জনপ্রিয় পোস্টসমূহ

বৃহস্পতিবার, ৭ নভেম্বর, ২০১৩

মায়ায় জড়ানো অনুভূতি গুলো...


প্রচন্ড ক্লান্তি যেনো চোখে এসে ভর করেছেন,কোনভাবেই চোখ মেলতে পারছেন না রোকেয়া!কিন্তু তার খুব ইচ্ছে করছে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা প্রিয় মুখ গুলোর দিকে একটা বার চোখ খুলে তাকাতে। তিনি জানেন,চোখ মেলে একটিবার তাকালেই প্রচন্ড ভাবে কাঁদতে থাকা এই মানুষ গুলোর মুখে হাসি ফুঁটে উঠবে,তাদের ভীতিগ্রস্থ মনে আশার আলো জ্বলে উঠবে কিন্তু তিনি পারছেন না,চোখ মেলতে। রোকেয়ার কেন জানি মনে হচ্ছে,এখন সকাল বেলা,কেমন হিম হিম লাগছে তার কাছে,কিন্তু সকালে তো অনেক ব্যস্ত থাকেন তিনি!কতো কাজ তার সকালে,ভাবতে ভাবতে মনের চোখে ভেসে উঠলো তার প্রিয় সংসারে কাটানো রোজকার দিন গুলো...

সকালের এই সময়টা বড্ড বেশিই ব্যস্ত বলা চলে। চারপাশ জুড়ে যেনো শুধু ছুটাছুটি আর শোরগোল,সবাই খুব ব্যস্ত। ৪নং রোডের একদম শেষ মাথার এই বাড়িটাতেও এই সময় সবাই প্রচন্ড ব্যস্ত থাকে। সবচেয়ে বেশি ছুটোছুটিতে থাকেন রোকেয়া,যিনি এই বাড়ির গিন্নী। যতক্ষন পর্যন্ত না তিনি হাঁক-ডাক শুরু করবেন ততোক্ষন পর্যন্ত কেউই রুম থেকে বের হবে না,না ছেলে-মেয়ে না তাদের বাবা। রোকেয়ার মনে হয়,সে এই মানুষ গুলোর জন্য ঘড়ি হিসেবেও কাজ করে!
যতোক্ষন সে ডাক না দিবে,কেউ ঘুম থেকে উঠবে না,যতক্ষন তাড়া না দিবে,কেউ রেডি হয়ে খেতে আসবে না,আবার যতোক্ষন ফোন করে সময় মনে করিয়ে না দিবে কেউ সময় মতো বাসায়ও ফিরবে না!
মাঝে মাঝে অসম্ভব বিরক্ত হলেও এক ধরনের অভ্যস্থতাও কাজ করে। রোজকার মতো তাই আজো,নাশতা রেডি করে টেবিলে রাখতে রাখতে একবার করে সবার রুমের সামনে যেয়ে ডেকে আসলেন। ছেলের রুমের সামনে হয়ে আসার সময় দেখলেন,হাতে ব্রাশ নিয়ে ছেলেটা বিছানায় বসে ঘুমে ঢুলছে!ভাব দেখে মনে হচ্ছে যেকোন মূহুর্তে সে বিছানায় আবার শুয়ে পড়বে! রোকেয়ার ইচ্ছে হলো,যেয়ে কানটা ধরে বসা থেকে উঠে দাঁড় করাতে। কিন্তু সদ্য ভার্সিটিতে ভর্তি হওয়া ছেলেকে কি আর কান ধরে বকা দেয়া যায়?তাই দরজায় দাঁড়িয়ে কড়া গলায় বললেন,
-হুম,এভাবেই ঝিঁমাতে থাক ঘুমে,বেলা বাজে ৮টা ক্লাসে যাওয়ার জন্য রেডি হওয়া বাদ দিয়ে সে ঘুমে ঢুলছে!এমনই কর,বুঝলি?
মায়ের গলার আওয়াজ পেয়ে ছেলে রাহী হাই হাই তুলতে মুখে ব্রাশ পুরলো।
-আম্মু আমি যাচ্ছি,আসসালামু আলাইকুম।
মেয়ের আওয়াজ পেয়ে দ্রুত রান্না ঘর থেকে বের হলেন রোকেয়া,দৌড়ে এসে জিজ্ঞেস করলেন,
-কিরে তুই যাচ্ছিস,পানির বোতল নিয়েছিস?
রুবা উল্টো দৌড় দিয়ে টেবিলের কাছে এসে দ্রুত ব্যাগে পানির বোতল ঢুকালো। রোজই সে এই কাজটা করে,রোকেয়া খেয়াল না করলে সে পানি না নিয়েই বের হয়ে যায়,রুবা বাইরের পানি খেতে পারে না,যেদিন বাসা থেকে পানি নিয়ে যাবে না,সেদিন দরকার হলে সারাদিন সে পানি না খেয়ে থাকবে,তবুও বাইরের পানি খাবে না।
রুবা চলে গেলে,রাহীকে আরেকবার ডাক দিয়ে রোকেয়া ইসলাম নিজের রুমে গেলেন। রহমান সাহেবের তখনো পেপার পড়া শেষ হয়নি,তিনি প্রচুর পড়ুয়া মানুষ। পেপার পড়ার বেলাতেও তার একাধিক পেপার পড়তে হয়,বাসায় একটা পরেন,অফিসে যেতে যেতে একটা পড়েন,আবার অফিসে যেয়ে একটা পড়েন। হকার সকালে পেপার দিয়ে যাবার পর সেটাকে এনে বেড রুমে রাখাটা যেমন রোকেয়ার কাজ,তেমনি সব কিছু রেডি করে এসে হাত থেকে পেপারটা নিয়ে ভাঁজ করে রাখাটাও তারই কাজ,যতক্ষন তিনি এটা না করবেন রহমান সাহেবের মনে পড়বে না,যে তাকে অফিসে যেতে হবে!

এমন সব বেখবর,অগোছালো আর ভুলো মনের মানুষদের মাঝে রোকেয়রা মতো একজন কর্মঠ,দায়িত্বশীলা,চতুর্দর্শী মানুষ যে বছরের পর বছর কিভাবে আছেন তা কোনভাবেই কাজের বুয়া মতির মায়ের মাথায় আসে না! বেচারী প্রায়ই একা একা বিড়বিড় করেন,
-কি সব আজব লোকজন এরা!বাপ-ছেলের একই কাপড় চাইরদিন পড়লেও হুঁশ হয় না ধুইতে দেয়ার,মাইয়া একজন এই মোটা মোটা বই হাতে নিয়া ঘুরতেছে অথচ জামা পড়ছে এক তো সালোয়ার আরেক!চুলার পাড়ে চা নিতে আইসা ওড়নায় আগুন লাইগা যায় আর সে চুপচাপ চা খাইতে খাইতে বাইর হইয়া যাইতেছে! বাপ না হয় এমন মানলাম,কিন্তু তাই বইলা,পোলা-মাইয়া গুলা একটাও মায়ের মতোন হইবো না?হইলো কিছু?! মা টা সারাদিন তাগো পিছনে দৌড়ায় দেইখা,না হইলে খবরই আছিলো!
রুবার মাঝে মাঝে বায়োক্যামস্ট্রির বই পড়তে পড়তে,কিংবা দূর থেকে তাকিয়ে অথবা বিকেল বেলা রিকশায় ফিরতে ফিরতে মাথায় খুব ঘুরে,তার মা আসলে কতোটা গুণবতী,সহনশীলা মানুষ!কতোটা ভালোবাসা থাকলে তিনি পারছেন ওদের এমন যন্ত্রণা গুলো হাসিমুখে সহ্য করে নিতে,এসবের সাথে অভ্যস্থ হয়ে দিন কাটাতে। অথচ সে তো মনে হয়,এই মা এর মেয়ে হিসেবে তার এক ভাগ গুনও পায়নি!
কিন্তু রুবা যতোটা ভাবে তার এক ভাগও রাহীর মাথায় ঢুকে না!তবে ঢুকুক না ঢুকুক,মা কে ছাড়া তার একদিনও চলবে না,দিন শেষে বাড়ি ফিরে যতক্ষন না মা ভাত মাখিয়ে এনে সামনে রাখবেন,ততক্ষন পর্যন্ত খাওয়ার কথা তার মনে হবে না! কোন কিছু করতে বা আনতে ভুলে গেলে সোজা এক বাক্যে নির্দোষী সে,'আম্মু তো আমাকে মনে করিয়ে দেয়নি!আমার কি দোষ?!'
রহমান সাহেব মাঝে মাঝে অফিসে কলিগদের সাথে গল্প করতে গেলে খেয়াল করেন,অফিসের সবাই থাকে খুব সেলডিপেন্ডেন্ট মানুষ হিসেবে ভাবে,সব কিছুতে বেশ নিয়ম মেনে চলেন,অথচ রহমান সাহেবের মনে হয়,তার এই গোছালো জীবন,যা কিছু অর্জন তার পেছনে তেইশ বছর আগেও একমাত্র তারই অবদান বেশি ছিলো,কিন্তু বিয়ের পর এই ২৩বছরের বিবাহিত জীবনে যা কিছু তিনি করেছেন তার পেছনে নিজের থেকেও বেশি অবদান রোকেয়ার। আজ তার ভালো চাকরী,যা কিছু এসেট,সততা আর নিষ্ঠার সম্মান সব কিছুর পেছনেই অর্ধেকের বেশি অবদান রেখেছেন রোকেয়া।
রহমান সাহেব চাপা স্বভাবের মানুষ,অনুভূতি প্রকাশের ক্ষমতা তার খুবই কম,আর তাই কোনদিন মুখে তার পরিবারের কারো প্রশংসা করেন না,করতে পারেন না,কিন্তু যতোবারই জীবনে প্রাপ্তির আনন্দ পেয়েছেন,মন ভরে রোকেয়ার জন্য দোয়া করেছেন। যদিও কোনদিনই তিনি বুঝাতে বা বলতে পারেননি তার জীবনে রোকেয়া আল্লাহর দেয়া কত বড় নিয়ামত।
ছেলে-মেয়ে দুটোও তার মতোই হয়েছে,সারাক্ষন মা মা করবে কিন্তু মায়ের সামনে আসলে মুখের হাসি-মায়া সব উড়ে যায়!আবার মা একটু দৃষ্টির আড়াল হলেই অস্থির হয়ে যায়! কিন্তু মায়ের সামনে কোন কথা নাই,কোন অনুভূতির প্রকাশ নেই।

রোকেয়ার মনে হলো তার আবারো দম বন্ধ হয়ে আসছে যেনো!কিন্তু চোখ খোলার খুব চেষ্টা করছেন তিনি। সবাইকে খুব দেখতে ইচ্ছে করছে,সেই যে রান্নাঘরে হঠাত করে মাথা ঘুরে পরে গেলেন,তারপর থেকে তো আর চোখই খুলতে পারছেন না তিনি। রোকেয়া নিজের স্বাস্থ্যের ব্যাপারে কখনোই উদাসীন ছিলেন না,তার মাথায় একটা চিন্তাই ঘুরতো,
'আমি অসূস্থ হয়ে পড়লে আমার সংসারের মানুষ গুলোকে দেখবে কে?ওদের খেয়াল রাখবে কে?'
কিন্তু হঠাত করে যে কি হলো বুঝতে পারেননি!বাসায় ও সেই সময় কেউ ছিলো না। চূলোর তরকারী নাড়তে নাড়তে হঠাত করেই মাথা ঘুরে পড়ে গেলেন। প্রায় অনেক সময় পড়েছিলেন,বুয়া ছিলো ছাদে,সে এসে দেখে দ্রুত পাশের বাসার ভাবিকে ডেকে এনে সবাইকে খবর দেয়।
রোকেয়ার মনে হলো,তার মাথার কাছে তার নানী বসে আছেন,সেই অনেক বছর আগের মতো। তাকে বলছেন,
-হ্যাঁরে বুবু,এভাবে শুয়ে থাকলে হবে?মেয়ে মানুষের এতো শুয়ে থাকা চলে না,কতো কাজ করতে হয়। ঐযে দেখ,বাইরে তোর ছেলে-মেয়ে দুটো কিভাবে কাঁদছে,আর তোর জামাই টা... আহা,বেচারা তো তোর শোকে কাহিল হয়ে যাচ্ছে!
রোকেয়ার খুব ইচ্ছে করছে,সেই ছেলে বেলার মতো করে নানীর কোলে মাথা রেখে ঘুমোতে!কিন্তু কেন জানি অনেক শব্দ কানে বাজছে! মনে হচ্ছে,রুবা ডাকছে,
-আম্মু...কি হলো তোমার?ও আম্মু...
রোকেয়ার কপাল কুঁচকে এলো!আরেকবার চেষ্টা করলেন চোখ দুটো খোলার কিন্তু নাহ!পারছেন না এবারও। কেউ মনে হচ্ছে চোখের পাতার উপর বরফ দিয়ে রেখেছে!
সেই তখন থেকে রুবা কেঁদেই যাচ্ছে! লায়লা আন্টি স্বান্তনা দেয়ার চেষ্টা করছেন,একটু দূরে চেয়ারে বসে ফুঁপিয়ে কাঁদছে রাহী,আর বাবা সেই তখন থেকে মুখ কালো করে আসেন।
বুয়া এসে রুবাকে বলল,
'এতো কান্দে না,ভাবির কিছু হয় নাই,বেশি খাঁটা-খাঁটনি করে তো এই জন্য মনে কয়,মাথা ঘুইরা পইড়া গেছে! ডা তো কয়া গেলোই,শুনো নাই?'
রুবার কান্না দ্বিগুণ বেগে বাড়লো যেনো! রুবার বারবার মনে হতে লাগল,আম্মু ওদের জন্য কষ্ট করতে করতে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন! সারাটা দিন-রাত শুধু ওদের জন্য ব্যয় করতেন,নিজের দিকে একটুও খেয়াল করেননি!আর ওরাও কেউ আম্মুর দিকে খেয়াল রাখেনি,যদি রাখতো তাহলে আজ আর আম্মুর এই অবস্থা হতো না!
ধীরে ধীরে রোকেয়া চোখ মেললেন,সবাই তার পাশে ছুটে আসল,রোকেয়া রুবা কে ইশারায় কাছে ডেকে খুব আস্তে আস্তে বললেন,
-কয়টা বাজে এখন?
-৪টা বাজে আম্মু। তুমি এখন কেমন ফিল করছো?
রোকেয়া আগের মতোই বললেন,
-ভালো,তোরা দুপুরে খেয়েছিস?
রুবা কিছু বললো না। রহমান সাহেব বললেন,
-তুমি চুপ করে রেস্ট নাও,কথা বলো না।
রোকেয়া তার দিকে তাকিয়ে বললেন,
-কয়টা বাজে এখন?তুমিও খাওনি,ছেলে-মেয়ে গুলোও খায়নি!জলদি খেয়ে নাও,আমি ঠিক আছি।
লায়লা আন্টি হেসে বললেন,
-আপনার এই অবস্থা দেখে কি কারো খাওয়া হবে?কি ভয়টাই না পেয়েছে সবাই!ঠিক আছে,আমি যাই এখন পরে আবার আসব,ওকে?
রোকেয়া একবার সবার দিকে তাকালেন,হাতের ইশারায় সবাই কে আবারো খেতে যেতে বললেন। রুবা দ্রুত টেবিলে খাবার সাজিয়ে,মায়ের জন্য প্লেটে খাবার নিয়ে রুমে আসল।
-আম্মু,একটু উঠে বসো,খাবে এখন।
-তুই খেয়েছিস?
-না তুমি খাবে,তারপর খাবো,আমি খাইয়ে দেই?
রোকেয়া কিছু না বলে উঠে বসলেন।
রুবা মাকে খাইয়ে দিচ্ছে,রাহী পানির জগ-গ্লাস নিয়ে পাশে বসে আছে। দরজায় এসে দাঁড়ালেন রহমান সাহেব। রোকেয়া তার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসি দিলেন,তারপর ছেলে-মেয়ের দিকে তাকালেন,মনে মনে বললেন,
'মাঝে মাঝে এমন অসূস্থ হওয়াটা খারাপ না আসলে!যদি এভাবে প্রিয়জনদের ভালোবাসা পাওয়া যায় তবে...!' :)



সোমবার, ৪ নভেম্বর, ২০১৩

প্রশ্নটা প্রশ্নই থেকে যায়!


আবার দেখা হবে কোন দিন
আবার কথা হবে কখনো,
মাঝখানে জমা রয়ে যাবে
অনেক গুলো বছরের গল্প!

হয়তো কোন একদিন কথা হবে
হয়তো কোন এক তপ্ত দুপুরে
আবারো দেখা হবে,
তখন একই প্রশ্নই হয়তো ঘুরে ফিরে আসবে
আজ এতোদিন পর কে বেশি বদলেছে মনে হয়?
সময়?নাকি আমি?

তারপর আবারো কোন একদিন দেখা হয়ে যাবে
কোন এক মধ্য দুপুরে
হয়তো লেকের পাড়ের ব্রিজটিতে
অথবা শপিং মলের পাশে সেই গাছগুলোর নীচে!
ঘুরে ফিরে আবারো সেই একই প্রশ্নই থাকবে,
কে বেশি বদলে গেছে? সময় নাকি আমি?

উত্তর খুঁজতে খুঁজতেই সময় ফুরিয়ে যাবে
যাবার বেলায় তখন শুধু একটু হেসে বলা হবে,
'প্রশ্নটা তোলা রইল,আবার কখনো দেখা হলে
উত্তরটা দিবো,আজ বরং আসি'

তারপর আবার হয়তো কোনদিন দেখা হবে
কোন এক দ্বিপ্রহরে
ব্যস্ত সড়কের পাশে ক্লান্ত সময় ছুঁয়ে,
সেদিনও প্রশ্নটা একই রকম থাকবে,
কে বেশি বদলে যায়?সময় নাকি আমি?

সেদিন হয়তো সময় আর ফুরোবে না
তবুও উত্তরটা পাওয়া হবে না,
শুধু বলা হবে,
'উত্তরটা খুঁজে পেয়েছিলাম,কিন্তু দীর্ঘ সময়ের ভীড়ে
হারিয়ে ফেলেছি!প্রশ্নটা না হয় প্রশ্নই থেকে যাক!

উত্তর খোঁজার দায় থেকে পালাতে পালাতে
আজ অনেক প্রশ্নই এভাবে ঘুরে ফিরে,
ঠিক সেখানটায়,একইভাবে সামনে এসে দাঁড়ায়
যেখানটায় প্রশ্ন গুলো জন্মেছিলো!

নিরুত্তর আমি দিনের পর দিন
এভাবেই পালিয়ে বাঁচি,
এভাবেই দিন-মাস আর বছর কেটে যায়
প্রশ্ন গুলো প্রশ্নই থেকে যায়!





রবিবার, ২০ অক্টোবর, ২০১৩

এইতো আমি...!

জানি দেয়ালের ওপারেও আছে আকাশ
তবে দেয়াল ভাঙ্গার নেই অবকাশ,
চার কিংবা চতুর দেয়াল
থাকি নিয়ে আপন খেয়াল!
ভালো মন্দের হিসেব কষতেও 
থাকে দ্বিধাদ্বন্দ্ব!  
তাই তো আমার দেয়াল জুড়ে
বাজে নানান ছন্দ! 

দিন বদলায় মাস চলে যায় বছর ফুরায় কালে
আমার থাকা এই আমাতেই আমার আপন তালে,
শীত-গ্রীষ্ম ঢেউ খেলেনা ব্যস্ত জোয়ার ভেঙ্গে
শরত-বর্ষা ঘুম ভাঙ্গায় না থাকলেও রাত জেগে! 
এইতো আমার এইতো আমি এই আমাতেই সারা
আমার জন্য আমায় গড়তে কাটিয়ে দেই বেলা! 

জানি আলোর ওপাশেই আছে আঁধার 
নিকষ কালো বেশে,
তবু আমার মাঝে নেই বিকার 
থাকি আলো ঝলমল রেশে! 
বাঁচতে শেখার এই খেলাতে 
প্রতিক্ষণেই যেনো মরছি!
মরতে মরতেই কোন ভাবে বেঁচে থাকাটা শিখছি। 

আয়না ছাড়াই দিব্যি দেখি আমার সাজানো মুখটি
আয়না দেখলেই পালিয়ে বাঁচি অথবা মারি ঘাপটি!






সোমবার, ১৪ অক্টোবর, ২০১৩

ইনডাইরেক্ট সাইন!


প্রচন্ড বেগে বালিশটা কেঁপে উঠলো যেনো!সাদিয়া একবার চেষ্টা করলো চোখ দু'টো খোলার কিন্তু পারলো না। এই মূহুর্তে চোখ মেলে তাকানো টা দুনিয়ার সবচেয়ে কঠিন কাজ সাদিয়ার জন্য। চোখ বন্ধ রেখেই হাতড়ে বের করলো মোবাইলটা,তারপর 'ওকে' বাটনে ক্লিক করে আবারো বালিশের পাশে রেখে দিলো। সাদিয়ার মনে হলো,ঘুমের মাঝেই সে দিব্যি দেখতে পাচ্ছে,''রোজকার মতো আজকেও ফজরের আযানের পর ও এলার্ম বন্ধ করে মোবাইলটা রাখার কিছুক্ষন পরেই আম্মু রুমে আসলো,তারপর লাইট জ্বালিয়ে ফ্যান বন্ধ করে দিয়ে চলে গেলেন,তার কিছুক্ষন পর মসজিদে যাবার আগে আব্বু দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ওকে ডাকলেন ক'বার। ব্যাস,আস্তে আস্তে ঘুমটা কমে আসলে সে উঠে বসল বিছানায়।'' খানিকক্ষন পর আবারো এলার্মের শব্দ শুনতে পেলো সাদিয়া!প্রচন্ড বিরক্তির সাথে ভ্রু কুঁচকালো,আবার এলার্ম বাজে কেন এখন?সে তো একবারই এলার্ম দিয়েছে!উফ...! এলার্ম বেজেই চলছে একটানা। সাদিয়া চোখ বন্ধ রেখেই মোবাইলটা হাতে নিলো,কোন রকমে চোখটা একটু খুলে মোবাইলের দিকে তাকালো সে,এ কি?!! এলার্ম তো ওর মোবাইলে বাজছে না,তাহলে কার মোবাইলে বাজছে?! ঘাড় ঘুরিয়ে পাশে তাকাতেই ছোট-খাট একটা ধাক্কা খেলো! আস্তে আস্তে সবকিছু পরিস্কার হলো ওর কাছে,লাফ দিয়ে বিছানায় উঠে বসল সে,নিজেকে নিজের একটা কষে চড় লাগাতে ইচ্ছে করলো!
'হায়রে সাদিয়া!কি রকম মানুষ তুই?বিয়ের প্রথম দিন কেউ এভাবে মরার মতো ঘুমায়?!মানুষ নাকি বিয়ের পর নতুন জায়গায় যেয়ে টেনশনে ঠিক মতো ঘুমাতেই পারে না,আর তুই একজন!!যেখানেই কাৎ তো সেখানেই রাত!!'
একটা নিঃশ্বাস ফেলে খুব ধীরে ধীরে বিছানা থেকে নামতে যেয়ে হঠাত মনে হলো,সে এতো আস্তে আস্তে কেন নামছে?তার পাশের জন কি উঠবে না? ঘুমের জন্য তো কাল রাতে ঠিক মতো কেউ কারো সাথে কথাও বলেনি!মানুষটা যে তার মতোই ঘুম পাগল বুঝা গেছে কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, এতো দেখি তার থেকেও এক ডিগ্রী উপরে আছে,সে তো তবুও চোখ খুলে এলার্ম বন্ধ করে ঘুমায় কিন্তু এই জনাব তো এলার্মটাও বন্ধ করতে পারে না! সাদিয়া এবার বেশ শব্দ করেই বিছানা থেকে নামলো,লাইট জ্বালালো তারপর ব্যাগ খুঁজে ব্রাশ-পেস্ট বের করে লাইট জ্বালিয়ে রেখেই ওয়াশরুমে ঢুকলো।

জাহিদ প্রথমে একবার কপাল কুঁচকালো,তারপর খুব বিরক্তি নিয়ে বিড়বিড় করলো,
'কোন আক্কেল ছাড়া মানুষ এভাবে লাইট টা জ্বালালো?!ধুর... নিশ্চয়ই,এই কাজ আম্মা করছে!উফরে আম্মা...কেন যে আরামের ঘুমটা নষ্ট করো!' বলতে বলতে হঠাত মনে হলো,সে ফ্ল্যাশব্যাকে দেখতে পাচ্ছে, আম্মা তার মাথায় পাগড়ি পড়িয়ে দেবার সময় কাঁদছেন,তা দেখে সে জিজ্ঞেস করছে,
-আম্মা,আজকে তো তোমার ছেলের বিয়ে,আজকে কাঁদতেছো কেন?
আম্মা চোখ মুছতে মুছতে বললেন,
-খুশীতে কাঁদছিরে বাবা!আজ মনটা অনেক খুশী আমার!
পাশে দাঁড়ানো ছোট দুলাভাই ফিসফিস করে বললেন,
-শালা সাহেব,আম্মা এই জন্য কাঁদতেছে,এতোদিন আপনি তার ছেলে ছিলেন,আজকে থেকে আপনার শ্বাশুড়িও আপনাকে তার ছেলে দাবী করবে তাই!
জাহিদ কনুই দিয়ে দুলাভাইয়ের ভুঁড়িতে একটা গুঁতো দিয়ে বলল,
-ফরেন মিনিস্ট্রিতে চাকরী করতে করতে পুরাই কূটনা হয়ে গেছেন!খালি কূটনামী মার্কা চিন্তা!হুহ।
জাহিদ দৃশ্য গুলো মনে পড়তেই এক লাফে বিছানায় উঠে বসল। চোখ দুটো বড় বড় করে চারপাশ দেখতে লাগল...
হায় আল্লাহ,কি মানুষ সে!!বিয়ের প্রথম দিন সে মরার মতো এক ঘুমে রাত পার করে ফেলেছে!অবশ্য খুব আশ্চর্য্য হবার কিছু নেই,কারণ দোষ তো তার একার না! সে তো সারাদিনের ধকল সহ্য করে হলেও ঘুম ঘুম চোখে কথা বলার প্রিপারেশন রেখেছিলো,কিন্তু সাদিয়াই তো ২মি কথা বলে হাই তুলতে তুলতে বলেছিলো,
-আচ্ছা,সব কথা কি আমরা আজকেই বলে ফেলবো?পরে বলা যাবে না?মানে রাত তো অনেক হলো,ঘুম বাদ দিয়ে আজকে বক বক না করলেও তো হয়!
জাহিদ কথাটা শুনে আনন্দে আটখানা হয়েও আবার গম্ভীর হওয়ার চেষ্টা করে বলল,
-হুম,কথায় যুক্তি আছে!অন্যরা কি করে সেটা তো বিষয় না,আমাদের উচিত আমাদের জন্য যেটা ভালো হয় সেটাই করা!
সাদিয়া আবারো হাই তুলতে তুলতে মাথা দুলিয়ে সায় দিয়ে ঘুমাতে যাবার জন্য তৈরী হয়ে যায়। তা দেখে জাহিদও ততোক্ষন চেপে রাখা ঘুম ঘুম ভাবটাকে প্রকাশ করে হাই তোলা শুরু করেছিলো!

জাহিদ মাথা চুলকাতে চুলকাতে বুঝতে পারল লাইট সাদিয়া জ্বেলেছে,এবং সে যেনো উঠে তাই জ্বালিয়ে রেখে বাথরুমে গেছে।
বাহ!কি সুন্দর ইনডাইরেক্ট ওর্ডার!
সাদিয়া বের হয়ে দেখলো জাহিদ বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। সাদিয়া একবার ভাবলো 'জাহিদ সাহেব' বলে ডাকবে,কিন্তু ভালো লাগলো না,শুধু একটু শব্দ করে কাঁশলো। জাহিদও কান খাঁড়া করে কাঁশি শুনলো,সে বুঝতে পারলো সাদিয়া বলতে চাচ্ছে,আপনি এখন অজু করার জন্য বাথরুমে যেতে পারেন। এটাও এক ধরণের ইনডাইরেক্ট সাইন!মেয়েটা দেখছি ভালোই ইনডাইরেক্টলি কাজ করতে পারে!
জাহিদ রেডি হয়ে রুম থেকে বের হওয়ার আগে একবার শব্দ করে দরজাটা লাগিয়ে গেলো! সাদিয়া কপাল কুঁচকালো!
এই ইন্ডাইরেক্ট সাইনের মানে কি?দরজাটা লাগাতে বলল?নাকি সে কোন কথা বলেনি দেখে একটু বিরক্তি প্রকাশ করলো!
এমন সময় সাদিয়ার শ্বাশুড়ি দরজায় নক করলেন,
-সাদিয়া উঠেছো?
দ্রুত জায়নামাজ ভাঁজ করে উঠে দাঁড়ালো সাদিয়া।
-জ্বী আম্মা আসেন,আমার নামাজ পড়া শেষ।
-মাশাআল্লাহ,এইতো ভালো মেয়ে,কি সুন্দর, বিয়ের পর প্রথম দিনটাই শুরু করলে আল্লাহকে স্মরণ করে। অনেক ভালো লাগল দেখে গো মা,আল্লাহ তোমাদের জীবনটাকে অনেক সুন্দর করে দিন।
সাদিয়ার মনটা খুব খুশী হয়ে গেলো,নতুন জীবনের প্রথম দিনটা সে এক মায়ের দোয়া নিয়ে শুরু করছে। তার ইচ্ছে করলো আম্মুকে একবার ফোন করতে,করলে নিশ্চয়ই তিনিও এমন দোয়া করবেন,কে জানে কাল সারারাত বেচারী ঘুমিয়েছে কি না! সাদিয়ার শ্বাশুড়ি আরো কিছুক্ষন ওর সাথে গল্প করে নিজের ঘরে চলে গেলেন।
সাদিয়া মোবাইলটা মাত্র হাতে নিয়েছে তখনই জাহিদের কন্ঠ শুনতে পেলো!কপালটা কুঁচকে মোবাইলটা রেখে দিলো! সাত সকালে যদি দেখে বউ মোবাইলে কথা বলছে,ডেফিনেটলি মনে মনে বিরক্ত হবে।

দুপুরে দিকে সাদিয়ার আম্মুরা সবাই আসলেন,তারা দুপুরে খেয়ে বিকেলে সাদিয়া-জাহিদকে নিয়ে যাবেন। সাদিয়া সকাল থেকেই শ্বাশুড়ির সাথে আঠার মতো লেগে আছে,উনি যা যা করতে বলছেন সে পাখীর মতো উড়ে যেয়ে তা ই করছে। মনে মনে আবার হাসছে,
'বাহ,সাদিয়া,তুই কতো কাজ করছিস আজকে,অথচ বাবার বাড়ি যখন ছিলি,আম্মু কাজের জন্য ডাকলেই বই নিয়ে বসতি!আর এখন?হিহিহি, গুড জব...!'
জাহিদ নাশতার টেবিলে বসে একবার ভাবলো,সাদিয়াকে জিজ্ঞেস করবে,
-সাদিয়া,তুমি কি নাশতা করেছো?না করলে বসতে পারো আমার সাথে!
কিন্তু একটু পরেই মত পাল্টালো!নাহ,প্রথম দিনেই সবার সামনে এভাবে জিজ্ঞেস করা যায় না!সবাই ক্ষেপাবে!
নাশতা সামনে নিয়ে ওর এমন চিন্তা করা দেখে মেঝ বোন মুখ টিপে হাসল। তারপর একটু জোরেই বলল,
-জাহিদ,তুই নিশ্চিন্ত মনে নাশতা করতে পারিস,তোর বউ কে খাওয়ানোর দায়িত্ব আমার,ওকে?
পাশ থেকে রুহি মানে বড় ভাগ্নিটা ফট করে বলল,
-মামা মনে হচ্ছে,মামী কে ছাড়া নাশতা করতে চাচ্ছে না!কই গো নানি?বউ কি শুধু আপনার সাথেই থাকবে,মামার কি হবে তাহলে?
হাসির রোল পড়ে গেলো ডাইনিং টেবিলে!জাহিদ কটমট করে রুহির দিকে তাকালো। রুহি তখন রান্নাঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে সাদিয়া কে ডাকলো কয়েকবার,কিন্তু সাদিয়া বের হলো না,সে পরে আম্মা-আপুদের সাথে খাবে তাই!
জাহিদ মনে মনে সুধালো,'যার জন্য করি চুরি সেই বলে চোর' এত্তগুলো টিটকারী হজম করলাম,আর ম্যাডাম বলে পরে খাবো! তারমানে এটাও একরকম ইনডাইরেক্ট সাইন!!সে বুঝালো,যে তার জাহিদের সাথে খাওয়ার ইচ্ছে নাই! হুহ
সাদিয়ার আম্মু দুপুরে খাওয়া শেষ করে ওর শ্বাশুড়িকে জিজ্ঞেস করলেন,
-তা আপা,কেমন দেখলেন বউ কে?আপনার মনের মতো মনে হয়?না হলে বলেন,দু'দিন যে আমার কাছে থাকবে ভালো করে সব শিখিয়ে দিবো!হাহাহা
সাদিয়ার শ্বাশুড়ি হেসে বললেন,
-নাহ আপা,এমন মেয়ে আবার মনের মতো বউ হবে না?মাশাআল্লাহ,যথেষ্ট বুদ্ধিমতি মেয়ে,আর ভুল-ত্রুটি তো একটু হবেই,তবে সেটা নিয়ে আপনি আর ভাববেন না সেগুলো আমিই শুধরে নিবো,এখন তো সে আমার সংসারের বউ তাই না?  সাদিয়া ততক্ষনে সব কিছু গুছিয়ে নিজের রুমে দৌড়ে আসল। এসেই জলদি ব্যাগ গোছাতে লাগল,জাহিদ মোবাইল নেয়ার জন্য রুমে এসে দেখল সাদিয়া ব্যাগ গোছাচ্ছে! সে তখন দ্রুত বের হয়ে দুলাভাইকে এক পাশে ডেকে আনলো,
-দুলাভাই,আজকে কি আমাকেও ওদের বাড়ি যেতে হবে?আমি না গেলে হয় না?
-কাদের বাড়ি?
-আরে ওদের বাড়ি!
-ওদের ওদের করছো কেন?বলো তোমার শ্বশুড় বাড়ী,এতো খুঁজে একখান বউ এনে দিলাম,আর তুমি মিয়া বউ এর নাম নিতে লজ্জা পাও!!হায়রে!
জাহিদ কপট রাগ দেখিয়ে বলল,
-দুলাভাই পয়েন্টে আসেন,আমি না গেলে কি সমস্যা হবে?আমি যেয়ে ওখানে কি করবো?
-আরে মিয়া এটা নিয়ম,তোমাকে তো যেতেই হবে,আর তোমার শ্বশুড় বাড়ি তো তুমিই বেড়াবা সেখানে আর কে থাকবে? কেন,তোমার আপুর বিয়ের পর আমি এসে ছিলাম না তোমাদের বাসায়,ভুলে গেছো?
জাহিদ মুখ ভার করে বলল,
-আপনার সাথে আপুর কবে বিয়ে হয়েছিলো সেটাই মনে নাই,আর আপনি আছেন কি হয়েছিলো সেটা নিয়ে!! ধুর,দুলাভাই,এটা কি নিয়ম?আমি যাইতে পারবো না,আপনি ওদেরকে বুঝান!
-তোমার কি মাথা খারাপ হয়েছে?দুনিয়ার সবাই যায়,আর তুমি যেতে পারবে না?আম্মা শুনলে দিবে একটা ধোলাই!যাও,যেয়ে ব্যাগ গোছাও।
জাহিদ মুখটা বাংলার পাঁচ করে নিজের ঘরে আসল,সে দেখে সাদিয়া একদম রেডি হয়ে বসে আছে। মেজাজটা আরেকটু খারাপ হলো,বাবার বাড়ি যাবার জন্য ম্যাডাম একদম সবার আগে রেডি হয়েগেছে!আর জামাইর যে যেতে ইচ্ছে করছে না সে খবর একদমই নাই! রুম থেকে আবারো বের হয়ে গেলো সে। বের হতে হতে ভাবল,সাদিয়া রেডি হয়ে বসেছিলো,তার মানে সে কি কোন ইনডাইরেক্ট সাইন দিচ্ছিলো?যে আমি রেডী,তুমিও রেডি হও টাইপের কিছু!!
সাদিয়া এভাবে এসেই আবার জাহিদের চলে যাওয়া দেখে কিছুটা অবাক হলো!তারপর ওর মনে পড়লো,জাহিদের ব্যাগ তো গোছানো হয়নি! দ্রুত বের হয়ে জাহিদের ভাগ্নিটাকে ডেকে আনলো,ওকে বলল,জাহিদ কে জিজ্ঞেস করে তার জিনিসপত্র কোথায় কি আছে,কি কি নেয়া লাগবে তা একটু গুছিয়ে দেবার জন্য।
জাহিদ সোফায় বসে ছিলো,ভাগ্নি রুহি যখন এসে ওকে ডেকে রুমে নিয়ে আসল,এবং কি কি লাগবে জিজ্ঞেস করলো,তখন জাহিদ বুঝলো সাদিয়াই ওকে পাঠিয়েছে। তার মানে এটাও এক রকম ইনডাইরেক্ট সাইন!!!

গাড়িতে বসে সাদিয়া খেয়াল করলো জাহিদ সেই তখন থেকে মোবাইলে ডুব মেরে আছে! এপাশে যে ওর শ্যালক সুহাইল আর শ্যালিকা সুবাতা ওর কাজ দেখে মুখ টিপে হাসছে,আর সাদিয়া কে ক্ষেপাচ্ছে সে ব্যাপারে জাহিদ একদমই বেখেয়াল!
কি এতো করছে সে মোবাইলে?সাদিয়ার একবার ইচ্ছে করলো জিজ্ঞেস করতে,কিন্তু করলো না,শুধু একবার জোরে কাশি দিলো! জাহিদের ভাষায় সেটা হলো,ইনডাইরেক্ট সাইন!
কিন্তু জাহিদের কোন রেসপন্স নেই!ব্যাপার কি? সাদিয়া যে ইনডাইরেক্টলি ওকে সাইন দিচ্ছে সেটা কি জনাব বুঝতে পারছে না?! সাদিয়ার রাগ আরো বেড়ে গেলো! কোন রকম কথা ছাড়াই সে টান দিয়ে জাহিদের হাত থেকে মোবাইলটা নিয়ে গেলো,কোন দিকে না তাকিয়ে সেটাকে নিজের ব্যাগে ভরে মুখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে রাখল।
জাহিদের কিছুটা সময় লাগল,ব্যাপারটা বুঝতে! যখন বুঝতে পারল,তখন কিছুক্ষন অবাক হয়ে সাদিয়ার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল,তারপর আস্তে করে বলল,
-আমাকে আগে থেকে ইনডাইরেক্টলি সাইন দিলেই হতো!আমি মোবাইল টা রেখে দিতাম,তাহলে তো আর এতো রাগ দেখতে হতো না!
সাদিয়া রাগী মুখে ওর দিকে চোখ ফিরিয়ে বলল,
-ইনডাইরেক্ট সাইন বুঝতে হলে ডিরেক্ট এটেনশন থাকা চাই,কিন্তু কারো তো আমার দিকে কোন খেয়ালই নাই!সমস্ত মনোযোগ ঐ মোবাইলে!এজন্য এবার ডিরেক্ট সাইন দিলাম,ওকে?
জাহিদ মাথা দুলিয়ে বলল,
-বুঝতে পেরেছি,ভুলটা আসলে আমারই ছিলো! এনিওয়ে,এখন থেকে কি তাহলে আমাকে ডিরেকটলিই সাইন দেয়া হবে,কোন ইনডাইরেক্ট সাইন দেয়া হবে না আর?
সাদিয়ার খুব হাসি পেলো!কিন্তু সে হাসি চেপে বলল,
-ইনডারেক্টলি তো আর কারো মনের ভাব বুঝা যায় না,তাই কি আর করা,ডিরেক্টলিই এখন থেকে সাইন দেয়া হবে।
জাহিদ এবার মিটমিট করে হেসে সাদিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
-ধন্যবাদ,ইনডাইরেক্ট থেকে ডাইরেক্ট একশ্যানে আসার জন্য!এখন থেকে আমিও ডিরেক্টলি সাইন দিবো ওকে?
সাদিয়া হাসতে হাসতে মাথা দোলালো। তা দেখে জাহিদ কিছু বলতে চাচ্ছিলো,কিন্তু তার আগেই সুবাতা বলে উঠলো,
-কি ব্যাপার দুলাভাই?কি নিয়ে এতো হাসাহাসি!আপনি কি কোন জোকস বলেছেন নাকি আপু কে?কি জোকস বললেন,একটু শুনি আমরাও!
জাহিদ খুক খুক করে কেশে হাসতে হাসতে বলল,
-জোকস এখনো বলিনি,তবে অনেক কিছু বলার জন্য ইনডাইরেক্ট থেকে ডাইরেক্ট গ্রিন সিগন্যাল পেয়েছি,তুমি অবশ্য সেটা বুঝবে না,বুঝলে?
সাদিয়া আরো জোরে হেসে ফেলল,বোনের হাসি দেখে সুবাতাও বোকার মতো হাসতে লাগল! শুধু জাহিদ মুচকি হাসি দিয়ে দিয়ে সাদিয়ার দিকে তাকিয়ে রইল।

[উৎসর্গঃ সাদিয়া কে। সাদিয়া প্রায়ই একটানা বকবক শেষে আমাকে বলবে,'তোকে আমি এতক্ষন এতো কথা কেন বললাম,বলতো?এই জন্য বললাম,যাতে তুই আমার এক্সপিরিয়েন্স থেকে গল্প লেখার থিম খুঁজে পাস,বুঝলি?' আমিও মনে মনে বলি,বুঝলাম,ইহা-উহা সবই বুঝলাম!!]







রবিবার, ১৩ অক্টোবর, ২০১৩

অনুভূতি গুলো সুখকর...


''আপু...চিনি কোথায় রেখেছো??পাচ্ছিনা!'' কোন জবাব আসলো না,নবনী এবার ডায়নিং রুম থেকে কিচেনে গেলো,সব গুলো তাক তন্ন তন্ন করে খুঁজতে লাগল,কিন্তু চিনির দেখা পাচ্ছে না!ওদিকে চূলোয় বসানো চা'এর পানি শুকিয়ে যাচ্ছে! আবারো চেঁচিয়ে উঠলো,
-'ছোটা'পু...চিনির বয়ামটা কোথায় রেখেছো?পাচ্ছি না তো!' কিন্তু এবারো কোন সাড়া নেই!আশ্চর্য হলো একটু নবনী!!! রুমের ভেতর করছে টা কি মেয়েটা? চা'এর চূলো বন্ধ করে বোনের রুমে গেলো,গিয়ে দেখে আপু মুখে ফেসপ্যাক মেখে বই পড়ছে,কানে আবার হেডফোন লাগানো!একসাথে কতো কাজ করছে সে,বাহ! টান দিয়ে কান থেকে হেডফোনটা খুলে ফেলল,হৃদিতা স্বাভাবিক ভাবে নবনীতার দিকে তাকালো,
-চিনি কোন বয়ামে নেই,ওটা প্যাকেটে আছে,প্যাকেট কেটে বয়ামে ভরতে হবে,কাল শেষ হয়ে গেছে বয়ামেরটা বুঝলি?এখন যা,চা বানা,আর আমাকেও এক মগ দিস,এবং অবশ্যই চিনি এক চামুচের বেশি না!
এক নাগারে কথা গুলো বলে,আবারো কানে হেড ফোন ঢুকালো হৃদিতা। নবনীতা বলল,
-তুমি যে দিন দিন সাইকো হয়ে যাচ্ছো সেটা কি জানো?
হৃদিতা উপর-নিচে মাথা দুলালো,তার মানে সে জানে!
-তোমার পাবনাতে চলে যাওয়া উচিত,এই বাসায় থেকে তুমি আমাকেও পাগল বানিয়ে ফেলবা!
-এক্সকিউজ মি,সাইকো আর পাগল এক না!তুই ইদানিং বেশি বক বক শিখেছিস!কিন্তু বেশির ভাগই ভুল বকিস!এখন তুই সামনে থেকে যা,তোর সাথে বেশি কথা বললে,আমার এতো কষ্ট করে মুখে লাগানো ফেস প্যাক নষ্ট হয়ে যাবে!
নবনীর ইচ্ছে করছে,বোনের গলাটা চেপে ধরতে!রাগে গজ গজ করতে করতে রুম থেকে বেরিয়ে গেলো। একটু পরে এক মগ চা এনে বোনের সামনে রেখে বলল,
-চা রেখে গেলাম,কারো ফেস প্যাকের ঢং শেষ হলে যেনো খেয়ে নেয়!পরে যদি বলে ঠান্ডা হয়ে গেছে,তখন আমি এই চা তার মাথায় ঢেলে দিবো!
হৃদিতা মুচকি হেসে চা এর মগটা হাতে নিয়ে বলল,
-শুকরিয়াহ,আল্লাহ তোর মনের আশা পূরণ করুন,আমীন।
এবার নবনীর মুখেও হাসি ফুঁটে উঠলো,কিছু না বলে চুপচাপ দু'বোন চা খেতে লাগল। হঠাত কি মনে করে যেনো,নবনী আলমারী থেকে দুটো এলবাম নামালো,বড় বোন দীপান্বিতা,আর মেঝ বোন অর্পিতার বিয়ের এলবাম। ছবি গুলো দেখতে দেখতে বলল,
-বড়া'পুর বিয়ের সময় আমি অনেক ছোট ছিলাম,তাই না আপু?
-হুম,তোর বয়স কতো হবে?ছয় কি সাত!আমি মাত্র তখন ক্লাস ফাইভে পড়তাম,তোকে দেখে দুলাভাইয়ের বন্ধুরা আফসোসে শেষ,বলে'দোস্ত,তোর শালীরা এতো ছোট কেন?!!'হাহাহা।
নবনী হাসতে হাসতে বলল,
-ইশ,কেন যে আমি তখন এতো ছোট ছিলাম! আর মেঝ'পুর বিয়েটা তো কেমন হুট করেই হয়ে গেলো!তাও আবার আমার বৃত্তি পরীক্ষার সময়!কি কপাল আমার,দুই দু'টা বোনের নিয়ে হলো,অথচ একটাতেও কোন মজা করতে পারলাম না!
-নিজের বিয়ের সময় করিস,আর সামনে তো ভাইয়াদের বিয়ে আছেই!
নবনী কপাল কুঁচকে বলল,
-কেন?তোর বিয়ের সময় কি ঘুমাবো!আমি তো সব মজা তোর বিয়েতেই করবো।
হৃদিতা মুচকি হেসে বলল,
-পারবি না!দেখিস...
নবনীতা শুধু মুখ বাঁকালো,কিছু বলতে নিয়েও আর বললো না। মনটা কেমন জানি হয়ে গেলো। কিছুক্ষন চুপ থেকে মগটা নিয়ে আম্মুর রুমে চলে আসল,কেন জানি হৃদি'পুর সামনে থাকতে খুব অস্বস্তি লাগছিলো!

নিলয় প্রচন্ড বিরক্ত হয়ে আলমারী ওলট-পালট করতে থাকা বড় ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে চেঁচালো,
-ভাইয়া,কি শুরু করলে তুমি?তোমার কাপড় আমার উপর কেন এসে পড়ছে?
-কথা কম বল,আজকে আমার ইম্পোর্টেন্ট প্রেজেন্টেশন,অথচ একটা শার্টও আয়রন করা দেখছি না!!
-তো সে জন্য আলমারীর বাকী কাপড় গুলো কি দোষ করছে?আগে থেকে কিছু খেয়াল করে না,এখন এসে টানাটানি!
নাবিল প্রচন্ড রাগান্বিত গলায় হাঁক দিলো,'এই নবনী,জলদি এ ঘরে আয়তো'
নবনীতা রান্না ঘরে বুয়ার সাথে সকালের নাশতা তৈরী করছিলো। রুটি বানানোর বেলুন হাতে নিয়েই দৌড়ে আসল ভাইয়ের রুমে,
-কি হয়েছে ভাইয়া?
-আমার একটা শার্টও আয়রন করা নাই কেন?
নবনীতা অবাক হলো,এই প্রশ্ন ভাইয়া ওকে করছে কেন?!!
-সেটার আমি কি জানি?আমি কি তোমাদের কারো কাপড় গোছাই?আর তোমার শার্ট কি আমি বাইরে থেকে আয়রন করিয়ে আনবো?তোমারই তো করার কথা!
-তোরা দুই বোন বাসায় সারাদিন করিস কি বলতো?খালি গল্প আর টিভি দেখা!ভাইদের কি দরকার না দরকার তার কোন খবরই নাই!যা আম্মু কে ডাক দে!
নবনীতা মুখ কালো করে রুম থেকে বেরিয়ে গেলো!সাত সকালে শুধু শুধুই ঝাড়ি শুনতে হলো!টেবিলে নাশতা দিয়ে ভাইয়াদেরকে ডাকতে যেয়ে দেখলো,হৃদিতা ততোক্ষনে ভাইয়ার একটা শার্ট ইস্ত্রি করে রুমে রেখে গেছে। নবনীতা হাঁফ ছাড়লো!বিড়বিড় করতে করতে নিজের রুমে আসলো
'আল্লাহ আপুর উপর রহম করুক!না হলে আজকে আমার কপালে ছিলো আরো কতোগুলো ঝাড়ি! যেই একেক জন অলস ভাই আমার,ওদের যদি হৃদি'পুর মতো একটা বোন না থাকতো তাহলে খবরই ছিলো!ভাইয়াদের মোবাইলে চার্জ দেয়া থেকে শুরু করে জুতো পর্যন্ত সব দিকে খেয়াল রাখে আপু,একদিন যদি ও বাসায় না থাকে ভাইয়াদের তান্ডবে কি যে অবস্থা হয় বাসার!অবশ্য আমি না থাকলেও ওদের সমস্যা!হৃদি'পুর রান্না নাকি মজা লাগে না!তখন আবার আরেক তান্ডব শুরু করে,ওদের সাথে আব্বুও যোগ দেয়!আহ... কি যে আছে এদের কপালে!!!

বাসা ভর্তি এতো মানুষ যে হাঁটতেও কষ্ট হচ্ছে! এতো হৈ চৈ এর মধ্যে কে যে কাকে ডাকছে,শোনাই যাচ্ছে না। নবনীতা সকাল সকাল গোসল করে,চুল মুছতে মুছতে আম্মুর রুমের বারান্দায় আসল। ভেতর থেকে ছোট খালা ডাক দিলো,
-কইরে নবনী,তাড়াতাড়ি কর,যাবিনা?দেরি করে গেলে তো দুপুরে মধ্যে সেন্টারে পৌছাতে দেরি হয়ে যাবে!
-আসছি খালা।
বলে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। প্রাণপনে চেষ্টা করছে,ভেতরের কান্নাটা আটকে রাখতে,কিন্তু পারছেনা! এই চেহারা নিয়ে ছোটা'পুর সামনে কোনভাবেই যাওয়া যাবে না,কিন্তু নবনী আপ্রাণ চেষ্টা করেও নিজেকে শক্ত রাখতে পারছে না! এমন সময় মেঝ ভাইয়া বারান্দায় আসল,ওকে দেখে পেছন থেকে বলল,
-এই তুই ভেতরে যা তো,আমি এখানে কাজ করবো।
নবনী একই ভাবে দাঁড়িয়ে থেকে বলল,
-ভাইয়া,কাজটা পরে করো,আমি এখন যেতে পারবো না।
নিলয় কিছু না বলে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। নবনীর কন্ঠ শুনে বুঝতে পেরেছে মেয়েটা কাঁদছে! একটা দীর্ঘশ্বাস বেড়িয়ে আসল নিলয়ের বুক থেকে। ধীরে ধীরে বোনের পাশে যেয়ে মাথায় হাত রাখল,নবনী আর পারলো না,হুঁ হুঁ করে কেঁদে ফেলল! নিলয়ের চোখ থেকেও জল গড়াতে লাগল।
-কাঁদিস না!তুই কাঁদলে হৃদি কষ্ট পাবে। আজকে হৃদির জীবনের অনেক খুশীর একটা দিন,আজ আমরা কাঁদলে ওর মনটা খারাপ হয়ে যাবে!
নবনী কাঁদতে কাঁদতে বলল,
-আপু চলে গেলে কে প্রতিদিন আমার সাথে গল্প করবে বলতো?আমি কার সাথে মন খুলে কথা বলবো?ভাইয়া,আমার অনেক কষ্ট হচ্ছে!
-জানিনারে!ও চলে গেলে,আমার ল্যাপটপে মনে করে কে চার্জ দিবে জানিনা!আমার বই খাতা,ডকুমেন্টস গুলো কে মনে করে গুছিয়ে রাখবে জানিনা! তোরা মেয়েরা বোন হয়ে কেন যে এতো কষ্ট দিস...
বলতে বলতে নিলয়ের কন্ঠটা বুজে এলো,নবনীতা কিছু না বলে চোখ মুছলো। ছোট খালা আবারো ডাকছেন! ভালো করে চোখ মুছে নিজের রুমে আসল নবনী। দেখলো হৃদিতা ওর দিকে তাকিয়ে আছে,ইচ্ছে করেই সেদিকে না তাকিয়ে দ্রুত প্রয়োজনিয় জিনিসপত্র আপুর ল্যাগেজে সাজাতে লাগল।
-আপু,তোর আর কি কি লাগবে বল?সবই তো ঢুকিয়েছি,আর কিছু কি বাকী আছে?দেখে নে ভালো করে!
হৃদি কিছু বলল না। নবনী চাইলেও বোনের দিকে তাকাতে পারছে না! খুব কষ্ট হচ্ছে ওর... ফুপি আসল রুমে,
-কিরে রেডি তোরা?ল্যাগেজ সব গোছানো হয়ে গেছে?
-হুম,ছোট'দাকে বল,এগুলো নিয়ে গাড়িতে রাখতে।
বলেই নবনী দ্রুত রুম থেকে বের হয়ে গেল। কিচেনে যেয়ে দেখল,আম্মু চূলোর দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছেন,বুঝাই যাচ্ছে তিনি কাঁদছেন! পেছন থেকে যেয়ে মা'কে জড়িয়ে ধরল নবনী্তা,
-আম্মু,আপুর বিয়ে না দিলে হয় না?
আম্মু কান্না ভেজা গলায় বলল,
-নারে পাগলী,পারলে কি আর কেউ মেয়েকে পরের বাড়ি পাঠায়?তোরাই তো আমার ঘরের প্রাণ।
-আম্মু,আমি কিন্তু কোথাও যাবো না,আগেই বলছি...আমি তোমাকে ছেড়ে কোথাও যাবো না,প্লিজ!
মা-মেয়ের কান্না দেখে কিচেনের দরজায় দাঁড়িয়ে চোখ মুছলেন বাবা। বড় মামা পাশে এসে তার কাঁধে হাত রাখলেন। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কাজে চলে গেলেন দু'জনে।
ফুপি ড্রয়িং রুমে এসে হাঁক ডাকলেন,
-কই ভাবি,কোথায়?হৃদি বের হচ্ছে তো,এদিকে আসেন। নবনী কোথায় তুই?যাবি না পার্লারে? কিরে,তোরা ভাই-বোনেরা সব কোথায় আছিস?
বড় ভাইয়া আগেই কমিউনিটি সেন্টারে চলে গেছেন। বাসায় ছিলো মেঝ আর ছোট ভাই,আর ওরা চার বোন। আস্তে আস্তে সবাই ড্রয়িং রুমে আসল,কেউ কারো দিকে চোখ তুলে তাকাতে পারছে না যেনো! মা চোখ নিচু রেখেই বললেন,
-তাড়াতাড়ি চলে আসিস,বর যাত্রী আসার আগেই। আর সাবধানে যেও সবাই,মোবাইল সাথেই রেখো,যেনো কল দিলে পাওয়া যায়। ঠিক আছে,আমি যাই,ওদিকে অনেক কাজ পরে আছে...
বলতে বলতে মা ঘুরে দাঁড়ালেন, আর তখনই হৃদিতা ছুটে এসে মা'কে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল!
ভাইবোনের সব এক সাথে কাঁদতে লাগল... চোখ শুকনো নেই ফুপি-খালাদেরও! কিছুক্ষন পর ফুপি এসে ভাবিকে সান্তনা দিয়ে বলল,
-ভাবি,আপনি কাঁদলে হবে?আজ মেয়েটার খুশির দিনে মা কাঁদলে কি হয়?শক্ত হোন ভাবি,মেয়ে তো পরের ঘরে যাবেই,এটাই নিয়ম। চাইলেও কি মেয়েকে কোন বাবা-মা পারে আগলে রাখতে?...
বলতে বলতে কন্ঠটা বুঝে এলো ফুপির! আম্মু নিজেকে সামলে নিতে নিতে হৃদিতার কপালে চুমু খেয়ে বললেন,
-বিয়ে হলেই মেয়ে পর হয় না মা,কাঁদতে নেই...হাসি মুখে নতুন জীবন শুরু করতে হয়। আমাদের দোয়া তোর সাথেই থাকবে ইনশাআল্লাহ।
হৃদিতা কাঁদতে কাঁদতে বলল,
-আম্মু,আমি কোথাও যাবো না... আমার দরকার নেই নতুন জীবনের!আমি তোমাদের ছেড়ে থাকতে পারবো না!
মা পরম যত্নে মেয়ের চোখের পানি মুছে দিয়ে বললেন,
-তুই তো দূরে কোথাও যাচ্ছিস না,আমরা সবাই সব সময়ই তোর সাথেই আছি। আর কাঁদবি না,মন থেকে সব কষ্ট ঝেড়ে ফেল...যেখানে যাচ্ছিস,ওরাও সবাই তোর আপনজন,ওরাও তোর জন্য অপেক্ষা করছে,সুতরাং এতো মন খারাপ করার কিছু নেই বরং খুশী মনে নতুন জীবন শুরু কর,ঠিক আছে?
হৃদিতা তবুও মা কে জড়িয়ে ধরে থাকলো,ওর মনে হচ্ছে মা কে ছেড়ে দিলে আর কখনো এভাবে ধরতে পারবে না! কেমন জানি,অবুঝ বাচ্চা মনে হচ্ছে নিজেকে,কিচ্ছুই মানতে ইচ্ছে করছে না,কোন কিছু বুঝতে ইচ্ছে করছে না। নিলয় চোখ মুছে  ছোট ভাই নাফি কে ল্যাগেজ নিয়ে বের হতে বলল,তারপর দুই বোন কে হাত ধরে টেনে নিয়ে চলতে শুরু করলো।

স্টেজে বসে হৃদিতা বারবার এদিক ওদিক তাকাতে লাগল,এতো মানুষ কে দেখছে কিন্তু নিজের ভাই-বোনদের দেখা পাচ্ছে না! বর যাত্রী আসেনি এখনো,সে চাচ্ছে কিছুটা সময় ভাই-বোনদের সাথে হাসিমুখে কাটাতে। এক কাজিনকে পাঠালো সব গুলোকে ধরে আনার জন্য। কিছুক্ষন পর নবনীতা ভাইয়াদেরকে নিয়ে আসল, হৃদিতা নাবিলকে জিজ্ঞেস করলো,
-ভাইয়া,আমাকে আজকে কেমন লাগছে?
নাবিল হাসার চেষ্টা করল কিছু বলল না। তা দেখে মেঝ'পু বলল,
-কিরে কেমন লাগছে বলিস না কেন?সব সময় তো ক্ষেপাতি,সাজলে ওকে পেত্নির মতো নাকি লাগে!
নাবিল ক্যামেরাটা হাত থেকে রেখে বোনের পাশে যেয়ে বসল,আস্তে করে বলল,
-আজকে তোকে অনেক সুন্দর লাগছে,একদম পরীর মতো।
হৃদিতা হাসল ভাইয়ার দিকে তাকিয়ে। একটু দূরে দাঁড়ানো ছোট ভাই নাফি কে জিজ্ঞেস করলো,
-কিরে নাফি তুই তো বললি না,আজ আমাকে কেমন লাগছে?
নাফি লাজুক ভাবে হেসে বলল,
-অনেক সুন্দর লাগছে,একদম পরীর মতো।
হৃদিতার মুখের হাসিটা আরো প্রাণবন্ত হলো। সব ভাই-বোন এক সাথে ছবি তোলার ফাঁকে গল্প করতে লাগল। নবনীতা খেয়াল করলো,হৃদি'পুর মুখে বাসা থেকে আসার সময় যে মন-মরা ভাবটা ছিলো তা আর নেই,খুব হাসছে সবার সাথে। নবনীতার মনটাও খুশীতে ভরে উঠলো আপুর হাসি দেখে। ও বার বার আপুর মুখের দিকে তাকাচ্ছিলো,তা খেয়াল করে বড় ভাইয়া এসে ওর পাশে দাঁড়ালো,আস্তে করে বলল,
-কিরে?কি ভাবিস?তোর সিরিয়াল কবে আসবে সে কথা?
নবনীতা খানিকটা কপাল কুঁচকে ভাইয়ের দিকে না তাকিয়ে বলল,
-তোমার মাথা!আপুকে অনেক সুন্দর লাগছে আজকে তাই না ভাইয়া?
-হুম,আসলেই। বিশ্বাসই হচ্ছে না,সেদিনের ছোট্ট বোনটা আজকে বউ সেজেছে!তুইও ক'দিন পর সাজবি তাই নারে?
-ধুর ভাইয়া!আমার অনেক দেরি আছে,আগে ভাবি আসুক!
নাবিল মৃদু হাসল। নবনীতা খানিক সময় পর আবারো বলল,
-আর কয়েক ঘন্টা পর আপুটা চলে যাবে,আজকের পর আপুটা কিন্তু আমাদের আর থাকবে না,ওর উপর আমাদের থেকেও বেশি অন্যদের দাবী হয়ে যাবে তাই না ভাইয়া?
-বিয়ে হলেই বোনের জন্য সবার ভালোবাসা কমে যায় না,আমাদের ভালোবাসা একই থাকবে,তবে সেটাকে ওর শ্বশুড় বাড়ির সাথে শেয়ার করতে হবে এই যা। এতোদিন আমাদের সব কিছুতে ও সাহায্য করেছে,মানসিক বল কাজ-কর্মে বল,এখন আমাদেরকেও ওকে সব সময় সাহায্য করতে হবে,উৎসাহ দিতে হবে,সাহস দিতে হবে,অনেক বেশি দোয়া করতে হবে ওর জন্য যেনো ও সবাইকে নিয়ে ভালো থাকতে পারে। তাই না?
-হুম,তাহলে আজকে আর ওর সামনে মন খারাপ করে দাঁড়াবো না,কি বলো? ও কি সুন্দর করে হাসছে,সবার সাথে আনন্দ করছে,ওকে এভাবে দেখতেই ভালো লাগছে। আল্লাহ যেনো ওকে সব সময় এভাবেই হাসি-খুশী রাখেন,তাই না ভাইয়া?
বলতে বলতে এক সাথে হেসে উঠলো দুই ভাই-বোন। এমন সময় আব্বুর গলা শুনতে পেলো,
'এই তোমরা কোথায় সব?বর যাত্রী চলে আসছে,নাফি কোথায় তোরা?বাইরে আয় জলদি...'
ভাইয়ারা সবাই দ্রুত চলে গেলো। হলের ভেতর সবাই আরেক দফা প্রস্তুতি নেয়া শুরু করলো। নবনীতা বোনের পাশে এসে বসল,হৃদিতার চেহারায় নার্ভাসনেস ফুঁটে উঠছে,নবনীতা দেখল,আপুর হাতটাও অল্প অল্প কাঁপছে,ওর দিকে তাকিয়ে বলল,
-নবনী,আমি কি ঘামছি?আমাকে কি নার্ভাস দেখাচ্ছে?
নবনীতা মুচকী হেসে বোনের হাতটা চেপে ধরল,কিছু বলল না মুখে। কারণ,তার নিজেরও ভেতরে ভেতরে উত্তেজনা কাজ করছে!! অদ্ভুদ সব অনুভূতি কাজ করছে,যদিও অনুভূতি গুলো সুখকর তবুও মনের ভেতর কোথায় যেনো ছন্দপতন হচ্ছে!

[বোন বিদায় দেয়া অনেক কষ্টকর! :( হোক না অনেক গুলো বোন,তবুও... ]




শুক্রবার, ৪ অক্টোবর, ২০১৩

শূণ্যে দোল খাওয়া...ফিলিং মোগলী!


ঘরে ঝুলানো পর্দা ধরে ঝুলার অভ্যাস কোন কালে ছিলো না ব্যাপারটা এমন না!ব্যাপারটা হলো,ছোট বেলায় 'মোগলী' আর 'টারজান' দেখার প্রতিক্রিয়া স্বরূপ একটা ধারনা মনের ভেতর তৈরী হয়েছিলো,যে 'ওওওঅ' করে চিৎকার দিলে 'টারজান' হওয়া যাবে আর ঘরের দরজায় লাগানো পর্দা ধরে ঝুলার ব্যার্থ চেষ্টা করলে 'মোগলী' হওয়া যাবে!
সেই থেকে পর্দা ধরে প্রথমে শূণ্যে দোল খাওয়ার চেষ্টা থেকে বর্তমানে পর্দা ধরে এ মাথা থেকে ও মাথা পর্যন্ত হাঁটতে হাঁটতে আম্মুর কাছে থেকে এটা-সেটার পারমিশন নেয়া। বেশিরভাগ সময় কাজটা করতে গেলে পর্দাটা 'ঠাশ' করে খুলে পরে যায়। তখন দুই রকমের রিএকশ্যান হয়।
রিএকঃ১ (আম্মু)
'কথা বলতেছিস বল,পর্দা ধরে টানার কি আছে?তুই তো মনে হয় টানতে টানতে কোনদিন পর্দার কাপড়টাই ছিঁড়ে ফেলবি!'
রিএকঃ২ (আমি)
'তোমাকে কতো তোষামদ করা লাগে আম্মু?!!সেই কখন থেকে বলতেছি,বলতে বলতে পর্দাটাই ছিঁড়ে ফেললাম কিন্তু তাও তুমি হ্যাঁ বলতেছো না!আজীব!!!'
এই ধরনের অলীক ধারনা গুলো বা কাজ গুলো জীবনের ছোটবেলার কিংবা কৈশোর কাল পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকাটা স্বাভাবিক এবং উত্তম। কিন্তু কথায় আছে,'আজাইরা কাজ করার কোন বয়স নাই'! কিংবা 'অকাম বুঝে না বয়স-মন'!! তো সেখানে আমার মতো মানুষের আর কি ই বা বলার থাকতে পারে,করার তো দূরের কথা! :P
সদ্য 'ডেঙ্গু জ্বর' থেকে আল্লাহর অশেষ রহমতে মুক্তি পেলাম,শরীর ভালোই দুর্বল বলা যায়। বেশিক্ষন কোন কাজ করলে চোখে অন্ধকার দেখছি,মনে হচ্ছে সারা দুনিয়া ঘুরছে!একদিকে একের পর এক স্যালাইন পুশের যন্ত্রণা তারউপর এন্টিব্যায়োটিক খাওয়ার পর তো এতো দুর্বল লাগে যে কম করে হলেও আধা ঘন্টা শুয়ে থাকতে হয়। এই অবস্থায় সারাক্ষন এটা সেটা খাওয়া নিয়ে একটু পর পর আম্মু হাজির হচ্ছে,বাসায় সারাদিনই কেউ না কেউ 'রোগী দেখা'র হিসেবটা বাড়ানোর জন্য আসছেন। কেউ আসলে পরে সময়টা ভালোই কাটে,তবে উপদেশের পর উপদেশ শুনতে শুনতে আমি বেজায় ক্লান্ত!
যাইহোক,আল্লাহর রহমতে সেদিন সকাল থেকে বেশ ভালো বোধ করছিলাম। মাথা ঘুরছিলো ঠিকই কিন্তু তাও শরীরটা ভালো লাগছিলো। বেশ কিছুক্ষন পড়লাম,ক'দিন পরেই মিডটার্ম পরীক্ষা তাই,তারপর কিছুক্ষন পিসি তে যেয়ে ফেবু-ব্লগে ঢুকলাম,বান্ধবীদের ফোন দিলাম,সুখ-দুঃখের কথা বললাম :P  মাঝখানে আম্মু তার রুম থেকে এলার্ম ঘন্টা বাজালেন,
'কিরে?তুই কি সুস্থ হয়ে গেছিস?তুই চা খাচ্ছিস কেন?তোকে ডাক্তার বলছে,বেশি করে তরল খাবার খেতে,স্যালাইন খেতে আর সে চা খাচ্ছে!দাঁড়া,ডাক্তারকে বলতে হবে আরো ২টা স্যালাইন পুশ করে দেয়ার জন্য!'
কি আর করা?এক বোতল জুস নিয়ে রুমের এই মাথা থেকে ঐ মাথা পর্যন্ত পায়চারী করতে লাগলাম। পায়চারী করতে করতে আবিস্কার করলাম,আমার বিছানা থেকে দরজার পর্দাটা ধরে যদি ঝুলা যায় তাহলে একটানে অনেকদূর যাওয়া যাবে!!! আশ্চর্যজনক ব্যাপার!আমি এটা এতোদিনে খেয়াল করলাম! :O
ভাবতে ভাবতে জুসের বোতলটা টেবিলে রেখে আমি লাফ দিয়ে বিছানায় উঠলাম,আমার সম্পূর্ণ মনোযোগ পর্দা ধরে শূণ্যে দোল খাওয়ার দিকে!কিন্তু বাস্তবে ব্যাপারটা কি ঘটতে যাচ্ছে সেটা ঐ মূহুর্তে আমার মাথা থেকে সম্পূর্ণ ভাবে হাওয়া!!
পর্দাটা ধরে আমি লাফ দেয়ার জন্য রেডী,ঠিক তখনই ঘটল একখান বিপত্তি!একদম সেই রকম বিপত্তি যাকে বলে!
বলা নেই কওয়া নেই,আমার পায়ের ধাক্কায় খাটটা গেল একদিকে সরে,আর আমি শূণ্যে দোল খেয়ে ভূপাতিত হওয়ার পূর্বেই ভূমিতে পতিত হলাম!হাতে ধরা পর্দাটাও যথারীতি খুলে পড়ে গেলো। পুরো বাসায় একসাথে তিনবার 'ধাম' শব্দ হলো!!!! :(
পরবর্তী দৃশ্য গুলো বেজায় স্বাভাবিক দৃশ্য!
রিএকঃ১ (আম্মু)
'তুই কি কোনকালে বড় হবি না?ডেঙ্গু জ্বর থেকে উঠতে না উঠতে তোর এখন হাত-পা ভেঙ্গে বিছানায় শোয়ার শখ হয়েছে না?আমাকে তুই আর কতো জ্বালাবি...ব্লা,ব্লা,ব্লা!'
রিএকঃ২ (পিচ্চি বোন)
'আপু,তুমি কি করতে চাচ্ছিলা?লাফ দিতে চাচ্ছিলা?এভাবে দেয়?আমাকে বলতা,আমি শিখায় দিতাম!' ব্লা,ব্লা!
আমার অবশ্য কোন রিএকশ্যান ছিলো না!কারণ,আমি ততোক্ষনে আবারো চোখে অন্ধকার দেখছিলাম। তবে শেষ মুহুর্ত পর্যন্ত আরেকবার মনে হচ্ছিলো,'আমার আর এই জীবনে মোগলীর মতো শূণ্যে দোল খাওয়া হইলো না!আফসোস!' :(


মঙ্গলবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৩

আমার গল্পটা


রোজ এই শহরে যখন সন্ধ্যে ফুরায়
তখন অনেক গুলো নামহীন গল্পের সমাপ্তি ঘটে,
হয়তো সেখানে আমার গল্পটাও আছে! 
রোজ এই শহরে যখন রাত্রী ফুরায়
তখন অনেক গুলো অশ্রু ভোরের হাওয়ার সাথে মিলিয়ে যায়,
হয়তো সেখানে আমার অশ্রু গুলোও আছে!
আছে তো তাই না?

আমার অনুভূতিগুলো,এই শহরের গল্পে আছে তো,তাই না? 
এই শহরের সব গুলো নামহীন,বর্ণহীন গল্পের মাঝে
আমার গল্পটাও আছে!আমি বিশ্বাস করি!

আমার জমানো দীর্ঘশ্বাস গুলো এখানে আছে
কোন সন্ধ্যের হাওয়া হয়ে অথবা তপ্ত দুপুরের মাঝে
নামহীন আমার গল্পটা জড়িয়ে আছে এখানে
অনেক অনেক সুপ্ত কথা হয়ে!

সময়ের পালাবদলের ভীড়ে
আমার গল্পটা তবু আসে ঘুরে ফিরে
শূণ্যতা আর অধরা সুখের আঁচড় রেখে যায়
এই শহরে!