মেয়ের মতো মায়াময় তোমার হাঁসি'। বলা হয়নি কখনো তবে মাঝে মাঝে একটা অদ্ভুদ খেয়াল কাজ করে ভেতরে!আমার কেন জানি মনে হয়,আমি একদিন নিতুকে হারিয়ে ফেলবো,হয়তো সে আমার সাথেই থাকবে তবে আমার থেকে অনেক দূরে...!!কেন মনে হয় জানিনা,তবে প্রায়ই মনে হয়!   

আশফাক ভাই একদিন অফিসে না আসা মানে,যথেষ্ট ঝামেলায় পড়া!উনি যেদিন না আসবেন,সেদিন সব কিছু ম্যানেজ করবেন বারী সাহেব!আর এই লোককে আমরা আড়ালে ডাকি 'গ্যাজর'!সারাক্ষন তিনি এটা-ওটা নিয়ে ঝামেলা করতেই থাকেন তাই। এক নাগারে অনেকক্ষন কাজ করে আমি ক্যালেন্ডারের দিকে তাকালাম। আজ ২৮শে মে!আশফাক ভাইয়ের 'নিরুদ্দেশ' দিবস। বছরের যে ক'দিন আশফাক ভাই গায়েব থাকেন তার মধ্যে এই দিনটা অন্যতম। কেন থাকেন,কোথায় থাকেন,কি করেন এই দিনে এসব নিয়ে এক সময় কিউরিসিটি থাকলেও এখন আর তা কাজ করে না। 
রাতে বাসায় ফিরে কফি খেতে খেতে ল্যাপিতে সোশ্যাল সাইট গুলোতে ঢুঁ দিচ্ছিলাম,নিতু এসে বলল,
-আজ তোমার আশফাক ভাই অফিসে যাননি?
আমি মাথা এপাশ-ওপাশ নাড়লাম। 
-আমি আজকে উনাকে দেখেছি। 
-কোথায়?
-বাংলা মোটরের মোড়ের ওভারব্রীজের উপরে। দাঁড়িয়েছিলেন একাই,এক দৃষ্টিতে শূন্যে তাকিয়ে ছিলেন,সাহিত্যকেন্দ্র থেকে বই নিয়ে ফেরার পথে দেখলাম। 
আমি কপাল কুঁচকে থেকে কিছুক্ষন পর বললাম,
-ওখানে কি করছিলো সে?!যাইহোক,আজকে তার নিরুদ্দেশ দিবস ছিলো,হয়তো তাই বাইরে বাইরে ঘুরছিলো!
খানিক সময় চুপ থেকে নিতু বলল,
-উনি এভাবে মাঝে মাঝে কেন ডুব দেন?কাজলকে খোঁজার জন্য?
আমিও কিছুক্ষন চুপ থেকে বললাম,
-হবে হয়তো!  
নিতু আর কিছু বলল না,আমিও না। বলতে পারলাম না হয়তো...! 

আজকের দিনটা আমার জন্য যথেষ্ট বিরক্তিকর!কাজ কাজ করতে করতে বার বার মনে হচ্ছিলো,
'বেঁচে থাকাটা এতো ঝামেলার কেন?কেউ কেন বুঝতে চায় না!'নিতুর কাছে কি আমি খুব বেশি কিছু এক্সপেক্ট করি?তারপরেও কেন ও এরকম করে!সামান্য কিছু ব্যাপারে মাঝে অনেক বেশি রিএক্ট করে,আবার কখনো দেখা যায় খুব কঠিন সময়েও অনেক ভালো বুঝে!'' 
বিরক্তি নিয়ে লাঞ্চ আওয়ারে ক্যান্টিনে এসে বসলাম। ভাবতে ভাবতে খাবার অর্ডার করতেও ভুলে গেছি,খানিক পর দেখি আশফাক ভাই দু'জনের জন্য লাঞ্চ নিয়ে এসে আমার পাশে বসলেন। 
-কি মিয়া?কই হারাইলা?আরে যেখানেই হারাও খাওয়ার কথা কি ভুললে চলবে?ইঞ্জিনিয়ার মানুষদের ইঞ্জিনটাই আসল বুঝলা?
আমি খানিকটা হাসার চেষ্টা করে বললাম,
-ঠিকই বলছেন,আমাদের আছে খালি ঐ ইঞ্জিনটাই!এছাড়া আর কিছু আছে বলে তো মানুষ ভাবে না!জীবনটা তো চলে গেলো এই ইঞ্জিনে তেল দিতে দিতেই!
-কি হইছে আজকে?নিতুর সাথে ঝগড়া?
-হুম,তাও খুবই সামান্য একটা ব্যাপার নিয়ে!
-হাহাহা... দম্পতিদের মধ্যে বেশির ভাগ ঝগড়াই হয় সামান্য ব্যাপার নিয়ে!আমি তো ঝগড়া করতাম সামান্য টুথপেষ্ট নিয়া!
আমি বিরস মুখে বললাম,
-কিন্তু নিতুর সমস্যা হলো মাঝে মাঝে সে খুবই অবুঝের মতো আচরন করে!তার মামাতো বোনের বিয়ে,এখন তার শখ হইছে একটা লাল জামদানী শাড়ি কিনবে!কিন্তু সে খুব ভালো করেই জানে আমার এইসব খরচ পছন্দ না,দরকার নাই শুধু শুধু কেন কিনবে?এই কথা বললাম কেন,তার জন্য রাত থেকে কোন কথাই সে বলতেছে না,একদম বরফের মতো আচরন করতেছে,যেনো আমি তাকে ইলেক্ট্রিক শক দিয়েছি,এমনকি ও বাসায় ফোন করে মামীকে বলছে,সে শুধু বিয়ের দিন যেয়ে চলে আসবে,১দিন আগে যাওয়ার প্ল্যান বাতিল! কোন মানে আছে এসবের?
-হুম!যদিও কমন সমস্যা,এমন টুকটাক হয় ই কিন্তু নিতু কি সব সময় শাড়ি-গয়না নিয়ে শখ করা মানুষ নাকি?
-নাহ,তা না।আর এটাও একটা সমস্যা বুঝলেন!সে সহজে কিছু চাইবে না,কেনার শখও করবে না,কিন্তু যদি একবার শখ করে তো হইছে সেটা না পেলে শোক দিবস পালন করা শুরু করে দিবে!এখন আমি পড়ছি জ্বালায়!
আশফাক ভাই সাথে সাথে কিছু বললেন না!আমিও কথা গুলো বলে কিছুটা হালকা বোধ করতে লাগলাম দেখে খাওয়ায় মনোযোগ দিলাম।
খানিক পর আশফাক ভাই বললেন,
-কল্লোল,আমার মনে হয় তোমার উচিত,আজ অফিস শেষে বাড়ি ফেরার সময় খুব সুন্দর দেখে একটা লাল জামদানী কিনে নিয়ে যাওয়া,আমাদের এদিকে তো দাম বেশি নিবে,তুমি হকার্সে দেখতে পারো।
আমি কিছুক্ষন চুপ করে থেকে বললাম,
-আশফাক ভাই,আমার এইসব পছন্দ না!বিরক্ত লাগে আমার,তারচেয়ে বরং ওকে টাকা দিয়ে দিবো,নিজের মতো কিনে নিবে।
আশফাক ভাই খুব গম্ভীর হয়ে বললেন,
-টাকা তো নিতুর কাছেও ছিলো,ও তো চাইলে নিজেরটা নিজেই কিনতে পারতো,কিন্তু ও তোমাকে কেন বলেছে বলতো?ও চায় শাড়িটা তুমি কিনে দাও!আর একবার ভাবতো,তুমি শাড়িটা নিয়ে যখন ওর সামনে যাবে ও কি পরিমাণ খুশী হবে!
আরে মিয়া,প্রিয় মানুষের খুশীর জন্য একটু নিজের স্বভাব বদলানো কি এমন কঠিন কাজ শুনি?একদিন ব্যতিক্রম হলে কিচ্ছু হয় না,বুঝলা? সময় চলে গেলে আর ফিরে আসে না,সময় থাকতে কাজে লাগাও,না হলে একদিন সময়ের সাথে সাথে মানুষকেও হারিয়ে ফেলতে পারো...!
শেষের কথা গুলো শুনে চমকে উঠলাম আমি!বুকের ভেতর আবারো সেই খেয়ালটা যেনো জেগে উঠলো!

বিয়ের অনুষ্ঠানের ঝামেলা শেষ করে ঢাকায় ফিরে এসে জানলাম,আশফাক ভাই কিছুদিন যাবত অসূস্থ,অফিসে এসেও ছুটি নিয়ে চলে গেছেন একদিন!আমি অফিস শেষ করে উনার বাসায় যেয়ে দেখলাম,জ্বর ভালো ভাবেই বাঁধিয়েছেন!উনার বোন গেছে এক আত্নীয়ের বাড়ি। ডাক্তার দেখিয়ে কিছু টেস্টের ঝামেলা শেষ করে উনাকে মেডিসিন খাইয়ে বাসায় রেখে ফিরতে ফিরতে অনেক রাত হয়ে গেলো!
হালকা কিছু মুখে দিয়ে শোয়ার জন্য প্রস্তুতি নিতে নিতে বললাম,
-আশফাক ভাইয়ের জন্য মাঝে মাঝে খুব কষ্ট লাগে!এভাবে একলা কতদিন থাকা যায়!
নিতু খুব হালকা ভাবেই বলল,
-বিয়ে করিয়ে দিলেই পারো।
আমি একটা নিঃশ্বাস ফেলে বললাম,
-সে চেষ্টা কি আর কেউ করেনি?কিন্তু না করলে কি করা!
-উনি কি আর কোন দিন ই বিয়ে করবেন না বলেছেন!আজব কথা!
আমি আর কিছু বললাম না। মাথার কাছের জানালাটা খুলে পর্দা টেনে দিতে দিতে নিতু বলল,
-একটা কথা জিজ্ঞেস করি?
-হুম,করো।
-আশফাক ভাই মানুষটা কি শুরু থেকেই এমন ছিলেন?নাকি পরে বদলেছেন?
আমি খানিকটা ভেবে বললাম,
-আমি উনাকে চিনি ৪ বছর ধরে,যতটুকু জানি,শুরুতে হয়তো এমন ছিলেন না!কিন্তু ঐ এক্সিডেন্টের পর এই ক'বছরে অনেক অনেক বদলে গেছেন তিনি এটুকু বলতে পারি!
নিতু চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে খানিকটা আপন মনেই বলতে লাগল,
-আল্লাহ মানুষের জীবন কত ভাবে বদলে দেন!হয়তো আজ আশফাক ভাই মানুষটাকে যেমন দেখছি ক'বছর আগেও হয়তো তেমন ছিলেন না,কাজল ভাবিকে হয়তো তিনি অনেক ভালোবাসতেন কিন্তু ভাবি তা বুঝলেও বিশ্বাস করতে পারতো না!অথবা ভাবি জানতেন এবং অনেক ভালোবাসতেন বলেই হয়তো আজ আশফাক ভাই পারছেন একা একা থাকতে,নিজেকে বদলাতে!কিন্তু আমার এই ব্যাপারটা কেন জানি বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে না,মেনে নিতে পারি না আমি!
আমি একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম,
-কোন ব্যাপারটা?!
-এই যে,উনি মাত্র দেড় বছর আইমিন আশফাক ভাইয়ের ভাষায়, ৯৪৫দিনের সংসার জীবনের গল্প নিয়ে গত ৩বছর সময় পার করছেন,এমনকি বাকী জীবন ও পার করার চিন্তা করছেন!কাজল ভাবি উনাকে যেমন দেখতে চাইতেন ঠিক তেমন হওয়ার চেষ্টা করছেন,একি সম্ভব?মানুষ তো পারে না,পারে না তো মানুষ থাকতে,মানুষ অনেক স্বার্থপর হয়,সুখের লোভে মানুষ অনেক কিছু বেমালুম ভুলে যায়,আর তাই স্মৃতির তাড়া নিয়ে মানুষ বেঁচে থাকতে চায় না।
আমি কিছু বলতে চেয়েও পারলাম না,নিতুর কথা ঠিক,মানুষ এভাবে থাকতে পারে না,থাকতে চায়ও না। নিতু আবার বলে উঠলো,
-আচ্ছা,যদি আশফাক ভাই থাকতে পারেন,তাহলে কেন আমার বাবা থাকতে পারলো না,বলতো?!
কথাটা শুনে আমি কিছুটা চমকালাম!খানিকটা অসহায়ের মতো নিতুর মুখের দিকে তাকালাম!বেচারীর চোখে তখন জল থৈ থৈ করছে!আর সেই সাথে রাজ্যের অভিমান! অনেকটা আপন মনেই বলতে লাগল,
-কাজল ভাবি তো আশফাক ভাইয়ের জন্য কোন সন্তান ও রেখে যাননি,হুট করে একদিন রোড এক্সিডেন্টে চলে গেছেন,আর আমার মা?আমার মা তো আমার বাবার জন্য আমাদের ২ভাই-বোন কে রেখে গিয়েছিলেন,দীর্ঘ ১৪বছর আমার মা বাবা কে,তার সংসারকে প্রচন্ড ভাবে ভালোবেসেছিলেন,কিন্ত তারপরেও কিভাবে পেরেছিলো আমার বাবা মা যাবার ২মাসের মাথায় আবারো বিয়ে করতে?! ২টা মাসও সময় লাগেনি বাবার সব কিছু মাটি চাপা দিতে!নতুন বউ নিয়ে আমাদের ২ভাই-বোনকে হোষ্টেল,আত্নীয়দের কাছে দিয়ে আলাদা সংসার শুরু করতে! আমার না বিশ্বাস করতে অনেক কষ্ট হয়,আর তাই বুঝি আশফাক ভাইয়ের কথা শুনলে আমার রাগও হয় খুব! ''বলতে বলতে কন্ঠ রুদ্ধ হয়ে আসে!
আমি কিছু বলতে পারলাম না,চুপ করে থাকলাম। নিতু কাঁদছে। আমি উঠে এসে আলতো করে ওর হাত দু'টো চেপে ধরলাম। নিতু কেঁদেই চলল!
আমার আর নিতুর ভাগ্য অনেকটা একই। একদম ছোট বেলায় আমি বাবা হারিয়েছি,আর কিশোরী বয়সে নিতু হারিয়েছে মা। আমার মা আমাকে দাদীর কাছে রেখে চলে গেছেন আর নিতুর বাবা নিতুকে ওর খালা মানে আমার মেঝ চাচীর কাছে রেখে চলে গেছেন। বাবাকে খুব ভালোবাসতো নিতু। ছোট বেলায় সব থেকেও হারানোর মতো দিন কাটানোর কারণেই হয়তো, আমাদের দু'জনের জীবনেই ভালোবাসা,মজবুত বন্ধনের প্রতি বিশ্বাস অনেক কম ছিলো!ছোট থেকেই আমাদের মধ্যে সংসার সম্পর্কে এক রকমের নেগেটিভ ধারনা কাজ করতো,আর আল্লাহরই কি ইচ্ছে,আমাদের দু'জনের মাঝেই সেই বন্ধন তৈরীর সুযোগ করে দিলেন। কত বছর পেরিয়েছে এর মাঝে,কিন্তু কৈশরে জমা হওয়া সে রাগ-অভিমান থেকে বলা যায় আমরা কেউ ই বেরিয়ে আসতে পারিনি! তবুও,আশফাক ভাইয়ের জীবনটা দেখলে অবাক লাগে!
এক সময়ের প্রচন্ড অহংকারী,রাগী,খেয়ালি মানুষটা আজ কতো বদলে গেছেন!কাজল ভাবি ছিলেন অসম্ভব শান্ত,সংসারী আর ধার্মিক মানুষ,বিয়ের পর খুব কষ্ট হতো বেচারীর এডজাস্ট করতে। কিন্তু কেন জানি তিনি ছোট বেলায় বাবা-মা হারা এই আশফাক ভাইকে অসম্ভব ভালোবাসতেন। আর তাই হয়তো আজ তার চলে যাবার পর আশফাক পুরোদমেই নিজেকে বদলে ফেলেছেন বলা যায়,শুধু মাঝে মাঝে হাসতে হাসতে কেঁদে ফেলেন,আর কখনো সব কিছু ফেলে নিরুদ্দেশ হয়ে যান!

আমার আজকাল কেন জানি মনে হয়,নিতু আমাকে অনেক বেশি ভালোবাসে!এতো ভালোবাসার মাঝে থাকার অভ্যেস আমার নেই!বরং এতো মায়ার টান আমাকে বিরক্ত করে,মনে হয় এই মায়ার মোহে পড়লে আর রেহাই নেই,একদম চুরমার হয়ে যেতে হবে।
আশফাক ভাই সুস্থ্য হয়ে অফিস জয়েন করেছেন,আজকাল তাই অফিসটাই আমার ভালো লাগে!কাজ করি,কাজের মাঝে ডুবে থাকি,আর বাড়ি ফিরে নিতুর মায়াভরা মুখটা দেখলেই বুকের ভেতর ঝড় উঠে! নাহ,সুখ সইতে পারাটাও অনেক কষ্টকর!
এরই মধ্যে একদিন খবর এলো নিতুর বাবা খুব অসূস্থ!খবরটা শুনে ক'দিন নিতু খুব একটা প্রতিক্রিয়া দেখালো না,শেষ পর্যন্ত আমিই জোর করে ওকে নিয়ে সিলেটে গেলাম। অনেক বছর পর বাবার মুখটা দেখে নিতুর ভেতরের সব রাগ-অভিমান গুলো যেনো এক ঝাটকায় ভেঙ্গে পড়লো! বাপ-মেয়ের সেই কান্নার দৃশ্য দেখে সত্যিই হিংসে হচ্ছিলো!
২দিনের মাথায় এক ভোরে চলে গেলেন নিতুর বাবা। আমি ফিরে এলাম নিতুকে নিয়ে। সব কিছু কেমন যেনো বদলে গেছে মনে হচ্ছিলো!নিতু একদমই চুপ হয়ে গিয়েছিলো। ফেরার পথে বাসে বসে আমার কাঁধে হেলান দিয়ে হঠাত নিতু আমার হাত চেপে বলল,
-শোন,আমি কি তোমাকে খুব যন্ত্রণা দেই?
প্রশ্নটা শুনে অবাক হয়ে বললাম,
-এটা কেমন কথা?!অবশ্যই না।
নিতু ছলছল চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বলল,
-তুমি খুব ভালো একটা মানুষ,আর দুনিয়াতে ভালো মানুষদের জন্য কষ্ট বেশি!তুমি পারবে আমার দেয়া কষ্ট সহ্য করতে?আমি একদিন তোমাকে অনেক কষ্ট দিবো! তারপরেও তুমি আমাকে মনে রেখো,না হয় খানিকটাই মনে রাখলে,তবুও মনে রেখো আমাকে!প্লিজ!
আমি সাথে সাথে কিছু বলতে পারলাম না,বুকের ভেতর পুরনো খেয়ালটা আবারো ঝড় তুললো! নিতুর হাতটা আরো শক্ত করে ধরে বললাম,
-কষ্ট দিবে তুমি?তাহলে তো কষ্ট তুমিই আবার পাবে!তাই না?এসব ভেবো না,এভাবেও বলোও না প্লিজ!জীবনে কষ্ট কম পাইনি আমি,আর কষ্টের ভয় দেখিও না!
নিতু কিছু বলল না আর,শুধু ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল! কোন ফাঁকে যেনো আমার চোখ দু'টোও ভিজে উঠলো!

৫বছর পর,

আমার এখন মাঝে মাঝে মনে হয়,নিতু অসম্ভব পাজি একটা মেয়ে ছিলো,ওর আমাকে কষ্ট দেয়া ছাড়া আর কোন কাজ ছিলো না। ভালোবাসতো না ছাই,খালি যন্ত্রণাই আমাকে দিতো এখনো দেয়!না হলে এমন ফুটফুটে একটা পরীকে আমার কাছে রেখে কেউ চলে যায়?
নিতু ঠিকই ওর কথা রেখেছিলো,আর তাই যাবার আগে অনেক বড় কষ্ট আমাকে দিয়ে গিয়েছিলো। আমাদের পরীটার জন্মের চার মাস ধরা পড়ল নিতুর ব্রেন টিউমার,ডাক্তার প্রথমে বলেছিলেন মিডল স্টেজে আছে,কিন্তু মাস ছ'য়েকের মধ্যে অবস্থার আরো অবনতি ঘটার পর আমি নিশ্চিত হলাম,আমার সেই খেয়ালটা সত্যি হতে চলেছে!নিতুকে আমি সত্যিই হারিয়ে ফেলবো!
পাজি মেয়েটা হসপিটালের বেডে শুয়ে আমাকে বলতো,
-যাবার আগে একটা বিয়ে খেয়ে যেতে চাই,পরীর তো বিয়ের সময় হয়নি,তাই তোমাকেই আরেকটা বিয়ে দিয়ে যাই কি বল?পরে তো করবাই,মাঝখানে না হয় আমিই একটু দেখে যাই!
-বাজে কথা বলবা না একদম!
-আরে?বাজে কথা কিসের?ইশশ...কি সাধু পুরুষ আমার!যেনো সে বিয়ে করবে না আর!একা একা কিভাবে থাকবে?কে খেয়াল রাখবে তোমার?পরীকে কে দেখবে?করো না প্লিজ,আমি না হয় একটু দেখে যাই,এত বছর আমার সাথে থেকে তোমার পছন্দের কেমন উন্নতি হয়েছে!
আমার চোখ ফেটে কান্না চলে আসে!এই মেয়েটা এমন কেন?খালি কষ্ট দেয় আমাকে!না হয় আমি মানুষটা না হয় ওর একদম মনের মতো ছিলাম না,কিন্তু তাই বলে কি আমাকে এভাবে কষ্ট দিবে?
আমার চুপ করে থাকা দেখে নিতু হাসতো!হাসতে ওর খুব কষ্ট হতো,কিন্তু তবুও আমাকে দেখলেই হাসতো!আমি অভিমান করে বলতাম,
-হাসো কেন?মায়া বাড়াও না?
-হুম,যাতে করে তুমি আমাকে ভুলে না যাও!
-হাসবা না,হাসলে তোমাকে সুন্দর লাগে,আর সেটা দেখে আমার আরো বেশি কষ্ট লাগে!
নিতু তবুও হাসতো,কখনো ছলছল চোখে,কখনো রাজ্যের সব ভালোবাসা নিয়ে। তারপর একদিন ভোরে চলে গেলো।
নিতুকে কবর দিয়ে আসার পর আমার মনে হয়েছিলো,আমার তো অনেক কথা বলার ছিলো নিতুকে! অনেক কথা...
আমি তো কিছুই বলতে পারলাম না!! কিছুই আর বলা হলো না আমার! শুধু একরাশ শূণ্যতার মাঝে নিজেকে হারিয়ে ফেললাম,নিতুকে হারিয়ে ফেললাম! সেই থেকে আমার অজস্র না বলা কথা গুলো নিয়ে আমি ঘুরছি।
পরী কে নিয়ে আমার দুনিয়ায় মাঝে মাঝে আশফাক ভাই আসেন,পরী তাকে ডাকে বড় বাবা বলে!ও যখন 'বড় বাবা' বলে তার দিকে দৌড়ে যায় খুশীতে আশফাক ভাইয়ের চোখে পানি চলে আসে। ছুটির দিনে আমি আর আশফাক ভাই পরীকে নিয়ে বেড়াতে যাই,পরী খেলে,হাসে আর আমরা দু'জন তাকিয়ে তাকিয়ে দেখি,কখনো লুকিয়ে চোখের পানি মুছি।
শত আঁধার ছাপিয়েও আমরা একটু আলোর মাঝেই বেঁচে থাকার চেষ্টা করি।